আমার চাকরির একটি বাড়তি পাওনা— মজার মজার জিনিস দেখা এবং সব সময়ই মজার মজার মানুষের সাক্ষাৎ পাওয়া। কোন কোন মানুষ অন্যদের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয়, আর আমি এটাও জেনেছি আপনি যার গুণমুগ্ধ সে মানুষটির সঙ্গে সাক্ষাৎ সাধারণত বিরক্তির ও হতাশাব্যঞ্জক। আপনি তাকে যেমন ভেবেছিলেন, তিনি দেখতে তার চেয়ে খাটো, মোটা ও কুিসত।
এই বিশেষ দৃশ্যে আমার মায়ের প্রিয় লেখক ফিলিপ রথের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি, মা তাকে আমার কাছে সাহিত্যের সিংহ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। আমি এমনিতে তার গুণমুগ্ধ মানুষ নই। যখন শুনলাম ফিলিপ রথও সেখানে যাচ্ছেন, আঙুলে তুড়ি বাজালাম। তার পর যা ঘটল— আমাদের দুজনের পরিচিত এক বন্ধু হাত ধরে টেনে আমাকে রথের কাছে নিয়ে গেল এবং তার নিজস্ব কায়দায় আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল, ফিলিপ এই হচ্ছে পেরিয়েল, সে অনেক বড় লেখক।
সারা পৃথিবীতে এর চেয়ে লজ্জাষ্কর আর কোনো কিছুর কথা আমি ভাবতে পারি না— আমি কোনো একটি গর্তে ঢুকে মরে যেতে চাই। আমার এই ক্ষতের ওপর আরো একপ্রস্থ অপমানের প্রলেপ দিতে তাকে ঘিরে থাকা তার এক বন্ধু রথের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমিও তাকে পছন্দ কর। আমার যতটুকু আত্মসম্মানই অবশিষ্ট থাকুক তা উদ্ধার করতে আমি বললাম, আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে চিনি না, কাজেই তাকে পরখ করতে পারি না। তবে তার কাজ আমার পছন্দ।
এটা একেবারে মিথ্যে কথা। ফিলিপ রথ কী লিখেছেন আমি আর একটি শব্দও পড়িনি। রথ তার সামনের টেবিলে একটি বড় পাত্রভর্তি চেরি রেখে বসে আছেন। তিনি চেরি থেকে মুখ তুলে উপর-নিচ তাকিয়ে আমাকে দেখলেন— তার দৃষ্টি দীর্ঘক্ষণ আমার বুকের ওপর নিবদ্ধ। আমি ব্রা পরিনি। আমি ভাবছিলাম (এবং গোপনে গোপনে আশাও করেছিলাম) রেস্তোরাঁর মৃদু আলোয় তিনি আমার স্তনের বোঁটার আভাস দেখতে পাচ্ছেন কিনা। এমনকি এই বুড়ো বয়সেও তিনি যথেষ্ট আকর্ষণীয়। আমি ভাবছিলাম, যদি আমার মাকে গিয়ে বলি তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম করে এসেছি, তাহলে মায়ের কী প্রতিক্রিয়া হবে।
রথ সরাসরি আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, তাহলে তুমি একজন বড় লেখক, হু?
আমি আর দৃষ্টির জবাব দিয়ে বললাম, আমি তাই ভাবতে চাই। তিনি তার চেরির পাত্রের দিকে তাকালেন, তার পর আমার দিকে বসো, বলে মাথা নেড়ে তার উল্টো দিকের চেয়ারটা নির্দেশ করলেন। আমার জীবনে এত দ্রুত কোনো আদেশ পালন করিনি।
বসতে বসতে আমি ভাবলাম সব নিপীড়ন ও গালমন্দের এত দিনে সুফল ফলেছে। আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি রথ আমার পরবর্তী বই সম্পর্কে প্রশংসানামা লিখছেন। তিনি হয়তো এ রকম একটা কিছু লিখছেন— পেরিয়েল আশেন ব্র্যান্ড এ পর্যন্ত আমার দেখা তরুণ লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী। কিংবা দারুণ ধীশক্তিসম্পন্ন, চেঁচিয়ে বলার মতো মজার গভীরভাবে নাড়া দেওয়ার মতো একটি গ্রন্থে আপনি যা আশা করেন সবই পাবেন। স্পষ্টতই তিনি এ রকম মামুলি কোনো কিছু বলবেন না— তবে সেটা বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে, আমি আমাদের সময়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য ব্যক্তিত্ব ফিলিপ রথের পাশে নমনীয়ভাবে ঘুরঘুর করছি। আহা! কী যে বড় (এফওয়ার্ড) কারবার।
আমি চেষ্টা করছিলাম তার মনে দাগ কাটতে এবং কথাবার্তায় হঠাৎ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে। সুতরাং আমি ফ্রেঞ্চ ক্রিটিক্যাল থিয়োরি নিয়ে আলাপ জুড়ে নিলাম। আসলে আমি ফ্রেঞ্চ ক্রিটিক্যাল থিয়োরি সম্পর্কে কিছুই জানি না। আমার জন্য এটা বড় ধরনের জুয়া। রথের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে আমি যদি ‘দ্য ডাইয়িং অ্যানিম্যাল’ পড়ে থাকতাম তাহলে আমি জানতাম এটা সময়ের বিশাল অপচয়। যখন বুঝতে পারলাম আমি কী পড়েছি তাতে কিছু এসে যায় না কারণ আমি যতটা সময় তার সঙ্গে ছিলাম, ফিলিপ রথ সময়ের বড় অংশটাই কাটিয়েছেন কিছুক্ষণ চেরি তার কত প্রিয় ফল সে কথা বলে আর কিছুক্ষণ আমার স্তনের বোঁটার দিকে তাকিয়ে।
আমি ফরাসি ফেমিনিস্ট দার্শনিক মনিক উইটিগ সম্পর্কে আমার ক্লান্তিকর বক্তৃতা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। তিনি একদিকে বিখ্যাত, অন্যদিকে অনালোচিত হওয়ায় আমি ভেবেছি পার পেয়ে যাব। ফিলিপ রথ আমাকে বাধা দিয়ে বললেন, ‘তোমার জন্য আমার একটা প্রশ্ন আছে।’
আমি ততক্ষণে আমার উত্তর ঠিক করে ফেলেছি, ‘হ্যাঁ মিস্টার অবশ্যই। আমার পরের বইটির ভূমিকা যদি আপনি লেখেন, ব্যাপারটা যে আমার জন্য কত থ্রিলিং হবে!’
মালিক যখন কুকুরের খাবারের পাত্রে খাবার দিতে যাবেন, তখন কুকুর তার দিকে যেভাবে তাকায় আমিও সে রকম প্রত্যাশা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
রথ বললেন, ‘তুমি চেরি পছন্দ করো?’
তাকে না এড়ানোর চেষ্টা করে আমার নিজের ঠোঁট চেপে ক’বার চোখের পাতা ফেলে মিষ্টি করে হেসে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে চেরি পছন্দ করে না?’
রথের চোখে শয়তানের মিটিমিটি, বললেন, ‘আমার চেরিগুলোর একটা খেয়ে দেখতে?’
তিনি তার কাঁটাচামচ দিয়ে একটি চেরি বিদ্ধ করলেন, আমি হাঁ করলাম, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ লেখকের একজন ফিলিপ রথ আমার মুখে চেরি ফলটি ঢুকিয়ে দিলেন।
‘হুমমম’ আমি তার দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম ‘বেশ মজা!’
পুরো বিষয়টিই খুব সেক্সি, আমি ভাবতে থাকি তিনি আমাকে তার সঙ্গে বাসায় যেতে কিংবা অন্য কিছু করতে বলেন কিনা, কিন্তু তিনি তা করলেন না। তিনি একটা কিছু করলেন, তা হচ্ছে আমাকে... ‘যোগাযোগ রেখো’, এক টুকরো ছোট্ট কাগজে তার ঠিকানা লিখে আমার হাতে তুলে দিলেন।
এখান থেকে বাইরে বেরিয়েই আমার মাকে ফোন করলাম, ‘মা আমি এইমাত্র কার সঙ্গে ছিলাম তুমি বললেও বিশ্বাস করবে না।’
মা বলল, ‘আমি ভয় পাচ্ছি, তুই কার সঙ্গে ছিলি?’
আমি: ‘তোমার ভয় পেতে হবে না, শুনলে উত্তেজিত হয়ে পড়বে, ফিলিপ রথ।’
আমার মা: ‘আমি তোর কথা বিশ্বাস করছি না।’
আমি: ‘কসম।’
আমার মা: ‘এটা অবিশ্বাস্য।’
আমি: ‘এটা অবিশ্বাস্যই। এটা যথেষ্ট পর্নোগ্রাফিকও।’
আমার মা: ‘পেরি প্লিজ।’
আমি: ‘কি? তাই ঘটেছে।’
আমার মা: ‘এর মানে কি, ব্যাপারটা পর্নোগ্রাফিক?’
আমি: ‘এর মানে আমি চাইলে সম্ভবত তার সঙ্গে শুতে পারতাম।’
আমার মা: ‘ওহ মাই গড! আমি এটা বিশ্বাস করতে পারি না! এটা বড্ড ভয়ঙ্কর।’
আমি: ‘ভয়ঙ্কর কেন হবে? আমি ভেবেছি এটা তো বিস্ময়কর ব্যাপার। সত্যি বলতে কী, তার সঙ্গে তার বাড়িতে যেতে না পারায় এখন আফসোস হচ্ছে। কিংবা কোনো হোটেলে, সেটাই বরং ভালো হতো।’
আমার মা: ‘পেরি, তুই কি আমাকে সত্যি কথা বলছিস?’
আমি: ‘হ্যাঁ মা, কসম। আমি আক্ষরিক অর্থেই রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে এসেছি। তিনি আমাকে তার ঠিকানাও দিয়েছেন।’
আমার মা: ‘তুই আমাকে বলছিস ফিলিপ রথ তোর সঙ্গে সেক্স করতে চেয়েছিলেন?’
আমি: ‘তিনি ঠিক আমার সঙ্গে সেক্স করতে চেষ্টা করেছেন তা নয়, তবে তিনি আমার সঙ্গে এতটা প্রেমবিলাসী হয়ে উঠেছিলেন, আমি চাইলে সম্ভবত তার সঙ্গে সেক্স করতে পারতাম। আমি তোমাকে সেটাই বলছি।’
আমার মা: ‘তা হোক, আমি মনে করি এটাই ভয়ঙ্কর। তার মতো এত বড় মাপের মানুষের এ রকম আচরণ করা উচিত নয়।’
আমি: ‘কোন রকম ব্যবহার? আমি তো তোমাকে বেলেছিই তিনি কিছু করেননি।’
আমার মা: ‘হ্যাঁ, কিন্তু তুই বলেছিস তিনি তোর সঙ্গে সেক্সবিলাসিতা করেছেন। আমি তো আশা করব, তার আচরণ অধিক সম্মানজনক হওয়া উচিত।
আর যাই হোক তিনি তো একজন প্রফেসর।’
আমি: ‘কিন্তু এসবের সঙ্গে প্রফেসর হওয়ার কী সম্পর্ক? তার বইপত্রগুলো কি পুরোপুরি পর্নোগ্রাফিক হয়?’
আমার মা: ‘হ্যাঁ, তা ঠিকই কিন্তু...’
আমি: ‘মা তুমি কি মনে কর না তার সঙ্গে সেক্স না করে আমি ভুল করেছি?’
আমার মা: ‘ওহ্ মাই গড! পেরি তুই কী বলছিস? না আমি মনে করি না তার সঙ্গে সেক্স না করে তুই ভুল করেছিস।’
আমি: ‘তিনি আমার সাহিত্যিক জীবনটাকে কত উপরে উঠিয়ে দিতে পারতেন।’
আমার মা: ‘তুই তোর নিজের মেধা দিয়ে তোর সাহিত্যিক জীবনকে তুলে নিয়ে আসতে পারতি, ফিলিপ রয়ের সঙ্গে শুয়ে নয়। আর এখন তো তার বয়স সত্তরের কোঠায়।’
আমি: ‘তাতে কী এসে যায়? ফ্রাঁসোয়া জিলোর সঙ্গে যখন পিকাসোর দেখা তখন তার বয়স সতেরো আর পিকাসোর পঁয়তাল্লিশ।’
আমার মা: ‘পিকাসো কি তার ক্যারিয়ার উপরে উঠাতে পেরেছেন?’
আমি: ‘বেশ তো তার কথা সবাই জানে, আমার তাই ধারণা।’
আমার মা: ‘তিনি ফ্রাঁসোয়া জিলোর ক্যারিয়ার উপরে তোলেননি, তার ছেনালিকে তুলে এনেছেন।’
আমি: ‘এটা তো প্রথম পদক্ষেপ, তাই না?’
আমার মা: ‘না পেরি, তা নয়।’
আমি: ‘তার মানে উপরে ওঠার পথে তুমি কারো সঙ্গে শোয়ার বিরুদ্ধে?’
আমার মা: ‘হ্যাঁ আমি, আমি তাই।’
আমি: ‘আমি অবশ্য তা মনে করি না। আমি মনে করি মস্ত একটা ভুল করে ফেলেছি। আমি সত্যিই মনে করি তার সঙ্গে আমার সেক্স করা উচিত ছিল।’
আমার মা: ‘ধ্যাৎ, তুই এত বাজে বকবক করছিস। এ ধরনের আহাম্মকি করে সময় নষ্ট না করে তুই তার একটা বই পড়ছিস না কেন?’
আমি: ‘হয়তো আমি দুটোই করব।’
আমার মা: ‘ফিলিপ রথের সঙ্গে তোকে শুতে হবে না। তুই আমার কথা বুঝতে পেরেছিস!?’
ফিলিপ রথের যে কটা বই পাওয়া সম্ভব, আমি প্রত্যেকটি কিনে আনছি। তার লেখা পোর্টনয়’স কমপ্লেইন্ট পড়ার পর আমি নিজেকে অভিশাপ দিলাম, কেন তার সঙ্গে শুতে গেলাম না। আমার পছন্দ প্রকাশ করতে তাকে একটি প্রতীকী উপহার পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলাম, কী উপহার দিতে হবে সে সম্পর্কে আমার স্পষ্ট পরিকল্পনা আছে। ব্যাপারটা আমি দ্রুত দ্রুত উপলব্ধি করলাম, পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো চেরি পাওয়া যায় মিশিগানের ট্র্যাভার্স সিটিতে। আমি অতিকায় এক বাক্স চেরি তার বাড়ির ঠিকানায় পাঠানোর জন্য দাম পরিশোধ করে নিজের ওপর খুব সন্তুষ্ট হলাম।
আমার উপহার গৃহীত হয়েছে এটা যখন নিশ্চিত হলাম, আমি বাতিকগ্রস্তে তার ধন্যবাদ পাওয়ার জন্য বারবার মেইল বক্স চেক করতে শুরু করলাম। আমি কল্পনা করলাম তিনি এমন কিছু লিখবেন, যাতে বোঝা যাবে আমি কত সেক্সি ও মজার ছিলাম, আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ তিনি কী দারুণ উপভোগ করেছেন, তিনি আমার বই পড়তে চাচ্ছেন।
তিনি যাই লিখুন, আমি নিশ্চিত তা খুবই মানোমুগ্ধকর হবে, সম্ভবত তার চিঠিটি পেলে আমি চমত্কার একটি অ্যান্টিক ফ্রেমে বাঁধিয়ে সবার চোখে পড়ার মতো করে সাজিয়ে রাখব।
যখন মানুষ আমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। অনিবার্যভাবে তারা জিজ্ঞেস করবে, এটা কী? আর আমিও অমনোযোগীর অভিনয় করে জিজ্ঞেস করব। কোনটা কী? তারা আবার এ প্রশ্নটা করবে, আর এই পুনঃপ্রশ্ন করায় আমি নিশ্চিত হতে পারব তারা এটার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছে। কেবল তখনই আমি উত্তর দেব।
আমি একটু বিরতি নিয়ে ঘাড় ঘোরাব, তারা যে জিনিসটা দেখেছে, যেন সেটা আমার ভালো করে দেখা দরকার। তখন হয়তো আমি খিলখিল করে হেসেও উঠতে পারি। তার পর যেনতেনভাবে আমি বলব, ওহ! ওটা, তোমরা এভাবে কী বলছিলে আমি বুঝতেই পারিনি। এটা কেবল একটা চিঠি। হুম, ফিলিপ রথ পাঠিয়েছেন।’
[পেরিয়েল আশেন ব্র্যান্ড: মা ইসরায়েলি; বাবা আমেরিকান। পেরিয়েল আশেন ব্র্যান্ড বয়স ৪০ বছর ‘On the trees’ নামের আত্মজীবনী লিখে এর মধ্যেই যথেষ্ট আলোচিত ও সমালোচিত। তাকে নিয়ে নারীবাদীরাও বিব্রত। পেরিয়েল আশেন ব্র্যান্ডের টি-শার্টে লিখন কিছুটা রাজনৈতিক, কিছুটা যৌনতাশ্রয়ী: The only bush i trust is my Own’ অনূদিত অংশটি তার স্মৃতিকথার ফিলিপ রথ এপিসোড।]
অনুবাদ: আন্দালিব রাশদী





