১৯৭৫-এ ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্র হিসেবে নাম নিবন্ধন করা আছে— গণিত, পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞান পড়ব, বাংলা ও ইংরেজি তো আছেই। কিন্তু তত দিনে আমি বুঝে গেছি রসায়ন আমার নয়, পদার্থবিজ্ঞান আমার নয়, যে কোনো ধরনের টেক্সট বই-ই হোক না কেন, কোনোটিই আমার নয়।
আমার প্রিয় পাঠ তখন অভিভাবকদের ভাষায় যত সব ‘বাজে বই’। আমার বাজে বই পাঠের দুটি পর্ব— প্রথম পর্বে নীহার রঞ্জন গুপ্ত, রোমেনা আফাজ, কাজী আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ আমার পাঠরুচি আমূল পাল্টে দিল। চুয়াত্তর-পঁচাত্তরে আমার সবচেয়ে প্রিয় লেখক বুদ্ধদেব বসু। তিথিডোর, মৌলি চাখের পাশাপাশি আমি তখন মগ্ন তারাশঙ্করের উপন্যাসে: চাঁপাডাঙ্গার বউ, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, কবি, ধাত্রীদেবতা, গণদেবতা। কিন্তু রাইকমল তখনো পড়া হয়নি। এরই মধ্যে প্রতি মিনিটে ৭৮ ঘূর্ণনের রেকর্ডে গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শুনি আমার বেলায় অশ্রুতপূর্ব এক অসাধারণ গান:
‘মধুর মধুর বংশী বাজে কোথা কোন কদমতলিতে
কোন মহাজন পারে বলিতে?
আমি পথের মাঝে পথ হারালেম ব্রজে চলিতে।
ওগো ললিতে।
হায় পোড়মন—
ভুল করিলি চোখ তুলিলি পথের ধুলা থেকে
রাই যে আমার রাঙা পায়ের ছাপ দিয়েছে এঁকে
আলোর ছটা চোখ ধাঁধালো চন্দ্রাবলির কুঞ্জগলিতে।
বিস্মিত হই যখন দেখি গীতিকারের নাম তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর আবিষ্কার করি, এ তো রাইকমলের গান, যেখানে মহান্ত শুনিয়েছে প্রাণের কথা:
‘সখি, সুখ দুখ দুটি ভাই
সুখের লাগিয়া
যে করে পীরিতি
দুঃখ যায় তার ঠাঁই।’
তারপর শুনি মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে সঙের দলের গান:
‘শিবো হে, শিবো হে, অ শিবো শঙ্কর হে।
হাড়মালা খুলে ফুলোমালা পরো হে
অ শিবো শঙ্কর হে
হায় হায় হায় হায়—
ফুল যে শুকিয়ে যায়
গলায় বিষের জ্বালায় শিবো জ্বরজ্বর হে।
অ শিবো শঙ্কর হে।’
এ গানের গীতিকারও যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তার চাঁপাডাঙ্গার বউ উপন্যাসের গান।
মানবেন্দ্র তখন তারাশঙ্করের কাছে নেহাতই ছোকড়া। তিনি তাকে বললেন, ‘এ কঠিন গান, তুমি তুলতে পারবে না।’
মানবেন্দ্র গোঁ ধরলেন, পারবেনই।
তারপর তারাশঙ্কর নিজেই, হাত উঁচিয়ে নেচে নেচে এই গানটি তুলে দিলেন মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে।
আমার জন্য তারাশঙ্কর এক আরাধ্য বিস্ময়। যে কালে লিখে টাকা-পয়সা পাওয়া রীতিমতো দুরূহ ব্যাপার ছিল, তারাশঙ্কর লেখার টাকায় গাড়ি কিনে গাড়ি হাঁকাতেন। শেষ জীবনে কিনেছিলেন সম্পূর্ণ নতুন একটি ফিয়াট।
তারাশঙ্করের আত্মকথায় পড়েছি, স্বদেশী যুগের আন্দোলনকারী তারাশঙ্কর গ্রেফতার এড়াতে পালাচ্ছেন, পেছনে তাকে ধাওয়া করেছেন পুলিশের রাজভক্ত এসডিপিও শামসুদ্দোহা। একবার ধরতে পারলে হাড়গোড় একাকার করে দেবেন। এ শামসুদ্দোহা (ইন্দিরা রোড নিবাসী) পূর্ব পাকিস্তান পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী হয়েছিলেন।
এই ধাওয়া তাকে নিষ্কৃতি দেয়নি, এমনকি মৃত্যুর বছরও। নকশালবাড়ি আন্দোলন তখন তুঙ্গে। ১৯৭১-এ জানা গেল ‘শ্রেণীশত্রু’ তারাশঙ্করের নামও রয়েছে তরুণ নকশালিদের খাতায়। একটা ট্রিগার টিপতে পারলেই আন্দোলন আরো একধাপ এগিয়ে যাবে।
তাদেরই একজন সূর্য মুর্মূ এসে হাজির হলেন— তারাশঙ্করকে রক্ষা করতে হবে। সূর্য লক্ষ রাখতেন তার ওপর; তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতেন। সূর্যের সাদামাটা পোশাকের আড়ালে থাকত লোডেড রিভলভার। প্রায় বন্দি জীবনই কাটিয়েছেন জীবনের শেষ বছরটি।
তারাশঙ্করের চরিত্রগুলো কি বাস্তবের?
‘আমার গল্প-উপন্যাসের সব চরিত্র বাস্তব থেকে উঠে আসা। ওরা সবাই আমার চেনা মানুষ। চেনা মানুষের মতো স্থান-কালও আমার পরিচিত। চেনা মানুষ, চেনা জায়গা না পেলে আমি পায়ের তলায় মাটি পাই না।’
রুদ্র প্রসাদ চক্রবর্তীর ‘চেনামুখ-অচেনা কথা’ গ্রন্থে তাকে দেয়া তারাশঙ্করের একটি পরামর্শের উদ্ধৃতি দিয়েছেন: ‘...তোমাকেও একটি কথা বলি, চেনা মানুষ আর চেনা জায়গার বাইরে পা দেবে না, শক্তি পাবে না, শক্ত মাটিও পাবে না।’
এটা আমিও মানি। আমার চেনাজানা নগরবৃত্তের বাইরে যেতে চাই না, পায়ের তলায় শক্ত মাটি পাই না।
দুই
কলকাতার এলিট কলেজ সেন্ট জেভিয়ার্সের আইএ ক্লাসের শিক্ষার্থী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে ১৯২১ সালে এক বছর কারাবাস করেন, তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি সেখানেই। আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করে ১৯৩০-এ আরো এক বছর অন্তরীণ থাকেন। প্রায় এক দশক পর পিতৃভূমি বীরভূমের লাভপুর গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন। লেখালেখিকে জীবন ও জীবিকার মাধ্যম করে নেন।
তারাশঙ্করের প্রকাশিত উপন্যাস ৬৫, গল্পগ্রন্থ ৫৩, নাটক ১১, প্রবন্ধ-নিবন্ধ ৪, ভ্রমণ ২ এবং আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ৪টি।
তারাশঙ্করের স্ত্রী উমাশশী দেবী (বিয়ের বছর ১৯১৬), দুই ছেলে— সনত্কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯১৮-তে এবং ছোট ছেলে সরিত্কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯২২-এ; তিন কন্যা— গঙ্গার জন্ম ১৯২৪, বুলু ১৯২৬ এবং বাণী ১৯৩২।
ভারতের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পুরস্কারগুলোর সবই তিনি পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের পর নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের দাবিদার একজন বাঙালি লেখকের নামও যদি করতে হয়, তা অবশ্যই তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম।
তারাশঙ্করের কনিষ্ঠ কন্যা বাণী রায়ের বাবাকে উত্সর্গ করা গ্রন্থ ‘তারাশঙ্কর-স্মৃতিচারণ’, প্রথম প্রকাশ ১৪০৯ বঙ্গাব্দ সাগ্রহে পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, মেয়ে তার বিশাল মহীরুহ বাবাকে কেমনভাবে দেখেছেন, তার কয়েকটি স্মৃতিচিত্র পাঠকের সঙ্গে ভাগ করা যায়— এ নিবন্ধটি রচনার তাগিদ বাণীর সেই বই। বইটির একটি উপ-শিরোনামও আছে— আমার বাবার কথা!
তিন
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের (২৩ জুলাই ১৮৯৮-১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১) বেশ ক’টি কাহিনী চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে: জলসাঘর, সপ্তপদী, অভিপ্রাণ, দুই পুরুষ, গণদেবতা, আঁচল, জীবন মাসি, অন্তরমহল, বেদেনী, রাইকমল প্রভৃতি।
উত্তম কুমার তারাশঙ্করের ১৩টি কাহিনীর অভিনেতা! চাপাডাঙ্গার বউ (১৯৫৪), রাইকমল (১৯৫৫), বিচারক (১৯৫৯), সপ্তপদী (১৯৬১), বিপাশা (১৯৬২), কান্না (১৯৬২), উত্তরায়ণ (১৯৬৩), শুকসারি (১৯৬৯), মঞ্জরি অপেরা (১৯৭০), হার মানা হার (১৯৭২), দুই পুরুষ (১৯৭৮), নবদিগন্ত (১৯৭৯) ও রাজা সাহেব (১৯৬০)। এর মধ্যে নয়টি মুক্তি পেয়েছে তারাশঙ্করের জীবদ্দশায়।
চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে তার সম্পর্কটি অন্তরঙ্গ। ছোট মেয়ে বাণীর বিয়েতে উত্তম কুমার, অজয় কর, শিশির মল্লিক, দেবকী কুমার বসু, দেবনারায়ণ গুপ্তসহ সেকালের খ্যাতিমান অনেক চলচ্চিত্রব্যক্তিত্বকে নিমন্ত্রণ জানিয়ে ছিলেন। আর সাহিত্যজগতের খ্যাতিমানরা তো ছিলেনই। আত্মীয়স্বজন আর তারাশঙ্করের লাভপুর গ্রামের সাধারণ মানুষ, তারাই তার গণদেবতা।
বিয়ের খাবার কত পদের হবে, সে তালিকা করে দিয়েছিলেন তারাশঙ্করের স্নেহভাজন সুধা, সজনীকান্ত দাসের স্ত্রী; আর ব্যবস্থাপনা সজনীকান্ত নিজেই।
বিয়েতে উত্তম কুমার বাণীকে শাড়ি দিয়েছেন, কিন্তু খেয়ে যাননি। তারাশঙ্কর ক্ষুব্ধ।
তিনি মেয়েকে বললেন, ‘উত্তম যে শাড়িটি দিয়েছে, সেটা যেমন আছে তেমনি থাক। ও খেয়ে যায়নি, স্নেহ করি বলেই নিমন্ত্রণ করেছিলাম, নাকি শাড়ি দেবার প্রত্যাশায়!’
বাকিটুকু বাণীর বর্ণনায়:
‘সেটা আবার কেমন কথা। সেখানে সজনীকান্ত ছিলেন খাওয়াদাওয়ার তদারকিতে, তাছাড়াও দুই ভাই তার দুই ছেলে সনত্, সরিত্ ও তার তিনটি ভাইপো— এতগুলি মানুষ।
উত্তম কুমার না খেয়ে গেলেন কীভাবে। উত্তরটি দিয়েছিলেন ছোট বৌদিই— কীভাবে খাবেন উনি। তুমিই বলেছো ঘরে কেউ ছিল না। বিয়ের দিন সবাই জানে মেয়েরা এমনভাবে ওর গাড়ি ঘিরে ধরেছিলেন, তাই উনি পেছনের রাস্তা দিয়ে পালিয়ে বেঁচেছিলেন। তাছাড়া তুমি তো দ্যাখোনি বাড়ির সামনের রাস্তায় এত গাড়ি দাঁড়িযেছিল, একেবারে ব্রিজ পর্যন্ত যে পুলিশও দিতে হয়েছিল।’
প্রায় সপ্তাহ পর যখন উত্তম কুমার তারাশঙ্করের বাড়িতে এলেন, তিনি শাড়ির প্যাকেট হাতে নিয়ে বললেন যে, শাড়ির প্রত্যাশায় তো আর তাকে নেমতন্ন করেননি।
উত্তম বারবার হাতজোড় করে ক্ষমা চাইছেন আর তারাশঙ্কর বলছেন, ‘তবুও তুমি খেয়ে যেতে পারতে।’
উত্তম বললেন, ‘সে যে কি নারী বাহিনী আমায় ঘিরে ধরেছিল, আপনি দেখেননি তাই বলছেন। আমি পেছনের রাস্তা দিয়ে পালিয়ে ছিলাম।’
‘তাহলে মিষ্টি খাও, তবেই তোমার শাড়ি রাখব।’
তারাশঙ্করের জন্মদিনে উত্তম কুমার প্রতি বছর সকাল সকাল এসে তাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে যেতেন।
বাণী তারাশঙ্করের ছোট মেয়ে, ১৯৩৪-এ বীরভূম জেলার লাভপুরে জন্ম। ১৯৫৭ সালে ডাক্তার ও সাহিত্যিক বিশ্বনাথ রায়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বাবাকে নিয়ে বাণীর বই ‘তারাশঙ্কর স্মৃতিচারণ’ তারাশঙ্কর ও তার কালের একটি বিশ্বস্ত দলিল।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের নকশালবাড়ি থেকে উদ্ভূত আন্দোলন বাংলার গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথাই আছে। শ্রেণীশত্রু নিধন হয়ে ওঠে আন্দোলন বাস্তবায়নের অন্যতম কর্মকৌশল। কিন্তু শ্রেণীশত্রু কে?
এ তালিকায় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উঠে যায়। কমরেড চারু মজুমদার হয়ে ওঠেন যুবমানসের আরাধ্য মুক্তিদাতা। তাকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে এলেন সূর্য মুর্মূ। গুলিভরা রিভলবার নিয়ে বাংলার শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিককে ২৪ ঘণ্টা প্রহরায় রাখেন।
বাণী রায় বাবাকে নিয়ে লিখছেন:
‘যে মানুষটি রীতিমতো সংগ্রাম করে দিনের পর দিন চা আর পাউরুটি খেয়ে জীবন ধারণ করেছিলেন, মায়ের সাজানো বাহারের নানারকম অন্নব্যঞ্জন পরিত্যাগ করে একাগ্র হয়েই দেবী সরস্বতীর সাধনা করে গিয়েছিলেন, পরাজয় কাকে বলে তিনি গ্রাহ্য করেননি, এই পথে যেতে কত অপমানিত কত ক্ষুব্ধ হয়েছেন কিন্তু পিছিয়ে আসেননি। সেই মানুষটি কিনা আজ ঘরে বন্দী!
কিছুদূর গেলেই সূর্য মুর্মূ বলেন— আর যাবেন না স্যার। মিনতি জানাতেন ঘরে যাবার জন্য। এই আন্দোলনটি মূলত ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এই সুযোগে কিছু সমাজবিরোধীও ঢুকে পড়েছিল ঐ দলের মধ্যে... দু’তিনটি তরুণ উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারাশঙ্করকেই লক্ষ করছিলেন। কে ওরা, কী চায়? কিছু না স্যার। ওরা কে জানি না, আপনি ঘরে চলুন। সূর্য মুর্মূ জোর করে উঠিয়ে নিয়ে যেতেন।’
তারাশঙ্করের আক্ষেপ: ওরে দেশের যে কি দুর্দিন আসছে। তারপর আর মাত্র ক’মাস। ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ ভোর ৬টায় তারাশঙ্করের জীবনাবসান ঘটল। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র সেদিন আকাশবাণী কলকাতায় তার মৃত্যু ও শবযাত্রার যে ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন, হয়তো এখনো তা কারো কারো কানে বাজে।
চার
তারাশঙ্করের দ্বিতীয় কন্যা বুলু, বাবার মতোই কালো। হয়তো কালোর কারণেই বাবারও প্রিয়তম। কালোতেও সুন্দর লাবণ্যময় মুখশ্রী। পুজোর সময় বুলু তার দিদি ফর্সা রঙ গঙ্গার সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির অর্চনা দেখতে গিয়েছিল। যাদব লাল ঠাকুরদের বাড়ি। ঠাকুরগিন্নিদের সুদর্শন একজন গঙ্গাকে জিজ্ঞেস করল, ‘গঙ্গা ওই কালো মেয়েটা কে রে?’ অপ্রতিভ গঙ্গা ‘ও তো আমার ছোট বোন’ বলে দ্রুত চলে আসে। বুলু বাড়ি ফিরে বাবার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে ঘটনাটি বলে, কষ্ট তারাশঙ্করও পেয়েছেন।
বাণী রায় লিখছেন:
‘এর কিছু পরে বুলুর হয় ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া। চিকিত্সাও হয়েছিল অবশ্যই। কিন্তু বুলু চলে গেলেন। বুলু বাবার জীবনে একটি বিপুল আশ্রয় ছিলেন। তারাশঙ্কর মর্মান্তিক বেদনার আবেগে খাওয়াদাওয়া, কাজকর্ম ছেড়েই দিয়েছিলেন। বুলুর আকস্মিক মৃত্যু তাঁকে শোকের একটি ঊর্ধ্বলোকে উঠিয়েছিল। তিনি দীর্ঘদিন কর্মহীন বিষণ্নতার জগতে বাস করছিলেন।
তাঁর এই সময়ের অনুভবের প্রতিফলন আছে তাঁর একটি ছোটগল্পে, নাম শ্মশানঘাট। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখেন সন্ধ্যামণি। কারণ বুলুর পোশাকি নাম ছিল ‘সন্ধ্যা’। মৃত্যুর জগত্ই তার কাছে একমাত্র সত্য।’
বুলুর বয়স মৃত্যুকালে ছয় বছর। তারাশঙ্করের এবারের আশ্রয় বাণী— আরো অনেক দিন পরে আরো একটি গল্পে তিনি লিখেছিলেন, ‘শোকের ঊর্ধ্বলোক হইতে যে আমাকে মাটিতে টানিয়া নামাইল সে যে ঐ বাণী।’ গল্পটির নাম ‘বাণীমা’।
বুলু তার বাবাকে এ কথাই বলেছে। বাবা তুমি কালো আর আমি কালো, দিদি (গঙ্গা) আর বোন (বাণী) ফর্সা।
কালোর জন্য তারাশঙ্করের টান তা তো তারই একটি ধ্রুপদ বাক্যে স্মরণীয় হয়ে আছে: ‘কালো যদি মন্দ তবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে।’
তারাশঙ্করের ‘কবি’ উপন্যাস থেকে খানিকটা উদ্ধৃতি অনিবার্য ঠেকছে। রাজার বেপরোয়া হাসিতে ঠাকুরঝি ‘বিপুল কৌতুক’ অনুভব করে জিজ্ঞেস করল:
‘— অই! অই! ই কি হাসি গো! এমন করে হাসছ কেনে গো জামাই? সঙ্গে সঙ্গে হাসির ছোঁয়াচ তাহাকেও লাগিয়া লাগিয়া গেল। সেও হাসিতে আরম্ভ করিল হি-হি-হি। হি-হি-হি। অত্যন্ত দ্রুত মৃদু ধাতব ঝঙ্কারের মত হাসি।
রাজার হাসি অকষ্মাত্ থামিয়া গেল। তাহার দিকে আঙ্গুল দেখাইয়া হাসার জন্য সে ভীষণ চটিয়াছে। তাহার মনে হইল মেয়েটা তাহাকে ব্যঙ্গ করিতেছে। ভীষণ চটিয়া রাজা ধমক দিয়া উঠিল— অ্যাও!
ধমক খাইয়া মেয়েটির হাসি বাড়িয়া গেল
রাজা বলিল— আলকাতরার মত রঙ, সাদা দাঁত বের করে হাসছে দেখ। লজ্জা নেই তোর?
...
ঠাকুরঝি মেয়েটি বড় ভাল। আজ সে অনেক কথা অনর্গল বলিত। বলিবার ছিল যে! গতরাত্রির কবিগান শুনিয়া ঠাকুরঝি সবিস্ময়ে কত কথা বলিত। মেয়েটি অত্যন্ত দুঃখ পাইয়াছে, তাই সে কথাগুলি না বলিয়াই চলিয়া গেল। আলকাতরার মত রঙ—। ছি ওই কথা কেউ বলে! কালো? ওই মেয়ে কালো? রাজনের চোখ নাই। তাছাড়া কালো কি মন্দ! কৃষ্ণ কালো, কোকিল কালো, চুল কালো— আহা-হা! আহা-হা! বড় সুন্দর বড় ভাল একটি কলি মনে আসিয়া গিয়াছে রে! হায়, হায়, হায়।
‘কালো যদি মন্দ হবে কেশ পাকিলে কান্দ কেনে?’
কেন কাঁদ?
পাঁচ
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী উমা দেবী নিজ অর্থে বরাহনগরে দোতলা সুন্দর একটি বাড়ি কেনেন। এখানে এক ফালি জমিতে তারাশঙ্কর বাগান করেছিলেন। বাণী লিখছেন:
“সত্যিই মাটির প্রতি এক ধরনের নিবিড় মমতা ছিল তাঁর। পালংশাক লাউশাক-এর লতা উঠেছিল লকলকিয়ে...ঐ কাঁচা পালং পাতা তিনি খেতেন এক ভাঁড় দই-এর সঙ্গে। বোধ হয় স্বাস্থ্যের কারণেই।
... আরো একটি ঘটনা মনে আছে, একদিন দাদা সনত্ হঠাত্ এসে খবর দিলেন— ‘বাবা, রবীন্দ্রনাথ আর নেই।’ বাবা পাঞ্জাবি কোনোমতে গলিয়ে বেরিয়ে গেলেন। আর দাদা সিঁড়িতে বসে দুহাতে মুখ ঢাকা দিয়ে কাঁদতে লাগলেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ছোট ছেলের মতোই।”
ছাদে বাণীর পুতুল খেলা। একটি ছোট্ট টিনের বাক্সে শাড়ি আর পুঁতির মালা।
বাবা একদিন বলেছিলেন— ‘এই বাণী, তুই পুতুল খেলবি না।’
মাও ছিলেন বাবার ঘরে। মা খুব অবাক হয়েই প্রশ্ন করেছিলেন— ‘কেন, কিসের জন্য খেলবে না। সবাই তো খেলে।’ — ‘বড়বৌ তুমি বুঝতে পারো না কেন যে, এসব ছোট ছোট মেয়েদের পুতুল খেলার ভেতর দিয়ে সংসার করার স্বাদ পায়। বই পড়ছে পড়ুক। কিন্তু পুতুল খেলা নয় একেবারেই।’
বন্ধ হলো পুতুল খেলা।
ছয়
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় পঞ্চাশ বছরে পা দিচ্ছেন। একটি সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। শ্যামবাজারে একটি অভিজাত বাড়ি ‘রাধাদামোদর কুঞ্জ’-এর উঠানে। সংবর্ধনা সভার প্রধান উদ্যোক্তা শনিবারের চিঠির সম্পাদক সজনীকান্ত দাস। ধাত্রীদেবতা গণদেবতা ততদিনে প্রকাশিত হয়েছে। তারাশঙ্কর খ্যাতির মধ্যগগনে। সেই সভায় তারাশঙ্করের পাশে বসেছিলেন তার কন্যা বাণী।
বহু কবি-সাহিত্যিক এসেছিলেন। কবি করুণা নিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, কালিদাস রায়, কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, মনোজ বসু, প্রবোধকুমার স্যান্যাল, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বনফুল, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, খগেন্দ্রনাথ মিত্র প্রমুখ। এরা নিজস্ব ক্ষেত্রে সবাই গুণীজন। যারা আসতে পারেননি তারা ভাষণ পাঠিয়েছিলেন। যেমন— বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
আর লাভপুর থেকে এসেছিলেন তারাশঙ্করের পুরনো সখা ভোলানাথ পণ্ডিতমশায়। তিনি বন্ধুকে নিয়ে লেখা স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। তার কবিতা সবাইকে অশ্রুসিক্ত করে তুলেছিল। অভিভূত প্রীতিমুগ্ধ তারাশঙ্কর প্রায় রুদ্ধকণ্ঠে নিজের ভাষণটি দিয়েছিলেন।
একটি বছর বাদে তারাশঙ্করের জন্মদিন বেশ ঘটা করে বাড়িতেই হতো। বাণী রায়ের বিবরণ:
‘ভোরে আসতেন শ্রদ্ধেয় গজেন্দ্রকুমার মিত্র, সুমথনাথ ঘোষ ও গৌরিশঙ্কর ভট্টাচার্য। ওঁদের হাতে থাকত ধুতি, চাদর, মিষ্টি ও ফুলের মালা। যুঁই কিংবা বেল ফুলের গোড়ের মালা। প্রণাম করতেন তারাশঙ্করকে, তারাশঙ্করও আলিঙ্গনে ওঁদের প্রীতি-ভালোবাসা জানাতেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। ওঁরা তো সন্দেশ খেয়েই বিদায় নিতেন। একটু পরে যিনি আসতেন তিনি সজনীকান্ত। বলিষ্ঠ মনের বিরাট পুরুষটি সজনীকান্ত। তাঁর হাতে থাকত বড়সড় একটা মাছ। খাদ্যরসিক ছিলেন সজনীকান্ত। তাই সুধা কাকীমা নানা রান্নাও জানতেন তার খাদ্যরসিক স্বামীটির জন্য। দরাজ গলায় হাঁক দিতেন— ‘কই হে বড়বাবু, বেরিয়ে এসো।’ বড়বাবুকে গায়ে আলিঙ্গনে সিক্ত করে দিতেন। এখানে বলে রাখা ভালো, সপ্তপদী চিত্র রূপায়িত হবার পর উত্তম কুমার আসতেন তারাশঙ্করের কাছে প্রতিটি ভোরেই। হাতে লাল গোলাপের গুচ্ছ নিয়ে। সাদা পাঞ্জাবি ও পাজামায় সুশোভিত হয়েই আসতেন। মিষ্টি খেতেন শুধু। আর সজনীকান্ত খেতেন বিনা চিনির চা।
...
আর সন্ধ্যেবেলায় হল আলো করে বসতেন তাঁর ‘ক্ষীরসমুদ্রের’ নবীন লেখকের দলটি। শ্রদ্ধেয় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সন্তোষ ঘোষ, গৌরিশঙ্কর, গৌরকিশোর ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র এবং তার ভাই ধীরেন্দ্রনাথ মিত্র, নারায়ণ চৌধুরী প্রমুখ। আর প্রবীণ যাঁরা তাঁদের মধ্যে ছিলেন শ্রদ্ধেয় মনোজ বসু, প্রবোধকুমার স্যান্যাল। জগদীশ ভট্টাচার্য, আশাপূর্ণা দেবী, সরোজকুমার রায় চৌধুরী ও পরে আসতেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এবং ডা. নীহাররঞ্জন গুপ্ত। আরো আসতেন শৈলজানন্দ ও প্রমথনাথ বিশী। মনে আছে একবার প্রমথনাথ বিশী আসতে পারেননি— একজনের হাতে দিয়ে পাঠিয়েছিলেন একটি ‘বাঁশের বাঁশি’। একটি কাগজে সুরসিক প্রমথনাথ লিখেছিলেন, ‘যে বাঁশেতে লাঠি হয়, মন, সেই বাঁশে হয় মোহনবাঁশি’।”
তারাশঙ্করের স্ত্রী এই বাঁশিটি নিজের ট্রাঙ্কে তুলে রেখেছিলেন।
সাত
‘পথের পাঁচালী’ দেখে বাণী মুগ্ধ। সেই ছবির নির্মাতা সত্যজিত্ রায় এসেছেন তারাশঙ্করের বাড়িতে ‘জলসাঘরে’র চিত্রস্বত্ব কিনতে। বাণীর বিবরণ:
‘দীর্ঘকায় ব্যক্তি, প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ তিনি। সকালের দিকেই এসেছিলেন তিনি। সেদিনও বাড়িতে কেউ ছিলেন কিনা ঠিক মনে পড়ছে না। দাদা থাকলে তো অভ্যর্থনা করতেন। হয়তো ছিলেন না। প্রায় ছ ফুটের উপর লম্বা পাঞ্জাবি পায়জামা সুশোভিত একটি মানুষ। উনি তারাশঙ্করের লাইব্রেরিতে ঢুকেছিলেন। পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখছিলাম, লাইব্রেরির দরজায় ওঁর মাথাটা আটকে যাচ্ছিল। নিজের মাথা বাঁচাবার জন্যেই মাথাটি নামিয়ে ঢুকেছিলেন। তারাশঙ্কর বসেছিলেন একটি বাঘের ছালের উপর। দুটি প্রবল ব্যক্তিত্ব মুখোমুখি। এত মৃদুসুরে কথা বলছিলেন, কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। অবশ্য কাজ শেষ করে মিনিট পনেরোর মধ্যেই তিনি চলে গিয়েছিলেন।’
আট
বাণী তেমন সুশী নয়। বাণী রোগা, বাণী বোকা। এমনকি বাণীর মা উমা দেবীই বেশি বলতেন ,‘বাণীর বুদ্ধি নেই।’ বাণীর যখন এ রকম একটি বৈরী সময়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় দোতলায় মেয়ের ঘরে ঢুকে নিজের মাথাটি বাড়িয়ে দিয়ে বলতেন, ‘মাগো মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও তো, লেখাটা যে আসছে না।’ কী অসম্ভব কথা, বিস্ময়ের কথা। যখন চারদিকেই তিনি শুনছেন বাণীর চেহারাটা বড় রোগা, বুদ্ধি কম! বিচলিত পিতৃদেব, সেখানে অসহায় তিনি। কার মুখে হাত চাপা তিনি দেবেন?





