‘যদি স্বর্গে যেতে চান, বাংলাদেশে আসুন’, বাংলাদেশ ভ্রমণকালে নিজের অভিনীত তথ্যমূলক চলচ্চিত্র ‘বাংলাদেশ আই লাভ ইউ’-এর একটি অংশে একথা বলেছিলেন কিংবদন্তি আমেরিকান মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। সময়টা ছিল আজ থেকে ৩৮ বছর আগে, ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি, যখন বিশ্বের সর্বকালের সেরা মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশে প্রথম পা রাখেন। সে সময় স্বঘোষিত এবং স্বীকৃত এ ‘গ্রেট’ বক্সারের সময়টা অবশ্য তত ভালো যাচ্ছিল না। সদ্যই লিওন স্প্রিংকসের কাছে হেরে ‘হেভিওয়েট’ খেতাবটি খুইয়ে বেশ মুষড়ে পড়েছিলেন। তাই যখন ‘বাংলাদেশ আই লাভ ইউ’ প্রামাণ্যচিত্রের নির্মাতা রেজিনাল্ড ম্যাসে সেই সময়টিকেই সুপারিশ করলেন তাদের বাংলাদেশ সফরের ক্ষণ হিসেবে, মোহাম্মদ আলী তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ভাই রেজ, তুমি কি নিশ্চিত?’ রেজিনাল্ড তখন আশ্বস্ত করেন আলীকে।

সেদিন রেজিনাল্ডের ভবিষ্যদ্বাণী ভুল প্রমাণ হয়নি। স্ত্রী ভেরোনিকা ও পরিবার-পরিজনদের নিয়ে সপ্তাহব্যাপী ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখে যখন মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশে প্রথম পা রাখেন, তখন তাকে ভালোবাসা জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন তার প্রায় বিশ লাখ ভক্ত! দারুণ রাজসিক উপায়ে অভ্যর্থনা জানানো হয় তাদের। তত্কালীন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আলী ও তার স্ত্রীসহ সম্পূর্ণ ভ্রমণকারী দলটিকে দেয়া হয় রাষ্ট্রীয় অতিথির সম্মাননা। এর অংশ হিসেবে মোহাম্মদ আলীকে প্রদান করা হয় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব। সে সময় মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমাকে যদি আমেরিকা থেকে বের করে দেয়া হয়, তাহলে আমার আরেকটি ঘর আছে।’

যে পরাজয়ে মুষড়ে পড়েছিলেন আমেরিকান এ বিশ্বসেরা মুষ্টিযোদ্ধা, সেই একটি পরাজয়েই তার প্রতি সবার ভালোবাসায় ভাটা পড়ে যায়নি। এমনটি ঘটেনি বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রেও। তার কারণ মোহাম্মদ আলী বিশ্ববাসীর নিকট শুধু একজন কিংবদন্তি বক্সার হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না, তত দিনে তিনি সারা বিশ্বে পরিচিত হয়ে গেছেন একজন ‘বৈশ্বিক প্রতিকৃতি’ হিসেবে। নিজ কর্মস্থলে প্রাপ্ত সাফল্যের বাইরেও তার মতামত প্রকাশের দৃঢ় ভঙ্গি, যুদ্ধ ও বর্ণবৈষম্যবিরোধী অবস্থানকে শ্রদ্ধা করতেন অনেকে। যদিও জীবনের শেষভাগ পর্যন্ত নিজ দেশ আমেরিকায় মোহাম্মদ আলী ছিলেন একজন বিতর্কিত চরিত্র, তবে বহির্বিশ্বের প্রশংসা তিনি কুড়িয়ে নিয়েছিলেন তখনই, যখন ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিপক্ষে তার অবস্থানকে তিনি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন। এছাড়া মুসলমান বিশ্বে আলী সমাদৃত হন ইসলামের প্রতি তার আনুগত্যের কারণে, আর সাব-সাহারান অঞ্চলে বর্ণবৈষম্যের শিকার কালো চামড়ার লোকদের কাছে ‘ব্ল্যাক প্রাইড ও জাতীয়তাবাদ’-এর এক অনন্য প্রতিমূর্তি হয়ে দেখা দেন তিনি।

বাংলাদেশে অবস্থানের সময় মোহাম্মদ আলী ভ্রমণ করেছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকাগুলোয়। তিনি ভ্রমণ করেছিলেন পৃথিবী বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন ও ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবন, হ্রদে ঘেরা মনোলোভা শহর রাঙ্গামাটি, কক্সবাজারের উপকূলীয় সৌন্দর্য, আর সিলেটের সবুজ চা-বাগান। ‘বাংলাদেশ আই লাভ ইউ’-এর নির্মাতা রেজিনাল্ড ম্যাসে লিখেছিলেন, এসবের মাঝে তারা যখন আলীকে ক্যামেরায় ধারণ করছিলেন, আলী তখন বাংলাদেশের প্রকৃতির এ নির্মল সৌন্দর্য উপভোগ করে যাচ্ছিলেন।

তাই আলীর বাংলাদেশ ভ্রমণের কথা বলতে গেলে শুরু করতে হয় লেখক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা রেজিনাল্ড ম্যাসের গল্প দিয়ে। তারুণ্যের প্রথম ভাগেই বাংলার সংস্কৃতি ও এ অঞ্চলের মানুষের কথা জেনে বিমোহিত হয়েছিলেন রেজিনাল্ড। রাজা রামমোহন রায়, হেনরি ডিরোজিও, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও যামিনী রায়দের সৃজনশীলতায় বিমুগ্ধ ম্যাসের ভাষ্যে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো অঞ্চল এমন বিপুল সংখ্যক কবি ও শিল্পীদের জন্ম দেয়নি। সত্তরের দশকে ম্যাসে যখন লন্ডনে ‘সেভেন স্টার ফিল্মস’-এর চেয়ারম্যান, তখন তার দেখা হয় বাংলাদেশী ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দীন চৌধুরীর সঙ্গে। বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বাধিকারের প্রশ্নে আপসহীন হয়ে এ অঞ্চলের কিছু বীরযোদ্ধা তত দিনে পৃথিবীর বুকে এঁকেছেন বাংলাদেশ নামে এক নতুন ভূখণ্ডের নাম। গিয়াসউদ্দীন ম্যাসেকে পরামর্শ দিলেন বাংলাদেশকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরির। অনিবার্যভাবেই রেজিনাল্ড ম্যাসেকে এ চিন্তা প্রভাবিত করেছিল। সে সময় ম্যাসে ভাবছিলেন, এমন কারো কথা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে তুলে ধরা যায়। এবং তখনই তার মনে এসেছিল সে সময়কার জনপ্রিয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ আলীর কথা।

তারপর ভাবনা অনুযায়ী লস অ্যাঞ্জেলেসে বেশ কয়েকটি ভ্রমণ সম্পন্ন করার পর রেজিনাল্ড যখন মোহাম্মদ আলীর দেখা পেলেন, আলী রাজি হলেন বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করতে। কিন্তু জানালেন, তার আগে বক্সিং রিং-এর ভেতরে একটা ছোট্ট ব্যাপার তাকে মিটিয়ে নিতে হবে। আলীর ভাবনায় সেই ছোট্ট ব্যাপারটি ছিল আসলে লিওন স্প্রিংকসের সঙ্গে তার লড়াইয়ের নির্ঘণ্ট, যা শেষ পর্যন্ত আসলে একটি ছোট্ট ব্যাপার হয়ে থাকেনি। নিজের কর্মজীবনের ৬১টা লড়াইয়ের মধ্যে ৫৬টিতেই জয়ী হয়েছিলেন এ গ্রেট বক্সার, পরাজিত হয়েছিলেন মাত্র পাঁচটিতে। সেবার এসেছিল এমন এক পরাজয়, যাতে আলী বেশ ভেঙে পড়েন। তাই ঠিক ওই রকম একটা সময়ে ম্যাসে বাংলাদেশ ভ্রমণের কথা তুললে, প্রথমটায় সায় দিতে পারেননি আলী। কিন্তু রেজিনাল্ড তাকে আশ্বস্ত করে তখনই সফরটির আয়োজন করেন। এর পর বাংলাদেশে এসে আলী যা পেয়েছেন, সেটি আজো আলোচিত হয়ে আছে। 

আলী যখন বাংলাদেশে আসেন, তখনো এ দেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আসেনি। তবে এ মহান ব্যক্তিত্বকে সাদরে সম্ভাষণ জানাতে কোনো কমতি রাখেনি বাংলার মানুষ। তেমনই তা হূদয় দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন আলী ‘দ্য গ্রেট’। মোহাম্মদ আলীর বাংলাদেশ ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ঢাকা স্টেডিয়ামে প্রদর্শিত তার একটি বক্সিং ম্যাচ, যেখানে তিনি ১২ বছর বয়সী মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দীনের সঙ্গে একটি মুষ্টিযুদ্ধ মঞ্চায়িত করেন। এ দেশের লোকেরা তার সেই প্রদর্শনীতে ব্যাপক উচ্ছ্বাস প্রদর্শন করেছিল। সেবারই ঢাকার পল্টনে বক্সিং স্টেডিয়ামকে তার নামে নামকরণ করা হয়। এছাড়া এ দেশ থেকে কক্সবাজারে একখণ্ড জমিও তাকে পুরস্কার হিসেবে প্রদান করা হয়।

১৯৪২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ আলী যখন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন, তখন তার নাম দেয়া হয়েছিল ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে জুনিয়র। ১৯৬৪ সালে ২২ বছর বয়সে মুষ্টিযোদ্ধা সনি লিস্টনকে পরাজিত করে তিনি বিশ্ব হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নিয়েছিলেন। এর পর পরই তিনি নিজেকে ‘নেশন অব ইসলাম’-এর একজন সদস্য বলে ঘোষণা দেন। পরবর্তীতে সবার কাছে তিনি মোহাম্মদ আলী নামে পরিচিত হতে থাকেন। একই সঙ্গে তার অহিংস নীতির কারণে যে আমেরিকার দ্বারা যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কারণে ব্যাপক হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন নিজের কর্মজীবনে, সেই আমেরিকার হোয়াইট হাউজের পরবর্তী পেসিডেন্ট জিমি কার্টারেরও অনুরাগভাজন হন তিনি। বলা হয়, ‘নেশন অব ইসলাম’-এর উগ্রতাপূর্ণ ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতিকেও তিনি আজীবন এড়িয়ে চলেছেন। পরবর্তীতে সুফিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েন আলী।

অথচ নিজের কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টিতে তাকে বক্সিংজগতে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। গ্রেফতার করা হয়েছিল আলীকে। কারণ তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার শক্ত অবস্থান প্রদর্শন করেছিলেন। মোহাম্মদ আলী  তখন আমেরিকান সেনা বাহিনীতে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানান এই বলে যে, ভিয়েতনামের লোকদের সঙ্গে আমার কোনো দ্বন্দ্ব নেই। এ মানবিক অবস্থানের জন্যই চরম মূল্য দিতে হয় তাকে। নানা হেনস্তা তো রয়েছেই, তাকে গ্রেফতার করে তার চ্যাম্পিয়নশিপের খেতাবটা কেড়ে নেয়া হয়। বক্সিংজগতে নিজের কর্মজীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টিতে তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয় তাকে। চার বছর তিনি কোনো মুষ্টিযুদ্ধে অংশগ্রহণই করেননি। তবে সে সময় আমেরিকান সরকারের রোষানলে পড়লেও, বিশ্ববাসীর মন কেড়ে নেন আলী। সেসঙ্গে তার বিপুল অঙ্কের ভক্তশ্রেণী গড়ে ওঠে বাংলাদেশেও।

মোহাম্মদ আলীর বাংলাদেশ সফরের সময় এ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। আলীর অহিংস জীবনযাপন ও মানবিকতায় পূর্ণ দৃঢ় মনোবল নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি কেউ। এ দেশে সবকিছুর ঊর্ধ্বে আলী একজন পরম শ্রদ্ধার পাত্র।  ৩ জুন পারকিনসন্স রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করার পর বাংলাদেশের মানুষ পরম শ্রদ্ধাভরে আরেকবার স্মরণ করেছেন মোহাম্মদ আলীকে। ইনি সেই মোহাম্মদ আলী, যিনি যুদ্ধ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কামড়ে বিধ্বস্ত নবজন্ম লাভ করা দেশটির সৌন্দর্যের দিকটিকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে সহায়তা করেছিলেন আজ থেকে ৩৮ বছর আগে, যিনি বাংলাদেশকে ভালোবেসেছিলেন।