বেঁচে থাকার কিছু কারণ থাকতে হয়। তার সব কারণ ফুরিয়ে গেছে মনে করে একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল সত্যব্রত। ১৮-১৯ বছর আগের ঘটনা। ৮৪টা ফ্রিজিয়াম একসঙ্গে পানি ছাড়া গিলে ফেলেছিল। সেলফোনের যুগ নয় সেটা। ল্যান্ডফোন, কয়েনবক্সের যুগ। নিউমার্কেটের ফোন বুথ থেকে আইনুল একদিন ফোন করেছিল নূর ইসলাম স্যারের নম্বরে। স্থানীয় কলেজের জুলজির ইনস্ট্রাক্টর। চিরকুমার ও শৌখিনদার ব্যক্তি নূর ইসলাম স্যার। ছোটখাটো সাইজের মানুষটা। কোট-প্যান্ট পরে থাকেন দিনমান। চোখে সুরমা দেন। শিপারের চাচা হন সম্পর্কে। ফোন করলে বিরক্ত হন না। শিপার বাসায় থাকলে ডেকে দেন।

সেই সন্ধ্যায় বাসায় ছিল শিপার।

সত্যব্রতর কাহিনী শুনে আইনুল বিস্মিত হয়নি। এ রকম করতেই পারে পাগলাটা। ইমোশন্যাল এত। বলে, শিব ও কালীকে দেখতে পায়। হিন্দুদের দেবাদিদেব মহাদেব শিব ও নৃমুণ্ডমালিনী দেবী মাতা কালী। কথা বলতে বলতে চেঁচিয়ে ওঠে হঠাত্, ‘জয় মা তারা! মা! মাগো!’ মা তারা হলেন মা কালী। স্কুল লাইফ থেকেই এ রকম সত্যব্রত।

শিপার বলেছিল, ৬৩টা ফ্রিজিয়াম খেয়েছে পাগলটা।

পরের শীতে আইনুল গেছে শহরে। মড়ার টিলা রোড ধরে এক বিকালে সত্যব্রতকে নিয়ে লিপিদের বাসায় যাচ্ছিল।

‘৬৩টা ফ্রিজিয়াম! পানি ছাড়া কী করে গিলে ফেললি তুই!’

‘৬৩টা না তো! এ মা! ৬৩টা কে তোকে বলল?’

‘শিপার।’

‘ভুল বলেছে। ৬৩টা নারে, ৮৪টা! ৮৪টা! জয় মা তারা! মা! মাগো!’

পরের ১৮-১৯ বছরে উল্লেখযোগ্য কম ঘটনা ঘটেনি। পৃথিবীর হিসাব ধরলে সেলফোন, ইন্টারনেটের কথা বলতেই হয়। খোলনলচে পাল্টে গেছে পৃথিবীর। আর ব্যক্তিগত হিসাব ধরলে?

বয়স্ক ব্যক্তি এখন সত্যব্রত, আইনুলরা।

তাদের মধ্যে প্রথম বিবাহিত হয়েছে শিপার এবং দুই বাচ্চার বাবা হয়ে গেছে। দ্বিতীয় সত্যব্রত। তবে তার এখনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি। আইনুল বিয়ে করেছে দেরিতে। দুই বছর হয়েছে মাত্র। দুই বছরেই মাথায় উঠে গেছে সব। আইনুলের বউ পলা বিরাট সংস্কৃতিকর্মী। আইনুল হকের বউ পলা হক হয়নি। নয়ীম নূরের মেয়ে পলা নূর আছে। আইনুল তার একান্ত ব্যক্তিগত কথা শেয়ার করে একমাত্র ফরিদের সঙ্গে। ফরিদও বিবাহিত এবং বাবা হয়ে গেছে। এক ছেলে। আইনুল তাকে ফোন করে একদিন অতি দুঃখিতভাবে বলেছে, ‘জ্যানথিপির পুনর্জন্ম হয়েছে, বুঝেছিস? সক্রেটিসের বউ জ্যানথিপি। চিরকালের সেরা খাণ্ডারনি।’ চিরকালের খাণ্ডারনি শুধু! ইংলিশে ‘জ্যানথিপি’ শব্দটাই এসেছে ওই মহিলার নাম থেকে। এ শব্দের বাংলা খাণ্ডারনি! বিবাহিত আইনুলের অত্যন্ত ফেভারিট রেফারেন্স এটা।

আজ রোববার। ১৩ অক্টোবর। সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগে। দেশের অন্যত্র এর মধ্যে শীত পড়তে শুরু করে দিয়েছে। কুয়াশাচ্ছন্ন দিনাজপুরের একটা রাস্তার ছবি আজ ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। সকালে দেখে মুগ্ধ হয়েছিল আইনুল। পীড়নের রাতের পরও। পীড়নের রাত। আজ মিতিলতার জন্মদিন যাচ্ছে। নাম কিরে ভাই! মিতিলতা! প্রথমবার শুনে মনে হয়েছিল আইনুলের।

‘আমি মিতিলতা।’

মিতিলতা মানে কী? বাংলা শব্দ? বাংলা শব্দ। অভিধানে আছে। অর্থ, জ্ঞানলতা। মিথিলতা জ্ঞানলতাই। ফিজিকসে পড়ে। মিতিলতা আইরিন। বন্ধুরা ডাকে মিতিলতা আইরিনস্টাইন। আইনুলের সঙ্গে কী করে কী করে একটা মজার সম্পর্ক হয়ে গেছে এ বাচ্চাকাচ্চা আইরিনস্টাইনের। গতকাল রাত জিরো আওয়ারে মিতিলতাকে উইশ করেছিল আইনুল। টেক্সট মেসেজ পাঠিয়ে।

পৃথিবীর অপরূপা ‘চশমাপরা’

রাজকন্যাদের একজন

শুভ জন্মদিন!!!

টেক্সট করে ঘুমিয়ে পড়েছিল আইনুল।

পলা ওঠাল।

‘কী এসব?’

‘কী এসব মানে?’

ঘুম চোখে বুঝতে পারেনি, তরাসে ঘুম কেটে যেতে আইনুল দেখল, তার সেলফোন সিজ করেছে পলা। হিসহিস করে বলল, ‘রাজকন্যা! হ্যাঁ? চশমাপরা রাজকন্যা! অ্যাফেয়ার! তলে তলে অ্যাফেয়ার জমে উঠেছে!’

‘কী বলছ তুমি?’

‘রাজকন্যা রিপ্লাই দেয় আবার! থ্যাংক ইউ, আব্বু!... আব্বু! ছি! ছি! বাবা ডেকে গলায় ঝুলে পড়ার ফিকির! হারামজাদী! কুত্তী!... তোর কী? তোর কী? তোর কি লজ্জা-শরম নাই একটুও? বয়স কত তোর রাজকন্যার? চশমাপরা রাজকন্যার?’

‘তুমি এ রকম কেন, পলা?’

‘কী রকম? আমি কী রকম? আমি কী রকম তোকে দেখাচ্ছি। তোকে আমি চিনে ফেলেছি, বুঝেছিস। তোর চেহারা চিনতে আমার বাকি নাই আর! বেজন্মার বেজন্মা! কচি মেয়ে দেখলেই হয়ে যায় না? তুই তলে তলে এসব করবি আর আমি চুপ করে থাকব নাকি, হ্যাঁ? আমি কী রকম বলছিলি না? এই দেখ আমি কী রকম?’

আইনুলের গলা টিপে ধরেছিল পলা। মেরে ফেলবে।

পাগল! উন্মাদ! বিয়ের দু-এক মাস পরই পলার মাকে সরাসরি বলেছিল আইনুল, ‘আপনার মেয়ে তো একটা ফ্রিক! উন্মাদ। এর তো চিকিত্সা করানো দরকার।’

আজ আইনুল অফিসে যায়নি। কালও যাবে না, পরশুও যাবে না। আর কখনই যাবে কিনা নিশ্চিত নয়। আর কত! ভালো লাগে না। শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিয়েছে দিনটা। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুবাদে পলা দিনের বেশির ভাগ সময়ই বাসায় থাকে না। সকালে সংস্কৃতি রক্ষা করতে বের হয়, ফেরে রাত ১১টা, ১২টা, ১টায়। বলার কিছু নেই আইনুলের। বরং সে এ ব্যাপারটায় খুশি। সংস্কৃতিকর্মী বউ হলে ভালো। দিনের কিছুটা সময় অন্তত একা স্বস্তিতে থাকা যায় কিছুটা।

পলা বাসায় না থাকার কারণে মন্দ কাটেনি আজকের দিনটা। বুড়ি বুয়ার বিস্বাদতম রান্না খেয়েও মন্দ কাটেনি। ছুটা বুয়া। মেয়েকে নিয়ে এসেছিল একদিন। মেয়েটার সঙ্গে সে কী আচরণ পলার! রাতে ধরেছিল আইনুলকেও, ‘বুয়ার মেয়ের দিকে চোখ গেছে না? তোমার কি চোখের লজ্জাও নাই! শেষ পর্যন্ত বুয়ার মেয়ে! ছি! ছি-ছি-ছি!’

সন্ধ্যার আগে আগে বুয়া চলে যায়। চলে গেছে। পলা এখনো বাসায় আসেনি। সাংস্কৃতিক হিসেবে তো এখনো সন্ধ্যাই হয়নি। কিছু আনন্দিত আইনুল কিছুক্ষণ শুয়ে-বসে টেলিভিশন দেখেছে। কি বাংলা, কি ইংলিশ, কি হিন্দি, একটা চ্যানেলে দেখার মতো কিছু নেই! বিজ্ঞাপন, বিজ্ঞাপন, বিজ্ঞাপন এবং বিজ্ঞাপন। এবং বিজ্ঞাপন! ও, না, স্টার মুভিজে ‘কাউবয় ভার্সন অ্যালিয়েন’ দেখাচ্ছে। সাইফাই মুভি। আইনুল এসব তেমন পছন্দ করে না। তাও ১০-১২ মিনিট দেখেছে।

এশার আজান হলো এলাকার মসজিদে। ঠাণ্ডা একটা হাওয়া উড়ে এল ঘরে। কোত্থেকে? দিনাজপুর থেকে? আইনুলের অল্প শীত করে উঠল, এ সময় তার ফোন বাজল।

ঠঙগঅ

ঈধষষরহম...

মেয়েটার নাম আসলে তমা। বিশেষ সাইজের কারণে ‘ভোমা’ লিখে তার ফোনবুকে সেভ রেখেছে আইনুল। অফিসের ডিএমডির পিএস। একে নিয়মিত ফোন করে পলা। ফেসবুক ফ্রেন্ডও তারা। বকুলফুল-শিমুলফুল সই একেবারে! ভোমা তো আর বোঝে না, এসব নজরদারির উছিলামাত্র। নাকি বোঝে?

এখন কল ধরলে কী বলবে ভোমা?

পলা আপু তো বাসায় নেই, আমি এখন আপনার বাসায় আসি, স্যার?

জীবনে বলবে না।

যা বলবে সব অফিশিয়াল, ডিএমডির পিএস হিসেবে বলবে। দুদিন আগেও ফোন করেছিল একবার। কথা কিছু না, ডিএমডি স্যার দেখা করতে বলেছেন।

ভোমার ফোন না ধরে কেটে দিয়ে আইনুল বিচিত্র কাণ্ড করল। কল দিল পলাকে। পলা ধরল, ‘হ্যাঁ, বলো।’

‘তুমি কোথায়?’

‘হসপিটালে।’

‘হসপিটালে মানে? কী হয়েছে তোমার? অ্যাকসিডেন্ট করেছ?’

‘আমি অ্যাকসিডেন্ট করলে তো খুশি হতে তুমি। তা না—।’

‘আরে তুমি— !’

‘আস্তে কথা বলো। আমি না। আমার কিছু হয়নি! মনসুর ভাই আইসিইউতে।’

‘মনসুর ভাই!’

‘মনসুর ভাইকে তুমি চেনো না? টেলিভিশনে স্ক্রল দেখাচ্ছে দেখো। ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে দেখো।’

‘বাসায় কারেন্ট নাই।’

‘তাহলে ফোনে, অনলাইনে দেখো।’

‘দেখছি। শোনো—।’

‘কী? বলো!’

‘মানে ইয়ে—।’

‘মানে ইয়ে কী? কী হয়েছে? বলো!’

‘না, তনিমা ফোন করেছিল। ও আজ আমাদের বাসায় থাকবে।’

‘আমাদের বাসায় থাকবে! কেন? তনিমা কে?’

‘বলল কিছু সমস্যায় পড়েছে—।’

ফিসফিস করে কতটা হিসহিস করা যায়? পলা করল, ‘সমস্যায় পড়েছে! কিসের সমস্যা? তনিমা কে? এর নাম তো আগে কখনো শুনিনি। তুমি এক্ষুনি, এক্ষুনি ওর ফোন নম্বর আমার ফোনে ফরোয়ার্ড করে দাও।’

বলে ফোনের লাইন কেটে দিল পলা। তনিমা কে? আইনুল কি তনিমার নাম আগে কখনো শুনেছে? মনে এসেছে বলে দিয়েছে। এখন? তনিমার ফোন নম্বর দিতে হবে পলাকে!

কী করা যায়?

কী করা যায়?

আজকের পত্রিকায় ঘটক পাখি ভাইয়ের সেলফোন নম্বরসহ বিজ্ঞাপন দিয়েছে। পত্রিকা নিয়ে ঘটক পাখি ভাইয়ের নম্বরটা পলাকে সেন্ড করে দিল আইনুল। হাসল। রসিকতা। তবে খুবই করুণ রসিকতা! বিয়ের পরের মাসখানেক থেকেই অত্যন্ত তেতো তাদের সম্পর্ক। বিগত দুই বছরে রসিকতা করার মতো কিছু আর এ সম্পর্কে অবশিষ্ট থাকেনি। তবে একটা আশা করা যায়। মহাত্মা মনসুর ভাইয়ের অবস্থা আশঙ্কাজনক না হয়ে থাকলে তনিমার কথা শুনেছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আজ বাসায় ফিরে আসবে পলা। তাতেইবা কি? পলা ফিরলে কি খুশি হবে আইনুল? তা তো নয়।

কল বেল বাজল।

কে?

দরজা খুলে আইনুল উচ্ছ্বসিত হলো।

‘আরে তুই! তুই কোত্থেকে? আয়!’

সত্যব্রত!

আজব! এ সময় কোত্থেকে সে! ঢাকায় এল কত বছর পর? বিয়ের পর আর একবারও আসেনি। তার মানে পাক্কা ১৩ বছর। আগে ফোন করে কিছু বলেনি। সত্যি সত্যি একটা বিরাট সারপ্রাইজ। ঘরে ঢুকে বসে প্রথম ডায়ালগ, তুই এক্কেবারে বদলে গেছিসরে। এ মা! তোর দাড়িও সাদা হয়ে গেছে দেখি।’

‘সব সাদা হয়নি।’

‘হয়ে যাবেরে! হয়ে যাবে! মাগো মা! তখন তোকে কী রকম লাগবেরে! জয় মা তারা! মা! মাগো!’

এই হলো আদি অকৃত্রিম সত্যব্রত। সরল অকপট। কিছু জটিলতা আছে জীবনের। সেটা অতি ব্যক্তিগত তার। আইনুলকে শিপার বলেছে কিছুটা। কিন্তু কিছুর মালিন্য মনে হয় সত্যব্রতকে কিছুতে স্পর্শ করে না কিছুতে। সে থাকে তার আপন জগতে। বাবা মহাদেব, মা কালীর জগত্।

‘চা খাবি? না কফি?’

‘কে বানাবে? তুই?’

‘আর কে বানাবে? কফি বানাই।’

‘ভাবি কোথায়রে? ভাবি কোথায়? ভাবিকে ডাক। ভাবি কি ভেতরের ঘরে? ভাবি! ভাবি! ও-ও-ও ভাবি!’

‘চেঁচাবি না। পলা বাসায় নেই। তুই হঠাত্ ঢাকায় কেন এসেছিস? কাজবাজ আছে? না ঘুরতে?’

‘তোকে দেখতেরে, তোকে দেখতে। বিশ্বাস কর, তোকে দেখতে। মা কালীর কিরা। জয় মা তারা! মা! মাগো!’

‘মা তারা! উনাদের সঙ্গে এখনো কি কথা হয় তোর?’

‘বাবা মহাদেব আর মা কালী তো? দেখা হবে না! কি বলিস? তারা আগলে না রাখলে কি তুই আর আমাকে দেখতিরে, বল!’

মানুষের বিশ্বাস কত অদ্ভুত আসলে। হিন্দু পাড়ায় বড় হয়েছে, আইনুল অনেক কিছু জানে হিন্দুদের। দাস, কর্মকার, ধর, আচার্যরা বলেছে। ৩৩ কোটি দেবতা তাদের। ৩৩ কোটি নামই আছে পুরাণে। আমার তো শুধু কিছু কমন পূজা হতে দেখি। দুর্গা পূজা, সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মী পূজা, কালী পূজা। আরো কত রকমের পূজা যে হয়। আলাদা করে কার্তিক পূজা যেমন। চোররা করে। কেন নয়, কার্তিক হলেন চোরদের দেবতা। ওলাওঠার দেবী আছেন শীতলা। লক্ষ্মী যেমন আছেন, আছেন অলক্ষ্মীও। বিদ্যার যেমন আছেন, তেমনি আছেন অবিদ্যার দেবীও। এতজনের মধ্যে সত্যশিব আছেন শুধু দুজনকে নিয়ে। তার সঙ্গে থাকেন এ দুজন। তাকে আগলে রাখেন, ঘের দিয়ে রাখেন। মানে কী? এভাবে কখনই ভাবা হয়নি। কারণ স্কুল লাইফ থেকে আইনুলরা এ রকম দেখেছে কুড়িয়ারপাড়ের তারাপদ ডাক্তার কাকার ছেলে সত্যব্রতকে। স্বাভাবিক বলে জেনে-মেনেও নিয়েছে।

আইনুল বলল, ‘তুই কি একা এসেছিস?’

‘একারে একা! আমার সঙ্গে আর কে আসবে বল?’

‘পুষ্প। পুষ্পকে নিয়ে এলে পারতি।’

‘পুষ্প! এ মা! পুষ্প তো প্রেগন্যান্টরে, হ্যাঁ! কী করে আসবে বল? রিস্ক না এখন?’

‘পুষ্প প্রেগন্যান্ট?’

‘হ্যাঁরে হ্যাঁ। ছয় মাস চলছে তো। ডিসেম্বরে ডেট দিয়েছে ডাক্তার।’

পুষ্প প্রেগন্যান্ট! ছয় মাস চলছে! কেউ তো বলেনি। শিপার, ফরিদ, মান্না, অমিয়। কী করে? আড়াল-আবডালে এ আলোচনা তো সত্যব্রতর বিয়ের পর থেকেই চলছে। সবকিছু জেনে-বুঝেও কেন সত্যব্রতকে বিয়ে করাতে গেলেন তার মা-বাবা? একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করলেন। বাবা শিব-মা কালী, সত্যব্রত তো স্বাভাবিক নয় কখনই। শহরে কানাঘুষা আছে, সত্যব্রতর ছোট ভাই বিভুর সঙ্গে সম্পর্ক পুষ্পর। কেন হবে না?

পুষ্প বিভুর বাচ্চা পেটে নিয়েছে?

সত্যব্রত কত সহজ তার পরও!

আইনুল দুই মগ কফি বানাল।

কফির মগ নিয়ে সত্যব্রত বলল, ‘ভাবি কখন বাসায় ফিরবেরে?’

‘ফিরবে। এই তো।’

বেঁচে গেল আইনুল দুটো ঘটনায়। একসঙ্গে ঘটনা দুটো ঘটল। ইলেকট্রিসিটি ফেইল করল এবং তার সেলফোন বাজল। আইনুল বলল, ‘মোম ধরাচ্ছি দাঁড়া। ফোনটা আগে রিসিভ করে নিই।’

কলার, ফরিদ।

আইনুল ফোন ধরে বলল, ‘কিরে শালা?’

ফরিদ বলল, ‘তুই কি বাসায়?’

‘আর কোথায় থাকব? কী হয়েছে?’

‘শিপার তোকে ফোন দেয়নি?’

‘না। কেন?’

‘সত্যব্রত তো আবার—।’

‘কী? আরে, সত্যব্রত তো এখন আমার সামনে।’

‘কী বলিস!’

‘কী বলিস মানে? সত্যব্রতর সঙ্গে কথা বলবি তুই?’

ফরিদ সিরিয়াস হয়ে বলল, ‘শোন, আমি তো মনে করেছিলাম, শিপার তোকে ফোন করে বলেছে। সত্যব্রত আবার ট্যাবলেট খেয়েছিল।’

‘কী? কবে?’

‘দুপুরে মনে হয়। ওয়াশ দিয়েও কিছু হয়নি। মারা গেছে সন্ধ্যায়।’

‘কি? কি?’

‘হ্যাঁ।’

‘আচ্ছা, তুই রাখ এখন!’

বলে ফোনের লাইন কেটে দিল আইনুল। বলল, ‘সত্যব্রত?’

সত্যব্রত বলল, ‘কে ফোন করেছিলরে? শিপার?’

‘সত্যব্রত!’

‘কী হয়েছে, এই? কী হয়েছেরে?’

‘তুই আবার ট্যাবলেট খেয়েছিস?’

‘হ্যাঁ। ১২৭টা।’

‘মরে গেছিস।’

‘হ্যাঁ।’

‘কেন?’

‘কী করব বল? আমি তো কতবার পুষ্পকে বলেছি, বিভুকে নিয়ে তুমি ইন্ডিয়া চলে যাও।’

‘তাই বলে মরে যাবি তুই?’

‘উপায় ছিল নারে আর, উপায় ছিল না। জয় মা তারা! মা! মাগো! তুমি আমাকে দেখো গো মা।’

‘যাই বলিস, এটা তুই ভালো করিসনি, হ্যাঁ। এখন তুই কোথায়?’

‘এই তো রে! এই তো! এখানে! এই তো।’

ইলেকট্রিসিটি ফিরল এবং কী দেখল আইনুল?

ঘরে কেউ নেই।

ধোঁয়া উড়ছে সত্যব্রতর কফির মগ থেকে।

দুই চুমুক কি দিয়েছিল সত্যব্রত?

ইলেকট্রিসিটি অন্তত আর ১০টা মিনিট পর ফিরত।