বৃষ্টির মধ্যে রিকশা না পেয়ে বাতাসের দমকে ছাতার মাথা উল্টে গিয়ে ভিজে জবুথবু হয়ে নালার নোংরা পানি মাড়িয়ে অবশেষে যখন অফিসে পৌঁছলাম, ঘড়ির কাঁটা তখন নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে। অন্যদের মধ্যে কয়েকজন চলে এসেছেন। কয়েকটি চেয়ার অবশ্য তখনো খালি। জামা থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে, চেয়ারে যে বসব, তাতেও অস্বস্তি হচ্ছে। আগাগোড়া পুরাটাই ভিজে আছি, কিন্তু ঘিনঘিন লাগছিল নালার নোংরা পানির কথা মনে পড়ে। যাক, কোনোভাবে পা ধুয়ে, ফ্যান ছেড়ে চুলটাও হালকা একটু ঝেড়ে চেয়ারে বসতে না বসতেই দেখি, সেই ভদ্রলোক উপস্থিত।
বিরক্তিকর ভদ্রলোক। বিশেষণটা মনে মনেই রাখতে হয়। চাকরি বলে কথা। ভদ্রলোক গতকাল বলে গিয়েছিলেন আজ আসবেন। তাই বলে ভোরের প্রথম আলো দেখার মতো এই ঝুম বৃষ্টির মধ্যে প্রথম গ্রাহক হিসেবে তাকে দেখতে হবে এটা তো আর ভাবিনি। হঠাত্ চোখ পড়ল তার পেছন পেছন একটা অল্পবয়সী মেয়ে ঢুকল। বৃষ্টিস্নাত সবুজ পাতার মতো স্নিগ্ধ মুখখানি। অসম্ভব সুন্দর বলতে যা বোঝায়, ঠিক সে রকম। আমি মেয়ে হয়েও মুগ্ধচোখে তাকাই। ভাবলাম ভদ্রলোকের কন্যা বোধহয়।
আমার সামনে চেয়ার টেনে বসলেন উভয়েই। মেয়েটার চোখের দিকে চোখ পড়তেই দেখি ভীষণ নির্লিপ্ত, নিষ্প্রভ। আশ্চর্য, এ চোখের চাহনিটা খুব পরিচিত মনে হলো। কার সাথে মিল আছে ভাবতে ভাবতেই আমি কাজ শুরু করলাম। কম্পিউটারের মনিটরের দিকে তাকিয়ে ডাটা ইনপুট দিতে গিয়ে দুজনের ভোটার আইডি হাতে নিয়ে দেখি, মেয়েটার স্বামীর নামের জায়গায় ভদ্রলোকের নাম।
কেমন অবিশ্বাস্য ঠেকল। আর তখনই আমি আড়চোখে মেয়েটার চোখের দিকে আরেকবার তাকালাম। কেন জানি না একটা বড় দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আড়াল করার সুযোগ পেলাম না। কাজ করার সময় দু-একটা প্রয়োজনীয় তথ্য যখন জানতে চাইছিলাম, মেয়েটা বলার আগেই ভদ্রলোক বলে উঠছিলেন। কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে আমি আরো দু-একবার মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছিলাম।
আর ভাবছিলাম কী এমন অপারগতা ছিল তার পরিবারের কিংবা তার, যে কারণে ২১ বছর বয়সের ব্যবধানে একজন মানুষের সাথে জীবন গাট্টা বাঁধতে হলো তাকে। কাজ শেষে তারা চলে গেল। কিন্তু সারা দিন আমার মেয়েটার কথাই মনে পড়ছিল। তার চোখের উদাসীনতার সাথে ভীষণ পরিচিত আমি। এ চাহনি খুব চেনা আমার। আর ঠিক তখনই আমার পাখির কথা মনে পড়ে গেল। পাখিকে খুব হিংসা করতাম আমি। শুধু আমি না, লতা, আয়েশা, সুমি আমরা সবাই হিংসা করতাম।
হিংসা-বিদ্বেষ ভালো নয়, একথা জানার পরও হিংসা করতাম। পাখি ছিল স্বাধীন। পড়ালেখার কোনো চাপ ছিল না ওর। বছরের মাঝখানেই স্কুল ফেলে ও ওর খালার বাসায় বেড়াতে আসত। ওর খালার বছর বিরতি দিয়ে সন্তান হতো। সন্তান হওয়ার সময় টুকটাক কাজে সহযোগিতা করার জন্য পাখিকে নিয়ে আসত। পাখি এলেই আমাদের উত্সব শুরু হতো। কারণ পাখি আমাদের এমন সব গল্প বলত, যেসব গল্প শুনতে গিয়ে আমরা নিজের অজান্তেই ঢোঁক গিলে ফেলতাম। আর চোরের মতো আশপাশে তাকিয়ে দেখতাম, কেউ শুনে ফেলল না তো!
বিল্ডিংয়ে বাড়িওয়ালাসহ আমরা সাত প্রতিবেশী ছিলাম। এর মধ্যে পাখির খালারা সবচেয়ে নতুন। তারা এসেছে মাত্র দুই বছর হলো। পাখির খালু দুদিন পর পর নতুন নতুন ব্যবসা করত। কিছুদিন শুধু চামচ বানিয়েছে। ওষুধের বোতলের সঙ্গে যে চামচ প্যাকেট করে দিত সে চামচ। লাল রঙের চামচ। চামচগুলো মেশিন থেকে বের করার পর খাঁচা ভরে বাসায় পাঠিয়ে দিত। কারণ এগুলোর হাতলের সঙ্গে প্লাস্টিকের কিছু অংশ ঝুলত ঘুড়ির লেজের মতো, সেগুলো কেটে ঠিক করতে হতো।
আবার কখনো কখনো কিছু চামচের ভেতর ছিদ্র হয়ে যেত, কিছু চামচ মেশিনের অতিরিক্ত তাপে বেঁকে যেত, সেগুলো আলাদা করতে হতো। অনেকটা চাল থেকে কাঁকর বের করার মতো। এরপর কিছুদিন বানিয়েছে তৈলাক্ত এক তরল পদার্থ, যা অবিকল ভ্যাসলিনের মতো। শীতের শুরুতে একবার পাখি আর পাখির খালাতো বোন রিনা আমাদের চারজনকে চারটা ভ্যাসলিনের কৌটা দিয়েছে। আমরা তো মহাখুশি। মনে হলো, মেঘ না চাইতে বৃষ্টি! কিন্তু পরে একদিন শুনলাম পুলিশ এসে পাখির খালুকে হাজতে ভরেছে উল্টাপাল্টা কেমিক্যালের কারবার করার জন্য।
পাখির খালা, ভদ্রমহিলা অসম্ভব রূপসী ছিল। সেই তুলনায় খালুটাকে দেখলে মনে হতো জেলফেরত দাগি আসামি। ভূঁড়ি একটা এত বড় ছিল যে, পাখির খালু যখন হাঁটত তখন মনে হতো খোদ মৈনাক পর্বত নিজেই হাঁটছে। তবে মানুষটার মনে মায়া ছিল।
পাখির খালু মাঝে মাঝে বাসায় ভিসিআর আনত। বিল্ডিংয়ের কেউ কেউ বলত, পাখির খালুর কাঁচা টাকা আছে। আমরা সমবয়সীরা বিকালবেলা স্কুল থেকে ফিরে পাখির খালার বাসায় ভিসিআর দেখতে যেতাম। মিঠুন চক্রবর্তী আর রোজিনার ছবি ‘অন্যায় অবিচার’, শাবানা-আলমগীরের ‘গরীবের বউ’, ‘ক্ষতিপূরণ’, ভারতীয় বাংলা ছবি ‘ছোট বউ’, ‘ঘরের বউ’, ‘শুভ কামনা’সহ কত ছবি যে দেখেছি! ছবি দেখার ফাঁকে ফাঁকে পাখি না হলে পাখির খালাতো বোন রিনা টক ভর্তা বানিয়ে আনত।
কাঁচা আমের দিনে কাঁচা আমের ভর্তা, চালতার ভর্তা, বেলেম্বু ভর্তা, তেঁতুল দিয়ে পেঁপের ভর্তা, আর কোনো কিছু না থাকলে ক্ষীরা কেটে লবণ-মরিচ দিয়ে মেখে খেতে দিত।
আমরা সমবয়সীরা প্রায় সময় ভিসিআর দেখার লোভে পাখির খালার বাসায় গেলেও নিগার আপুরা কখনো যেত না। নিগার আপুরা বিল্ডিংয়ের সবচেয়ে আলাদা পরিবার। নিগার আপুরা দুই বোন, এক ভাই। নিগার আপুর বাবা কী যেন ব্যবসা করে, আর নিগার আপুর মা একটা স্কুলের টিচার। নিগার আপু খুবই মেধাবী। সামনে এসএসসি পরীক্ষা। সবাই বলে, নিগার আপু স্ট্যান্ড করবে। শুধু স্ট্যান্ড না, ফার্স্ট স্ট্যান্ড করবে। নিগার আপুর ছোট বোন নাহার হচ্ছে একটা হিংসুটে। নাহার আমাদের স্কুলের ভালো ছাত্রী দেখে ও আমাদের সঙ্গে সেভাবে কথা বলে না। আমরাও ওকে দেখলেও পাত্তা দিতাম না। আমাদের বয়েই গেল ওর সাথে কথা বলতে। এ রকম কত নাহারকে আমরা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিই।
বিকালবেলা আমরা বিল্ডিংয়ের পাশের খোলা জায়গাতে খেলতে যেতাম। সেই মাঠের মতো জায়গাতে অনেক গাছপালা ছিল। অনেক টগর গাছ ছিল। ছোট্ট একটা খাল ছিল। খালের ওপারে ছিল বড় রাস্তা। সে রাস্তায় শাঁই শাঁই করে গাড়ি ছুটত। রিকশা ছুটত টংটাং বেল বাজিয়ে। হকার আসত। এই কেরোসিন বলে হাঁক ছুড়লে বিল্ডিংয়ের সবাই পড়িমড়ি করে চোঙ্গাকৃতির অ্যালুমিনিয়ামের জগ নিয়ে ছুটত কেরোসিন নেয়ার জন্য। আবার আসত লবণওয়ালা। খোলা লবণ।
তারই কি কদর! আসত হাঁড়ি-পাতিলওয়ালা। মাথায় কাপড়ের গাঁটরি নিয়ে আসত টাঙ্গাইলের শাড়িওয়ালা। হাঁক ছুড়ত এই শাড়ি-কাপড়। এই শাড়ি-কাপড়। অন্য কিছু কেনার জন্য মাঝে মধ্যে দু-এক বাসার গিন্নি কিছুটা আলসেমি করলেও টাঙ্গাইলের শাড়িওয়ালার ডাকে খোদ মরণঘুম ভেঙেও ছুটে আসতে কার্পণ্য হতো না কারো। শাড়ি থাকত পঁচিশ, তিরিশ, বড়জোড় চল্লিশেক। কিন্তু একেক করে সবগুলোই খুলে দেখতে হতো বিল্ডিংয়ের গিন্নিদের। এটার জমিন ভালো, রঙ ভালো নয়, ওটার রঙ ভালো সুতা ম্যাড়ম্যাড়ে। আরেকটা কি ছাইপাশ ডিজাইন! মাগনা দিলেও গায়ে লাগাব না। আবার যেটা একজনের পছন্দ হয়, সেটাই দরকার হয় বাকি দু-তিনজনের। তার পরও টাঙ্গাইলের শাড়িওয়ালা দেখি বেজায় খুশি। বত্রিশ দন্ত বিকশিত করে সদ্য হাকিমপুরি জর্দা মিশ্রিত পান খেয়ে বেশ আয়েশ করেই দুপুরটা কাটিয়ে দেয় রমণীদের কিচিরমিচির শুনতে শুনতে। বেচাবিক্রিও নেহাত খারাপ হয় না। খুব মন্দার দিনেও দু-তিনখানা শাড়ি নিজ দায়িত্বেই বগলদাবা করে নেয় গিন্নিরা।
বিকালবেলা খেলার সময় একবার সুমি পাখিকে জিজ্ঞেস করল, সে যে বছরের মাঝখানে স্কুল ফেলে খালার বাসায় চলে আসে, তার স্কুলে কিছু বলে না? পাখি আমাদের জানাল, তার বাবা বলেছে, তার পড়ালেখা হচ্ছে শুধু চিঠি লেখার জন্য। বিয়ের পরে পাখি যেন পাখির বিদেশ থাকা বরের কাছে ইনিয়ে বিনিয়ে এবং অন্যের সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজে চিঠি লিখতে পারে, সে উদ্দেশ্যেই তার বাবা তাকে পড়ালেখা করাচ্ছে। পাখি জানিয়েছে, সে চিঠি লেখা শিখে গেছে। তাই তার বাবা খুবই সন্তুষ্ট মেয়ের পড়ালেখা নিয়ে। এখন পাখির বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছে।
পাখির কথা শুনতে শুনতে সুমির চোখের দৃষ্টি যেন ঘোলাটে হয়ে এল। কারণ গতকালও সুমির আম্মা সুমিকে অনেক ব্যঞ্জনবাক্য শুনিয়েছিল সিক্সের বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় না হয়ে চতুর্থ অবস্থান করার জন্য। সুমি বলল, আমার আব্বাও যদি তোর আব্বার মতো হইত! যদি চিঠি লিখতে পারলেই আমারে বিয়ে দিয়ে দিত! পড়ালেখাটা কে যে বাইর করছিল!! সুমির আক্ষেপ আমাদেরকেও ছুঁয়ে যেত। পড়ালেখার প্রতি রীতিমতো অভক্তি এসে গিয়েছিল। সারা রাত পড়ি, অথচ স্কুলে গেলে কিছু মনে থাকে না। এবার স্কুলের আপার শাস্তি খাও, কান ধরে লো বেঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকো, বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অন্য ক্লাসের মেয়েরা উঁকি দিয়ে দেখে, জীবনটা যেন তেজপাতা হয়ে গেল।
একদিন সন্ধ্যাবেলায় দেখি, লতার মা আর আয়েশার মা খুব হন্তদন্ত হয়ে আমাদের বাসায় এল। আম্মা তখন মাত্র কচুর লতি কাটা শেষ করে বাথরুমের অমসৃণ দেয়ালে আঙুল ঘষে ঘষে লতির কষের কালো দাগ তুলছিল। ফ্রিজ থেকে নামিয়ে ইলিশ মাছ আগেই ভিজিয়ে রেখেছিল।
খালাম্মাদের দেখে বুঝতে পারল রাস্তায় চলন্ত গাড়ির গতি হঠাত্ ব্রেক কষেছে। তার মানে লম্বা সময়ের গল্প শুরু হবে। আম্মা আমাকে চুলায় চায়ের পানি আরো দুই কাপ বেশি বসাতে বলে খালাম্মাদের কাছে গেল। লতার মা-ই বলেছিল, বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এইবার ঘুঘু তোমার বধিব পরান।
আয়েশার মা বলে, ভাবী কাব্য বাদ দিয়ে মূলকথা বলেন। নূপুরের মা ভাবী তো কিছুই জানে না। আম্মা কিছু না জানার কথায় সম্মতি জানাল। লতার মা গল্পের গুরুত্ব বাড়াতে গলার স্বর কিছুটা নিচু করে বলল, নিগারের বাপ তো কাজ করে ফেলছে। আম্মা বলল, কী কাজ?
লতার মা খিকখিক করে হাসি দিয়ে বলল, গার্মেন্টসের মেয়ে একটারে বিয়ে করে ফেলছে।
আয়েশার মা সঙ্গে সঙ্গে বলল, শিক্ষিত মানুষের কারবার দেখলেন ভাবী। রিনার বাবারে নিয়ে কত আজেবাজে কথা বলছে সেদিন। রিনার বাপ অশিক্ষিত, মূর্খ আরো কত কি! আর নিজে কেমন ভদ্রলোক দেখছেন!
আম্মা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, সত্যি বলতেছেন? লতার আম্মা বিরক্ত হয়ে জবাব দিল, আপনার কী মনে হয় রসিকতা করতেছি? রসিকতা করার আর মানুষ পাইলাম না আমরা, তাই না? লুইচ্চা বেটারে নিয়ে রসিকতা করব আমরা?
ঘটনা সত্যি। নাহার এক সপ্তাহ স্কুলে যায়নি। নিগার আপুও যায়নি। এক সপ্তাহ পরে নাহার যেদিন স্কুলে গেল, সেদিন একমাত্র বাংলা প্রথম পত্রের রঞ্জনা আপা ছাড়া সবাই নাহারকে জিজ্ঞেস করল, নাহারের বাপ যে গার্মেন্টের একটা মেয়েকে বিয়ে করে ফেলেছে, ঘটনা সত্যি কিনা।
সেদিন প্রথম নাহারের জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছিল। প্রতিটা ক্লাসে ওর বাবার বিয়ের প্রশ্নটা শুনে উত্তরে ও খুব অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে রেখেছিল। যেটা ওর স্বভাববিরুদ্ধ কাজ। বারবার একই প্রশ্ন শুনতে শুনতে এবং সহপাঠীদের অনেকের টিটকারি বাক্য শুনে একপর্যায়ে নাহার শুধু কেঁদেছিল। তার চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি ছিল, সে বছর এসএসসি পরীক্ষায় বোর্ডের সম্ভাব্য প্রথম স্ট্যান্ড করা সম্ভাবনাময়ী নিগার আপু এসএসসি পরীক্ষাই দেয়নি। কী এক অসুখ হয়েছিল, প্রায় সময় দেখতাম ওর মা আর ছোট ভাই ধরাধরি করে রিকশায় তুলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। মাস ছয়েক পর নিগার আপুরা বাসা ছেড়ে চলে গেল অন্য কোথাও। “সমগ্র বাংলাদেশ ৫ টন” লেখা একটা বড় ট্রাকে করে ওদের সব মালপত্র গাড়িতে তোলা হলো। আম্মা ওদের সকালের নাশতা খাওয়াল। লতার আম্মা দুপুরের ভাত খাওয়াল। সুমির আম্মা খাওয়াতে চেয়েছিল, কিন্তু লতার আম্মা দেয়নি। যাওয়ার সময় নিগার আপুর আম্মা বিল্ডিংয়ের সবার বাসায় গেল। এমনকি পাখির খালার বাসায়ও গেল। সাথে নাহারও ছিল। সেদিন নাহার আমাদেরকে জড়িয়ে ধরেছিল। নাহারের চোখ ছলছল করছিল। আশ্চর্য, যাকে দুচোখে দেখতে পারতাম না, তার জন্যও বাঁধ ভেঙে কান্না আসতে লাগল।
নিগার আপু অবশ্য কারো সাথে তেমন একটা কথা বলেনি। ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল বিল্ডিংয়ের সামনের বাদাম গাছটার দিকে। সেখানে অসংখ্য চড়ুই পাখি কিচির মিচির করছিল।
নিগার আপুরা চলে যাওয়ার পরও বেশ কিছুদিন বিল্ডিংয়ের সবাই নিগার আপুর বাবার বিয়ে নিয়ে আলোচনা করত।
কয়েক দিন পর আবার আমরা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ি স্কুলের পরীক্ষা নিয়ে। বিল্ডিংয়ে যেহেতু সমবয়সী তিন-চারজন ছিলাম, আমাদের মায়েরা প্রতিবেশীর আড়ালে যতই আত্মীয়তার প্যাঁচে বাঁধা পড়ুক না কেন, সন্তানের স্কুলের পড়ালেখা নিয়ে নিজেদের মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতা ছিল।
এইসব প্রতিযোগিতার খপ্পরে পড়ে বেচারি সুমির অবস্থা ছিল বেশি নাকাল। নাহার যত দিন ছিল, সুমির আম্মা সুমিকে যে কত হাজারবার নাহারের গু খাইয়েছে, তার কোনো শেষ নেই। কথায় কথায় খোঁটা দিয়ে সুমির আম্মা সুমিকে বলত, যা নাহারের গু খেয়ে আয়। গাধা কোথাকার! পরীক্ষায় সেকেন্ড হওয়ার চেয়েও তাই সুমির দুঃখ বেশি ছিল নাহারের গু খাওয়া নিয়ে। লতা আর আমিও অল্প বিস্তর চাপে থাকতাম। তবে শান্তিতে ছিল আয়েশা। ওর মা-বাবার ছেলের পড়ালেখা নিয়ে কিছুটা প্রত্যাশা থাকলেও মেয়ের পড়ালেখা নিয়ে তেমন কোনো প্রত্যাশা ছিল না। পাখির পরিবারের চেয়ে কিছুটা উন্নত সংস্করণ ছিল আয়েশাদের বাসায়।
একদিন বিকালবেলা পাখি জানাল এক সপ্তাহ পর ও গ্রামে চলে যাবে। ওর বিয়ে ঠিক হয়েছে। সুমি খুব অবাক হয়ে বলল, তুই তো এখানে, বিয়ে ঠিক হলো কীভাবে?
পাখি জবাব দিল, ছেলে ওর বাবার দিকের আত্মীয় হয়। তাই আগে থেকেই চেনাজানা।
লতা খুব মন খারাপ করে বলল, তোর খারাপ লাগছে না?
পাখি হাসতে হাসতে বলল, না, খারাপ লাগছে না, বিয়ের পর কী হবে তা তো আমি জানিই। কত দেখেছি।
আয়েশা কোনো কথা বলে না। আমিও কিছু বলি না। কারণ পাখি আমাদেরকে বিয়ে সম্পর্কিত এমন অনেক গল্প বলেছে, যেগুলো শোনার পর লজ্জায় আমরা লাল হয়ে যেতাম ঠিক, কিন্তু শুনতে খুব ভালো লাগত। আবার ভয় পেতাম অন্য কেউ যেন না শুনে ফেলে। তাহলে বাসায় আম্মা একেবারে কোরবানি করে দেবে আমাদেরকে।
অনেকক্ষণ পর সুমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ইশ! আমার বাপটাও যদি পাখির বাপের মতো হইত, তাইলে কী সুন্দর এখন আমারও বিয়ে হয়ে যাইতে পারত। আমার দিকে তাকিয়ে বলে, কি রে নুপূর, ঠিক বলছি না। পড়ালেখাটা অসহ্য লাগে আমার।
এক সপ্তাহ পর সত্যি সত্যি পাখি চলে গেল। পাখি যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা ভাবছিলাম, হয়তো শেষ মুহূর্তে ওর যাওয়াটা বাতিল হয়ে যাবে। পাখি চলে যাওয়ার পর আমাদের গল্পগুলো কেমন ছন্দহারা হয়ে গেল। কথাগুলো থমকে গেল। থেমে থেমে আমরা পাখির কথা ভাবতাম। বিয়ের পর ও না জানি কী করছে। ও আমাদেরকে যেসব গল্প বলত, সেগুলোই ঘটছে কি? বিয়ের কথা ভেবে ভেবে মনে মনে নিজেরাও অনেক স্বপ্ন আঁকতাম। তবে কেউ কাউকে কিছু বলতাম না, লজ্জায়।
প্রায় আট মাস পর পাখি আবার এল খালার বাসায়। আমরা তো স্কুল থেকে ফিরেই খবর পেয়ে ছুটে গেলাম পাখিকে দেখতে। পাখিও আমাদেরকে পেয়ে খুব খুশি ছিল, কিন্তু পাখিকে ঠিক চেনা যাচ্ছিল না। ওর আপেলের মতো মসৃণ গাল ভেঙে আমসির মতো শুকিয়ে গেছে। ভাসা ভাসা চোখগুলো মার্বেলের মতো বের হয়ে আসছিল কোটর থেকে। সপ্তাহখানেক ছিল পাখি। আমাদেরকে খুব বেশি সময় দিতে পারেনি। ওর জামাই কাঁঠালের আঠার মতো ওর সঙ্গে সারাক্ষণ লেগেছিল।
তবুও কষ্ট করে বেচারি একদিন বিকালে আমাদের সাথে সেই জঙ্গলের বাগানে গেল। সেখানে গিয়েই পাখি আমাদেরকে বলল, বিয়ে খুব খারাপ রে। বিয়ে খুব কষ্ট।
পাখির কণ্ঠের কাতরতা আমাদের চোখ এড়ায়নি। সেদিন আর আমাদের আড্ডা জমেনি। পাখির বিষণ্নতা, বিমর্ষতা আমাদের আড্ডার সুর কেটে দিয়েছিল।
আট মাসে দুবার গর্ভপাতের কারণে পাখির শরীর আর চলে না। তবু নাকি স্বামীর ভালোবাসা কমতেই চায় না।
একটা উচ্ছল প্রাণ যে সবার অলক্ষে জীবন্ত লাশ হয়ে যেতে পারে, সে কথা পাখিকে দেখেই ওই অতটুকুন বয়সে আমরা বুঝে গিয়েছিলাম। এরপর প্রায় দুই বছর কেটে গেল। পাখি আর পাখির খালার বাসায় আসেনি। মাঝে মাঝে আমরা রিনার কাছে পাখির কথা জিজ্ঞেস করতাম। পাখির খোঁজখবর নিতাম। তারপর হঠাত্ একদিন শুনি পাখির খালারা বাসা বদলিয়ে নতুন কোনো জায়গায় যেন চলে যাচ্ছে। এখানে নাকি বাসা ভাড়া বেশি হয়ে যাচ্ছে। পাখির খালুর ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না।
আশ্চর্য, পাখির খালা যেদিন চলে যাচ্ছিল, বিল্ডিংয়ের সব প্রতিবেশী ওদের বাসায় গিয়ে সুন্দরভাবে বিদায় দিল। আর সবাই পাখির খালাকে বলে দিল, পাখিকে নিয়ে যেন অবশ্যই বেড়াতে আসে। অথচ বিল্ডিংয়ের অনেকেরই পাখির খালার পরিবার নিয়ে বেশ অ্যালার্জি ছিল।
পাখির খালা বলে গিয়েছিল আসবে। কিন্তু সেই যে গেল আর কখনো আসেনি পাখির খালা। সময় কেটেছে সময়ের নিয়মে। আমরাও অনেকে জায়গা বদল করেছি অনেকবার। নিজেদের প্রয়োজনে। নিজেদের সুবিধামতো। আমাদের আর কখনো দেখা হয়নি পাখির সাথে। পৃথিবী গোল। কতজনের সাথেই তো হঠাত্ করে চলতি পথে দেখা হয়ে যায়। কিন্তু পাখির সাথে দেখা হলো না কোনো দিন।
কেন হলো না! পাখি নেই। পাখি একদিন কোথায় উড়ে গেছে!
অলঙ্করণ: সাগুফতা শারমীন তানিয়া





