&dquote;&dquote;আলোকচিত্রী শহিদুল আলম প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমিকদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। গত মাসে তার কাজের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে। গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (জিএফএমডি) প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে গত ১২ ডিসেম্বর সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল এ আলোকচিত্রীর ‘দ্য বেস্ট ইয়ার্স অব মাই লাইফ: বাংলাদেশী মাইগ্র্যান্টস ইন মালয়েশিয়া’। ৪০টি আলোকচিত্র, অডিও, ভিডিও উপস্থাপনা নিয়ে প্রদর্শনীর কিউরেটিং করেন এএসএম রেজাউর রহমান। একই শিরোনামে শহিদুল আলমের একটি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়। সেদিন এ আলোকচিত্রীর মুখোমুখি হয়েছিলেন রুহিনা ফেরদৌস—

বর্তমান বিশ্বে অভিবাসন একটি আলোচিত ইস্যু। সে সূত্রে জানতে চাই আপনি কত দিন ধরে প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করছেন?

নব্বইয়ের শুরুর দিকে। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে কাজ করেছি। তবে গত বছরের শেষের দিকে জিএফএমডি সম্মেলনের কথা ভেবে এ কাজটির সিদ্ধান্ত নেয়া। প্রদর্শনীটি তিনটি ভাগে করা। প্রবাসী শ্রমিকদের যাত্রা, জীবন এবং যে মানুষগুলো শ্রমিকের জীবনের কলকব্জা নাড়ায়, যেমন— মালিক, অ্যাক্টিভিস্ট, দালাল, রাজনীতিবিদ তাদের তুলে ধরা।

কাজটা শুরুর আগে আপনার নেপথ্যের চিন্তা কী ছিল?

পেছনের চিন্তাটা ছিল— অভিবাসীদের নিয়ে সাধারণ মানুষ যে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে, বিশেষ করে যে দেশে শ্রমিকরা যান, সে দেশে তাদের হেয় করা হয়, ছোট করে দেখা হয়। তাই আমি কাজটির মাধ্যমে দুটো জিনিস চেষ্টা করেছি। এক. তাদের জীবনের বৈচিত্র্য আর জটিলতার গল্পগুলো ‘শ্রমিক’ পরিচয়ে নয়, ‘মানুষ’ পরিচয়ে উপস্থাপন করা। দুই. তাদের শ্রমিক পরিচয়ের বাইরে আর কোনো পরিচয় নেই— এ ভাবনাকে ছিঁড়ে ফেলা।

শ্রমিকদের পাশাপাশি গোটা অভিবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত যেমন— বিদেশী কোম্পানির মালিক, দালাল, এমনকি রাষ্ট্রপ্রধানদের ছবি তুলেছেন, ভিডিও ধারণ করেছেন ও সাক্ষাত্কার নিয়েছেন। কীভাবে বিশাল এ কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করেছেন?

কাজটা বিভিন্ন স্তরে করা। শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের গল্প জানা এবং অভিবাসন বিষয়টির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজটি করতে হয়েছে। আমি আমার কাজ শুরুর আগে গোটা প্রক্রিয়া সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গভাবে বোঝার চেষ্টা করি। এক্ষেত্রে সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় আমি আমার কাজ দেখাচ্ছি। সাংবাদিক হিসেবে আমি নিজের কাজ নিয়ে সচেতন। আমি জানি, আমি যদি একটা প্রপাগান্ডা জিনিস করি তাহলে আমার নিজের কোনো ভিত্তি থাকবে না। কাজেই সরকারের সঙ্গে থেকে, সরকারের জায়গার মধ্যেই এমন কাজ করা সম্ভব, যেখানে সরকারকে প্রশ্ন করা যায় সেই জায়গাগুলো খুঁজে বের করা। আপনার প্রশ্নের চেয়েও কিন্তু প্রশ্নটি কঠিন। এটাকে আমি বলব সাংবাদিকতার পদ্ধতি।

প্রদর্শনীতে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভেতরের একটা ছবি রয়েছে...

ছবিটা হলো, শ্রমিকরা পাসপোর্ট নবায়ন করতে গেছেন। কিন্তু এখানে দালালদের দৌরাত্ম্য, দূতাবাস বন্ধ থাকে, দেয়া-নেয়া, লেনদেন সব দালালই করে। আমি বিষয়টি নিয়ে যখন বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলি, তিনি বললেন, আমার সামর্থ্য রয়েছে দিনে বড়জোর ৩০০ লোকের পাসপোর্ট নবায়নের, সেখানে যদি তিন হাজার লোক আসে তাহলে কী করার! এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলতে চাই, ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে ফলের দোকানে কাজ করত মামুন। একদিন হঠাৎ ও আমাকে বলে যে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছে। আমি ওর সঙ্গে পরের দিন একই বিমানে করে মালয়েশিয়া যাই। কিন্তু যারা শ্রমিক হিসেবে দেশের বাইরে যান, বিমানবন্দর থেকেই তাদের আলাদা করে ফেলা হয়। এর পর মামুনের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয় না। তিনদিন পর মামুন আমাকে ফোন করে জানায়, ওদের সবাইকে আলাদা একটা ঘরে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে দেশে ফোন করতে হয়েছে, দেশ থেকে আরো কিছু টাকা পাঠাতে হয়েছে সবার পরিবার-পরিজনকে। এর পর সেই টাকা বিমানবন্দরের কর্মচারীদের দেয়ার পর তাদের ছাড়া হয়।

&dquote;কুয়ালালামপুরে

মূল কারণটা কি আমাদের শ্রমিকদের অজ্ঞতা বা অশিক্ষা?

এটা তো আছেই, তার চেয়ে বড় ইস্যু আমাদের শ্রমিকরা অসহায়। কারণ দালালরা তাদের কাছ থেকে এত বেশি পরিমাণে টাকা নেয় যে, ওই টাকা পরিশোধ করার চাপে আমাদের শ্রমিকদের অনেক কিছুই মুখ বুজে মানতে হয়। কোনো উপায় থাকে না।

কাজটি করতে গিয়ে নানা ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, সে সম্পর্কে শুনতে চাই।

আমি দেখেছি, মানুষ যা বিশ্বাস করতে চায়, সে তা-ই বিশ্বাস করে। এ প্রদর্শনীতে মালয়েশিয়ার একজন দালালের ছবি আছে। ওনার বদ্ধ ধারণা, আমি তার গুণমুগ্ধ। মজার বিষয় হচ্ছে, একদিন ছবি তুলে বের হওয়ার সময় এ লোক আমার হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘আপনাকে তো কোনো আপ্যায়ন করতে পারলাম না।’ তো এই লোকটি আমাকে কীভাবে দেখেছেন আমি জানি না। তবে আমি কিন্তু স্পষ্টভাবেই তাকে বলেছি আমি কী করছি, কেন করছি। মেজর রামার কথা বলব, তার সঙ্গে পরিচয় হয় খুব ভিন্নভাবে। আমি সুভাষ চন্দ্র বোসকে নিয়ে ভিন্ন একটি কাজ করছিলাম। সুভাষ চন্দ্র বোসের সঙ্গে ‘কুইন অব ঝাঁসি’ নামে যে নারী সৈনিকরা ছিলেন, তাদের একজন জীবিত ছিলেন। আমি তাকে খুঁজে বের করি। একসময় জানতে পারি, তার মেয়ের একটা ফ্যাক্টরি আছে, যেখানে বাংলাদেশী শ্রমিকরা কাজ করেন। এখানে পার্থক্য শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকের সম্পর্ক। শ্রমিকদের কেউ তাকে ‘মা’ বলেন কেউ ‘দিদি’। সাংবাদিকতার একটা সমস্যাও রয়েছে, খুব সহজীকরণ করতে গিয়ে অনেকগুলো বাঁক আমরা হারিয়ে ফেলি এবং মানুষ যে মানুষ, সেটাও অনেক সময় হারিয়ে যায়। আমি এ কাজের মধ্যে এ বিষয়গুলো আনতে চেষ্টা করছি।

‘দ্য বেস্ট ইয়ার্স অব মাই লাইফ’ নিয়ে নতুন কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা?

সবচেয়ে ভালো হয়, একটি নির্দিষ্ট পরিসরে না রেখে দেশব্যাপী যদি প্রদর্শনীটি দেখানো যায়। ঢাকার আগে প্রদর্শনীটি মালয়েশিয়ায় করেছি, এছাড়া আসছে বছর মধ্যপ্রাচ্যের ওপর একটি কাজ করতে পারি, যেটা আগামী বছর জামার্নিতে অনুষ্ঠেয় জিএফএমডিতে দেখানো হবে।

ফেব্রুয়ারিতে আলোকচিত্র উৎসব ‘ছবিমেলা’ শুরু হচ্ছে। এবারের আয়োজন নিয়ে জানতে চাই—

প্রতিবার ছবিমেলার একটা থিম থাকে। এবারের থিম ‘ট্রানজিশন’। নানা রকম সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই আয়োজনটি করতে হয়। আমার মনে হয়, বিগত বছরগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে এবারের আয়োজন। এখানে কিংবদন্তি আলোকচিত্রীদের কাজ যেমন দেখানো হয়, তেমনি তরুণদের কাজকেও পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। তবে কাজের মাধ্যমেই নবীনরা এখানে জায়গা করে নেয়। ছবিমেলার মাধ্যমে বাংলাদেশে এ জায়গাটি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।