নিজার কাব্বানি

জেরুজালেম

অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী

 

জেরুজালেম! আমার ভালোবাসা, আমার শহর

যতক্ষণ না আমার অশ্রু শুকিয়ে আসে আমি কাঁদি

যতক্ষণ না বাতি নিভু নিভু আমি প্রার্থনায় থাকি

যতক্ষণ না মেঝেতে ফাটল ধরে আমি হাঁটুগেড়ে থাকি

আমি মোহাম্মদ ও খ্রিস্টের কথা জিজ্ঞেস করি

ওহ্ জেরুজালেম-পয়গম্বরদের সৌরভ

পৃথিবী ও আকাশের মধ্যে হ্রস্বতম পথ

ওহ্ জেরুজালেম— আইনের নগরদুর্গ

একটি সুন্দর শিশু পড়ে যাওয়া আঙ্গুল তার

দৃষ্টি আনত

তুমি সন্দিহান মরূদ্যান— যে পথ পেরিয়ে গেছেন পয়গম্বর

বিষণ্ন তোমার পথঘাট

তোমার খনিজ শোকাচ্ছন্ন

তুমি কালো পোশাকের তরুণী-কুমারী

শনিতার সকালে

কে বাজায় যিশুর জন্মের ঘণ্টাধ্বনি

বড়দিনের আগের দিন

কে এনে দেয় শিশুদের খেলনা?

ওহ্ জেরুজালেম, দুঃখের নগর

একটি বৃহৎ অশ্রুবিন্দু চোখের ওপর ভাসে

তোমার ওপর আগ্রাসন কে থামাবে?

ধর্মের মুক্তো তুমি

তোমার রক্তাক্ত দেয়াল কে মুছবে?

কে দেবে বাইবেলের নিরাপত্তা?

কে রক্ষা করবে কোরআন?

যিশুখ্রিস্টকে কে রক্ষা করবে

কে বাঁচাবে মানুষ?

ওহ্ জেরুজালেম! আমার ভালোবাসা, আমার শহর।

কাল লেবুগাছে প্রস্ফুটন হবে

আনন্দে নাচবে জলপাই গাছ

তোমার চোখ নাচবে

অভিবাসী পাখিরা ফিরে যাবে

তোমার পবিত্র ছাদে

তোমার শিশুরা আবার খেলবে

তোমার গোলাপি পাহাড়ে

পিতা ও পুত্রের মিলন হবে

আমার শহর

শান্তি ও জলপাইয়ের নগর।

 

ইয়েহুদা আমিহাই

জায়ন পর্বতে তার ছাগল খুঁজছে

এক আরব রাখাল

অনুবাদ: আলম খোরশেদ

 

জায়ন পর্বতে তার ছাগল খুঁজছে এক আরব রাখাল

অর উল্টো দিকের পাহাড়ে আমি খুঁজছি আমার ছেলে।

একজন আরব রাখাল আর একজন ইহুদি পিতা,

দুজনেরই বসবাস সাময়িক ব্যর্থতায়।

আমাদের দুজনের কণ্ঠস্বর আকাশে গিয়ে একসাথে মেলে,

আমাদের মাঝখানের উপত্যকায় সুলতানের সরোবর।

আমাদের দুজনের কেউই চাই না

ছেলেটি কিংবা ছাগলটি

রাষ্ট্রযন্ত্রের চাকায় আটকা পড়ুক।

 

কিছুক্ষণ পর আমরা তাদের লাশ খুঁজে পাই ঝোপের মধ্যে,

সেই সঙ্গে আমাদের হারানো কণ্ঠস্বরও ফিরে পাই আমরা

যুগপৎ হাসি ও কান্নার।

 

ছাগল কিংবা ছেলে খুঁজে ফেরা থেকেই

একেকটি নতুন ধর্মের উত্পত্তি হয়েছে এ পর্বতাঞ্চলে।

 

[ইয়েহুদা আমিহাই: আধুনিক ইসরায়েলি কবিতার অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর ইয়েহুদা আমিহাইয়ের জন্ম জার্মানির উর্জবার্গ শহরে ১৯২৪ সালে। ১৯৩৬ সালে তিনি পরিবারের সঙ্গে ফিলিস্তিনে অভিবাসী হন। পরবর্তীকালে ইসরায়েলের নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং কালক্রমে সে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবির মর্যাদা পান। তার কবিতায় আমরা আরব-ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব এবং সেই দ্বন্দ্বসম্ভূত যন্ত্রণা ও জটিলতার প্রকাশ দেখতে পাই অত্যন্ত মরমি ও মর্মস্পর্শী ভাষায়।]

জিদি মা’জা

জেরুজালেমে এক ঘুঘু

অনুবাদ: রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী

 

ভোরবেলায়, জেরুজালেমে

আমার হোটেলের জানালার বাইরে

বিরামহীনভাবে ডেকে যাচ্ছিল এক ঘুঘু

 

আমি কান পেতে শুনছিলাম ওই ঘুঘুর ডাক

অনেক অচেনা জবানের মাঝে আরেক জবান

এই কাছের, আবার দূরের

এমনটাই মনে হচ্ছিল সেই ধ্বনি

আমার মুশকিল হচ্ছিল বুঝতে কত দূরে ওটা

যেন বা তা আসছিল কোনো গহিন তলদেশ থেকে

কিংবা আমার কানে পৌঁছচ্ছিল মেঘের ওপর থেকে।

 

ওই ঘুঘুর ডাকটা ছিল বিষণ্ন আর শাশ্বত

হয়তো মৃত্যুর স্থায়িত্বের সমান

নিকটবর্তী এক জায়গায়, পাথরে

আল-আক্সা আর পশ্চিম দেয়াল অভিমুখে

বিভিন্ন বিশ্বাসের রক্তেরা এখনো ধুয়ে-মুছে যায়নি

শুধু ধর্মের খাতিরে, আমি বলব

ঈশ্বর আর আল্লাহ্র প্রেম আমরা কতটুকু পেয়েছি

 

আমি শুনলাম ঘুঘুটির ডাক আরো জোরালো হয়

তবে কান্না হোক, হোক বিলাপের বিস্তার

মাফ করবেন, আমার সঙ্গী মানবজাতি, এখন আমি শুধু চুপ করে থাকতে পারি...

 

(ডেনিস মেয়ারের করা ইংরেজি থেকে)

[জিদি মা’জা: চীনের প্রখ্যাত কবি। তার জন্ম ১৯৬১ সালে সিচুয়ান প্রদেশে। তিনি আদিবাসী গোষ্ঠীর একজন মানুষ।]