আপনি বহু বছর আগে থেকেই জানেন এমনটা হবে, তার পরও এ শোক সামলানো কঠিন। মোহাম্মদ আলী গত শুক্রবার ৭৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি তার যুগের সবচেয়ে চমকপ্রদ আমেরিকান চরিত্র। শারীরিক দক্ষতা, রাজনৈতিক অবাধ্যতা, বিশ্বজোড়া খ্যাতি আর নিজেই নিজেকে গড়ে তোলা— এমন জীবনকে উপন্যাসে ধারণ করতে সক্ষম একজন ঔপন্যাসিকের নামও খুঁজে পাওয়া কঠিন। জিম ক্রোর (বর্ণবাদী আইন) যুগে কেন্টাকির লুইভিলে ক্যাসিয়াস ক্লে নাম নিয়ে বেড়ে উঠছিলেন। বিজ্ঞাপন আঁকিয়ে ও হাউজ ক্লিনারের ঘরে জন্মানো রোগা-পাতলা ক্যাসিয়াস ছিল বুদ্ধিমান এবং রসিক। ১২ বছর বয়সে তার বাইসাইকেল চোরের ওপর প্রতিশোধ নিতে মুষ্টিযুদ্ধ শেখা শুরু করেন। ৬ ডলারের সেই লাল শুইন সাইকেল হারানোর বেদনা ক্যাসিয়াস সহ্য করতে পারেননি। একসময় আলী তর্কাতীতভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। পরিচিতি পেয়েছেন দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ অ্যাথেলিট, শক্তিমান ও গতিময় মানুষ হিসেবে। তিনি জাতিগত গৌরবের আদর্শ, গৌরবের প্রতীক। তিনি একজন যোদ্ধা, শিক্ষার্থী, প্রচারক, বিচ্ছিন্নতাবাদী, ঐক্যের দূত, কমেডিয়ান, অভিনেতা, নৃত্যশিল্পী, মৌমাছি ও প্রবল সাহসী।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি এলিজা মোহাম্মদের নেশন অব ইসলামের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা ঘোষণা করে তার ‘দাস নাম’ থেকে নিজেকে মুক্ত করেন। ভিয়েতনামে যুদ্ধ করার বদলে নিজের হেভিওয়েট খেতাব বিসর্জন দেয়াকে শ্রেয় মনে করেছেন। এসবের জন্য যেমন নিন্দিত হয়েছেন, তেমনি প্রশংসাও পেয়েছেন। বর্ণবাদের কাঠামোকে তিনি হুমকি ছুড়ে দিয়েছিলেন। বহু বছর ধরে তিনি অনেক আমেরিকানের কাছে এক বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত অনেকে তার নতুন নাম ধরে ডাকতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। কলামিস্ট জিমি ক্যানন লিখেছিলেন, ‘ক্লের প্রতি আমার সমবেদনা আছে আর তিনি যা উপস্থাপন করেন তাকে ঘৃণা জানাই।’ এমনকি সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় ক্রীড়া কলামিস্ট রেড স্মিথ যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া আলীকে ‘আবর্জনা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। কিন্তু গত কয়েক দশকে পারকিনসন রোগে তার চলাফেরা ও কথা বলার শক্তি রহিত হলে এবং দেশের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে আলী দুনিয়াজুড়ে স্নেহ লাভ করেন। কোনো চ্যারিটি ডিনার, বিমানবন্দর বা কোনো ক্রীড়া অনুষ্ঠানে মানুষ আলীর দিকে এমনভাবে তাকাতো, যেন তিনি পোপ ফ্রান্সিস বা দালাই লামা। আলী যদি ফিসফিস করে ছোট একটা কৌতুক বলতেন বা পুরনো দিনের মতো চোখটা একটু বড় করতেন, তাহলে মানুষের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হতো তারা এক বিস্ময়ের দেখা পেয়েছেন।
ক্যাসিয়াস ক্লে বড় হয়েছেন গ্র্যান্ড এভিনিউয়ের এক সাধারণ বাড়িতে, প্রতিবেশীরা সবাই কৃষ্ণাঙ্গ। গ্র্যান্ড এভিনিউয়ের অবস্থা দক্ষিণ-পশ্চিম লুইভিলে গরিব কৃষ্ণাঙ্গদের আবাস ‘স্মোকটাউন’ থেকে ভালো ছিল। অর্থাত্ আলীরা ছিলেন মধ্যবিত্ত। কিন্তু আলীকে নিয়ে একটি বইয়ের কাজ করার সময় টনি মরিসন আমাকে বলেছিলেন, ‘কৃষ্ণাঙ্গ মধ্যবিত্ত, দক্ষিণের কৃষ্ণাঙ্গ মধ্যবিত্ত আর শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত এক জিনিস নয়।’ (মরিসন র্যানডম হাউজের একজন সম্পাদক হিসেবে আলীর আত্মজীবনী ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ নিয়ে কাজ করেছেন) দাস প্রথাবিরোধী উনিশ শতকের কেন্টাকির এক নেতা ও সামরিক কমান্ডারের নাম অনুসারে নামকরণ হয়েছিল ক্যাসিয়াস। সেই ক্যাসিয়াসের ৪০ জন দাস ছিল, যাদের তিনি মেক্সিকো থেকে যুদ্ধ করে ফেরার পর মুক্ত করে দেন। কিছুদিন তিনি আব্রাহাম লিংকনের গুপ্তচর হিসেবে রাশিয়ায় কাজ করেছেন। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই কেন্টাকি ফিরে দাস প্রথাবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন।
চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে ক্যাসিয়াস যখন লুইভিলে বেড়ে উঠছিলেন, তখন সেটা ছিল জিম ক্রো (বর্ণবাদী আইন) শহর। আমেরিকান বর্ণবিদ্বেষ জ্যাকসন কিংবা মোবাইলের মতো উগ্র না হলেও যথেষ্ট খারাপ। স্যাভয়ের মতো মুভি থিয়েটারে শ্বেতাঙ্গরা বসত অর্কেস্ট্রায় আর কৃষ্ণাঙ্গদের জায়গা হতো ব্যালকনিতে। তবে বেশির ভাগ থিয়েটার ছিল শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্য। সেখানে ছিল শ্বেতাঙ্গদের স্কুল, শ্বেতাঙ্গদের ক্লাব, তাদের ব্যবসা। ক্লে যখন বড় হচ্ছেন লুইভিলের কৃষ্ণাঙ্গ লেখক ব্লাইডেন জ্যাকসন তখন তার চল্লিশের কোটায়, লিখেছেন, ‘পর্দার ওপাশে আমার সবকিছুই কালো: ঘরবাড়ি, জনগণ, গীর্জা, স্কুল, নিগ্রো পুলিশসহ নিগ্রো পার্ক... এখানে দুইটা লুইভিল আছে এবং আমেরিকায় দুইটা আমেরিকা।’ ক্যাসিয়াস তার বাল্যকালে দেখেছেন, সারা দিন শ্বেতাঙ্গ পরিবারের মেঝে আর টয়লেট পরিষ্কারের পর তার ক্লান্ত মাকে রেস্টুরেন্টে পানি খেতে দেয়া হয়নি। এগুলো ছিল নিত্তনৈমিত্তিক দৃশ্য, লুইভিলের বর্ণবাদী ব্যবস্থা।
ক্যাসিয়াসের বাবা ছিলেন স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় কাতর। তিনি শ্বেতাঙ্গদের অবিশ্বাস করতেন। তিনি মনে করতেন, শ্বেতাঙ্গরাই তাকে চিত্রশিল্পী হতে দেয়নি, বরং তাকে কেবল সাইন আর বিলবোর্ডের পেইন্টার করে রেখেছে। তিনি প্রচুর মদ্যপান করতেন। আলীর এক বন্ধুর কথায়, তিনি পরিবারের জন্য যথেষ্ট যন্ত্রণা বয়ে আনতেন। তার মা ওডেসা ছিলেন ক্যাসিয়াস সিনিয়রের ক্ষোভ আর রাগ ঝাড়ার জায়গা। ওডেসা ছিলেন আলীর আশ্রয়। ওডেসাই প্রথম খেয়াল করেছিলেন যে, তার পুত্র প্রচুর কথা বলে এবং তার বাঁ হাত বেশি দ্রুত চলে। একবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ওডেসা বলেছিলেন, ‘সে (আলী) সবসময়ই বেশি কথা বলত। একেবারে শিশু বয়সেই সে কথা বলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করত। সে সবসময় বকবক করত। অন্যরা ওর দিকে তাকিয়ে হাসলে সে আরো দ্রুত কথা বলত। কাউকে আমি এত দ্রুত কথা বলতে দেখিনি। একেবারে যেন বজে র গতি। সে কখনো চুপ করে বসতে পারত না। ছয় মাস বয়সেই ওর হাত পেশল হয়ে উঠেছিল, বিছানায় আমার মুখে আঘাত করত। ওর হাতের আঘাতে আমার সামনের দুটো দাঁত নড়বড়ে হয়ে যায় এবং পরে সেগুলো তুলে ফেলতে হয়েছিল। তাই আমি সবসময়ই বলি, তার প্রথম নকআউট পাঞ্চ ছিল আমার মুখে।’
অ্যাথলিট কিংবা পারফরমার হিসেবে ক্লে বিভিন্ন উত্স থেকে শিখেছেন ও অনুকরণ করেছেন। পেশাদার রেসলারের গর্বিত ভাব পেয়েছেন জর্জ ওয়াগনারের কাছে। ফুটওয়ার্ক আর বক্সিং স্টাইল সুগার রে রবিনসনের অনুকরণে। কিন্তু শিকাগোর কিশোর এমেট টিলের মতো আর কেউ তাকে এতটা প্রভাবিত করতে পারেনি। মিসিসিপিতে পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে এসে টিল শ্বেতাঙ্গদের হাতে খুন হন। ১৪ বছরের টিলের অপরাধ ছিল সে একজন শ্বেতাঙ্গ ক্যাশিয়ারকে ‘শিশু’ বলে সম্বোধন করেছিল। এর কয়েক দিন পরে শ্বেতাঙ্গরা তার বাসায় হামলা চালিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করে এবং তার লাশ তাল্লাহচি নদীতে ফেলে দেয়। লাইফের পাতায় টিলের ক্ষত-বিক্ষত মুখ আর কৃষ্ণাঙ্গদের পত্রিকা ক্যাসিয়াসকে বুঝিয়ে দেয় একজন কৃষ্ণাঙ্গ শিশু হিসেবে সমাজে তার সীমাবদ্ধতার কথা। একজন লেখককে নিজের বেড়ে ওঠার সংকীর্ণ পরিবেশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে আলী বলেছেন, ‘রাস্তায় আমাদের কিছুই করার ছিল না। শিশুরা রাস্তায় পাথর ছোড়াছুড়ি করত, রাতে রাস্তার বাতির তলায় দাঁড়িয়ে থাকত। কেউ বারে যেত, সিগারেট টানত, নয়তো মদ্যপান করত, আর কিছু করার ছিল না।’
তার প্রজন্মের যেকোনো কৃষ্ণাঙ্গ শিশুর মতো ক্লেও দ্রুতই শিখে নিয়েছিলেন যে, যদি তিনি তার কৃষ্ণাঙ্গ সমাজের বাইরে গিয়ে পোর্টল্যান্ডের শ্বেতাঙ্গদের এলাকায় ঢুকে পড়েন, তাহলে তাকে ‘নিগার!’ এবং ‘নিগার এখান থেকে ভাগো!’ এ জাতীয় কথা শুনতে হবে। ওয়ালনাট স্ট্রিটের পঞ্চম ও দশম সড়কের মধ্যকার দোকানগুলো কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। হোটেলগুলো পৃথক ছিল। স্কুলগুলোও কার্যত পৃথক ছিল। তবে সেখানে কিছুটা হলেও পরস্পরের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ ছিল। সে সময় ছিল ‘শ্বেতাঙ্গ স্টোর’, ‘কৃষ্ণাঙ্গ স্টোর’; ছিল ‘শ্বেতাঙ্গ পার্ক’, ‘কৃষ্ণাঙ্গ পার্ক’। ক্যাসিয়াসের এক স্কুল সহপাঠী বেভারলি এডওয়ার্ডসের কথায়, ‘এ রকম একটা পরিবেশেই আমরা বাস করতাম।’ পিতা যখন তাকে এমেট টিলকে প্রহার, থেতলে দেয়া ও মাথায় গুলি করে লাশ নদীতে ফেলে দেয়ার ঘটনাটি বলেন, ক্লে তখন নিজেকে টিলের জায়গায় দেখতে পান। টিল তার চেয়ে এক বছরের বড় ছিল। এ হত্যাকাণ্ড ক্যাসিয়াসের মনে একটি ধারণাকে শক্ত করে দেয় যে, লুইভিলের একজন কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে বাইরের দুনিয়া তাকে অস্বীকার করবে, ধমকাবে এমনকি তাকে ঘৃণা করবে।
দশম গ্রেডে ক্যাসিয়াসের নম্বর এত কম ছিল যে, তাকে আবার এক বছর ওই শ্রেণীতেই থাকতে হয়। ফুটবল বা বাস্কেটবলে ক্যারিয়ারের জন্য কলেজে যাওয়া প্রয়োজন ছিল আর তিনি বুঝতে পারছিলেন, তার কলেজে যাওয়া হবে না। মুষ্টিযুদ্ধই ছিল রাস্তা। ক্লাসে বসে দিবাস্বপ্ন দেখতে লাগলেন। পরবর্তীতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মুষ্টিযুদ্ধ শুরু করেছিলাম, কারণ আমার মনে হয়েছিল, একজন কৃষ্ণাঙ্গের জন্য এ দেশে দ্রুত সফলতা পাওয়ার এটাই একমাত্র উপায়।’ তার প্রথম প্রশিক্ষণ ছিল স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা জো মার্টিনের জিমে। সেই কৈশোরেই তিনি অদ্ভুত কিছু কৌশল প্রদর্শন করেছিলেন। তখনই তিনি ছিলেন দারুণ নিয়মানুবর্তী, খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে চিকাস পার্কে দৌড়াতেন। শুরুর সেসব দিন থেকেই তার মধ্যে অতিপ্রাকৃত এক আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছিল। রিংয়ে প্রবেশের আগেই তিনি প্রায় ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ হয়ে উঠেছিলেন। তখনই তিনি মুষ্টিযুদ্ধের সময় মার্কিন কবি ওগডেন ন্যাশের ছড়া ব্যবহার করতেন: ‘দিজ গাই মাস্ট বি ডান/ আই উইল স্টপ হিম ওয়ান।’ স্কুল অ্যাসেম্বলিতে প্রধান শিক্ষক এটউড উইলসন ক্যাসিয়াসকে সম্বোধন করে বলতেন, ‘পৃথিবীর ভবিষ্যত্ হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন! এ ছেলে একদিন লক্ষ লক্ষ ডলার উপার্জন করবে!’ ক্লাসে তিনি পাসের জন্য সংগ্রাম করেছেন, বই পড়তে তার কষ্ট হতো। কিন্তু তিনি বুদ্ধিমান ছিলেন, বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জ্ঞান আহরণ করতেন।
অলিম্পিক জিতে ক্যাসিয়াস মুষ্টিযুদ্ধ-বিষয়ক লেখকদের তেমন সন্তুষ্ট করতে পারেননি, বরং তিনি লেখকদের হতবুদ্ধি করে দিয়েছিলেন। তার স্টাইল নিয়ে সেরা লেখক এ. জে. লিয়েবলিংসহ অন্যরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। মুষ্টিযুদ্ধে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঐতিহ্যবাহী পৌরুষদীপ্ত পাঞ্চ বিনিময়ে অস্বীকৃতি, নেচে নেচে লড়াই, প্রতিপক্ষকে ঘিরে চক্কর কাটা— ক্লের এসব কৌশল লেখকদের কাছে সঠিক মনে হতো না।
১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিকে পোল্যান্ডের প্রতিপক্ষকে হারিয়ে ক্লে স্বর্ণপদক জেতেন। লিয়েবলিংই একমাত্র প্রশংসা করেছিলেন এবং তাও একেবারে মেপে মেপে। ক্লে পেশাদার হয়ে ওঠার পরও লিয়েবলিং তার প্রতি উষ্ণতা দেখাননি। ডগ জোনসের সঙ্গে তার লড়াইয়ের পর লিয়েবলিং ক্লেকে ‘দাম্ভিক’ হিসেবে সম্বোধন করেন। অন্যরা তাকে ‘গ্যাসিয়াস (বায়বীয়) ক্যাসিয়াস’ নামে ডাকা শুরু করে। তবে পিটার হ্যামিল নামের একজন উদারবাদী শ্বেতাঙ্গ অবশ্য ক্লেকে প্রশংসা করেন। তিনি নিউইয়র্ক পোস্টে লেখেন, ‘ক্যাসিয়াস ক্লে একেবারে তরুণ, কিন্তু দারুণ আকর্ষণীয়। তবে সে ক্লান্তিকর একঘেয়েমিতে রূপান্তরের বিপদে আছে।’
১৯৬০ সালে রোমে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে অংশ নেয়ার সময় ক্যাসিয়াসের বয়স মাত্র ১৮। তিনি অলিম্পিক ভিলেজে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিলেন। নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ সম্পর্কে তাদের জানাতে দেরি করছিলেন না। ক্লে সবাইকে এতটা আনন্দ দিয়েছিলেন যে, তিনি অলিম্পিক ভিলেজের মেয়র হিসেবে পরিচিতি পান। রোমের রিংয়ে তার অভিজ্ঞতাও কম সুখকর ছিল না। ফাইনালে পোল্যান্ডের ইসবিগনিয়াজ পিয়েট্রাইভস্কিকে হারিয়ে স্বর্ণপদক জেতেন। ম্যাচের শেষে পোলিশ মুষ্টিযোদ্ধার রক্তে ক্লের সাদা শর্টস ভিজে গিয়েছিল। পুরস্কার বিতরণের পর এক সোভিয়েত সাংবাদিক ক্লেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যে দেশ লুইভিলের উলওয়ার্থে আপনাকে খাওয়ার অধিকার দেয়নি, সে দেশের জন্য সম্মান অর্জন করে আপনার কেমন লাগছে। জবাবে ক্লে বলেছিলেন, ‘আপনার পাঠকদের বলবেন, এ সমস্যা নিয়ে কাজ করার জন্য আমাদের যোগ্য লোক আছেন এবং ফলাফল নিয়ে আমি চিন্তিত নই। আপনার দেশসহ অন্য সব দেশের বিবেচনায় এখনো যুক্তরাষ্ট্র আমার কাছে সেরা দেশ। মাঝে মাঝে খাওয়ার মতো কিছু না পাওয়াটা হয়তো কষ্টকর, কিন্তু যাই হোক আমাকে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে না বা মাটির ঘরেও থাকতে হচ্ছে না।’ ক্লের সুনাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে এ মন্তব্য ডজনখানেক আমেরিকান সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল।
ইতিহাস পরবর্তী বছরগুলোয় তার অ্যাথলেটিক ক্যারিয়ার ও আমেরিকান জীবনের বিবরণী লিপিবদ্ধ করবে এবং দেখা যাবে, সেই জীবন ছিল একঘেয়েমি থেকে একেবারে উল্টো। নাগরিক অধিকার, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষমতার মাঝে তিনি উত্তেজনা এবং উসকানির কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আলীর গল্পকে কোনো বইই ধারণ করতে পারেনি। অনেকগুলো জয়, সংকট, বিপর্যয়, প্রত্যাবর্তন, অপমান, বিচার, বিয়োগান্তক দৃশ্য!
একজন অ্যাথলিট হিসেবে ক্লে তার চারপাশের বর্ণবাদ ও রাজনৈতিক বিষয়াদি থেকে দূরে থাকবেন, এমনটাই অনুমিত। কিন্তু ক্লে শুধু প্রতিক্রিয়াই দেখাননি, বরং এমনভাবে দেখিয়েছেন, যাতে হোয়াইট সিটিজেনস কাউন্সিলের নেতা থেকে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালারড পিপল সবাইকে ক্ষুব্ধ করেছে। ক্লে তার ধর্ম ও নাম পরিবর্তন করেছেন। তিনি নিজেকে সব রকমের কাঠামো ও প্রত্যাশা থেকে মুক্ত ঘোষণা করেছেন। তিনি অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছেন, বোকার মতো অনেক ভুলও করেছেন। প্রশংসা আর ভালোবাসা পাওয়ার আগে তিনি একসময় ছিলেন ঘৃণার পাত্র। তিনি ছিলেন তার মতো। ক্যাসিয়াস ক্লে হয়েছিলেন মোহাম্মদ আলী। তিনি নিজেই নিজেকে তৈরি করেছেন।
রোমে যাওয়ার আগেই ক্যাসিয়াস নেশন অব ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন, যা কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম নামেও পরিচিত ছিল। তার একজন জীবনীকার টমাস হাউসারের দেয়া তথ্য অনুসারে, ক্যাসিয়াস নেশন অব ইসলাম সম্পর্কে প্রথম জেনেছিলেন ১৯৫৯ সালে। সেবার শিকাগোয় গোল্ডেন গ্লোব টুর্নামেন্টে অংশ নিতে গিয়ে তিনি এ সংগঠন সম্পর্কে অবগত হন। শিকাগো ছিল সংগঠনের মূল কেন্দ্র এবং এর নেতা এলিজা মুহাম্মদের আবাস। ক্লের চাচি জানিয়েছেন, তিনি লুইভিলের বাসায় ফিরেছিলেন মুহাম্মদের ধর্মোপদেশের রেকর্ড নিয়ে। পরবর্তী বসন্তে অলিম্পিকের জন্য দেশ ছাড়ার আগে ক্লে নেশনের আনুষ্ঠানিক পত্রিকা মুহাম্মদ স্পিকসের একটি সংখ্যা পড়েছিলেন। মুসলমানদের গৌরব ও পৃথক সত্তা নিয়ে তিনি যা শুনেছিলেন ও পড়েছিলেন, সেগুলো মাথায় নিয়েই রোমে গিয়েছিলেন। ক্লের হাই স্কুলের সহপাঠী ল্যামন্ট জনসন আমাকে বলেছিলেন, ‘সে সময় মুসলমানরা লুইভিলে কার্যত অজ্ঞাত ছিলেন।’ তিনি কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিমদের নিয়ে টার্ম পেপার লিখতে চান— এ কথা বলে ক্লে তার হাই স্কুলের শিক্ষককে হতভম্ব করে দিয়েছিলেন। কিন্তু শিক্ষক তাকে অনুমতি দেননি। সে সময় তার আগ্রহ এক স্কুল বালকের মতোই ছিল; কিন্তু কিছু বিষয় তার মনে অনুরণিত হচ্ছিল— মুসলমানদের শৃঙ্খলা, ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে তাদের ভাবনা, সাহসিকতা ও আত্মসম্মান। মুসলমানরা যেভাবে সিগারেট, মদ্যপান ও হইহুল্লোড় থেকে দূরে থাকে এবং তাদের জাতিগত গৌরবও ক্লের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।
রোম থেকে ফিরে ক্লে বিভিন্ন শহরে কংগ্রেস অব রেসিয়াল ইকুয়ালিটি এবং নেশন অব ইসলামের সভায় যোগ দেন। ক্লে মুসলমানদের দ্বারা এমনভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন, যা অন্য কোনো দল বা গির্জা দ্বারা হননি। পরের বছর সাংবাদিক জ্যাক ওলসেনকে তিনি বলেছিলেন, ‘গির্জায় আমি যা পাই তা হচ্ছে পৃথক্করণ। কিন্তু এখন আমি নিজের মতো করে গ্রহণ করতে শিখেছি এবং নিজেকে উপলব্ধি করতে পারছি।’ ১৯৬০ ও ১৯৬১ সালের মধ্যে নেশন অব ইসলাম নিয়ে ক্লে তার আগ্রহকে খুব একটা প্রকাশ করেননি। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে মুষ্টিযোদ্ধা ও পারফরমার হিসেবে তিনি বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন।
মোহাম্মদ আলীর জীবনের সবকিছুই বিরাটকায়— ১৯৬৪ সালে বিপর্যয় ঘটিয়ে সনি লিস্টনের কাছ থেকে খেতাব জয় (রিংয়ের পাশে থাকা সাংবাদিকদের উদ্দেশে চিত্কার করে বলেছিলেন, ‘আমি দুনিয়ার রাজা’), ম্যালকম এক্সের সঙ্গে বন্ধুত্ব (এবং কলহ), নেশন অব ইসলামে যোগ দেয়া, ষাটের দশকের মধ্যভাগে দুর্দান্ত লড়াইয়ের ঝলক, সেনাবাহিনীতে যোগদানে অস্বীকৃতি, কারাবরণের ঝুঁকি নেয়া, খেতাব বিসর্জন, নির্বাসন। আলীকে রাজনৈতিক নেতা কিংবা চিন্তক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়, কিন্তু তার রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল প্রত্যাখ্যান আর কৃষ্ণাঙ্গ গৌরবের প্রতীক হিসেবে। বিশেষত সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য যেসব তরুণ বাছাইয়ের মুখে পড়ছিলেন, তাদের কাছে আলী দারুণ এক গ্ল্যামারাস চরিত্র হয়ে ওঠেন, যার সমকক্ষ অবস্থান তখনকার কোনো রকস্টারেরও ছিল না। ১৯৭১ সালের মার্চে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আলী যখন জো ফ্রেজিয়ারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেন, তখন রিংয়ের পাশে লাইফের আলোকচিত্রী ফ্র্যাংক সিনাত্রা উপস্থিত ছিলেন। আলী জায়ারে গিয়ে জর্জ ফোরম্যানকে পরাজিত করলেন। আলীর অ্যাথলেটিক কীর্তিগুলো ছিল বেপরোয়া। কারণ সেগুলো তিনি বিরাট শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি নিয়ে করতেন। ম্যানিলায় জো ফ্রেজিয়ারের সঙ্গে তার তৃতীয় লড়াইটা দেখুন। দুজনই দুজনকে প্রায় ধ্বংস করে দিচ্ছিলেন। ম্যাচের পর আলী বলেছিলেন, ‘এটাই মৃত্যুকে সবচেয়ে কাছে থেকে দেখা।’ আলী ফ্রেজিয়ারকে অপমান করে গরিলা ও আঙ্কেল টম বলে সম্বোধন করেন। ক্রুদ্ধ ফ্রেজিয়ারের কথায়, ‘আমি তাকে যে পাঞ্চ মেরেছি, তাতে বিল্ডিংও ধসে পড়ত।’ আলীর বিবেচনায় সেই তৃতীয়বার মুখোমুখি হওয়ার পর তিনি ও জো আর আগের মতো ছিলেন না। তার কথায়, ‘আমরা ম্যানিলা গিয়েছিলাম চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবং ফিরে আসি বৃদ্ধ মানুষ হয়ে।’
মুষ্টিযুদ্ধ তার পেশা হলেও তিনি এ খেলার ভণ্ডামি ও বর্বরতার ব্যাপারে অন্ধ ছিলেন না। তিনি যে খেলা দিয়ে বিখ্যাত হয়েছেন, তার ইতিহাসে বর্ণবাদ অনেক সময় এক বাজে চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। এটা এমন এক খেলা, যেখানে একজন তার প্রতিপক্ষকে অজ্ঞান করে ফেলার আগ পর্যন্ত মারতে থাকে, অন্যের মাথায় আঘাত (নকআউট) করার চেষ্টা করে। আলী এ লড়াই করেই লক্ষ লক্ষ ডলার উপার্জন করেছেন এবং তাই অনেক সময় এসবের প্রতি পরস্পরবিরোধী মনোভাব পোষণ করেছেন। যখন একজন অন্যজনের সঙ্গে কিংবা এক কৃষ্ণাঙ্গ আরেক কৃষ্ণাঙ্গের সঙ্গে লড়াই করেছে, আলী তখন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন। খেলার ফলাফল ও পুরস্কার আলী উপভোগ করেছেন। কিন্তু তিনি খেলার ইতিহাসটাও জানতেন, জন এল. সুলিভান কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিযোগীর সঙ্গে লড়াইয়ে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং জিম জেফরি বলেছিলেন, দুনিয়ায় যদি আর কোনো শ্বেতাঙ্গ মুষ্টিযোদ্ধা না থাকে, তাহলে তিনি অবসরে যাবেন। আলী শিক্ষা পেয়েছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ জ্যাক জনসনের গৌরব আর শাস্তির ইতিহাসে, জনসনের মুখোমুখি হওয়ার সময় জেফরির মনোভাব ছিল, ‘সব নিগ্রোই আমার কাছে সমান’। আলী দেখেছেন কীভাবে খেতাব অর্জনের পর জ্যাক ডেম্পসে কৃষ্ণাঙ্গ মুষ্টিযোদ্ধাদের এড়িয়ে চলেছেন। আলী আরো দেখেছেন তার বিপক্ষে রিংয়ে নামা যোদ্ধাদের কীভাবে মাফিয়ারা পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, শোষণ করেছে। জো লুইয়ের প্রশিক্ষক তাকে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান সমাজ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া থেকে বাঁচতে বেশকিছু পরামর্শ, নিয়ম-কানুন শিখিয়েছিলেন। আলী ছোটবেলা থেকেই এসব নিয়ম স্মরণে রেখেছিলেন।
সনি লিস্টনের মুখোমুখি হওয়ার আগে ক্লে সেই লড়াইয়ের সম্মানে একটি কবিতা লিখেছিলেন। মাঝে মাঝে ক্লে দু-এক লাইন কবিতা লিখেছেন। তার প্রশিক্ষক ডান্ডির কথায়, ‘আমরা মাঝে মাঝেই কয়েক লাইন লিখতাম, কিন্তু এটা পুরোটাই ক্লের লেখা। অষ্টম রাউন্ডের পরিণতি নিয়ে এ কবিতায় একটি সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। কবিতার নাম ছিল ‘সং অব মাইসেলফ’।
অবসর নেয়ার পর আলীর জীবনের সবচেয়ে বড় বিজয়টি এসেছিল আটলান্টায়। তিনি ১৯৯৬ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক মশাল জ্বালিয়েছিলেন। ৩০০ কোটি মানুষ দেখছিলেন সেদিন মশাল জ্বালাতে গিয়ে আলী কাঁপছিলেন। পারকিনসন এবং সেই সময় উভয়ই সেদিন তাকে কাঁপিয়েছিল। আলীর স্ত্রী লোনির স্মৃতিচারণে, ‘সেদিন রাতে মোহাম্মদ বিছানায় যাচ্ছিলেন না। মশালটা হাতে নিয়ে তিনি হোটেলে একটা চেয়ারে বসে ছিলেন। মনে হচ্ছিল তিনি জীবনে চতুর্থবারের মতো হেভিওয়েট খেতাব জিতেছেন।’
গতকাল রাতে (৩ জুন) ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলের গ্রিক থিয়েটারে পল সাইমন গাইছিলেন ‘দ্য বক্সার’। অনেক দর্শকের মাঝে আমিও ছিলাম। শেষ অংশটি শুরু করার আগে একটু বিরতি নিয়ে সাইমন দর্শকদের বললেন, ‘আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, মোহাম্মদ আলী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।’
অনুবাদ: শানজিদ অর্ণব





