ইতিহাসের নানা বড় বড় ঘটনার নেপথ্যে থাকে আরো অনেক ছোটবড় ঘটনা। তার কিছু হয়তো আমাদের মধ্যে চর্চিত, আবার কিছু ঘটনা নিয়ে একদমই আলোচনা হয় না। আবার কিছু ঘটনা, মূল ঘটনার সাথে এমনভাবে যুক্ত যে আপাতদৃষ্টিতে তাকে অবহেলা করলেও একসময় গুরুত্ব ধরা পড়ে। ঠিক এমনই এক রেলযাত্রা হয়েছিল ১০০ বছর আগে, যে ঘটনা পৃথিবীকে এমনভাবে বদলে দিয়েছিল, যে বদলের রেশ ছিল অনেকদিন এবং প্রভাব আজও বর্তমান।
সুইজারল্যান্ড থেকে শুরু হয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গের ফিনল্যান্ড স্টেশনে এসে শেষ হওয়া এ রেলযাত্রাকে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রেলযাত্রা হিসেবে মনে করা যায়। কেননা প্রায় দুই হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এ যাত্রা করে নির্বাসন থেকে বহুদিন পর নিজ ভূমিতে ফিরেছিলেন রুশ বিপ্লবের নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন।
একটি বদ্ধ রেলগাড়ি
বিষয়টা যখন রাজনৈতিক এবং গোপন, তখন এই তৃতীয় পক্ষের লোকজন কাজ করে ছায়ার মতো। লেনিনও সেই পদ্ধতি গ্রহণ করলেন। যেহেতু গ্রেট ব্রিটেন সাহায্য করতে রাজি না, তিনি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে জার্মানির সাথেই আলোচনা শুরু করলেন। মজার ব্যাপার হলো জার্মানি ঠিক এ রকম কোনো কিছুর জন্যই অপেক্ষা করছিল। ফলে এ প্রস্তাব তাদের কাছে ‘মেঘ না চাইতে বৃষ্টি’। কেননা লেনিনের মাধ্যমে রাশিয়ায় যে অস্থির অবস্থা সৃষ্টি হবে, তা জার্মানির জন্য হিতকর। ফলে জার্মানি একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করল, যা সুইস সীমান্ত থেকে লেনিনকে নিয়ে যাবে।
তবে এটিকে ‘ট্রেন’ বললে কিছুটা ভুল হয়। মূলত এটি ছিল রেলগাড়ির একটা কামরা, অর্থাৎ আমরা যাকে বলি ‘বগি’। একটি নির্দিষ্ট বগিতে লেনিন এবং তার সঙ্গীরা থাকবেন এবং একে এমন করে বন্ধ করা হবে যেন তাদের অস্তিত্ব কেউ টের না পায়।
সুইজারল্যান্ড থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট
লেনিন তার স্ত্রী এবং আরো ৩১ জন নির্বাসিত বলশেভিককে নিয়ে একটি সাধারণ সুইস ট্রেনে ওঠেন, যা তাদের জুরিখ থেকে সিঙ্গেন সীমান্ত পার করবে। ফ্রিত্জ প্লাতেন নামে একজন সুইস কমিউনিস্ট তাদের সঙ্গী হয়েছিলেন, যার কাজ জার্মান কর্তাদের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে লেনিনকে এ রাস্তাটুকু নির্বিঘ্নে পার করে দেয়া। মূলত জার্মানি তখন একটা খিচুড়ি বিশেষ ছিল, কেননা সেখানে ছোট ছোট নানা অংশের ভিন্ন নিয়ম নীতি তারা কঠোরভাবে পালন করত। এ যাত্রায় লেনিনকে জার্মানির চারটি ভিন্ন রাজ্যের স্টেশন অতিক্রম করতে হয়েছিল। তাদের ছিল ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম। তাই লেনিনের কামরাটিকে বারবার আলাদা ট্রেনের মাঝে জুড়ে দেয়া হয়েছিল।
যাত্রা এমন করে পরিকল্পনা করা হয় যেন কোনোভাবেই তা চলমান সামরিক কার্যক্রম কর্তৃক বাধা না পায়। সিঙ্গেনে লেনিন ও তার সঙ্গীরা সুইস ট্রেন ত্যাগ করে একটি সবুজ রঙের বগিতে ওঠেন, যা তাদের জন্য তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছিল। পরদিন সকালে কামরাটি একটি ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত হয়, যা তাদের সিঙ্গেনের বাইরে প্রথমে উলমের উত্তর-পূর্ব ও স্টুটগার্ডের উত্তর-পশ্চিমে নিয়ে যায়।
ট্রেনটির জন্য প্রথম বড় স্টেশন ছিল স্টুটগার্ড, যেখানে এটি বিরতি দেয়। অবশ্য ট্রেন থামলেও কোনো যাত্রীর বাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করে কার্সরুহার দিকে। ব্রেট্টেনে ইঞ্জিন বদলে ম্যানহাইমে হয়ে রাইন পার করে আরো একবার ইঞ্জিন বদলে তারা ফ্রাঙ্কফুর্টে পৌঁছলেন।
ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে বার্লিন
সন্ধ্যায় যখন লেনিনের ট্রেনটি বিরতি নিচ্ছিল ফ্রাঙ্কফুর্টের স্টেশনে তখন সেখানে ব্যস্ত সময়। ঘরে ফিরতে থাকা মানুষ আর সেনাদের ভিড়। কোনোভাবে লেনিনের অবস্থানের খবর জানা গেলে তারা ভিড় করে জানতে চান, ‘শান্তি কবে আসবে?’
ফ্রাঙ্কফুর্টে পৌঁছতে দেরি হয়েছিল অনেকটা তাই যে ট্রেনের সঙ্গে বগিটির যুক্ত হওয়ার কথা ছিল তা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী উপযুক্ত ট্রেনের অপেক্ষায় থাকার সময়ে সিদ্ধান্ত হয় যত দ্রুত সম্ভব কামরাটির যাত্রীদের চলার ব্যবস্থা করতে হবে। এমনকি এজন্য রাজপুত্রের ট্রেনকে পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল। পোস্টড্যাম থেকে বার্লিনে প্রবেশের জন্য ট্রেনটিকে ঘুরপথে নিয়ে যাওয়া হয়। এ চলাচলের মধ্যে ফেরি মিস করার জন্য ট্রেনটিকে প্রায় ২০ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
লেনিনের কামরাটি কোন ট্রেনে যুক্ত হয়েছিল, বা এই ২০শ ঘণ্টা সময়ে কী হয়েছিল, জার্মান পররাষ্ট্র দপ্তরের নথিগুলো এ সম্পর্কে ধোঁয়াশা রেখে দিয়েছে। এই ২০ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে পররাষ্ট্র দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল এমন ধারণা করা হয়। সে বৈঠকে এমনকি আর্থার জিম্মারম্যান ও লেনিন ছিলেন এমনো শোনা যায়। রাশিয়ার অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি তত্ত্বের অন্যতম সমর্থক ছিলেন জিম্মারম্যান, এমনকি এই বদ্ধ রেলযাত্রার আয়োজক হিসেবে তার নামও করে কেউ কেউ।
বার্লিন থেকে বাল্টিক
বার্লিন থেকে বেরিয়ে স্টেটিন স্টেশন থেকে ট্রেনটি উত্তরে রুগেন দ্বীপের দিকে যাত্রা করে। মূল ভূমির সাথে যুক্ত একটি ব্রিজ পেরিয়ে যায় ট্রেনটি। তারপর সাসনিৎস পৌঁছে কুইন ভিক্টোরিয়া ফেরিতে ওঠে, যা ৪ ঘণ্টা যাত্রার পর সুইডেনের নিরপেক্ষ অঞ্চল ট্রেলবার্গ পৌঁছে।
এ দীর্ঘ যাত্রার সময় ভিন্ন ভিন্ন ইঞ্জিনের সাথে বগিটি যুক্ত হয়েছিল, কিন্তু সেসব মূল ট্রেন বা ইঞ্জিন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় না বললেই চলে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ইউরোপ এবং খোদ জার্মানির অস্থির অবস্থার মধ্যে এসব নথি ঠিক করে রাখা সম্ভভব হয়নি। এমনকি লেনিনের এ যাত্রার খুঁটিনাটি তথ্য আসলেও রাখা হয়েছিল কিনা তা নিয়েও সন্দেহ থাকে। কেননা লেনিন তার যাত্রার গোপনীয়তা নিশ্চিত করেছিলেন।
তবে একটি নিশ্চিত ধারণা হলো অন্তত একটি ট্রেন, ‘পি৮’ ইঞ্জিন দ্বারা চালিত হয়েছিল। এ রকম আরো ৩ হাজার ৫০০ ইঞ্জিন সে সময়ে জার্মানিতে তৈরি হয়। এ ৪-৬-০ ধাচের ইঞ্জিন একসাথে প্রায় ১৪টি কোচ বা বগি টানতে সক্ষম ছিল। এখনো অন্তত ১০টি এ ধরনের ‘পি৮’ ইঞ্জিন জার্মানি, বেলজিয়াম, পোল্যান্ডের নানা জাদুঘরে রাখা আছে।
সুইডেন
সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দলটি যখন ট্রেলবার্গে পৌঁছে, তখন মোটামুটি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার অবকাশ হয়েছিল। কেননা এ অঞ্চল তুলনামূলক নিরাপদ। এখানে সুইডেনের সমাজতন্ত্রী এবং মেয়রের তরফ থেকে তারা উষ্ণ অভ্যর্থনা পান। পরবর্তী গন্তব্য ছিল মালামো। একটি সাধারণ ট্রেন ঠিক ১৫ মিনিটের মাথায় লেনিন ও তার দলকে নিয়ে মালামোর উদ্দেশে যাত্রা করে।
মালামোয় দলটি কেবল হাত-পা ছেড়ে বিশ্রাম নেয়ার অবকাশই পায় না বরং তারা ভোজে আমন্ত্রিত হয়। লেনিন নিজেও কিছু জামাকাপড় কেনেন। কিন্তু তিনি সেসব কালোবাজারির সঙ্গে সাক্ষাতে রাজি হননি, যারা এর আগে তার এ যাত্রার মধ্যস্থতায় ভূমিকা রেখেছিল। পরবর্তী দিনে একটি র্লিপার কোচে চড়ে তারা ৬০০ মাইল দীর্ঘ পরবর্তী যাত্রা করেন। এ যাত্রার ইঞ্জিন ছিল ‘এফ ক্লাস ৪-৬-২ প্যাসিফিকস। ১৯১৪-১৬ পর্যন্ত সুইডেনে এ ধরনের স্টিম ইঞ্জিন তৈরি হতো।
ফিনল্যান্ড
তর্নিয়োনকি নদীর মোহনায় ফিনল্যান্ডের অবস্থান। এ সময়ে ফিনল্যান্ডের ‘গ্র্যান্ড দুকি’ মূলত রাশিয়ার অধীন একটি আধা স্বাধীন প্রদেশ ছিল। লেনিনের ভয় ছিল এখানে বাধা পাওয়ার। তর্নিয়োতে কর্মকর্তারা তাদের পুঙ্খানুপুঙ্খু তাল্লাশি এবং প্রশ্নবাণে জর্জরিত করেও তাদের বাধা দেয়ার মতো কিছু করতে পারলেন না।
এরপর একটি সাধারণ সার্ভিস ট্রেন দক্ষিণ দিকে যাত্রা করে বরফে আবৃত ধূসর ভূমির ওপর দিয়ে পাইন বনের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে। রাজধানী হেলসিঙ্কি বাদ দিয়ে শিল্প শহর তাম্পেরে ছুঁয়ে কেরেলিয়ার বেলুস্ত্রভে রাশিয়ার সীমান্তে পৌঁছে। এ সময় সাধারণ কম্পার্টমেন্টের কাঠের আসনে বসে লেনিন ও তার দল এই ভেবে আতঙ্কিত হচ্ছিলেন যে রাশিয়ায় হয়তো স্টেশনে তাদের জন্য একদল কশাক অপেক্ষা করছে। পৌঁছতেই তারা আক্রমণের শিকার বা গ্রেফতার হবেন।
কিন্তু বাস্তবে তারা যখন সেখানে পৌঁছলেন তখন কয়েক মাইল দূরের একটি প্লান্টের শ্রমিকরা তাদের জন্য আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। তারা লেনিনকে কাঁধে তুলে নিয়ে হর্ষধ্বনি দিলেন। যাত্রার এ অংশের যান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়। এ যাত্রায় ব্যবহূত ইঞ্জিন ৪-৬-০ ধরনের ছিল, যা রিচমন্ড লোকোমোটিভ ওয়ার্কসে তৈরি।
রাশিয়া
বেলস্ট্রভ থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গের দূরত্ব সামান্যই। কিন্তু এটুকু যাত্রার শঙ্কা ছিল সবচেয়ে বেশি। লেনিন ও তার দল ভাবছিলেন রাজধানীতে নিশ্চয়ই বাধা পাবেন। কিন্তু সেখানে স্টেশনে তাদেরই সমর্থকরা অপেক্ষা করছিল। ইঞ্জিনের সামনের তিনটি বাতির আলো দেখতে না দেখতেই স্টেশনের সেই মানুষের মাঝে কোলাহল তৈরি হয়। কয়েকজন সৈন্য একত্র হয়; ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানের পাশাপাশি মিলিটারি ব্যান্ড বাজানো হয়। এখানেও যথারীতি কমরেড লেনিনকে কাঁধে তুলে জয়ধ্বনি করা হয়েছিল। তারা সবাই বিশ্বাস করত, তাদের ‘মুক্তিদাতা’ এসে পৌঁছেছেন।
এ অভাবনীয় বিজয়ের পর আর ওই বদ্ধ রেল-কামরার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু রেলের সঙ্গে লেনিনের সংযোগ কেবল এই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরবর্তী সময়ে জার্মানির সাথে লেনিনের চুক্তি এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে জনতার মধ্যে প্রতিবাদ ও আন্দোলন শুরু হলে লেনিনের আবার গা ঢাকা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। তাকে বেলুস্ত্রভ থেকে দূরে একটি দ্বীপে প্রেরণ করা হয়।
পরে এ প্রতিবাদ থেমে গেলেও লেনিনের ফিরে আসার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হয়। কেননা তাকে আবার রাশিয়ার সীমান্ত পার করতে হবে। এ পর্যায়ে লেনিন একজন ফায়ারম্যানের ছদ্মবেশে একটি ট্রেনে উঠে পড়েন। যে ট্রেনের চালকের সহায়তায় কাজটি সম্ভব হয় সেটি ছিল একটি ‘এইচ ২ ক্লাস’ ২৯৩ নং। ট্রেনটি এখনো ফিনল্যান্ড স্টেশনে প্রদর্শিত হয় এবং পাশাপাশি ‘ইউ১২৭’ নামে একটি ইঞ্জিন যেটি ‘লেনিনস লোকোমোটিভ’ নামে পরিচিত, মস্কোর জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। এটি একটি ‘ইউ ক্লাস ৪-৬-০ সিলিন্ডার’ ডি গ্লেন কম্পাউন্ড, যা ১৯১০ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে তৈরি হয়েছিল।
এভাবেই একটি দীর্ঘ রেলযাত্রার মাধ্যমে লেনিন স্বদেশে ফেরেন এবং তার এই ফিরে আসার পরই রাশিয়ার চেহারা বদলে যায়। দীর্ঘ এই রেলযাত্রা যেমন ছিল শঙ্কাময়, তেমনি ছিল ক্লান্তিকর। তবু সব ক্লান্তি আর শঙ্কা পার করে লেনিন রাশিয়ায় পৌঁছেছিলেন আর সৃষ্টি করেছিলেন নতুন ইতিহাস। তাই লেনিনের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এই রেলযাত্রা। পাশাপাশি রেল ব্যবস্থা ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বদলের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিল।
নোট:
৪-৬-০, ৪-৬-২; ইত্যাদি মূলত বিংশ শতাব্দীর রেল ইঞ্জিনের ধরন, যা চাকা এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর নির্ধারণ করে এ রকম সংকেতের মাধ্যমে সংক্ষেপে লেখা হতো।
মাহমুদুর রহমান: লেখক




