১.
পরশু রাতের কথা। ঘুমিয়ে আছেন স্যার। ঘুমের মধ্যেই বুঝলেন কেউ হাত বুলোচ্ছে। মাথায়।
চোখ খুললেন। কিন্তু দেখা গেল না কাউকে। চোখ ডলে আবার তাকালেন। এবার দেখা গেল। মোড়াটায় বসে আছেন সুখতারা। হাসছেন মিটিমিটি।
স্যার কিন্তু হাসলেন না। তার রাগ হয়েছে। প্রতিদিন সুখি আসে। বসে। হাসে। কিন্তু কথা বলে না। রাগটা তাকে দেখানো দরকার। পাশ ফিরে শুলেন। তখনই কলকলিয়ে উঠল সুখি।
স্যার কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছেন? যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। তার তো কোনো দোষ নেই। ইত্যাদি।
উঠে বসলেন স্যার।
কত দিন পর সুখির কথা শুনছেন। শুনেই যাচ্ছেন।
একটা প্রশ্ন পাকাচ্ছিল ভেতরে। করে বসলেন।
সুখির পেটটা সমান কেন? বাবুটার আসার সময় হয়েছে না? এত দিনে তো ওর অনেক বড় হওয়ার কথা। পেটের ভেতর খেলার কথা। হাত-পা ছোড়ার কথা। কই কোনো নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে না তো! ঘটনা কী?
আবার হাসলেন সুখি। বুঝিয়ে বললেন ব্যাপারটা।
বাবুটা বড় হয়ে গিয়েছিল। টানতে পারছিলেন না। আরেকজনের কাছে রেখে দিয়েছেন। হওয়ার পরই নিয়ে আসবেন।
চমকে উঠলেন স্যার! মানুষ খুব হিংস্র হয়ে গেছে এখন। হওয়া বাচ্চাকেই পিটিয়ে মেরে ফেলছে! তার বাচ্চাকে তো হতেই দেবে না!
কার কাছে রেখেছে? বাড়ি কোথায় তার? জানতে চাইলেন স্যার।
শর্ত দিলেন সুখতারা। কাল থেকে স্বাভাবিক হতে হবে স্যারকে। তবেই সব বলবেন।
স্যার রাজি হলেন।
২.
পথের শেষে উঠোন। উঠোন শেষেই ঘর।
ঘরে ঢুকল নুরি। বই-খাতা রাখল। ঘুমন্ত বোনটাকে আদর করল। তারপর গেল মায়ের কাছে।
কদবানু তখন লাউ মাচানের নিচে।
সেখানে শুকনো পাতার মিছিল। পা ফেললেই নূপুর বাজে। সুর তুলে বের হলেন তিনি। হাতে লাউ। লাউটা নুরিকে দিলেন।
এইডা তুলে রাক তো মা। কাইল ব্যানে মক্তবে দিয়ে আসিস।
গাছের প্রথম ফল সবার আগে হুজুরের প্রাপ্য। নুরি এটা জানে। ওতে বরকত হয়। কিন্তু এখন তো লাউয়ের শেষ সময়! এখনো কেন মক্তব?
কিছুদিন হলো এ-ই হচ্ছে। যা পাচ্ছে, তাই মসজিদে-মক্তবে পাঠাচ্ছে মা। বালামুসিবত যেন না আসে আর।
ঘরের দিকে পা বাড়াল নুরি। তখনই চোখ পড়ল রাস্তায়। অবাক হতে হলো। দাঁড়িয়ে আছেন হক স্যার।
তাকিয়ে আছেন ওর দিকেই।
কিছুক্ষণ আগে যখন ফিরছিল ও, পেছন পেছন এসেছেন স্যার।
থানার মোড়ে কলেজ। ওখান থেকে অন্তপুর পর্যন্ত দেড় মাইল। পাকা রাস্তা। চোখে বুকে পাথর আর পিচ ঢেলে পড়ে আছে পথটুকু। এরপর একটা বাঁক। হাঁটাপথ। পুষ্টিহীন লিকলিকে রাস্তা। কাঁচা। হাসলে ধোঁয়া ওঠে ধুলোয়। কাঁদলে কাদায় ভরে। কিছুদূর গিয়েই পথটা নুরিকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। ছুঁয়ে যায় বাড়ির পেছন দিকটা। তারপর একটু বেঁকে চলে যায় ওপাশের গাঁয়। আজও গেল।
পাকা রাস্তাটুকু আজ অটোতে এসেছে নুরি। সাথে দুজন বান্ধবী। ওখানে নেমে তিনজন তিন দিকে।
মনটা বেশ খারাপ ওর। সপ্তাখানেক ধরে শরীরটাও। এতক্ষণ গল্পকথায় ভুলে ছিল ব্যাপারটা। একা হতেই বিষাদভাবটা ফিরল আবার। তাই পাশ কাটাল কাদের পাগলা, অথচ ভেংচাল না ও। জলিলের ঘরের পিছে ভাঁটফুলের ঢেউ, তুলে নিল না এক গোছা। নবীদের আম গাছ বোলে বোলে একাকার অথচ দাঁত কিড়মিড় করে ভাবল না, যারা হাতের ময়লাও দেয় না কাউকে, তাদের ঘরেই কেন রাজ্যের ধন! জসিমের দোকান পেরিয়ে এল, অথচ এক ডজন চুড়ির ভেতর দুটো ভাঙা বা টিপগুলো ঠিকমতো লাগছে না বা পছন্দের ভিউকার্ডটা এখনো আনল না কেন বা ওরকম হাঁ করে তাকিয়ে থাকার অপরাধে তাকে শাসাল না। পিচ্চি বোনটার জন্য কাঠি লজেন্স নেবার কথাটাও মনে থাকল না। আপনমনে হাঁটল নুরি।
তাই খেয়াল করতে পারেনি স্যারকে।
অন্য সময় হলে আগে পরে কে হাঁটছে তা ও জানে। অন্যরাও বোঝে নুরি যাচ্ছে।
যাহোক। স্যার তার বাড়ির সামনে দাঁড়ানো এবং তার দিকেই তাকিয়ে আছেন— দেখা গেল।
ত্রস্ত একটা সালাম দিল। কিন্তু ওটুকুই। ওখানে কেন দাঁড়িয়ে আছেন স্যার বা এদিকে তো আসেন না তিনি বা কারো জন্য অপেক্ষা করছেন কিনা বা ওকেই কি কিছু বলবেন স্যার— এতসব চিন্তা হওয়ার কথা। কিন্তু তার অবকাশ সে পেল না। রান্নাঘরের দরজা খোলা। একটা কুকুর ঢুকছে। তেড়ে যেতে হলো।
-ছেই! ছেই কুত্তা। ছেই। মা, তুমারে না কতবার বলিচি, রান্নাঘরডা বন্ধ করে রাকতি?
-ওই নেড়ি কুত্তাডা আবার এয়েচে, না? তাড়া, তাড়া! কাল সকালেও বুড়ির ভাতে মুখ দিয়েচে। তাড়া শিগগির।
তাড়িয়ে এল কুকুরটাকে। ফেরার সময়ই খেয়াল হলো ব্যাপারটা। তাই কথা বলে এল। তখন বিকেল। শুয়ে পড়ছে ছায়াগুলো সবার।
সে বিকেল যখন বুড়িয়ে গেছে, তখনও স্যারকে দেখা গেল। শিশু গাছটার নিচে।
যখন সন্ধ্যা, বিষণ্ন বাতাস বয়ে গেল, তখন পর্যন্ত স্যার নড়লেন না।
যখন রাত, চাঁদ ভাসছে। আর ডুবছে। রাত হাসছে। আর কাঁদছে। তখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে স্যার। ওখানেই।
৩.
এ কলেজে বছর পাঁচেক হলো হক স্যারের।
গাঁয়ের বাড়ি নান্দিগাঁয়। দূরত্ব বেশি না। শুরুতে বাড়ি থেকেই যাওয়া-আসা করতেন। তবে পথটা বড় বেয়াড়া। এবড়োখেবড়ো। তার ওপর লক্কড়-ঝক্কড় সাইকেল। যেতে আসতে প্রাণান্ত।
সে ঘানি টানলেন বছরখানেক।
তারপর জমি কিনলেন। ক্যাম্পাস থেকে চোখ বাড়ালেই দেখা যায়। রাস্তার গা’য়। পতিত জমি। আগাছায় ভরা। তাতে ঘর উঠল। ইটের ভিত, টিনের বেড়া, টিনের চাল। দু’কামরা ঘর। সামনে বড় উঠোন। উঠোনের গায়ে রান্নাঘর। একচালা। চাঁচের।
দু’বছর পর উঠল প্রাচীর।
দালান করবেন করবেন করছিলেন। কিন্তু তার আগেই ঘর ভাঙল তাঁর।
মাস আটেক আগের কথা।
ঘুম থেকে কেবল উঠেছেন স্যার। আড়মোড় ভাঙছেন। দেখা গেল কাঁদছেন সুখি। কারণ কী? কী হলো এই সাত সকালে!
দুঃস্বপ্ন দেখেছেন ম্যাডাম। বাবা-মাকে নিয়ে।
ব্যাপারটাকে হালকা করতে গেলেন স্যার। স্বপ্ন তো স্বপ্নই। কান্না থামানোর চেষ্টা। কিন্তু থামল না সেটা। বাড়ল বরং।
গুছিয়ে নিচ্ছিলেন স্যার। ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে। সুখতারা বললেন, তিনি বাপের বাড়ি যাবেন। মায়ের কথা মনে পড়ছে খুব। না করলেন স্যার। তাঁর এক বন্ধুর আসার কথা। সুখি না থাকলে তিনি কীভাবে কী করবেন?
এই নিয়ে মনকষাকষি। একটু কথা কাটাকাটি। এর পর ঢাকঢাক গুড়গুড়। তারপর গুড়ুম গুড়ুম।
বলতে থাকলেন দুজনেই।
একজন ইট ছোড়েন তো আরেকজন পাটকেল।
এ পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণ রাখা দায়। পারলেন না স্যারও।
ম্যাডামের চাচাতো ভাই আকতার। গোপন একটা সম্পর্ক নাকি আছে এই দুজনের। বিয়ের পর থেকেই কথাটা শুনছেন স্যার। পাত্তা দেননি। কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে ইদানীং। ছুতোনাতায় বাপের বাড়ি যায় সুখি। প্রায়ই। আকতারের সাথে দেখা করতেই নিশ্চয়!
চিন্তাটা হাওয়ায় উড়ত। ঠোঁটে এনে ফেললেন সেদিন।
নাঙের সাথে দেখা করতি যাবা। বুজতি পারচি। কিন্তু আমার উপায় নেই। মান্নান এসে পড়বে কালই। আসুক। চলে যাক। তারপর তুমি যেও। এই ক’দিনে তো আর উধাও হবে না তোমার নাঙ! তাছাড়া ডাক দিলিই হাজির হওয়া ভালো না। একটু অপেক্ষায় রাখো। শালা! পরের বউয়ের সাথে লুচ্চোমি করে, জানে একটু সবুর করতি হয়।
অনেক ছাত্রীর যাওয়া-আসা আছে স্যারের বাড়ি। কারো কারো সাথে বেশিই যেন মেশেন স্যার। কানাঘুষা শুনেছেন ম্যাডাম। চাইলে সেসব তুলতে পারতেন। কিন্তু তুললেন না।
ছি! তুমি না শিক্ষক? তোমার মুখে কী কথা এসব?
বাহ্ রে! তুমি করতি পারো আর আমি বলতি পারব না?
এরপর আর কিছু বলেননি সুখতারা। স্যারও না। কলেজে গেছেন। অ্যাসেম্বলি করিয়েছেন। দশটায় প্রথম আর এগারোটায় দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস নিয়েছেন। একটু পড়েছেন লাইব্রেরিতে। তারপর খেতে এসেছেন দুপুরে। এসেই দেখেছেন সব শেষ। ঘরের আড়ায় ঝুলছে প্রিয় সুখি। গলায় বাঁধা দড়িটা চকচক করছে।
উঠোনের কোনায় একটা কুলগাছ। হেলে পড়েছিল। পাশের বড় গাছটার সাথে বাঁধতে হবে। সোজা করা দরকার। না হলে ভেঙে পড়বে। তাই কিনেছিলেন দুধসাদা নাইলনের দড়িটুকু।
তাতেই মিশে গেছে সুখির শেষ নিঃশ্বাস।
৪.
নুরির সবচেয়ে প্রিয় হক স্যার। অসাধারণ মানুষ তিনি। চমত্কার পড়ান। অসাধারণ লেখেন। আর অসম্ভব ভালো সুরে গান। স্যারের সবকিছুই সুন্দর। লোকটার জ্ঞানের পরিধি পায় না সে। এখানে কেন পড়ে আছেন তিনি? প্রশ্ন তুলেছে বারবার। স্যারকেও জিজ্ঞেস করেছিল একবার। কিছু বলেননি স্যার। গালভরে হেসেছিলেন। কী সুন্দর টোপ পড়া হাসি! মুগ্ধ হতেই হয়।
মুগ্ধতাটা প্রকাশও করেছে সে। গতবার ফাইনালে। প্রিয় শিক্ষক রচনায় স্যারের কথা লিখেছে! দেখে কী ক্ষোভ ইংরেজি স্যারের! কিন্তু তাতে কী? যা সত্য তা বলেছে। তাতে কেউ ক্ষেপলে ক্ষেপুক। রাগলে রাগুক।
খুব একটা ভালো ছাত্রী নুরি না। তবু তাকে পছন্দ করেন স্যার। একটু যেন প্রশ্রয়ও দেন। নুরি বোঝে।
বাড়ি আসার পথেই স্যারের বাড়ি। সুযোগ পেলেই ঢুঁ মারত ও। ম্যাডামও খুশি হতেন। সারা দিন একা। কথা বলার মানুষই তো মেলে না। জমে যেত দুজনের। স্যারও যোগ দিতেন কখনো সখনো। খুব মজার মানুষ স্যার। হাসতেন। হাসাতেন।
কিন্তু কেমন যেন হয়ে গেছেন ইদানীং। এখানে সেখানে পড়ে থাকেন। কারো সঙ্গে কথা বলেন না। একা একা হাঁটেন। বিড়বিড় করেন। ক্যাম্পাসে যান না। অদ্ভুত চোখে তাকান। ভয় পায় সবাই। নুরিও। তবু একদিন গিয়েছিল স্যারকে দেখতে। শরতের ফরসা বিকেলটা যদিও ভুলেই থাকতে চায় সে।
প্রিয় সেই স্যার দাঁড়িয়ে আছেন বাড়ির সামনে, আর নুরি যাবে না ছোটে? গিয়েছিল। মাও ছিল সাথে। ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করল ওরা। ভেতরে আসতে বলল। কিছু বললেন না স্যার। নড়লেনও না।
চিন্তায় পড়ে গেল ওরা। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন কেন স্যার? কী সমস্যা? বিকেল পড়ে এসেছিল। হাঁস-মুরগিগুলো তুলতে হবে। তাড়া ছিল। তাই চলে এল ওরা।
নুরির বাবা রাজমিস্ত্রি। যেখানে কাজ, সেখানে থাকা। সপ্তায়-দু’সপ্তায় একবার আসেন। বাড়িতে আর পুরুষ নেই। সময় বদলেছে। আপন-পর চেনা যায় না। যে যেদিকে সুযোগ পায়, সেদিক থেকে মারে। সোমত্ত মেয়ে নিয়ে একা ঘরে থাকা। ভয়ের তো আর অভাব নেই। সন্ধ্যার পরে তাই বাইরে বের হতে মানা। তার ওপর স্যার দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাথার ঠিক নেই। কী করতে কী করে বসেন। ভয়ে আর বেরুলেন না কদবানু। নুরিকেও নিষেধ করলেন।
শুতে যখন গেল, নুরির বুকে আশা, সকালে উঠে আর দেখবে না স্যারকে। নিশ্চয়ই বাড়ি গিয়ে ঘুমোবেন তিনি।
ইদানীং কী যেন হয়েছে ওর। বল পায় না শরীরে। ক্লান্ত লাগে। তবু ঘুম আসে না। ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল। কী ওষুধ যে দিয়েছে, খেলেই চোখ ভেঙে আসে। ঘুম ভাঙে অনেক বেলা করে।
সেদিন ভাঙল আরো দেরিতে। ঘড়ির বুকে বারো! এ কি মরণঘুম ঘুমোচ্ছে ও! বিরক্ত হলো নিজের ওপর। তার পরই মনে পড়ল স্যারের কথা। স্যার কি এখনো আছেন? দেখতে হবে।
৫.
বুক পেতে মৃত্যুর দায়টা নিয়েছিলেন স্যার। কিন্তু ভারটা নিতে পারছিলেন না।
কেমন যেন উল্টে গিয়েছিল সব! পাল্টে গিয়েছিল! কীভাবে কী হলো! বুঝতে পারতেন না। পারার কথাও না। বাবা হবেন— খবর দিয়েছিলেন সবাইকে। মিষ্টি খাইয়েছিলেন। মাসও যায়নি। আবার মিষ্টি কিনতে হলো। মিলাদের জন্য।
আকতারও এসেছিল মিলাদে। ভেবেছিলেন জিজ্ঞেস করবেন সম্পর্কের কথাটা। সাহস হয়নি।
স্যারের সেই বন্ধু, মান্নান সাহেব, অবশ্য আসেননি কোনো দিন। আসার কথা ছিলও না। পরকীয়ার কথাটা পেয়ে বসেছিল। তাদের দেখা হোক চাননি। তাই মিথ্যে বলেছিলেন।
অতটুকু মিথ্যের জল যে এত দূর গড়াবে, বুঝতে পারেননি।
অপরাধবোধে ভুগছিলেন।
শ্বশুরবাড়ির লোকেরাও সন্দেহ করছিলেন তাঁকে। তিনিই নাকি খুন করেছেন স্ত্রীকে। চাউর হয়ে গিয়েছিল কথাটা। ঘর থেকে পাড়া। পাড়া থেকে গ্রাম। ক্লাস থেকে মাঠ। মাঠ থেকে বাজার। সবখানেই উড়ছিল প্রশ্নটা।
শুনতে শুনতে স্যারেরই বিশ্বাস হয়ে গিয়েছিল। সন্দেহ করছিলেন নিজেকে। তিনিই হয়তো করেছেন কাজটা। রাগের বশে বা অচেতন অবস্থায় বা ইচ্ছে করে।
এড়াতে পারছিলেন না চিন্তাটাকে। ভুলতে পারছিলেন না।
ভীষণ ভালোবাসতেন বউকে। কাছ ছাড়া হতে দিতেন না। বিদায়েও দেননি।
ঘরের পাশেই কবর। প্রিয় বকুল গাছের নিচে।
তখন শ্রাবণ অথবা ভাদ্র। ঠিক মনে নেই স্যারের। তবে সেটা বর্ষার মৌসুম। মনে আছে। কিন্তু বৃষ্টি ছিল না ক’দিন ধরে। তাঁর আবার ভিজতে ইচ্ছে করছিল। ইচ্ছে করছিল গলা ছেড়ে কাঁদতে। গান শুনতে ইচ্ছে করছিল।
ফ্যাসফেসে গলা ছিল সুখতারার। চাপা স্বর। কোনো গানই গাইতে পারত না ঠিকমতো। কথা ভুল হতো। তবু গাইত সে। থামত না। ভুলে যাওয়া কথার ফাঁক পূরণ করত গুনগুনিয়ে। গাওয়া শেষে নিজেই হাততালি দিত।
সে রকম করে একটা লালনের গান কি সে গাইতে পারে না আবার?
খাটের যে পাশে সুখতারা শুত, সেখানে শুয়ে থাকতেন স্যার। আর ভাবতেন এসব। আর ঘুমোতেন। আর ভাবতেন। কাজের মহিলা খাবার দিয়ে যেত। ইচ্ছে হলে খেতেন, না হলে না।
এমনই চলছিল।
এক রাতে বৃষ্টি এল। প্রবল ধারা।
বের হলেন স্যার। কবরের কাছে গেলেন।
কবরের মাটি ভেসে যাচ্ছে। কবরকে আর কবর মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে গর্ত।
পাশেই বসলেন স্যার। কাঁদছেন। সে কান্নার শেষ নেই। কিছুক্ষণ পর সুখতারাকে দেখা গেল। বসে আছেন স্যারের পাশে। কেমন যেন শুকিয়ে গেছে মেয়েটা। হাত বাড়ালেন স্যার। ভালোবাসার। আদরের।
পরদিন কবর থেকে তোলা হলো স্যারকে।
৬.
উঠোনে পা দিয়েই নুরি বুঝল ঘটনার শিকড় গজিয়েছে। বাড়ির সামনে লোকারণ্য। সবাই যেন একযোগে কথা বলছে। কারো কথাই বোঝা যাচ্ছে না ঠিকমতো।
শরীরটা খুব দুর্বল লাগছে ওর। তবু এগিয়ে গেল জটলাটার দিকে। ধীরপায়ে। স্যারকে উদ্ধার করতে হবে। না-জানি কে কী ব্যবহার করছে মানুষটার সাথে।
এর মধ্যেই বাবার কণ্ঠ শোনল নুরি। বাবা এসেছেন নাকি?
হ্যাঁ। ঘণ্টাখানেক হলো। স্যারের সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। নানাজন নানা কথা বলছে। শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। সহ্য হচ্ছে না তার। বেশ কবার তিনি চেষ্টা করেছেন স্যারের সঙ্গে কথা বলতে। সাড়া দেননি স্যার। গাছ-লতা-ফুল-পাখি দেখছেন একমনে। কিন্তু আর কত? বিহিত এর করতেই হবে একটা।
এসবের কারণ জানতে চাইলেন নুরির বাবা।
এর আগেও অনেকে জিজ্ঞেস করেছে এটা। ভিড় ঠেলে এমনকি কদবানুও একবার জানতে চেয়েছিলেন। উত্তর দেননি স্যার। এবারো দিলেন না।
কিন্তু হাল ছাড়লেন না নুরির বাবা। জেরা চলল। ক্রমে গরম হয়ে উঠল প্রশ্নগুলো। লোকজনও যোগ দিল। একপর্যায়ে মুখ খুললেন স্যার।
ছেলের নিরাপত্তার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। কেউ যেন কোনো ক্ষতি করতে না পারে, তাই পাহারা দিচ্ছেন।
কোথায় স্যারের ছেলে?
নুরির পেটে!
শোরগোলটা বেড়ে গেল।
নুরির বাবার মুখ থেকে কথা সরে না!
প্রশ্নটা এবার এক প্রতিবেশী করল। একই উত্তর দিলেন স্যার। অবলীলায়। যেন খুব সাধারণ কথা বলছেন তিনি।
নুরি ততক্ষণ জটলাটার কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। কথাটা কানে গেল। পৃথিবীটা তার ঘুরে উঠল হঠাৎ। আন্ধার দেখল চোখে। তারপর পড়ে গেল।
সবকিছুতেই বিভক্ত হয় মানুষ। একদল যা করে, অন্যরা তার বিপরীত। একদল বামে গেলে অন্যদল ডানে। একদল হাসলেই অন্যরা মনে করে তাদের নিয়ে হাসাহাসি। এখানেও তা-ই হলো। দুদলে ভাগ হয়ে গেল সবাই।
একদলের কাছে মনে হলো, নুরিই এখন মূল আকর্ষণ। তারা তাই নুরির দিকে মনোযোগ দিল।
আরেক দলের আগ্রহের কেন্দ্রে তখনো স্যার। তারা স্যারের কাছেই থাকল।
প্রথম দল আবার দুটো ভাগে ভাগ হলো। একভাগ মনে করল নুরির শুশ্রূষা দরকার। মেয়েটাকে বাড়ির দিকে নিয়ে গেল তারা। অন্যভাগের কাছে এটা অতি ন্যক্কারজনক ঘটনা। তারা খুব আগ্রহভরে থু-থু ফেলতে লাগল। ছি-ছির হিড়িক পড়ল তাদের মাঝে।
দ্বিতীয় দলও দুটো ভাগে ভাগ হলো। একভাগ হাসল। নুরিরা চার বোন। চারজনেরই একটা ভাইয়ের খুব শখ। কথা বলতে না শেখা ছোট বোনটারও!
আর ছেলের শখ তো সব বাবা-মায়েরই থাকে। পাঁচ মাস চলছে কদবানুর। প্রসঙ্গটা টেনে আনল এক রসিকজন। বাচ্চা থাকলে মায়ের পেটে থাকবে, নুরির পেটে কীভাবে?
স্যার তার কথারও উত্তর দিলেন। তাহলে ওর মায়ের পেটেই আমার ছেলে। যার পেটেই হোক, এই বাড়িতেই আছে।
আরেক পশলা হুল্লোড় উঠল এ কথায়।
অবশিষ্ট লোকেরা মারতে এল স্যারকে। নুরির বাবাও তাদের দলে। তখন আবার প্রথমভাগের লোকেরা এল মারমুখী দলটাকে থামাতে।
স্যার তখনো নির্বিকার। দাঁড়িয়ে আছেন। তাকিয়ে আছেন বাড়িটার দিকে। লোক জমার আগে তীক্ষ চোখে পাহারা দিয়েছেন। উঠোনে ক’টা মুরগি খেলছে, ক’টা হাঁস, হিসাব রাখছিলেন। এখন দেখতে অসুবিধা হচ্ছে। তিনি তাই চোখ রেখেছেন একটু উপরে। টিনের চালে রোদ। তাকানো যাচ্ছে না। চোখ সরাতে হলো। পাশেই একটা শিমুল গাছ। পাতা নেই একটাও। লালে লাল হয়ে আছে ডালগুলো। ক’টা ফুল পড়ে আছে টিনের চালে। দূর থেকে কালো দেখাচ্ছে। এ রকম টকটকে লাল ফুল পচলে কালো হয়ে যায়, কেন? পাশের মেহগনি গাছের দিকে চোখ গেল। টিয়া রঙের পাতাগুলোয় তেল মাখাল কে? চকচক করছে টাকের মতো! আলো পড়ছে আর পিছলে যাচ্ছে! পড়ছে আর পিছলে যাচ্ছে! সুখির কথা মনে হলো স্যারের। চোখে ভাসল শ্যামলা মুখের মসৃণ চেহারাটা। সেখানেও আলো পড়ে পিছলে যেত! বাচ্চার কথাটাও মনে হলো। বাচ্চাটা তার এ বাড়িতেই আছে। চারদিকে কত শত্রু তার, কে কি করে না করে! ভাবতে ভাবতে খেয়াল করলেন টানাহিঁচড়া হচ্ছে তাঁকে নিয়ে।
যেনবা লঙ্কাকাণ্ডই বাধল তখন। কেউ মারে। কেউ ঠেকায়। হইচই, চিত্কার-চেঁচামেচি। কান পাতা দায়। লোক জমল আরো। ধ্বস্তাধ্বস্তি হলো। ঠেলাঠেলি হলো। কারা যেন জাপটে ধরল স্যারকে। ভ্যানে উঠাল। ঘরে তালা দিয়ে রাখা হবে তাকে। পা চালাল ভ্যানটা।
ভ্যানেও হইচই। নানা কথা হচ্ছে। ভীমরতি নিয়ে আলোচনা হলো। মুলোর জোর পরীক্ষা করে দেখার প্রস্তাব দিল কেউ কেউ। স্যার কিন্তু শুনছেন না কিছুই। ধাক্কাধাক্কিতে তার কপালটা ছড়ে গেছে। রক্ত ঝরছে। ভ্রুক্ষেপ নেই সেদিকে। খুলে গেছে মোটা ফ্রেমের চশমাটা। সেটাও পার্থক্য আনেনি খুব। মুখের ওপর ঝুঁকে পড়া মুখগুলোই যা একটু ঝাপসা। তাছাড়া ঠিক আছে সব। নতুন একটা থিওরি এল মাথায়। আকাশ দেখার জন্য চশমা লাগে না। চোখ খোলা রাখলেই হয়। চোখ খুলে রাখা যদিও কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। শরীর দুর্বল। প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে তার। কিন্তু ঘুমোতে ইচ্ছে করছে না। খুব করে তাই আকাশ দেখছেন তিনি। আকাশটা পিছিয়ে যাচ্ছে। গাছগুলো মাথা নুইয়ে আছে। দুপাশ থেকে। এবং পিছিয়ে যাচ্ছে। স্যারের মনে হলো, সাঁতার কাটছেন তিনি। আকাশে। এত বড় আকাশে একা ভাসছেন! ভয় করছে না কেন তার? পরক্ষণেই খেয়াল করলেন পাশেই ভাসছে সুখি।
৭.
নুরির জ্ঞান ফিরল বিকেলে।
কী ঝড় যে বয়ে গেছে, টের পায়নি সে।
পাশে বসে আছেন কদবানু। কান্নাকাটি করছেন। দরজায় খিল দিতে হয়েছে। দরজা ধাক্কাচ্ছেন নুরির বাবা। চিত্কার করছেন। মেরেই ফেলবেন মেয়েকে আজ। না হয় পুঁতে ফেলবেন জ্যান্ত।
হক স্যারের ঘটনাটা হেসে উড়িয়েছিল সবাই। পাগলে পাওয়া মানুষ কত কিছু বলে। সব নিয়ে ভাবলে চলবে না। তাছাড়া কাজের তো আর অভাব নেই গাঁয়ে। যে যার পথে ব্যস্ত হয়েছিল।
কিন্তু হঠাৎই এলোমেলো হলো সব। আবার।
নুরিদের ঘরটা দক্ষিণমুখী। এক চিলতে উঠোন। উঠোন পেরিয়ে কাঠা তিনেক জমি। তার একাংশে লাউ মাচান। অন্যপাশ ফাঁকা। বুকভরা ঘাস নিয়ে পড়ে আছে জায়গাটা। বেকার। বিকেলে আড্ডা জমে। জমে চুল বাঁধা। কাঁথা সেলাই। জমে সুখ আর দুখের বয়ান। আর পরচর্চা। সকালের রোদ প্রথমেই হাসে জমিটাকে দেখে। ওর তাই কদর খুব। ধান গম আটা শুকোয়। ঘুঁটে শুকোয়। নেদি শুকোয়।
গত পরশু বড়া দিয়েছেন কদবানু। কেজি পাঁচেক কলাইডাল আর ক’টা চালকুমড়ো মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে তাতে। গোটা গোটা হয়ে শুকোচ্ছিল ওই খোলা জায়গাটাতে।
নুরির প্রতিবেশী আম্বিয়া। পাশাপাশি ঘর। তার একপাল গরু। নুরিদের উঠোন দিয়ে পথে ওঠে। সকালে যায়। বিকেলে ফেরে। আজ সকালেও গেছে। সে সময়ের ঘটনা। গাইগরুটার কী হয়েছিল কে জানে, মাড়িয়ে গেছে বড়াগুলো। এত শ্রমের বড়া! সব নষ্ট। সহ্য হয়? এ্যাতো বেখেয়াল কেন আম্বি? আরেকটু সাবধানে নিতে পারত না সে গরুগুলোকে? এই নিয়ে ঝগড়া।
কদবানুর সাথে পেরে ওঠা কঠিন। পারছিল না আম্বিয়াও। বড় হাঁড়িটা তাই ভেঙেই দিল।
দু’সপ্তা আগে পেট ফেলেছে নুরি! হক স্যার মিথ্যে বলেননি!
আইবুড়ো মেয়ে পেট বাঁধিয়েছে! দিশে পাচ্ছিল না নুরির মা। ছুটে গিয়েছিল আম্বিয়ার কাছে। পরিবার পরিকল্পনার আয়া সে। কিছু করার থাকলে সে-ই তো করবে। করেও ছিল। না হলে কেলেঙ্কারি বেধে যেত না? এই দুদিনেই সব ভুলে গেল নুরির মা! এতটা নিমকহারাম সে! দুটো বড়াই না হয় নষ্ট হয়েছে। তাতে কী? কৃতজ্ঞতা বলে কিছুই কি নেই তার?
বাতাস ছিল না খুব একটা। তবু ছড়িয়ে গেল কথাটা। বাতাসের বেগে।
ছি ছি পড়ে গেল। কেউ থু-থু ফেলল। কেউ গুষ্টি উদ্ধার করল স্যারের।
নুরির বাবার রাগ দেখে কে! তেড়ে গেলেন ঘরের দিকে। নুরিকে আজ কচুকাটা করবেন। কিন্তু পারলেন না। লোকজন ছিল। ঠেকাল। রাগের চোটে বেরিয়ে গেলেন। হাতে ভোঁতা দা। সাথে ক’টা চ্যাংড়া। স্যারের হাড়-গোশত আলাদা করা হবে। ষাঁড়ের রোষে এগোল তারা। কিন্তু বিফলে গেল ক্রোধ।
স্যারকে ঘরে রেখে তালা দিয়ে এসেছিল দুপুরেই। সেই তালা ভাঙা। হক স্যারের খোঁজ নেই।
স্যার তখন তেবাড়িয়ায়। দাঁড়িয়ে আছেন এক বাড়ির সামনে। উত্সুক লোকের ভিড়। নানাজন নানা প্রশ্ন করছেন। স্যার কিছু বলছেন না। তাকিয়ে আছেন বাড়ির দিকে। ভেতরে কাঁদছে একটা মেয়ে। নাম জেসমিন। স্যারের ছাত্রী।
তখনই দেখা দিলেন সুখতারা। দু’কানের লতি ধরে হাসছেন। আবারো ভুল করেছেন তিনি। এই মেয়েরও না, ছেলে তার অন্য পেটে। অন্য গ্রামে।
৮.
উঠোনের ওপারে পেঁপে গাছ। তার পাতায় কনে দেখা আলো। পাতার গা গ’লে সে আলো ছুটে এসেছে নুরির মুখে। পাতার ছায়াও এসেছে। মুখের ওপর ছায়া। ছায়ার ফাঁকে আলো। নকশা কাটা চেহারা নিয়ে বসে আছে নুরি। বারান্দায়।
একটা তুলকালাম চলছে। চারদিক থেকে ঘৃণা আসছে ধেয়ে। ঢেউ ভাঙছে ওর বুকে। ঝাপসা চোখে চেয়ে আছে ও। দৃষ্টিপথে আম্বিয়াদের ঘর। কিন্তু চোখে ভাসছে অন্য বিকেল। যে বিকেল আশ্রয় নিয়েছিল তার গর্ভে।
বিকেলটা রঙিন ছিল। এমনই। ছিল খোলামেলা। এমনই।
প্রাইভেট পড়া শেষ। স্যারকে দেখতে যাবে নুরি। মানুষটার দুঃসময়। পাশে থাকা উচিত।
ইয়াসিন নুরির ক্লাসমেট। বন্ধু। বিশেষ বন্ধু। সেও পা বাড়াল। স্যারের হুঁশ নেই। কী হতে কী হয়! একা যাওয়া ঠিক হবে না নুরির।
স্যারের দরজা খোলা। জানলা খোলা। স্যার নেই।
অনেকক্ষণ ডাকল ওরা। সাড়া নেই।
সন্ধ্যা হলো। বিদ্যুৎ নেই। হারিকেনটা জ্বালাতে পারত নুরি। সামনেই ছিল। কিন্তু জ্বালল না।
তারপর অনেকক্ষণ কাটল। দেয়ালঘড়ির চেহারা বদলাল। সময়ের রঙ বদলাল।
তখনো ঘরে ফেরেননি স্যার।





