বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কিংবা কুজো হয়ে যায় মানুষ। সময়ের পরিক্রমায় তেমনি ম্রিয়মাণ এককালের দেশব্যাপী পরিচিত বাণিজ্যকেন্দ্র চৌমুহনী। এ শহরের অলংকার ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। কিন্তু উগ্র মনোভাব আর নানা অপ্রীতিকর ঘটনা সে অবস্থান চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে।

ব্রিটিশ শাসনামলে এ বাণিজ্যকেন্দ্রটি গড়ে উঠলেও এর সঠিক বয়সসীমা কারোরই মনে পড়ে না। নোয়াখালী খাল, ছাতার পাইয়া খাল, ফেনী খাল ও পৌরন বিবি খাল তথা চার খালের মোহনায় এ বাণিজ্য কেন্দ্রটি গড়ে ওঠায় এর নাম রাখা হয়েছিল চৌমুহনী। ফলে নৌযানই ছিল এখানকার যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম।

তৎকালীন সময় এখানকার বেশির ভাগই ব্যবসায়ী ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। মারোয়াড়িদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও এখানে বিস্তৃত ছিল। হাতে গোনা ক’জন ছিলেন মুসলিম ব্যবসায়ী। পাকিস্তান ও ভারত ভাগাভাগি হওয়ার পর প্রভাবশালী হিন্দু ব্যবসায়ীরা নানা কারণে ক্রমান্বয়ে ভারতে চলে যেতে থাকে। যে ধারা চলে স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৯৩ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পর্যন্ত।

চৌমুহনীর সঙ্গে বৃহত্তর কুমিল্লার দক্ষিণাঞ্চল, বৃহত্তর নোয়াখালীর পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নৌযান ছিল বড় মাধ্যম। ভৈরব, আশুগঞ্জ, চাঁদপুরসহ বড় বড় নদী বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগাযোগ ছিল প্রগাঢ়। তৎকালীন সময় থেকে প্রায় নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত চৌমুহনী থেকে গ্রামগঞ্জের ব্যবসায়ীরা তাদের মালপত্র নিতেন নৌপথে। এছাড়া রেল যোগাযোগের ব্যাপক সুবিধা পায় চৌমুহনী। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ওয়াগনের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন হতো এখানে।

অতীত বাণিজ্য ঐতিহ্য: কলকাতা থেকে নদীপথে বড় বড় সওদাগরি নৌকায় এখানে আসত বিভিন্ন পণ্য। আর নৌকাবোঝাই পাট যেত কলকাতায়। ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের গদিতে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সন্ধ্যার পর পাইকারদের লম্বা লাইন পড়ে থাকত। পাট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চৌমুহনীতে গড়ে উঠেছিল ডেল্টা জুট মিল। আমিন জুট মিল এবং বর্তমানে বিলুপ্ত এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুট মিলের পাট ক্রয় কেন্দ্রও ছিল চৌমুহনীতে। ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে উঠেছিল পাটের বেল মেশিন। আড়তদাররা তাদের পাট বেল করে তা মিলে সরবরাহ করতেন।

সরিষার তেলের জন্যও চৌমুহনী প্রসিদ্ধ ছিল। অনেকে মনে করেন, ১৯৪৭ সালের দিকেই চৌমুহনীতে সরিষার তেলের মিলের গোড়াপত্তন হয়। সেই থেকে স্বাধীনতাপূর্বকালেই এখানে ৩৪টি তেলের মিল ছিল। গোটা পাকিস্তানে কোথাও এত তেলের মিল ছিল না। এখানকার উৎপাদিত সরিষার তেল ভোলা, বরিশাল, চাঁদপুর, ভৈরব, নরসিংদী, সিলেট, শ্রীমঙ্গলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হতো। তাছাড়া দেশের চাহিদা মিটিয়ে নেপাল ও ভারতেও রফতানি হতো। ‘ঘানি যার, সরিষা আমদানির পারমিট তার’ এমন নিয়মের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালেও এখানকার তেলের মিল মালিকরা করাচি, ভারত, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে অংশীদার ভিত্তিতে সরিষা আমদানি করতেন। স্থাপিত হয় আরো দুটি নতুন তেলের মিল।

আশির দশকের শুরু থেকে সরিষার তেলের বিকল্প হিসেবে সয়াবিন ও পাম অয়েলের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে এবং সরিষার আমদানি শুল্ক বেড়ে যাওয়ার ফলে পর্যায়ক্রমে এখানকার মিল মালিকরা ক্রমেই নিরুৎসাহিত হতে থাকে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সরিষা আমদানি চলে যায় বৃহৎ শিল্প পরিবারগুলোর নিয়ন্ত্রণে এবং তারা নিজেরাই খুলে বসে সরিষার তেলের মিল। বর্তমানে নামকাওয়াস্তে চলে পাঁচ-ছয়টি তেলের কল।

পাট-সরিষার মতোই এখানকার প্রকাশনা শিল্প ছিল দেশ বিখ্যাত। অমর একুশে বইমেলার গোড়াপত্তনকারী  চিত্তরঞ্জন সাহার হাত ধরে পুঁথিঘর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বই প্রকাশনী, পপুলার লাইব্রেরি, রেখা প্রকাশনী, কলকণ্ঠ প্রকাশনী, মিনার প্রকাশনী, আজিজিয়া লাইব্রেরিসহ অনেক প্রকাশনা সংস্থা পুঁথিঘরের মাধ্যমে শুরু হওয়া যাত্রাকে সমৃদ্ধ করেছে। এখনো ছাপাখানার জন্য এ অঞ্চলে বিখ্যাত চৌমুহনী।

চৌমুহনীর প্রকাশক ও বই ব্যবসায়ীরা ঢাকার বাংলাবাজারমুখী হয় সময়ের প্রয়োজনে। পুঁজির স্বল্পতা, প্রযুক্তি ও মেধার প্রতিযোগিতায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়েন এখানকার প্রকাশকরা। ফলে বই ব্যবসার জৌলুস হারিয়ে যায় একসময়।

দেশ বিখ্যাত পারটেক্স গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপের মতোই নোয়াখালী অঞ্চলের শিল্পপতিদের অনেকেরই স্বাধীনতা-পূর্ববর্তীকালে ব্যবসায়িক গোড়াপত্তন হয়েছিল এ  চৌমুহনী থেকে।

যদিও এখানকার ধবধবে ধুতি, পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা ভুঁড়িওয়ালা বাবু, মিয়াদের এখন আর দেখা যায় না। দোকানে আর ফড়িয়াদের লম্বা লাইন পড়ে থাকে না। চৌমুহনীতে একসময়কার বড় বড় ‘গদি’ এখন আর চোখে পড়ে না। জায়গার অভাব বনেদি-ভাবে বাগড়া বসিয়েছে। গদির পরিবর্তে উড ফার্নিচার, লালসালু দিয়ে বাঁধাই করার খতিয়ান খাতার পরিবর্তে সফটওয়্যার, নৌকার বদলে ছোট ছোট পিকআপ এখানকার ব্যবসার চেহারা পাল্টে দিয়েছে। ট্রাক আর কাভার্ড ভ্যান তো রয়েছেই।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে পর্যায়ক্রমে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাজার সম্প্রসারণ এবং সেখানকার ব্যবসায়ীরা ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি ব্যবসা, এখানকার শ্রমিকদের সঙ্গে স্থানীয় এবং বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ব্যবসায়ী ও পণ্য পরিবহনকারীদের মতবিরোধকে দায়ী করা হয় চৌমুহনীর বাণিজ্যিক গুরুত্ব খর্ব হওয়ার জন্য। দখলদারদের কবলে পড়ে খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া এবং নৌকাঘাট দখল হয়ে যাওয়ায় নৌ-যোগাযোগ পুরোটাই বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় দুই যুগ।

সব অবশ্য হারিয়ে যায়নি। ব্যবসার ধরন বদলে নিজেদের মেধা-মননের সঙ্গে পুঁজি বিনিয়োগের মাধ্যমে এখানকার ব্যবসায়ীদের অনেকেই দাপটের সঙ্গে সারা দেশের সঙ্গে ব্যবসা করছেন। চাল ও ময়দার উন্নত প্রযুক্তির মিল স্থাপন, মুড়ির কারখানা, ছোট ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি শাকসবজি ও ফলমূলের আড়তের পরিধি বেড়েছে। উত্তরাঞ্চলের ফলের বাগান ও কৃষিতে বিনিয়োগ আছে এখানকার ব্যবসায়ীদের।

চৌমুহনী থেকেই ভোগ্যপণ্য, ইলেকট্রনিকস পণ্যসহ নানা পণ্য আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলেন এখানকার অনেকেই। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ইউরোপ, আমেরিকায় ভ্রমণ তো স্বাভাবিক ঘটনা অনেকের কাছে।

চৌমুহনীর টিনের চালার ঘরগুলো পর্যায়ক্রমে বহুতল ভবন হচ্ছে। এখানে লিফট, চলন্ত সিঁড়ি বসেছে বিপণিবিতানগুলোয়। মানসম্মত আবাসিক হোটেলের পাশাপাশি আধুনিক তথ্য যোগাযোগ সুবিধাও আছে।

এখানকার ব্যবসার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যাংক খাতের কলেবরও। এখানে দেশের প্রায় সব ব্যাংকের শাখা রয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ব্যাংকের তিনটি শাখাও রয়েছে। প্রতিদিন এখানে কোনো কোনো ব্যাংকের শাখায় ১৫০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হয়। এমন তথ্য ব্যাংকারদের।

বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম লাভজনক রেলওয়ে স্টেশন ছিল চৌমুহনী। প্রতিদিন পণ্যবাহী ওয়াগনের দীর্ঘ লাইন পড়ে থাকা এখন শুধুই স্মৃতি। রেলওয়ের সম্পত্তি দখল হয়ে গেছে। রেললাইনের ওপর দোকান, নার্সারি গড়ে উঠেছে। রেলওয়ের পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গুদামগুলোও বন্দোবস্ত দিয়ে দিয়েছে রেলওয়ে। চৌমুহনী স্টেশন ইয়ার্ডে নেই আগের কোলাহল।

এককালের ছিমছাম বাণিজ্যিক শহর চৌমুহনী এখন ধুলাবালি আর পূতিময় গন্ধের শহর। মানুষ, যানবাহন আর পরিবেশের কারণে চৌমুহনীতে বিরাজ করে অস্বস্তির পরিবেশ, যার ফলে ব্যবসায়ীদের অনেকেই জেলা সদরে বাসাবাড়ি স্থানান্তর করেছেন।

 

রুদ্র মাসুদ : প্রবাসী সাংবাদিক