উত্তমকুমার ছিলেন তার আইডল। তিনি তখনো জীবিত, খ্যাতির মধ্যগগনে। ফলে উত্তম-ফ্যান, পশ্চিমবঙ্গের সিনেযশপ্রার্থী আবদুর রাজ্জাকের অবধারিত গন্তব্য হওয়ার কথা মুম্বাই। কিন্তু তিনি ধরলেন উল্টো পথ। চলে এলেন ঢাকায়, শরণার্থী হয়ে। ঢাকা তখন একটা প্রাদেশিক রাজধানী। সিনে-ইন্ডাস্ট্রি বলতে কিছু নেই, যা আছে তাকে কুটিরশিল্প বলা যায়। নিজের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে জানান দিতে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছে মাত্র। এ রকম একটা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রিতে ক্যারিয়ার গড়বেন, সেই আশায় স্ত্রী ও একমাত্র শিশুসন্তানকে নিয়ে পাকাপাকিভাবে ঢাকায় চলে আসেন তিনি, ষাটের দশকের শুরুতে।
এই সিদ্ধান্ত সিনেমাকর্মীর না, অভিনেতারও না। তুখোড় এন্ট্রাপ্রেনিউর ছাড়া এ রকম ঝুঁকি নেয়া খুব কঠিন। মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তাকে উচ্চতার চরম শিখরে নিয়ে যেতে পারত। সেটা না পারলেও অন্তত খেয়েপড়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিতে পারত। ঢাকার তখন কোনোটাই পারার অবস্থা ছিল না। তবু তিনি ঢাকায় এলেন। কোনো জাতীয়তাবাদী প্রণোদনায় নয়, ধর্মীয় উন্মাদনায়ও নয়। কিন্তু লোকে তো উল্টোপথে যায়! শচীন দেব বর্মণ কুমিল্লা থেকে মুম্বাই গেলেন, আব্বাসউদ্দীন গেলেন কলকাতায়। আরো অনেকে। আর কলকাতা ছেড়ে মুম্বাই না গিয়ে এমনকি করাচি না গিয়ে, রাজ্জাক এলেন ঢাকায়!
রাজ্জাক কি জানতেন, তার ঢাকায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করবে? তার ঢাকায় আসার মাত্র সাত বছরের মধ্যে একটা স্বাধীন বাংলাদেশ গঠিত হবে? সেই স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দিয়ে মোড়ানো সিনেমা ‘জীবন থেকে নেয়া’য় অভিনয়ের সময় কি তার একবারও এ রকমটি মনে হয়নি? যখন তাকে আর জহির রায়হানকে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পুলিশ ধরে নিয়ে গেল, নানা জিজ্ঞাসাবাদ করল, তখন? নিজে সদ্য শরণার্থী, অথচ সিনেমা-মারফত যুক্ত হয়ে গেলেন একটা অতিসংবেদনশীল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে! এই ঝুঁকি এন্ট্রাপ্রেনিউরের নয়, দেশপ্রেমিকের। আমরা জানতাম পিচঢালা পথটারে ভালোবাসতে শুরু করেছেন কলকাতার এই শরণার্থী যুবক, তাই বলে কয়েক বছরের মধ্যে সেই ভালোবাসা বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলনের সঙ্গে এতখানি ওতপ্রোত হয়ে জড়াবে? মনে পড়ে, সাবদার সিদ্দিকীর সেই অমর কবিতা, ‘যেখানেই যাই, পায়ের নিচে দু’টুকরো জমি, হয়ে যায় আপন মাতৃভূমি!’
২.
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ রাজ্জাকের অভিনয়জীবনকে মোটাদাগে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। স্বাধীনতা-পূর্ব রাজ্জাক উত্তমকুমারের হ্যাংঅভার। ক্লিনশেভড। একই রকম ব্যাকব্রাশ করা বড় কপালে চেহারা। শহুরে ও রোমান্টিক। ববিতা-বান্ধব এবং অংশত কবরী-প্রয়াসী। স্বাধীনতা-উত্তর রাজ্জাক সেই পথ মাড়িয়েছেন কদাচিত্। বরং তিনি বস্তির রংবাজি আর স্কুলের দপ্তরির ভূমিকায় সামান্য সময় কাটিয়ে প্রায় পাকাপাকিভাবে চলে গেছেন গ্রামে। সেই রাজ্জাক গোঁফওয়ালা, আলগা চুলে কপালঢাকা। অধিকাংশ সময়েই শাবানাভিলাষী। উত্তম কুমার দিয়ে এই রাজ্জাককে চেনা যাবে না। টালিগঞ্জ কিংবা বলিউডের অন্য কাউকে দিয়েও নয়। বাংলাদেশের সিনেমা তখন শহুরে মধ্যবিত্তের ঘেরাটোপের বাইরে যেতে শুরু করেছে। আর সেটা রাজ্জাকের হাত ধরেই।
শহুরে মধ্যবিত্ত অবশ্য এই গ্রামীণ রাজ্জাককে কদাচিত্ খেয়াল করেছে। তাদের কাছে সেই রাজ্জাকই অধিক পছন্দের, যে রাজ্জাক উত্তম কুমারের প্রোটোটাইপ। অভিনেতা রাজ্জাকের সেটা বুঝতে না পারার কোনো কারণ ছিল না। তিনি সেটাকে আরো অনির্দিষ্টকাল অবধি নগদায়ন করে যেতে পারতেন, কিন্তু তার বদলে তিনি আবার ঝুঁকি নিলেন। সেটা তার শহুরে দর্শকশ্রেণীকে রীতিমতো ঝাঁকি দিয়ে। এই পর্বে তিনি আগের মতো মৃদু নন, রোমান্টিক তো ননই। নিষ্ঠুর গোঁফজোড়া তার হাসির ধরনকে আমূল বদলে দিয়েছে, কপালঢাকা চুলরাশি তাকে করে তুলেছে অচেনা। এই গ্রামীণ জীবনে তিনি অনেক বেশি পুরুষতান্ত্রিক, আগ্রাসী, মেলোড্রামাটিক এবং মারপিটে দক্ষ। তিনি জানতেন, এই ইমেজ তার মধ্যবিত্ত দর্শকশ্রেণীকে নিরাশ করবে। তবু সে পথেই হেঁটেছিলেন। সেটা কি উত্তম কুমারের হ্যাংঅভার থেকে নিজের শিল্পীসত্তাকে মুক্তি দেয়ার জন্য? নাকি স্বাধীন গ্রামবাংলার নায়ক হিসেবে নিজেকে পুনর্গঠন করার জন্য?
যে কারণেই হোক, এই বদলে যাওয়া পারসোনাই তাকে ‘নায়করাজ’ বানিয়েছে। স্বাধীনতাপূর্ব রাজ্জাকের কুশলতা এই অভিধার জন্য যথেষ্ট ছিল না। তার বাংলাদেশী হয়ে ওঠার প্রয়োজন ছিল। নানা কারণে শহুরে রাজ্জাকের পক্ষে সেটা কঠিন হয়ে গিয়েছিল। কারণ, জহির রায়হান নেই, আলমগীর কবীর উচ্চশিল্পের আর খান আতা বক্তব্যধর্মিতার ফাঁদে পড়ে গেছেন; আমজাদ হোসেন তো গোলাপিকে নিয়ে ঢাকাগামী ট্রেনে উঠেছেন মাত্র! বদলে যেতে থাকা ঢাকা শহরকে সিনেমায় বোঝার মতো প্রতিভা কেবল জহিরুল হকই একবার দেখিয়েছেন, ‘রংবাজ’ ছবিতে। অবধারিতভাবে, রাজ্জাকের হাত ধরেই।
৩.
রাজ্জাকের লাশ শহীদ মিনারে রাখার পুরো সময়টার লাইভ কাভারেজ হচ্ছিল টেলিভিশনে। নানা জনের টুকরো-টাকরা প্রতিক্রিয়া নেয়া হচ্ছিল, ধারাবর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে। একসময় একটি বোরখাপরা মহিলা এলেন। অঝোরে কাঁদছিলেন তিনি। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু বলতে পারলেন, তার মর্মার্থ হলো, রাজ্জাক তার নায়ক ছিলেন। সে নায়ককে আর তিনি দেখবেন না। তার দুই কন্যা কোনোদিনও রাজ্জাককে নায়ক হিসেবে পাবে না। অবশ্য তারা পাবে রাজ্জাকের ছেলে বাপ্পারাজকে। তারা যে বাপ্পারাজকে পাচ্ছে, তাতেই তিনি পারিবারিকভাবে রাজ্জাককে পেতে থাকবেন। রাজ্জাককে হারিয়ে তিনি শোকাকুল হলেও এটুকু সান্ত্বনা আছে তার।
এই হলো নায়করাজ রাজ্জাকের ফ্যানগোষ্ঠী। বড় আইডলদের ক্ষেত্রে এ রকমটি হয় বোধ হয়। লোকজন তাদের বংশানুক্রমিকভাবে ভালোবাসে। কিন্তু সেই ভালোবাসা এমনি এমনি হয় না। দ্বিপক্ষীয় হতে হয়। রাজ্জাক সিনেমা করেছেন, এই শিল্পটাকে মনেপ্রাণে ভালোবেসেই। তার সময়ের অনেকেই সেটা করেননি। মওকা মতো সরে গিয়েছেন। মুমূর্ষু ঢালিউডের পাশে সবসময় থাকার প্রতিজ্ঞা খুব অল্প লোকেরই ছিল। রাজ্জাক ছিলেন তাদের সবার পুরোভাগে।





