১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন নিশ্চিত হয়েছিলেন যে মিত্র শক্তিগুলো তাকে এবং তার সহযোদ্ধাদের রাশিয়ায় যেতে দেবে না। তবে তখনো দুটি সম্ভাবনা বিদ্যমান ছিল—হয় আমরা জার্মানি দিয়ে অবৈধভাবে যাওয়ার করার চেষ্টা করতে পারি, অথবা আমরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ভ্রমণ করতে পারি।

ড. ডিনহার্ডের মাধ্যমে আমরা জার্মান রাষ্ট্রদূত রোমবার্গকে জিজ্ঞেস করলাম যে জার্মানি রাশিয়ার নির্বাসিত নেতাদের তার ভূখণ্ড দিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেবে কিনা। জবাবে রোমবার্গ বার্লিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতামত জানার চেষ্টা করলেন। তার উত্তর ছিল আমাদের অনুকূলে। তারপর আমরা যে শর্তের ভিত্তিতে জার্মানির ওপর দিয়ে যেতে চাই, তা বিস্তারিত বললাম। মূল শর্তগুলো ছিল নিম্নরূপ—জার্মান সরকারকে সব আবেদনকারীর নাম না জিজ্ঞেস করেই যাওয়ার অনুমতি দিতে হবে; যাত্রীদের উচ্চ পর্যায়ের নিরাপত্তা দিতে হবে এবং যাত্রা চলাকালীন কেউ তাদের সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনায় যাওয়ার সুযোগ পাবে না। এ শর্তগুলো দিয়ে আমরা সুইস সমাজতান্ত্রিক দলের ডেপুটি রবার্ট গ্রিম এবং আমাদের রাজনৈতিক সহযোগী কমরেড প্লাটেনকে রোমবার্গের কাছে পাঠালাম। জার্মান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের পর আমরা ট্রেড-ইউনিয়ন চত্বরে দেখা করি। আমাদের শর্তগুলো দেখার পর জার্মান রাষ্ট্রদূত কতটা বিস্মিত হয়েছিলেন গ্রিম তা বর্ণনা করছিল। জার্মান রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, ‘আমি তো রাশিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার অনুমতি নিচ্ছি না, বরং মি. উলিয়ানভ এবং অন্যরা আমার কাছে জার্মানির ভেতর দিয়ে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছেন। এখানে আমরাই শর্ত চাপিয়ে দেয়ার অবস্থানে রয়েছি। অথচ উল্টো আপনারাই কিনা আমাদের ওপর শর্ত দিচ্ছেন।’ তবু তিনি বার্লিনের কাছ থেকে আমাদের দাবি আদায় করে নিয়েছিলেন।

এক সময় জার্মান ট্রেনে আমাদের যাত্রা হলো। এটি ছিল একটি উদ্বেগজনক মুহূর্ত, যা আমার স্মৃতিতে রয়ে গেছে। জার্মান অফিসাররা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তারা আমাদের কাস্টমস হলে নিয়ে গিয়েছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী তারা আমাদের কাগজপত্র চাওয়ার অধিকার রাখত না। কাস্টমস হলে তারা পুরুষ ও নারীদের পৃথক করে রেখেছিলেন, যেন আমরা পালিয়ে যেতে না পারি বা কোনো বলশেভিককে কোনো জার্মানের সঙ্গে পাল্টে দিয়ে বিপ্লবের বীজবপন করা সম্ভব না হয়।

অবশেষে আমরা যখন কোচে স্থির হয়ে যাত্রা করলাম, তখন ভ্লাদিমির ইলিচের সঙ্গে আমাদের সমস্যা হতে শুরু করল। আমরা তাকে ও নাদেজদা ক্রুপস্কায়াকে একটা পৃথক বগিতে রেখেছিলাম, যাতে তিনি শান্তিতে কাজ করতে পারেন। তবে ভ্রমণের সময় আমরা তাকে বেশি কাজ করতে দিইনি! পাশের বগিতে কমরেড সাফারভ, তার স্ত্রী কমরেড ওলগা রভিচ, ইনেসা আরমান্দ ও আমি ছিলাম। এ সময় আমরা সাফারভের সঙ্গে সুবিধাবাদ নিয়ে বিতর্ক না করলেও সবাই বগিতে প্রচুর শব্দ করছিলাম। সন্ধ্যার শেষ দিকে ইলিচ আমাদের বগিতে আসলেন এবং কমরেড ওলগা রভিচকে বের করে দিলেন। কারণ তিনি ভেবেছিলেন যে সে ও আমি মূলত এ গোলমালের জন্য দায়ী। সত্যি বলতে কমরেড ওলগা সর্বদা দলের প্রতি একজন মনোযোগী সদস্য ছিলেন। আমি একাই মূলত গল্প বলছিলাম। তাই আওয়াজ করার জন্য প্রকৃত দোষী ছিলাম আমি।

ইলিচ পুরো সফরজুড়ে কাজ করেছেন। তিনি পড়ছিলেন, নোটবুকগুলোয় ঢুঁ মারছিলেন, একই সঙ্গে সাংগঠনিক প্রশ্নগুলোর প্রতিও মনোযোগী ছিলেন।

সম্ভবত এটি ছিল কার্লস্রুয়া, যেখানে প্লাটেন আমাদের জানিয়েছিল যে জনসন নামের জার্মান ট্রেড-ইউনিয়ন নেতৃত্বের একজন সদস্য ট্রেনে আছেন এবং তিনি লেজিয়েন ও জার্মান ট্রেড-ইউনিয়নের নেতাদের কাছ থেকে আমাদের জন্য শুভেচ্ছা বার্তা এনেছেন। ইলিচ বললেন, সে জাহান্নামে যাক এবং তার সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করলেন। যেহেতু জনসন আমাকে চিনতেন এবং আমি একজন অস্ট্রিয়ান হয়ে লুকিয়ে সফর করছিলাম। তাই কমরেডরা ভয় পেয়েছিল যে আমি তাদের সঙ্গে সফর করছি বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাবে। শুরু থেকেই আমার ভাগ্য লিখন এটাই ছিল যে জার্মানির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কমরেড চিচেরিনের জন্য আমি সমস্যা সৃষ্টি করছিলাম। তাই আমি লাগেজের বগিতে লুকিয়ে পড়লাম এবং প্রায় ৫০টি সংবাদপত্র সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম, যাতে আমি চুপ করে থাকতে পারি এবং কোনো কেলেঙ্কারি না ঘটে। প্লাটেন জনসনকে আমাদের সঙ্গে থাকা জার্মান অফিসারদের গাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল। এ মনোমালিন্য সত্ত্বেও তিনি আমাদের জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। প্রতিটি স্টেশনে আমাদের জন্য জার্মান পত্রিকা কিনেছিলেন এবং প্লাটেন যখন তাকে এর মূল্য ফেরত দিয়েছিল, তখন তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন।

ফ্রাংকফুর্টে ট্রেনটি দীর্ঘ সময়ের জন্য থামে এবং প্লাটফর্মটি সামরিক বাহিনী দ্বারা সিল করে দেয়া হয়। হঠাৎ কর্ডনটি ভেঙে গেল। জার্মান সৈন্যরা আমাদের দিকে ছুটে এল। তারা শুনেছিল যে রাশিয়ার শান্তিকামী বিপ্লবীরা এ ট্রেনে যাচ্ছে। তাদের প্রত্যেকে দুহাতে বিয়ারের জগ ধরেছিল। উত্তেজনায় তারা আমাদের জিজ্ঞেস করেছিল কখন শান্তি আসবে।

এ ঘটনার পর সফরের মধ্যে আমরা আর কাউকে দেখিনি। বার্লিনের প্লাটফর্মটি পুলিশ কর্তৃক কর্ডন করা ছিল। সুতরাং আমরা সাসনিটজ পর্যন্ত এগিয়ে চললাম। সেখানে আমরা একটি সুইডিশ স্টিমারে আরোহণ করলাম। এখানে আমাদের স্বাভাবিক আনুষ্ঠানিকতা মেনে চলার প্রয়োজন হয়েছিল এবং একটি প্রশ্নপত্র পূরণ করতে বলা হয়েছিল। ইলিচ এটাকে একটি ফাঁদ হিসেবে সন্দেহ করেছিলেন। তাই তিনি আমাদের ছদ্মনাম ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা পরে একটি মজার ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করেছিল। স্টিমারের রেডিও ট্রেলেবার্গে আমাদের কমরেড গানেটস্কির কাছ থেকে একটি প্রশ্ন পেয়েছিলেন যে স্টিমারে উলিয়ানভ নামে কেউ আছে কিনা। স্টিমারের ক্যাপটেন পূরণ করা প্রশ্নপত্র থেকে জানতেন যে দলে কোনো উলিয়ানভ নেই। তার পরও তিনি আমাদের জিজ্ঞেস করলেন উলিয়ানভ নামে সত্যিই কেউ আছে কিনা। ইলিচ দীর্ঘক্ষণ ইতস্তত করলেন, তারপরে স্বীকার করে নিলেন যে তিনিই উলিয়ানভ। গানেটস্কিকে এ সময় আমাদের আগমনের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল।

ট্রেলেবার্গে আমরা নিজেদের ব্যাপারে খুবই আকর্ষণীয় ইমেজ তৈরি করেছিলাম। গানেটস্কি আমাদের সবাইকে রাতের খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ভ্লাদিমির ইলিচ কিছুই খেলেন না। তিনি রাশিয়ার বিপ্লব সম্পর্কে গানেটস্কি থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু গানেটস্কি কিছুই জানত না। পরদিন সকালে আমরা স্টকহোমে পৌঁছলাম। সুইডিশ কমরেড, সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফাররা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। সেই সময় তিনি আমাদের খাঁটি সুইডিশ বাম সমাজতান্ত্রিক হিসেবে অভিবাদন জানালেন এবং আমাদের সম্মানে যে সকালের নাশতার আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে স্টকহোমের সম্মানিত ও সংবেদনশীল মেয়র লিন্ডেগেনের সঙ্গে পাশাপাশি বসলেন।

এটি সম্ভবত আমাদের প্রকৃত সুইডিশ কমরেডদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, যা আমাদের মধ্যে উৎসাহ জুগিয়েছিল এমন কিছু করতে, যেন ইলিচকে দেখতে আরেকটু সভ্য মানুষের মতো লাগে। আমরা তাকে কমপক্ষে কিছু নতুন বুট কিনতে প্ররোচিত করলাম। তিনি ছেঁড়া পাহাড়ি জুতো নিয়ে চলাচল করছিলেন। আমরা তাকে বললাম, যদি তিনি এ বুটগুলো দিয়ে সুইস বুর্জোয়া শহরগুলোর ফুটপাত নষ্ট করতে চান, তবে করুন। কিন্তু তার বিবেক তাকে অবশ্যই ধ্বংসের এ সরঞ্জামগুলো পেট্রোগ্রাদে নিতে বারণ করবে। কারণ সেখানে সম্ভবত কোনো ফুটপাত বাকি নেই।

স্থানীয় রীতিনীতি ও পরিস্থিতি সম্পর্কে জানে এমন এক ইহুদি শ্রমিক চ্যাপিনকে নিয়ে আমি ইলিচের সঙ্গে স্টকহোমের একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে গেলাম। সেখানে আমরা ইলিচের জন্য কিছু জুতো কিনলাম এবং আরো কিছু পোশাক কেনার জন্য তাকে পীড়াপীড়ি করলাম। তিনি যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং আমাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তিনি পেট্রোগ্রাদে তৈরি পোশাকের দোকান খুলতে চলেছেন আমরা তাই ভাবছি কিনা। অবশেষে আমরা হার মানলাম। তবে তাকে এক জোড়া ট্রাউজার উপহার দিলাম। আমি সেই ট্রাউজার জোড়া তখনো পরতে দেখেছি, যখন আমি অক্টোবরে পেট্রোগ্রাদে এসেছিলাম। বলাবাহুল্য যে রাশিয়ান বিপ্লবের প্রভাবে তাদের করুণ অবস্থা হয়েছিল। স্টকহোমে পারভাস নামক এক ব্যক্তি জার্মান সামাজিক গণতন্ত্রের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিনিধি হিসেবে লেনিনের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে ইলিচ কেবল তার সঙ্গে দেখা করতেই অস্বীকার করেননি, সুইডিশ কমরেডদের সঙ্গে মিলে আমাকে, ভরভস্কি ও গানেটস্কিকে এ প্রচেষ্টার আনুষ্ঠানিক রেকর্ড তৈরি করার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। পুরো দিনটি আলোচনায় কেটে গিয়েছিল। আমরা এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম। তবে লেনিন চলে যাওয়ার আগে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সংঘটিত হয়েছিল।

পুনরায় যাত্রার মুহূর্তটি ঘনিয়ে আসছিল। স্টকহোমের সুইডিশ কমরেড ও রাশিয়ান উপনিবেশের একটি অংশের সঙ্গে আমরা একসঙ্গে রেজিনা হোটেল থেকে স্টেশনে গিয়েছিলাম। যখন আমাদের কমরেডদের প্রায় সবাই ট্রেনে উঠে পড়েছেন, তখন এক রাশিয়ান লোক তার টুপিটি খুলে লেনিনের কাছে গিয়ে তার অনুভূতি জানালেন। কথার শুরুতে লোকটি যে আবেগ দেখিয়েছিলেন, তাতে লেনিনকে ‘আমাদের প্রিয় নেতা’ বলে সম্বোধন করেছিল সে। লেনিন এতে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু লোকটি তার রাগকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। লোকটি যা বলতে চেয়েছিলেন তার সারমর্মটি ছিল এ রকম—প্রিয় নেতা, নিজের যত্ন নেবেন। পেট্রোগ্রাদে আপনাকে যেন কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়তে না হয়। আবেগ উদ্বেলিত লেনিন লোকটির কথার প্রথম বাক্যের প্রশংসাসূচক অংশটিকে একটি মুচকি হাসির নিচে চাপা দিতে চেয়েছিলেন। ট্রেন চলতে শুরু করেছিল। আমরা তখনো হাসিটি দেখতে পাচ্ছিলাম।

 

কার্ল রাদেক (১৮৮৫-১৯৩৯): পোলিশ ও জার্মান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনের কর্মী। সিলড ট্রেন যাত্রায় লেনিনের সহযাত্রী ছিলেন।