দুঃখজনক হলেও বিষয়টি সত্য যে আমরা লন্ডনের প্রথম হিন্দুস্তানি কফি হাউজ সম্পর্কে ততটা জানি না। আগ্রহী পাঠকদের জানতে খুব ইচ্ছা হবে যে হিন্দুস্তানি কফি হাউজে খাবার মেনু কী ছিল? কিন্তু এর একমাত্র রেকর্ড রয়েছে একটি গাইডের বিজ্ঞাপনে, যা স্বয়ং দীন মোহাম্মদ নিজে দিয়েছিলেন আর এ গাইডের নাম “দি এপিকার’স আলমানাক”। দি এপিকার’স আলমানাক গাইড ও কফি হাউজ সম্পর্কে দি টাইমস পত্রিকায় ২৭ মার্চ ২০১১ সালে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়।

দি এপিকার’স আলমানাক প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮১৫ সালে। লন্ডনের বিশিষ্ট কবি ও নাট্যকার  রাফ রাইল্যান্স (Ralph Rylance) লন্ডনের প্রথম রেস্টুরেন্ট গাইডটি সংকলন করেন। ২০১২ সালে ব্রিটিশ লাইব্রেরি গাইডটি নিয়ে পত্রিকায় আরেকটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। এটি ছিল লন্ডনের রেস্টুরেন্ট তথ্যের এক অনন্য সম্পদ, আর ইংল্যান্ড তখন সরাসরি রাজকীয় শাসনে পরিচালিত হতো।

যা-ই হোক রাইল্যান্সের তথ্য থেকে হিন্দুস্তানি কফি হাউজ সম্পর্কে তেমন বেশি তথ্য জানা যায়নি, কারণ তিনি তার গাইডটি রচনা করেন কফি হাউজটি বন্ধ হওয়ার পর। ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত যে কারণেই হোন না করেন, তবে তিনি তার লেখায় দীন মোহাম্মদকে লিখেন সিদি মোহাম্মেদ।

 হিন্দুস্তানি কফি হাউজ সম্পর্কে  রাইল্যান্স লিখেন যে, ‘এটি খোলা হয়েছে সম্পূর্ণ হিন্দুস্তানি স্টাইলে আর ডিনারও পরিবেশন করা হয় সনাতন ভারতীয় স্টাইলে। ডিনার পরিবেশন করার পাশাপাশি এর সঙ্গে  অন্যান্য স্ন্যাকস যা পরিবেশন করা হয়, তার সব মেনুই ভারতীয়।

এখানে সব খাবারই কারি পাউডার, চাল ইত্যাদি  দিয়ে তৈরি হতো আর মসলা হিসেবে ঝাল মরিচের গুঁড়ো এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের সেরা মসলা দিয়ে রান্না করা হতো। তাছাড়া একটি কক্ষ ছেড়ে দেয়া হয়েছিল হুকা পান করার জন্য আর এই হুকার ছিলিম তৈরি করা হতো খাঁটি, সেরা মানের তামাকের সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার ভারতীয় মসলা মিশিয়ে।’ এই কক্ষটিকে একটি স্যুটের মতো করে তৈরি করা হয়েছিল। অতিথিদের আসনের জন্য  বেতের তৈরি সোফা, চেয়ার ব্যবহূত হতো। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের চায়নিজ চিত্রকর্ম ও ভারতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানের ছবি দিয়ে কক্ষটিকেও সাজানো হয়েছিল।

হিন্দুস্তানি কফি হাউজ সম্পর্কে আমাদের তথ্য এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ। তবে একটি বিষয় সত্য যে, এটি ছিল একটি সত্যিকারের রিলাক্স করার স্থান। আর স্বল্প মসলায় রান্না করা কারিগুলো ছিল আসলেই সুস্বাদু।

যেকোনো ইভেন্টেই অন্তত একজন এগিয়ে থাকেন, ভারতের বাইরে ইন্ডিয়ান খাবার পরিবেশন ও বিক্রয় করার জন্য দীন মোহাম্মদ ছিলেন সে রকমই একজন অগ্রগামী। ভারতীয় খাবার দিনে দিনে ইংল্যান্ডে জনপ্রিয় হতে থাকে বিশেষ করে, রানি ভিক্টোরিয়ার যুগে, যিনি নিজে ভারতীয় খাবার পছন্দ করতেন এবং ভারতীয় খাবার রান্না করার জন্য তিনি ভারত থেকে আব্দুল নামে একজনকে তার খাস সহকারী বা চাকর হিসেবে নিয়োগও দিয়েছিলেন।

 

লন্ডনে বাংলাদেশী খাবার: আধুনিক যুগে

লন্ডনের বিখ্যাত ক্যামডান মার্কেটে ইন্ডিয়ান খাবারের দোকান।

২০ শতকের প্রথমদিকে নাবিক বিশেষ করে, পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আসা নাবিকরা এখানে প্রায় নিয়মিতই আসতেন। তাছাড়া নিজেদের কমিউনিটির একজন এ রেস্টুরেন্টের মালিক এটিও তাদের ভেতরে কাজ করত। এভাবেই লন্ডনে ১৯৪০-এর দশকে গড়ে ওঠে বেশকিছু রেস্টুরেন্ট, যেগুলোয় ভারতীয় কিংবা পাকিস্তানি/বাংলাদেশী খাবার বিক্রি করা হতো। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রচুর সংখ্যক বাঙালি ইংল্যান্ডে অভিবাসী হন, একই সঙ্গে কারি হাউসের সংখ্যা ও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে এবং তা ইন্ডাস্ট্রিতে রূপ নেয়।

দীন মোহাম্মদের প্রথম রেস্টুরেন্ট বেশি দিন টিকেনি, লোকসানের কারণে তিনি এক পর্যায়ে তা বন্ধ করে দেন। এর প্রায় শত বত্সর পর সেখানে লন্ডনি স্টাইলে আধুনিক বাঙালি রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠতে থাকে। পিটার ও কলিন গ্রুভসের সম্পাদনায় প্রকাশিত মুডফুড/মেনু ম্যাগাজিনে এ বর্ণনা করা হয়েছে যে ‘স্যালুট ই হিন্দ’ নামে হলবর্নে একটি রেস্টুরেন্ট তখন যথেষ্ট নাম করে, যা ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত। রুপার স্ট্রিটে কোহিনূর ও কারি ক্যাফে রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২০-এর দশকে।

পশ্চিম লন্ডনের রিজেন্ট স্ট্রিটে বীরাস্বামী রেস্টুরেন্ট কয়েক হাত মালিকানা পরিবর্তনের পর সবচেয়ে পুুরনো ভারতীয় রেস্টুরেন্ট এটি। এর পেছনেই ছিল ভারতীয় রেস্টুরেন্ট হালাল, যা ১৯৩৯ সালে কভেন্ট গার্ডেনে পাঞ্জাব রেস্টুরেন্ট, যা ১৯৪৬ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

১৯২০ সালে অত্যন্ত ঘটা করে গেরাড স্ট্রিটে ‘দ্য সফি’ রেস্টুরেন্ট খোলা হয়। তবে এ রেস্টুরেন্টগুলো মূলত ইন্ডিয়ান খাবার পরিবেশন করত। কিন্তু যখন এডওয়ার্ড পালমার ১৯২৬ সালে পিকাডেলিতে ভেরাসোয়ামি (Veeraswamy) রেস্টুরেন্ট খোলেন, সেটি ছিল এক ধরনের বিপ্লবের। ভেরাসোয়ামির জনপ্রিয়তার বড় কারণ ছিল  ভারতীয় খাবারের সঙ্গে লন্ডনি খাবারের ফিউশন। আর এ খাবার পরিবেশন করা হতো সম্পূর্ণ ব্রিটিশ কায়দায়। তাই কেবল ভারতীয়রাই নয় ইংল্যান্ডের লোকজনও সেখানে নিয়মিত খেতে আসতেন।

দীন মোহাম্মদ ভাবতে পেরেছিলেন কি না, তা আমরা জানি না কারণ, ইংল্যান্ডের সাবেক বিদেশ সেক্রেটারি রবিন কুক ২০০১ সালে চিকেন টিক্কা মাসালাকে ব্রিটেনের জাতীয় খাবার হিসেবে ঘোষণা দেন। হয়তোবা দীন মোহাম্মদ আজ আকাশের গায় হেলান দিয়ে হুক্কা টানছেন আর দেখছেন তার উদ্যোগের কারণেই আজ ইংল্যান্ডে কারি ব্যবসা ইন্ডাস্ট্রির রূপ নিয়েছে এবং যেখানে প্রতি বছর প্রায় ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন পাউন্ড লেনদেন হয়, আর কর্মসংস্থান হয়েছে এক লাখ লোকের। জয়তু দীন মোহাম্মদ।