কী করছ বাবা?

আমার হূদয় খুঁজছি, যা সেই রাতে হারিয়ে গেছে।

তুমি কি ভাবছ তা এখানে খুঁজে পাবে?

আর কোথায় পাব তাহলে? অক্টোবরে যেমন কৃষকরা থোকায় থোকায় জায়তুন সংগ্রহ করে, তেমনি করে আমি জায়তুন জমা করছি নিচু হয়ে।

কিন্তু তুমি তো জায়তুন নয় কিছু নুড়ি পাথর কুড়িয়েছ।

এভাবে মনে মনে কল্পনা করা ভালো অভ্যেস। কে জানে? হতে পারে এই নুড়ি পাথরগুলোই আমার মনের সান্ত্বনা। যখনই কিছু হারিয়ে ফেলি, তখন তা যেন নিজের মধ্যেই খুঁজতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারি। এই খুঁজে বেড়ানোর অর্থ হলো যা হারিয়ে গেছে, তা মেনে নিতে অস্বীকার করা। এ খোঁজার আরেকটি দিক হলো আমি কিছু হারিয়েছি, তবে যা হারিয়েছি তা আর খুঁজে না পাওয়া।

আর কী করছ বাবা?

আমার হূদয়ের মতো দেখতে নুড়ি পাথরগুলো যখন আমি পাই, তখন আঙুলের সাহায্যে সেগুলো শব্দে পরিণত করি। এগুলো আমাকে দূরের মাতৃভূমির সান্নিধ্যে নিয়ে যায়। আমরা তখন এমন একটা ভাষায় পরিণত হই, যা রক্তে-মাংসে গড়া।

আর কিছু কি বলতে চাও বাবা?

আমি বলতে চাই আরো অনেক কিছুই কিন্তু সব শব্দ বুঝি না। যে নারীকে আমি বিয়ের প্রস্তাব দেই, সে অচেনা হয়ে যায়।

যখন তুমি ছোট ছিলে, তখন কি চাঁদকে ভয় পেতে?

সবাই তাই বলে থাকে। কিন্তু চাঁদ তো সব শিশুই ভয় পায়। যদি এমন না হতো! আমি খুব অসময়েই ইয়াতিম হয়েছিলাম। কূপে পড়ার মতো বয়স তখনো হয়নি। কূপটা আমার চেয়ে অনেক উঁচু ছিল। আমার দাদাবাড়ির উঠানের মধ্যখানের তুত গাছের নিচে ছিল কূপটা। যখনই পূর্ণিমা হতো, তখন আমাদের কুকুরটা ঘেউ ঘেউ শুরু করত। যেদিন প্রথম গুলির আওয়াজ শোনা গেল, আমি অবাক হয়ে ভেবেছিলাম নিশ্চয় আশপাশে কোথাও বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। ওরা যখন আমাকে দীর্ঘ কাফেলার দিকে টেনে নিয়ে গেল, তখন চাঁদটাও আমাদের সঙ্গ  দিয়েছিল। পরে জেনেছিলাম আমাদের সেদিন নির্বাসনে যেতে হয়েছিল। ওইদিনই আমি আমার বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিলাম চিরদিনের জন্য। ইশ, যদি এমন না হতো!

আর কি স্মরণ করতে পারো তুমি বাবা?

আমার মনে পড়ে আমি খুব অল্প বয়সে একা ভ্রমণ করতে শিখেছিলাম। আমার মা আমাকে না নিয়ে আকা শহরে গিয়েছিলেন। শুনে আমি খুবই রাগ করেছিলাম। আকা যাওয়ার কত শখ ছিল আমার! বহু বছর আগে এটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল। এত বছর পর আবার সেটি সেই আগের মতোই প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। পাঁচ বছরের ছোট শিশু আমি একাই রওনা দেই আকার পথে।

তুমি কি আকা যাওয়ার পথ চিনতে?

ইটপাথরের রাস্তাটা ধরে পশ্চিম দিকে গেলেই আকা যাওয়া যায়, এমনটাই জানতাম তখন। সেদিন প্রচণ্ড গরম ছিল। উত্তপ্ত আবহাওয়ায় পিপাসায় আমি কাঁদতে শুরু করি কিছুটা পথ পেরোতেই। ক্লান্ত হয়ে বারবার বসে পড়ছিলাম রাস্তার ধারে। ফিরে আসার কথা ভেবেছি অনেকবার কিন্তু হেরে যাওয়ার লজ্জায় ফিরতে পারিনি।

হেরে যাওয়ার অর্থ কী ছিল তখন তোমার কাছে?

কোনো কিছু অনুসন্ধান করে খুঁজে না পাওয়া। কোনো কিছু শুরু করে শেষ না করা। তাই আমি আকার পথে এগিয়ে যেতে থাকি সেদিন। আকা শহরের প্রবেশমুখে বেশ কয়েকটি রাস্তা বিভিন্ন দিকে গেছে। আমি কোন রাস্তা দিয়ে এগোব বুঝতে পারছিলাম না। প্রথমে আমি দক্ষিণে যাই। এটা আমাকে বালুকাময় সাগরতীরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। মা ছিল না সেখানে। এরপর ফিরে এসে আমি উত্তরের রাস্তা ধরলাম। এটা গেছে বৈরুতের দিকে। কিন্তু মা তো বৈরুতের দিকে যায়নি। আবার ফিরে আসি চৌরাস্তার মোড়ে। এরপর যাই পশ্চিমের রাস্তা ধরে। এটা আমাকে আকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে নিয়ে যায়।  একটা দোকানে আমি পানি খেতে চাই। ওরা জানতে চায় আমি কাকে খুঁজছি। বলি, আমার মাকে খুঁজছি আমি।

কীভাবে গ্রামের একটি বালক এমন ব্যস্ত শহরে তার মাকে খুঁজে পাবে?

আমি তো জানি হাজার মুখের ভিড়ে আমি ঠিকই আমার মাকে খুঁজে বের করতে পারব। আমার খুব ভয় লাগতে শুরু করে কারণ একটু পরেই গাঢ় অন্ধকার রাত নামবে তখন মাকে কীভাবে খুঁজে পাব। পাঁচ বছরের ছোট ছেলেকে কখনো কখনো অবশ্যই পরাজয় স্বীকার করে নিতেই হয়। তাই খালি হাতেই ফিরে আসি গ্রামের পথে। তবে অন্ধকারে পথ চলতে পারি না। একটা ট্রাক ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে জানতে চায়, কোথায় যাবে? আমি বলি, ‘বিরওয়া’।

মা ততক্ষণে বাড়ি ফিরে এসেছেন। বাড়ির সবাই এবং প্রতিবেশীরাও আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছে সারা দিন। কোথাও না পেয়ে গ্রামের কূপগুলোয় খুঁজছে। কোনো শিশু হারিয়ে গেলে সবার ধারণা হতো সে নিশ্চয়ই কূপে পড়েছে। মা কাঁদছিল, সঙ্গে আমিও। আমাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে মা কাঁদছে আর আমাকে মারছে। দাদা একসময় আমাকে সরিয়ে নিয়ে যান। মিষ্টি খেতে দেন আমাকে। এভাবেই আমার প্রথম সফর শেষ হয়।

আকা শহরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সেটাই প্রথম। আমি সবসময়ই সে শহরে এমন কিছু খুঁজেছি, যা কখনো পাইনি। মা খুঁজছিলাম অথচ মা ততক্ষণে বাড়ি ফিরে এসেছেন। কয়েক বছর পর আমার প্রেমিকাকে খুঁজতে আমি আকা গিয়েছিলাম। আর তখন তার অন্য একজনের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেছে। ভীষণ দারিদ্র্যের সময় চাকরি খুঁজতেও আকা গিয়েছিলাম। অথচ তখন আমার পরিচিত মানুষের সঙ্গে আমি গেলাম একটা জেলখানায়। সেখানে পেলাম কঠোর হূদয়ের এক জেলার। আকা পৃথিবীর শেষ সীমানা। এখান থেকেই শুরু হয় সংগ্রাম ও ব্যর্থতা। যুগে যুগে ক্ষয়ে গেছে এর প্রাচীরগুলো।

পৃথিবীর শুরুর দিকের কথা মনে আছে তোমার?

আমি একটা অস্পষ্ট আকৃতি মনে করতে পারি, যা আমাকে সহযোগিতা করেছে স্বপ্ন আর কল্পনার হাত থেকে রক্ষা পেতে। এটা বিকশিত হওয়ার সময়েই বিঘ্নিত হয়েছে আমার জ্ঞান হওয়ার পূর্বেই। তাই আবার স্বপ্নেই ফিরে যেতে হয়েছে। একমাত্র স্বপ্নেই আমার অস্তিত্ব নিরাপদ থাকে। স্বপ্ন বা কল্পনাতেই হারিয়ে যাওয়া জিনিস খুঁজে পাওয়া যায়। এ স্বপ্ন কোনো আকাশ কুসুম কল্পনা নয়। খুব পরিমার্জিত আর বাস্তবসম্মত। পৃথিবীকে দেখি একই সঙ্গে পাখি আর পাথরের রূপে।

বাবা, তুমি কেন আমাকে উপেক্ষা করছ? তুমি কি তোমার অতীতের সাথে একটা দূরত্ব রাখতে চাও?

তোমার কাছে এটা স্পষ্ট করতে চাই যে আমি অতীতের সৌভাগ্য থেকে যেমন দূরে থাকতে চাই না, তেমনি অতীতের দুর্ভাগ্যকেও মনে রাখতে চাই না। আমাদের কপাল ভালো যে, আমাদের দেশটি সৌন্দর্যমণ্ডিত আর ন্যায়ভিত্তিক। না, শুধু বঞ্চিত হওয়ার জন্যই তাকে সুন্দর বলছি না। এটা একটা স্বপ্নভূমি, আর এমন একটা দেশের স্বপ্ন দেখা খুবই ন্যায়সঙ্গত। আমরা কোনো হতদরিদ্র দেশের জন্য লালায়িত হচ্ছি না বরং আমরা চাই আমাদের জান্নাতকে। আমরা মানবতার চর্চা করতে চাই আমাদের নিজস্ব ভূমিতেই।

এখানে একটু থামো—

হাজার হাজার প্রাণ উৎসর্গ করেছি, শাহাদাত বরণ করেছি এ দেশের জন্য। এ প্রাণগুলোর সঙ্গে তো প্রতারণা করা যায় না। তাদের মধ্যে এমন অনেকে আছে, যারা কখনো নিজের মাতৃভূমিকে দেখার সুযোগও পায়নি। এক ভালোবাসার রোগে মারা গেছে তারা। মানচিত্র তো এত ভুল হয় না। ইতিহাসও ভুল করে না সবসময়। কেন অসংখ্য নবী-রাসুল, বিজয়ী যোদ্ধা আর দরিদ্র লোকেরা এই মৃত্যুপুরীকেই ভালোবেসে এখানে জমায়েত হয়েছিল? এখানে আছে এক মৃত সাগর। কারণ কাউকে অবশ্যই মরতে হবে এই জান্নাতে। তাহলে এখানকার জীবন কখনো একঘেয়ে হয়ে উঠবে না। ঘন গাছপালায় আচ্ছাদিত জেরুজালেমকে বারবার প্রমাণ করতে হবে যে এখানকার পাথরগুলো জীবন্ত ভাষার অধিকারী। এটাই আমার দেশ। আমার বাবার এক বন্ধু যিনি বৈরুতে থাকতেন, ইয়াফা শহরের লেবুর বাগানে যখন ফুল ফুটত, তখন দূর থেকেই তার গন্ধ পেতেন।

তাহলে এটাই কি হারানো জান্নাতুল ফিরদাউস?

সাবধান! এমন শব্দ ব্যবহার করবে না। এ শব্দ ব্যবহার করার অর্থ কোনো কিছু শেষ হয়ে যাওয়াকে বৈধতা দেয়া। হারানো ফিরদাউস সাধারণ অর্থে যা, ফিলিস্তিনিদের কাছে তা নয়। সাধারণ অর্থে এমন জান্নাতের জন্য আক্ষেপ, যা আর ফিরে পাওয়ার আশা নেই, যেখানে কোনো সংগ্রাম নেই ফিরে পাওয়ার জন্য। যতক্ষণ সংগ্রাম-সংঘর্ষ চলমান, ততক্ষণ বলা যাবে না হারানো ফিরদাউস। এটা এখন দখলকৃত জান্নাত আর এখনো এট মুক্ত করার চেষ্টা চলছে। ফিলিস্তিনিরা হারানো ফিরদাউসের দৃষ্টিতে তাদের মাতৃভূমিকে দেখে না। যেমন আরবরা আন্দালুসিয়াকে দেখে। ফিলিস্তিন আর আন্দালুসিয়ার অবস্থা এক নয়। কিছু দরদি পর্যটক এ দুয়ের মধ্যে মিল খোঁজার চেষ্টা করেন। যদি তোমার অধিকার ছেড়ে দিয়ে এই দখলদারিত্ব মেনে নাও এবং তোমার অস্তিত্বকে বিলীন করে দাও, তবে এই পর্যটকরা তোমার চেয়েও বেশি কাঁদবে। আবার যখন তোমার স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে বুঝিয়ে দেবে আন্দালুসিয়া আর ফিলিস্তিনের মধ্যে পার্থক্যটা, তখন এই অতীত দরদি পর্যটকরাই সবার আগে তোমাকে প্রতিরোধ করবে। কারণ এতে ঐতিহাসিক কবরস্থানের সৌন্দর্য নষ্ট হবে। হারানো ফিরদাউস বা লস্ট প্যারাডাইজের ধারণা তাদেরই কাছে আকর্ষণীয় আর যথোপযুক্ত, খারাপ কোনো কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি তারা দাঁড়িয়ে নেই। যারা ফিলিস্তিনিদের দুরবস্থায় অশ্রু বন্যা বইয়ে দিতে পারে আর যাদের রক্তে দুর্বলতা আছে, তারাই বলতে পারে হারানো ফিরদাউস। এজন্যই আমার মাতৃভূমি জান্নাতুল ফিরদাউসের চেয়েও উত্তম। এটা জান্নাতের মতো, তবে এমন জান্নাত যা ফিরে পাওয়া সম্ভব!

মাহমুদ দারবীশ, জন্ম: ১৩ মার্চ ১৯৪১, মৃত্যু: ৯ আগস্ট ২০০৮

 

[মূল আরবি ‘ইয়াওমিয়্যাত আল হুজন আল আদি’ গ্রন্থ থেকে অনূদিত]

অনুবাদ: তাসনীম আলম