টমাস হারবার্ট লিউইন, যে টিএইচ লিউইনকে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের কিংবদন্তি জেলা প্রশাসক হিসেবে জানি, যিনি ১৮৬৬-৭৩ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও তৎসংলগ্ন মিজোরামে লুসাই পাহাড় এলাকায় কাজ করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। এরও আগে তিনি নোয়াখালী জেলায় পুলিশ সুপার হিসেবে কাজ করেছেন, তা আমরা অনেকেই জানি না। লিউইনের পিতা ১৮২৩ সালে প্রথম ব্রহ্মযুদ্ধে অংশ নেন আর লিউইনও অত্যন্ত কম বয়সে প্রথমে সেনাবাহিনীতে ও পরে একাধিক জেলায় পুলিশ সুপার পদে কাজ করেছেন।

১৮৬৪ সালে ২৩ বছর বয়সে তিনি বিহারের হাজারীবাগ থেকে কলকাতা-চট্টগ্রাম হয়ে নোয়াখালী আসেন। কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম একটি বার্মাগামী উপকূলীয় জাহাজে ও চট্টগ্রাম থেকে দুদিনে নৌকা করে মেঘনা মোহনায় এসে জোয়ারের অপেক্ষায় সিধি (সুধারাম?) দ্বীপের একটি খাঁড়িতে নামেন। দুই কুকুর এসকি ও গ্র্যাবিসহ নেমেই চরের সবুজ ঘাস আর বিলাতি ধরনের একপ্রকার ঝোপালো গাছ দেখে তার মন ভালো হয়ে যায়। তবে সমপরিমাণ মন খারাপ হয় নোয়াখালীতে এসে। লিউইন লেখেন,

‘I had seen many dull stations, but for steady and persistent dullness Noacolly surpassed them all. The English society consisted of the Civil Surgeon and his wife and the magistrate, who was unmarried. The only available residence for me was a small thatched bungalow,...which was reported by the natives to be haunted.’

তিনি আরো লেখেন ‘মেঘনার বান’-এর কথা, ‘and a great tidal bore which made a daily and ever-varying excitement. Twice in the twenty-four hours the whole volume of the downpouring river was met and opposed by the incoming tide of the Indian Ocean, which rolled it back on itself in a mighty wave, whose roaring foamy crest, some miles in length, varied from three to twelve feet in height.’ এ বানের বিবরণ বুদ্ধদেব বসুর শৈশবস্মৃতিতেও আছে।

পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালনে তাকে নৌকায় ভ্রমণ করতে হতো। তিনি নিপুণ কথাশিল্পীর ন্যায় লিখেছেন, ‘the day slipped by as insensibly as the even course of our boat on the river or as the gliding ever-changing procession of the green banks we passed; now it was a village, with the women coming down to fetch water, under the spreading shades of the mango trees; then a grove of slender-shafted areca palms, or a glimpse of the golden-green plumes of the cocoa-nut, which here, within sniff of the ocean throve wonderfully.’ এখনকার নোয়াখালীর সঙ্গে মিলবে না, এমন কথাও তিনি বলেছেন, ‘the whole district being covered by a great net-work of small streams, all communicating with the great estuary of Meghna, a great deal of illicit salt manufacture was carried on, which it was part of my duty to check.’ নোয়াখালী সম্ভবত (বৃহত্তর নোয়াখালী নয়) একমাত্র জেলা, যার অভ্যন্তরে কোনো নদী নেই। আর লবণচাষীদের জন্য যে জেলার জন্ম, সে জেলায় বহুদিন কোনো লবণ হয় না।

তিনি সেখানে থাকাকালে ১৮৬৪ সালের মার্চে এক ফরাসি ভদ্রলোকের পৈতৃক জমিদারিতে শিকারের জন্য আমন্ত্রিত হয়ে যান। কয়েক হাজার একর জমি ও পাঁচ-ছয়টি গ্রাম নিয়ে এ জমিদারি। অবিবাহিত এ জমিদারের ছিল বার্ষিক ৬০০ পাউন্ড আয়, ছয়টি হাতি ও সেরা সব বন্দুক। নদীর মাঝের চরের জঙ্গলে তিনি হাতির পিঠ থেকে এক বাঘ শিকার করেন। হ্যাঁ, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার এবং সেটা নোয়াখালীতে। সেখান থেকেই তিনি নিঃসঙ্গ এক বৃদ্ধের বাড়ি ডাকাতির সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে যান। ডাকাতরা মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে এ বৃদ্ধকে ফতুর করে দিয়েছে। ওইদিন রাতেই বৃদ্ধ বাড়ির পেছনে গাছে ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। লিউইন সেখান থেকে ফিরে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন এবং সে অবস্থায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট থেকে পত্র পান, এক বেনামি দরখাস্তে অভিযোগ করা হয়েছে যে তার হুকুমে পুলিশ টাকাপয়সার লোভে বৃদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে দিয়েছে।

এপ্রিলে নোয়াখালীতে কলেরার প্রাদুর্ভাবের কথা লিখেছেন তিনি। এটি এমন প্রাণঘাতী ছিল, এক রাতে এক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মোক্তারের পরিবারের পাঁচ সদস্য কলেরায় মারা যায়, বেঁচে ছিলেন কেবল মোক্তারবাবু। মে মাসে বৃষ্টি শুরু হলে এ বালাই দূর হয়।

মে মাসেই লবণের চোরাই মজুদ জব্দ করতে গিয়ে সন্দ্বীপে পুলিশ-গ্রামবাসী সংঘর্ষে পদদলিত হয়ে এক শিশু মারা যায়। ‘the relatives placed the child’s body on a bier, and bore it along, followed by a long procession of mourners, to the magistrate’s court-house at Noacolly, weeping, wailing, tearing their garments, and calling for vengeance on the bloodthirsty policemen who had murdered the innocent child.’ তবে তিনি তদন্ত করে এর কোনো সত্যতা না পেয়ে ফিরে এসে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেন। নোয়াখালী থাকাকালে তার কুকুর এসকি, বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে পাগল হয়ে মারা যায়। এটা তখন ঘটেছিল, যখন গভর্নমেন্ট অব বেঙ্গল এক হুকুম জারি করে বেওয়ারিশ কুকুর নিধন করতে বলে। এ বিষয় নিয়ে পত্রপত্রিকায় নিষ্ঠুর ইংরেজ শাসকদের সমালোচনা শুরু হয়। তিনি সেখানে সাপের উপদ্রবের কথা উল্লেখ করেছেন ও স্নানাগারে তার কাঁধের ওপর সাপ পড়ার এক ঘটনার বর্ণনাও দিয়েছেন।

জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে প্রথম দিন থেকেই তার বিরূপ সম্পর্কের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। যে কারণে এর উদ্ভব ঘটেছে, তার বিস্তারিত বিবরণও দিয়েছেন। তার আগের স্টেশন হাজারীবাগেও এ ধরনের সম্পর্কের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। কাজের অবসরে তিনি একটি ‘পুলিশ অফিসার্স ম্যানুয়াল’ সংকলন করেন, যা পরে সরকারিভাবে প্রকাশ হয়। উল্লেখ্য, ১৮৬১ সালে পুলিশ আইন হলেও পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল বা ফৌজদারি কার্যবিধি কোনোটাই প্রণীত হয়নি। ফলে দায়িত্ব পালনের অস্পষ্টতা ছিল। তার এ কাজের জন্য তিনি সরকারের কাছ থেকে প্রশংসাসূচক পত্র পান এবং একই সঙ্গে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট পদে বদলি হন।

 

সূত্র

১. A fly on the wheel or how I helped to govern India, Thomas Herbert Lewin , Allen 1885

২. Thangliena : A life of T H Lewin, John Whitehead, Kiscadale 1992

 

জালাল আহমেদ: সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব