এমন একটা যুগ গেছে যখন উদ্ভিদের নামে দুনিয়ার মানচিত্র টানা হয়েছিল, সেটা ছিল পূর্ব আর পশ্চিম গোলার্ধের দুই সাম্রাজ্যের লড়াই— ভারত ও চীনা সাম্রাজ্য পপি এবং চা নিয়ে লড়াই করেছে।

পপি থেকে তৈরি হতো আফিম, যা আঠারো ও উনিশ শতকে প্রাচ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হতো। তত্কালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ ভারতে এই আফিম উত্পাদন ও প্রক্রিয়াজাত করা হতো। আফিম উত্পাদন ও বাজারজাতের নিয়ন্ত্রণাধিকার ছিল একমাত্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। কোম্পানি ভারতে তাদের এই আফিম সাম্রাজ্য চালাত। অন্যদিকে দুনিয়ায় চা উত্পাদনে একক অধিকার ও সামর্থ্য ছিল শুধু চীনের। প্রায় ২০০ বছর ধরে চীন ও ব্রিটেন নিজেদের মধ্যে চা ও আফিম বিনিময় করেছে। এই বিনিময় যে ইংল্যান্ডের জন্য খুব লাভজনক ছিল, তেমনটা নয়; কিন্তু তার পরও এটি তাদের অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য খাতে পরিণত হয়েছিল। সরকারের আয় করা প্রতি ১০ পাউন্ড স্টারলিংয়ের ১ পাউন্ড আসত চা আমদানি ও বিক্রির ওপর ধার্য করা কর থেকে। এ হিসাবে বছরে একজন ব্রিটিশ নাগরিকের বিপরীতে সরকার ১ পাউন্ড রাজস্ব পেত। চা থেকে পাওয়া রাজস্ব দিয়ে ব্রিটিশ সরকার একটি শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় যে খরচ হয়, তার অনেকটা নির্বাহ করেছে। যেমন— রেলপথ, সড়ক নির্মাণ, কর্মকর্তাদের বেতন প্রদান প্রভৃতি। অন্যদিকে আফিমও ব্রিটিশদের জন্য জরুরি ছিল। কারণ এ আফিমের আয় থেকে তারা তাদের সম্ভাবনাময় উপনিবেশ ভারতের খরচ জোগাড় করত।

বিশ্ব অর্থনীতির বিকাশে সেকালে উদ্ভিজ্জ পণ্যের ত্রিভুজ বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। উদ্ভিদ চাষ, প্রক্রিয়াকরণ ও বিক্রির মাধ্যমেই সাম্রাজ্যের চাকা ঘুরত। চীনের ছিল চা আর ব্রিটেনের ছিল আফিম। আর দুই সাম্রাজ্যের এই বাণিজ্যে ভারত ছিল এক অপরিহার্য স্টেশন। উনিশ শতকের মধ্যভাগ নাগাদ ব্রিটিশ ও চীনাদের সম্পর্ক মারাত্মক খারাপ হয়ে যায়। চীনা সম্রাট ১৭২৯ খ্রিস্টাব্দে চীনে আফিম বিক্রি নিষিদ্ধ করেন। তার পরও বহুবছর চোরাচালানের মাধ্যমে আফিম চীনে বিক্রি হতো। উল্লেখ্য, সে সময় ব্রিটেনের রানীর আদেশে আফিম বিক্রি নিষিদ্ধ ছিল এবং রানীর আদেশ সেখানে সবাই মেনে চলে।

আফিম বিক্রি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ১৮২২-৩৭ সময়কালে আফিমের উত্পাদন পাঁচ গুণ বৃদ্ধি পায়। শেষে ১৮৩৯ সালে চীনের ক্যান্টন বন্দরের এক কর্মকর্তা বিদেশী আফিম ব্যবসায়ীদের শয়তানি আর চীনাদের আফিম আসক্তির কুফল দেখে আর স্থির থাকতে পারেননি। তিনি বন্দরের সব বিদেশীকে আটক করে তাদের জন্য ৩০০ ব্রিটন মুক্তিপণ দাবি করেন। আজকের দিনে যা সাড়ে ১৪ কোটি মার্কিন ডলার। আফিম চীনা কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করার পরে বন্দিদের মুক্তি দেয়া হয়। আফিমের পরিমাণ ছিল ৩০ লাখ পাউন্ড। তিনি ৫০০ চীনা কুলিকে এ আফিম ধ্বংস করার জন্য নিয়োগ দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় নিজেদের লাভজনক এই বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে ব্রিটেনের রানী তাদের নৌবহর প্রেরণ করেন। ব্রিটেনের বাষ্পচালিত আধুনিক নৌবহরের সামনে চীনাদের কাঠের তৈরি পালতোলা জাহাজ টিকতে পারেনি। এরপর ইংল্যান্ড চীনের কাছ থেকে যে সুবিধা আদায় করে নেয়, তা হয়তো বহুবছরের কূটনৈতিক তত্পরতা দিয়েও অর্জন সম্ভব নয়। চীন হংকং ও পাঁচটি বন্দর ব্রিটেনের হাতে হস্তান্তর করে।

&dquote;&dquote;অল্প কয়েকজন পশ্চিমা মার্কো পোলোর আমলেই চীনে প্রবেশ করেছিল। প্রথম আফিম যুদ্ধের ২০০ বছর আগে থেকে ব্রিটিশ জাহাজগুলো কেবল ক্যান্টন বন্দরের প্রবেশপথ পর্যন্ত যেতে পারত। ব্রিটিশরা বন্দরে তাদের মালপত্র রাখার গুদাম থেকে আর কোথাও যেতে পারত না। এমনকি অনেকে ব্রিটিশ গুদাম থেকে ২০০ গজ দূরে ২০ ফুট চওড়া, ২৫ ফুট উঁচু শহর রক্ষা দেয়ালও দেখতে পায়নি; কিন্তু এবার আফিম যুদ্ধে জেতার পর পাঁচটি শহরে ব্রিটিশদের প্রবেশাধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো। তবে ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ও বণিকরা এবার ভিন্ন একটি আশঙ্কায় চিন্তিত হয়ে পড়লেন। চীনে আফিম উত্পাদন বৈধ করে দেয়া হয়। ফলে আফিম উত্পাদনে ভারতের একচেটিয়া আধিপত্য তথা ব্রিটিশদের বাণিজ্য শেষ হয়ে এল। লন্ডনে এবার নতুন পরিকল্পনা রচিত হলো, আফিমের পরিবর্তে চায়ের বাণিজ্য দখলের। 

ভারতের হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি ও আবহাওয়া ছিল চীনের সেরা চা উত্পাদক অঞ্চলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই ব্রিটিশদের পক্ষে চায়ের বাজারে প্রবেশের অনুকূল পরিবেশ ছিল। দরকার ছিল কেবল চীনা চা গাছ, বীজ। আর চায়ের চাষ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতি শেখা। এ কাজে ব্রিটিশদের এমন একজন মানুষকে দরকার ছিল, যিনি একাধারে উদ্ভিদবিদ, শিকারি, চোর ও গুপ্তচর। এসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে একজন সেদিন ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন, তার নাম রবার্ট ফরচুন।

চীন থেকে চায়ের উত্পাদন কৌশলের ইউরোপ যাত্রা ছিল ইতিহাসের অন্যতম সফল করপোরেট গুপ্তচরবৃত্তির ফসল। আর এ ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল, তারা ইতিহাসে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী করপোরেট লুটেরা বলে পরিচিত। আর কেউ নয়, এ হলো ব্রিটেনের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রবার্ট ফরচুনকে চীনের অভ্যন্তরে পাঠায়। চীন তখন বিদেশীদের জন্য এক নিষিদ্ধ এলাকা। ফরচুনের কাজ ছিল চা গাছের চাষ পদ্ধতি ও চা তৈরির প্রক্রিয়া জেনে নেয়া। ছদ্মবেশ নিয়ে ফরচুন চীনে প্রবেশ করেন। তিনি ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট গুপ্তচর হিসেবে সফলভাবে তার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ব্যাপারটা কিন্তু এমন ছিল না যে, ফরচুন চীন যাওয়ার আগে ইউরোপে কেউ চা পান করত না। সে সময় ইউরোপে চায়ের ভালোই সরবরাহ ছিল। সমস্যা ছিল, এ চায়ের সবটাই উত্পাদন হতো চীনে। অর্থাত্ চায়ের বাণিজ্যে চীনের ছিল একচেটিয়া আধিপত্য। দুই শতক ধরে এমনটাই চলছিল। এ সময়ের মধ্যে বিষয়টি কোনো আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠেনি। চীনারা চায়ের চাষ করত, পাতা প্রক্রিয়াজাত করে সেরা চা নিজেদের ভোগের জন্য রেখে বাকিটা বিদেশে রফতানি করত। নিম্নমানের চা নিয়েও ব্রিটিশদের মধ্যে দারুণ আগ্রহ দেখা দেয়। ব্রিটেনে চায়ের বিপুল চাহিদা পূরণের দায়িত্ব নেয় লন্ডনভিত্তিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ভারতে উত্পাদিত আফিমের বিনিময়ে তারা চীন থেকে চা সংগ্রহ করত। এটা ছিল নিষ্পাপ বিনিময়। ব্রিটিশ ও চীনা উভয়ই তাদের পছন্দের নেশা পেয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু এবার ব্রিটিশরা চায়ের ওপর চীনের একক দখলদারিত্বের অবসানের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা এবার ভারতে হিমালয়ের পাদদেশে চা উত্পাদনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ এলাকার জলবায়ু ও ভূগোল চীনের চা উত্পাদনকারী অঞ্চলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। তবে কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। চা বেশ সংবেদনশীল উদ্ভিদ। অন্যদিকে চীনারা শত শত বছর ধরে চায়ের চাষ এবং প্রক্রিয়াকরণের প্রবল উত্সাহ ও হিংসা নিয়ে নিজেদের মধ্যেই গোপন রেখেছিল।

ভারতে চা উত্পাদনের প্রাথমিক প্রচেষ্টাগুলো ছিল ব্যর্থ। গাছগুলো বেঁচে গিয়েছিল কিন্তু চা হতো তেতো ও বাজে স্বাদের। চীনের চায়ের মতো সুগন্ধি, সুস্বাদু হতো না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালকরা বুঝতে পারছিলেন তাদের আসল বীজ, সঠিক গাছ ও প্রযুক্তি প্রয়োজন। এগুলোর কোনোটাই চীনারা স্বেচ্ছায় দেবে না— এটাও তারা বুঝেছিলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেদিন যা করেছিল, তা আজকের দিনে শিল্প খাতের গুপ্তচরবৃত্তি বলে পরিচিত। তখন ডাকাতির জন্য চীনে জ্যান্ত মানুষের চামড়া ছাড়িয়ে নেয়া হতো, তাই যিনি গুপ্তচরবৃত্তি করে চায়ের রহস্য উন্মোচন করবেন, তাকে এই ঝুঁকি মাথায় নিয়েই চীনে প্রবেশ করতে হবে।

গাছপালা নিয়ে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আছে এমন একজন ছিলেন ৩৫ বছর বয়সী ফরচুন। কোম্পানির পরিচালকরা তাকেই চীনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। ফরচুন ছিলেন বিখ্যাত চেলসি ফিজিক গার্ডেনের কিউরেটর।

সেকালের নিষিদ্ধ শহর পিকিং থেকে বিস্তৃত বিশাল সাম্রাজ্য সম্পর্কে পশ্চিমাদের পরিষ্কার কোনো ধারণা ছিল না। তবে ফরচুনের অবস্থা একটু ভিন্ন ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাকে চীনে পাঠানোর কয়েক বছর আগেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন রয়াল হর্টিকালচার সোসাইটির পক্ষ থেকে একটি অভিযানে। তিনি সেবার এমন সব ফুল ও গাছ নিয়ে আসেন, যা আগে পশ্চিমে ছিল না; যেমন— শীতকালের জেসমিন, ব্লিডিং হার্ট, হোয়াইট ওয়েইসটেরিয়া, দ্য ফ্যান পাম। মাথা কামিয়ে পেছনে টিকি রেখে এবং মান্দারিন পোশাক পরে ছদ্মবেশে ফরচুন চীনে প্রবেশ করেছিলেন। তিনি আরো এনেছিলেন কুমকোয়াট ফল ও ডাবল ইয়েলো রোজ। ইংল্যান্ডের বহু বাগানে এখন এগুলো দেখা যাবে। প্রথমবারের এ অভিযানে ভাগ্যের শিকে ছিঁড়তে ফরচুনকে অনেক ঝুঁকি নিতে হয়েছিল, স্থানীয় চাকরদের মুখ বন্ধ রেখেছিলেন তাদের অনেক টাকা দিয়ে। ফিরে আসার পথে দক্ষিণ চীন সাগরে জলদস্যুদের কবলে পড়েছিলেন। কিন্তু চীনে দ্বিতীয় অভিযানেও কি ভাগ্য ফরচুনের পক্ষে থাকবে? তিনি চীনাদের চায়ের রহস্য উন্মোচন করতে পারবেন? ফরচুনের আগে চীনের বাইরে আর কেউই চায়ের রহস্য উন্মোচন করতে পারেননি।

ফরচুন আবারো চীনে প্রবেশ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার জন্ম হয়েছিল এক সাধারণ ঘরে, পিতা ছিলেন খামারের শ্রমিক। ছোটবেলা থেকেই ফরচুন বাগানে কাজ করতেন এবং পড়াশোনার চেয়ে বাস্তব কাজের মাধ্যমে গাছপালা সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেন।

রয়াল হর্টিকালচার সোসাইটির জন্য অর্কিড চাষ করে তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন, তাই চীনে অভিযানের জন্য তাকে বাছাই করা হয়েছিল। তবে প্রথমবারের অভিযান ফরচুনের জন্য কোনো আর্থিক পুরস্কার নিশ্চিত করেনি। গাছপালা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে একটি বড় ব্যবসায়িক পণ্য ছিল, শুধু বাগান সাজানো নয় বরং ওষুধ হিসেবে যেমন— কুইনাইন তৈরিতে গাছপালা ব্যবহার হতো। ফরচুন লাভের কোনো অংশ না পেলেও তার সেই চীন অভিযান থেকে ব্রিটিশ সমাজ নানাভাবে উপকৃত হয়েছিল। তাই এবার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে নিজের পাওনা নিয়ে চুক্তি করলেন। চুক্তি অনুযায়ী ফরচুন বেশ ধনী হয়ে যাবেন। চুক্তি অনুযায়ী অভিযানে থাকা অবস্থায় তিনি বছরে ৫০০ পাউন্ড বেতনের পরিবর্তে কোম্পানিকে চীনের সেরা চা এনে দেবেন। তবে চা ব্যতীত আর কোনো উদ্ভিদ জোগাড় করতে পারলে সেটার অধিকার ফরচুনেরই থাকবে। আর যদি তা হয় তাহলে তো ফরচুন একবারেই বিরাট ধনী হয়ে যাবেন।

১৮৪৮ সালের সেপ্টেম্বরে ফরচুন চীনের উপকূলে হাজির হলেন। তিনি তখন ওয়্যাং নামে এক চীনার ছোট এক নৌকায়। ওয়্যাং মূলত তার নৌকাটি দিয়ে ব্যবসায়ী, চোরাকারবারিদের চীনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছে দেয়। এ চাকররাই ছিল ফরচুনের ভরসা। এরাই তাকে চীনের চা বাগান অবধি পৌঁছে দেবে। চীনে চা চাষ হয় এমন অঞ্চলের মানুষদেরই তিনি চাকর হিসেবে ভাড়া করেছিলেন।

চীনে প্রবেশের পর একজন পশ্চিমা হিসেবে তিনি স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। তবে তার বুদ্ধিমত্তা ও অনুকরণ করার ক্ষমতা তাকে চীনাদের চোখে সহনীয় করে তুলেছিল। কিন্তু চীনের ভেতরে যাওয়ার জন্য তার চাকররা শর্ত জুড়ে দিল। তারা বলল, দেশের ভেতরে যাওয়ার জন্য ফরচুনকে ছদ্মবেশ নিতে হবে নতুবা তারা সঙ্গে যাবে না। খুব সম্ভবত একজন পশ্চিমাকে দেশের ভেতরে নিয়ে আসার জন্য নিজেরা সমস্যায় পড়তে পারে— এমন বিবেচনা থেকেই চীনা চাকররা এ দাবি জানিয়েছিল।

চাকরদের নিয়ে ফরচুন একদিন সাংহাইতে হাজির হলেন পুরো কামানো মাথা, পেছনে কোমর পর্যন্ত নেমে আসা সেলাই করে লাগানো নকল টিকি নিয়ে। তিনি দুধ-চিনি ছাড়া পোর্সেলিনের বাটি থেকে চা চুমুক দিলেন। এটা চা পানের চায়নিজ পদ্ধতি। নিজের নাম নিলেন সিং ওয়া। তার গন্তব্য সুং-লো পর্বত, এখানেই জন্মাত চীনের সেরা চা। যে কয়েকজন ব্রিটিশ তখন চীনে প্রবেশ করেছিল, তারা যত দূর পর্যন্ত গিয়েছিল, তার চেয়ে ফরচুনকে আরো কয়েকশ মাইল ভেতরে প্রবেশ করতে হবে।

ফরচুন চীনাদের গড় উচ্চতার চেয়ে এক ফুট বেশি লম্বা ছিলেন। তাই তার উচ্চতা ও সাজপোশাক নিয়ে মাঝে মাঝে স্থানীয়দের অনুসন্ধানের মুখে পড়তে হয়েছে। উত্তর দিতেন যে, তিনি ‘গ্রেট ওয়াল’ ছাড়িয়ে আরো দূরের এক প্রদেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার পরিচয় আর ব্যাখ্যা শুনে স্থানীয়রা তাকে মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করত। পথে যেতে যেতে তিনি বিচিত্র সব উদ্ভিদ আর বীজ সংগ্রহ করছিলেন। বিস্ময়করভাবে কোনো চীনা চাকর তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি।

১৮৪৮ সালের অক্টোবরে ফরচুন দলবল নিয়ে ইয়াংজি নদীর তীরে এক চা বাগান ও কারখানায় হাজির হলেন। এ কারখানার দেয়ালে চা নিয়ে লু ইয়ুর বিখ্যাত কাজের কয়েকটি লাইন ক্যালিগ্রাফিতে লেখা ছিল:

 

সবচেয়ে ভালো মানের চায়ে

তাতার ঘোড়সওয়ারদের বুটের চামড়ার মতো

শক্তিশালী ষাঁড়ের গলার ভাঁজের মতো ভাঁজ থাকবে।

এই চা হবে গিরিখাত থেকে ওঠা কুয়াশার মতো,

দিঘীর পানিতে বাতাস ছুঁয়ে গেলে যেমন ঝকমক করে তেমনি

আর বৃষ্টির পরে মাটি যেমন ভেজা নরম হয় সে রকম।

 &dquote;&dquote;

এখানে এসে ফরচুন চায়ের উত্পত্তি নিয়ে চীনাদের বিশ্বাস জানতে পারেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, চায়ের উদ্ভব হয়েছিল গৌতম বুদ্ধের মাধ্যমে। বুদ্ধ যখন নির্বাণ লাভের জন্য ধ্যান করছিলেন, তখন একদিন তিনি শারীরিকভাবে খুব দুর্বল ও ঘুম ঘুম বোধ করছিলেন। বুদ্ধ তখন নিজের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। তার ধ্যানে কোনো কিছু বাধা সৃষ্টি করবে— এ তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তখন তিনি নিজের সব চোখের পাপড়ি ছিঁড়ে ফেলে দেন। তার চোখের পাপড়ি যেখানে যেখানে পড়েছিল, সেখানে সুগন্ধি গাছের ঝোপ গড়ে ওঠে। এ গাছই চা গাছ। একটি চীনা প্রবাদকে উদ্ধৃত করে ফরচুন পরবর্তীতে বলেছিলেন, ‘চা একটি অত্যন্ত উপকারী উদ্ভিদ। এটা চাষ করলে বহুমুখী সুবিধা পাওয়া যায়। চা পান করলে প্রাণশক্তি উদ্দীপ্ত হয়।’

ফরচুন এ চা কারখানায় একটি নতুন বিষয় শেখেন। সে সময় ইউরোপের মানুষের ধারণা ছিল, গ্রিন টি ও ব্ল্যাক টি ভিন্ন প্রজাতির গাছ থেকে উত্পাদন হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে একই গাছের পাতা দিয়ে এ দুই ধরনের চা তৈরি করা হতো। পার্থক্য ছিল শুধু পাতার প্রক্রিয়াকরণে। তিনি আরো একটি ভয়ানক বিষয় আবিষ্কার করলেন যে, চা পানের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয়দের একটি স্বাস্থ্য সতর্কতাও মাথায় রাখতে হবে। চীনারা চায়ে রঙ মিশিয়ে ইউরোপে পাঠাত। তাদের ধারণা ছিল, স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সবুজ রঙ ব্রিটিশদের বেশি আকর্ষণ করবে। এ রঙ ছিল প্রুশিয়ান ব্লু, মানে এক ধরনের সায়ানাইড। অর্থাত্ বহুবছর ধরে চীনের চা ব্রিটিশদের শরীরে বিষ প্রবেশ করাচ্ছিল। এরপর তিনি পৌঁছে গেলেন পার্বত্য উপত্যকায়, যেখানে পাহাড়ের ঢালগুলো চা গাছে আচ্ছাদিত, পরিবেশ কুয়াশাচ্ছন্ন, বাতাসে চায়ের সুবাস।

ফরচুন বড় করে শ্বাস নিলেন, তারপর কাজে লেগে গেলেন। মাটির নমুনা, চা গাছে কুঁড়ি, গাছ, বীজ সংগ্রহ করলেন। নমুনাগুলো তিনি সতর্কতার সঙ্গে বাক্সে পুরলেন। বুঝতে পারলেন, এগুলো ভারতে নিয়ে আবার রোপণ করতে বহুপথ ও ঝামেলা পোহাতে হবে।

গাছ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেয়া কঠিন কাজ। তার সংগ্রহ করা ১০ হাজার বীজ ও ১৩ হাজার চারা বাঁচিয়ে রাখতে যত্ন-পরিচর্যা দরকার ছিল। এ কাজে ভিক্টোরিয়ান যুগের সর্বশেষ আবিষ্কার তার সঙ্গে ছিল। তিনি সঙ্গে করে কাচের বাক্স নিয়ে এসেছিলেন, সেগুলোয় ধানের তুষ পুড়িয়ে ছাই রাখা হতো। এ ছাই অতিরিক্ত আর্দ্রতা শুষে নিয়ে পোকামাকড় জন্মাতে দিত না। কোনো রকমের হস্তক্ষেপ করা না হলে এ চারা ও বীজ সুস্থভাবেই দেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল।

ফরচুন দক্ষতার সঙ্গে তার কাজ সম্পন্ন করেন। তিনি নমুনাগুলো প্যাকেট করে সেগুলোকে হংকং থেকে ভারতের উদ্দেশে পাঠান। নিরাপদে ও সফলভাবেই তিনি তার দায়িত্ব শেষ করলেন।

ব্রিটিশ শাসনাধীন কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লোকজন অধীর আগ্রহে ফরচুনের পাঠানো শিপমেন্টের জন্য অপেক্ষা করছিল। কলকাতায় পৌঁছার পরে বাক্সগুলো বিশেষ যত্ন পেল। স্টিমারে করে সেগুলোকে এলাহাবাদ শহরে পাঠানো হলো। সেখান থেকে হিমালয়ের পাদদেশে। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিল চা গাছ ভালোভাবে জন্মায় কিনা সেটা দেখতে। তবে একজন অতি উত্সাহী কর্মকর্তা ও একজন অজ্ঞ উদ্ভিদবিদ ঝামেলা পাকিয়ে বসলেন। কার্গোতে আসা বাক্সগুলোয় যে চায়ের নমুনা আছে, সেটা এরা দুজন জানতেন না। কিন্তু কার্গোগুলোর জন্য বিপুল নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলে, ভেতরে কী আছে, সেটা তারা একনজর দেখতে চান। উদ্ভিদবিদ সিল ভেঙে ভেতরে উঁকি দেন। তিনি পরবর্তীতে জানান, সিল ভেঙে সবকিছু স্বাভাবিকই দেখেছিলেন। কিন্তু যখন পার্বত্য এলাকায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্লানটেশনে নিয়ে বাক্সগুলো খোলা হলো, তখন দেখা গেল সবকিছু ধ্বংস। ১৩ হাজার কচি চা গাছের মধ্যে বেঁচেছিল মাত্র এক হাজারটি। আর যেগুলো বেঁচেছিল সেগুলো ফাঙ্গাসে আক্রান্ত। মাত্র ৮০টি গাছ মাটিতে লাগানোর মতো সুস্থ ছিল। ১০ হাজার বীজের সব নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বীজ আর চারাগুলো ধ্বংসের পেছনে দায়ী ছিল সেই অজ্ঞ উদ্ভিদবিদ। গাছগুলোর পাঁচ হাজার মাইলের শেষ ছয় মাস তিনি সেগুলোর সঙ্গে ছিলেন। তিনি সিল ভেঙে বাক্স খুলে গাছে পানি দিয়ে সেগুলোকে ছায়ায় রেখেছিলেন। অথচ এ গ্লাস জারগুলো ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ, এগুলোয় পানি দেয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এবং সেগুলোকে রোদে রাখার প্রয়োজন ছিল। কাচের জারগুলোর মুখ খোলায় সেগুলোর ভেতরের বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হয়ে যায়। আর পানি দেয়ায় বাকি সর্বনাশের চূড়ান্ত হয়।

ভাগ্যে শিকা ছিঁড়ল না। চীন থেকে চায়ের চারা এনে ভারতে লাগানোর পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। ব্রিটেনে চা পানের ভবিষ্যত্ খাদের মুখে এসে পড়ল। সৌভাগ্যবশত ফরচুন ছিলেন। এই পরিশ্রমী অভিযাত্রী তার প্রথম কনসাইনমেন্ট প্রেরণের পরে নৌকা ও পালকিযোগে তিনি উয়ি পর্বতমালার দিকে যাত্রা করেন। এখানে ব্ল্যাক টি উত্পাদন হতো। এ যাত্রা ছিল প্রথমটির চেয়ে অনেক কষ্টকর ও বিপদসঙ্কুুল। এ অঞ্চলে ছিল অসংখ্য যুদ্ধবাজ জমিদার এবং সম্রাটের বিরুদ্ধে অনেক কৃষক বিদ্রোহ। নিজেকে রক্ষা করার জন্য ছিল পুরনো জং ধরা একটা পিস্তল। সব বিপদ মোকাবেলা করে তিনি এগিয়ে চলেছিলেন। পথে চাসহ উদ্ভিদের যত নমুনা পাচ্ছিলেন, সেগুলো সংগ্রহ করে নিজের পালকিতে তুলছিলেন। একসময় পালকিতে তার বসার আর জায়গা রইল না। তখন তিনি নিজে পালকি ছেড়ে বেহারাদের সঙ্গে হেঁটে পথ চললেন। পথে পর্বতের চূড়া, বাঁশের বন, শ্বাসরুদ্ধকর জলপ্রপাত তাকে শিহরিত করেছিল। এমন পরিবেশে অসংখ্য মন্দিরের অস্তিত্ব, তার মনে হচ্ছিল তিনি যেন স্বর্গে পৌঁছে গেছেন। এ রকম এক মন্দিরেই তার ভাগ্য খুলে যায়। মন্দিরের এক শ্রমণ তাকে চায়ের আরো অনেক গোপনীয় বিষয় শিক্ষা দেয়। এসব শিক্ষার মধ্যে ছিল— গরম পানির গুরুত্ব, আবার বেশি গরম পানি নয়, সামান্য উত্তপ্ত কাপ ব্যবহার করা এবং সুবাসের জন্য বড় পাতা ব্যবহার করা। ফরচুন চায়ের পাতা সংগ্রহ করে সেগুলো শুকিয়ে নিজের সঙ্গে নিলেন। স্থানীয়দের বিভিন্ন  কলাকৌশল, গাছ লাগানোর কৌশল, টি টেস্টার ও টি মেকার তৈরির পদ্ধতি জেনে নিলেন। শেষমেশ চায়ের ডা হোং পাও প্রজাতির গাছ কিনে নিলেন। এ প্রজাতিকে বলা হতো ঈশ্বর ও সম্রাটের চা। এটি ছিল তখন দুনিয়ার সবচেয়ে দুর্লভ ও দামি চা। এ চায়ের বিশুদ্ধ রূপটি স্বর্ণের চেয়েও দামি ছিল।

নিজের প্রথম কনসাইনমেন্টের করুণ পরিণতির কথা তত দিনে ফরচুনের কানে পৌঁছে গেছে। তাই এবার তিনি এসব নতুন নমুনা কীভাবে ভারতে পাঠাবেন, সেটা নিয়ে নতুন করে চিন্তা-ভাবনা শুরু করলেন। এ ব্যাপারে তিনি তার জীবনের বহুবছরের বাগান পরিচর্যা-সংক্রান্ত জ্ঞান কাজে লাগালেন। বীজগুলো বস্তাবন্দি না করে প্রথমে সেগুলোকে অল্প মাটির মধ্যে রাখলেন, তারপর মাটিসহ সেগুলোকে কাচের বাক্সে আবদ্ধ করলেন। এবার অসাধারণ ফল পাওয়া গেল। হাজার হাজার বীজের অঙ্কুরোদগম হতে লাগল কাচের বাক্সের মধ্যে। ভারতে পৌঁছতে পৌঁছতে একেবারে জমিতে রোপণের উপযোগী হয়ে উঠল। এবার কিন্তু এসব চারায় পানি না দেয়ার জন্য ফরচুন কঠোর নির্দেশ জারি করলেন এবং এবার সবাই তার কথা মেনে চলল। শিগগিরই হিমালয়ের পাদদেশের এ অঞ্চলে ফরচুনের আনা চা গাছে ফুল ধরল এবং স্থানীয়ভাবে গাছের বংশবৃদ্ধি হলো। এগুলো কিন্তু যেনতেন চা নয়, দুনিয়ার সেরা চা।

এ চা-ই কিন্তু ফরচুনের চুরির শেষ নয়। তিনি চায়ের সঙ্গে জেসমিন ও বারগামোট গাছও নিয়ে এসেছিলেন, চীনারা এগুলো চায়ের ফ্লেভার হিসেবে ব্যবহার করত। ফরচুন সবচেয়ে বড় একটি ঘটনা ঘটিয়েছিলেন, মোটা বেতনের লোভ দেখিয়ে তিনি আটজন চীনা চা বিশেষজ্ঞকে ভারতে নিয়ে আসেন। তাদের কাজ ছিল ভারতে চা চাষের ব্যাপারে সহযোগিতা করা।

ফরচুনের গুপ্তচরবৃত্তি চা ব্যবসায় চীনের মনোপলি ভেঙে দিল। বিশিষ্ট গবেষক সারাহ রোজ লিখেছেন, এক প্রজন্মের মধ্যেই ভারতের হিমালয় অঞ্চলের চা শিল্প চীনের চাকে গুণাগুণ, পরিমাণ ও দামে পেছনে ফেলে দিল। ফলে চা কেবল ধনীদের কাপেই সীমাবদ্ধ থাকল না, বরং যেকোনো মানুষই এবার চায়ের স্বাদ নিতে পারলেন। ফরচুন তার নামের সার্থকতা বাস্তবে প্রতিপন্ন করেছিলেন। এবার তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে মহামূল্যবান হয়ে দেখা দিলেন। কোম্পানি তাকে নতুন অভিযানে আবারো চীনে পাঠাল। এবার তিনি গিয়েছিলেন আফিমের চোরাচালানকারীর ছদ্মবেশে। উদ্দেশ্য ছিল, চীনাদের আফিম চাষাবাদ ও প্রক্রিয়াকরণের আদ্যোপান্ত উন্মোচন। মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে ফরচুন আবারো সফল হয়ে ফিরলেন, সঙ্গে নিয়ে এলেন চীনের পপির শুষ্ক নমুনা, পপির বীজ সংগ্রহে ব্যবহূত বিশেষ চীনা ছুরি ও কিছু পপির বীজ।

আমেরিকার সরকার যুক্তরাষ্ট্রে চা শিল্প গড়ে তোলার জন্য ফরচুনকে ভাড়া করল। জাপান ছিল প্রাচ্যের আরেকটি রক্ষণশীল দেশ। ফরচুন নিজ উদ্যোগেই গোপনে জাপানে প্রবেশ করে সেখান থেকে কিছু দুর্লভ ও মূল্যবান উদ্ভিদ প্রজাতি ব্রিটিশদের জন্য নিয়ে আসেন। এভাবে ফরচুন একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মূল্যবান মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। ১৮৮০ সালে বেশ ধনী অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন টমাস জেফারসন বলেছিলেন, ‘দেশের প্রতি শ্রেষ্ঠ সেবা হবে যদি কেউ তার দেশের সংস্কৃতিতে একটি নতুন উদ্ভিদ যোগ করেন।’ এ হিসাবে ফরচুন তার দেশ অর্থাত্ ইংল্যান্ডের প্রতি যে কর্তব্য পালন করেছেন, তা তুলনাহীন।

 

সূত্র: সারাহ রোজের গ্রন্থ ফর অল দ্য টি ইন চায়না: হাউ ইংল্যান্ড স্টোল দ্য ওয়ার্ল্ড’স ফেভারিট ড্রিংক অ্যান্ড চেঞ্জড হিস্টরি, স্মিথসোনিয়ান