হিমালয়ের বিস্তৃতি দেড় হাজার মাইল। বরফে ঢাকা এ পর্বতে আছে দুনিয়ার সবচেয়ে উঁচু চূড়া এভারেস্ট। পর্যটক, প্রকৃতিবিদ, অভিযাত্রী, ভূগোলবিদ, তীর্থযাত্রী, লেখক— কাকে আকর্ষণ করেনি এ হিমালয়! কত মানুষের মরদেহ এখনো হিমালয়ের বরফের তলায় চাপা পড়ে আছে কে জানে! তার পরও অনেকে হিমালয়কে চ্যালেঞ্জ করেন, তাকে জয় করতে চান। কারো কাছে হিমালয় তীর্থ, তারা যান ঈশ্বরের সন্ধানে। হাজার বছর ধরে হিমালয় তার বরফে ঢাকা দুর্গম ভূমিতেই তৈরি করেছে এক সভ্যতা। হিমালয়কে ঘিরে আছে স্বর্গীয় শান্তি আবার আছে আধুনিককালের রাজনৈতিক টানাপড়েন।
আমাদের চেনা দুনিয়ার বহু বিখ্যাত মানুষ এ হিমালয় সফর করেছেন এবং তাদের সেই সফরের বর্ণনাও লিপিবদ্ধ করেছেন— চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন থেকে প্রথম এভারেস্টজয়ী তেনজিংয়ের পুত্র জামলিং। এ তালিকায় আছেন ফা-হিয়েন, সম্রাট জাহাঙ্গীর, চট্টগ্রামের সন্তান তিব্বতীয় সংস্কৃতি ও ভাষা বিশেষজ্ঞ শরৎ চন্দ্র দাস, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মার্ক টোয়েন, জিম করবেট, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, স্বামী বিবেকানন্দ, রাসকিন বন্ড, অমিতাভ ঘোষ, জাপানি পণ্ডিত একাই কাওয়াগুচি, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, ব্রিটিশ উদ্ভিদবিদ ফ্রাংক এস স্মিথে, ভুটানের সাবেক রানী কুইন মাদার দর্জি ওয়াংমো ওয়াংচুক, ব্রিটিশ পর্বতারোহী জর্জ ম্যালোরি, জামলিং তেনজিং নোরগে প্রমুখ। তাঁদের কয়েকজনের হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে এ সংক্ষিপ্ত সংকলন—
ফা-হিয়েনের ভ্রমণ
এইচএ জাইলস
(চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন ৩৯৯ থেকে ৪১২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারত, শ্রীলংকা সফর করেন। তার ভ্রমণবৃত্তান্তে নিচের অংশটি ছিল হিন্দুকুশ ও পশ্চিম হিমালয়ে বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থানগুলো সফরের বিবরণ।)
এবার তারা পশ্চিম দিকে উত্তর ভারতে যাত্রা করলেন। এক মাস সফরের পর তীর্থযাত্রীরা বোলোর-টাগ শ্রেণী পার হতে পারলেন। এখানকার পর্বত শীত-গ্রীষ্ম সবসময়ই বরফে ঢাকা থাকে। এখানে ছিল বিষধর ড্রাগন। এ ড্রাগনকে রাগালে সে বিষাক্ত বাতাস, বৃষ্টি, বরফ, বালি ও পাথর নির্গমন করে। এ ড্রাগনের সামনে পড়লে ১০ হাজার জনে একজন বেঁচে ফিরতে পারে। এ অঞ্চলের মানুষকে বরফ পর্বতের বাসিন্দা বলে ডাকা হয়।
বোলোর-টাগ শ্রেণী পার হয়ে পরিব্রাজকরা উত্তর ভারতে প্রবেশ করলেন। দলটি দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ১৫ দিন দুর্গম, বিপজ্জনক এক পথে যাত্রা করল। পর্বতের পাশটা পাথরের দেয়ালের মতো, যা ১০ হাজার ফুট উঁচু। কিনারের কাছে গেলে চোখ দ্বিধায় পড়ে যায়। মনে হয় এগিয়ে যাই, কিন্তু সেখানে তো পা রাখার জায়গা নেই। নিচে একটা নদী বয়ে চলেছে, যার নাম সিন্ধু। অনেক শ্রমণ ফা-হিয়েনকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি জানেন যে, বৌদ্ধ ধর্ম কখন পূর্ব দিকে যাত্রা করেছিল। ফা-হিয়েন জবাব দিলেন, ‘যখন আমি ওই এলাকার মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তখন তারা সবাই আমাকে বলেছিলেন যে, প্রাচীন এক বিবরণী অনুসারে মৈত্রেয় বোধিসত্ত্বের চিত্র স্থাপনের পর ভারত থেকে শ্রমণরা সূত্র ও আইন নিয়ে আসেন।’ এ চিত্র বুদ্ধের নির্বাণ প্রাপ্তির ৩০০ বছর পর স্থাপিত হয়েছিল। বলা হয়, এ চিত্র স্থাপনের পর থেকেই এ ধর্ম বিকশিত হতে শুরু করে।
সম্রাটের ভ্রমণ
জাহাঙ্গীর
আমার সৌভাগ্যময় শাসনের দ্বিতীয় বছর শুরু হয়েছিল ১০১৫ হিজরির জিলকদ মাসের ২ তারিখে (১০ মার্চ, ১৬০৬ খ্রি.)। ১০১৫ হিজরির জিলকদ মাসের ৭ তারিখে আমি লাহোরে দুর্গ ত্যাগ করে রাভি নদী পার হয়ে দিলামেজের বাগানে পৌঁছলাম। এখানে আমি চারদিন অবস্থান করি...
শুক্রবার আমরা গুজরাতের পাঁচ লিগ দূরে খাবাসপুরে পৌঁছলাম। তারপর গেলাম বেহাত নদীর তীরে। সেখানে আমরা তাঁবু খাটালাম। রাতে ভীষণ বাতাস বইল। এমন বৃষ্টি হলো যে, সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটাও বললেন যে, তিনি জীবনে এমন বৃষ্টিপাত দেখেননি। ঝড় থামল শিলাবৃষ্টির মাধ্যমে, শিলাগুলো মুরগির ডিমের আকারের। নদীর স্রোত ও বাতাসে সেতু ভেঙে গেল। হেরেমের নারীদের নিয়ে আমি নৌকায় পার হলাম। কিন্তু নৌকার সংখ্যা কম থাকায় আমি অন্যদের সেতু মেরামতের পরে নদী পার হতে বললাম। সেতু মেরামতে এক সপ্তাহ সময় লাগল। এরপর পুরো দল কোনো বিপদ ছাড়াই নদী পার হলো।
বেহাত নদীর উৎস কাশ্মীরের একটি ঝরনা, যার নাম বীরনাগ। হিন্দি ভাষায় এর অর্থ সাপ। নাম থেকে বোঝা যায়, ওই এলাকায় একসময় প্রচুর সাপের আবাস ছিল। পিতার জীবদ্দশায় আমি দুবার সেই ঝরনা দেখেছি। এ ঝরনার পানি এত পরিষ্কার যে, একটি পপিবীজ তাতে ফেললে একেবারে তলায় পৌঁছা পর্যন্ত সেটা দেখা যায়। ঝরনায় খুব সুন্দর মাছ ছিল। বলা হতো, এ ঝরনার গভীরতা অসীম। আমি তাই নির্দেশ দিয়েছিলাম একটা পাথরে দড়ি বেঁধে সেটা ঝরনার পানিতে ফেলতে। দেখা গেল, এর গভীরতা দেড়জন মানুষের সমান।
পামপুর গ্রামের দিকে এগিয়ে নদীটি আরো প্রশস্ত হয়ে গেছে। কাশ্মীর থেকে এ গ্রাম ১০ লিগ দূরত্বে অবস্থিত। কাশ্মীরের সব জাফরান এ গ্রামে তৈরি হয়। সম্ভবত পৃথিবীতে আর কোনো গ্রাম নেই, যেখানে এত জাফরান উৎপাদন হয়। পিতার সঙ্গে আমি একবার ফুল ফোটার মৌসুমে এ এলাকা সফর করেছিলাম। সব গাছেই ফুল ফুটে ছিল।
জাফরানের ক্ষেত অনেক সময় এক লিগ দীর্ঘ হয়। জাফরান তোলার মৌসুমে ক্ষেত থেকে এমন ঘ্রাণ আসে, যা মাথায় ব্যথা শুরু করে। আমি এক গ্লাস শরাব পান করেছিলাম, কিন্তু তার পরও মাথাব্যথা থেকে রেহাই পাইনি।
দ্য ট্রেন টু দার্জিলিং
মার্ক টোয়েন
আমরা একটা আরামদায়ক হোটেল খুঁজে পেলাম। এর মালিক ছিলেন খুব অগোছালো একজন মানুষ, তিনি কোনো কিছুর দিকেই নজর দিতেন না। সবকিছুর জন্য ভারতীয় চাকরদের এক বাহিনীর ওপরই তিনি নির্ভর করতেন। অবশ্য তিনি তার বিলের দিকে ভালোমতো নজর রাখতেন। একজন জানালেন যে, কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া মাঝে মাঝেই মেঘের আড়ালে ঢাকা থাকে। একবার নাকি ২২ দিন কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া মেঘে ঢেকে ছিল। পর্যটকরা বেশ অনেক দিন অপেক্ষা করে শেষমেশ না দেখতে পেয়েই ফিরে গেছে।
এক জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে সে রাতে আমি ক্লাবে ফিরে গেলাম। জায়গাটা বেশ আরামদায়ক। দারুণভাবে ক্লাবটা দাঁড়িয়ে রয়েছে, সামনে দিগন্ত বিস্তৃত দৃশ্য। এখানে থেকে তাকালে দেখা যায়, তিনটি দেশের সীমান্ত এক জায়গায় মিলেছে। জায়গাটা এখান থেকে ৩০ মাইল দূরে অবস্থিত। একটা দেশ হচ্ছে নেপাল, অন্যটা তিব্বত। ভারতের প্রায় প্রতিটি শহর ও নগর যেখানে ব্রিটিশ সিভিল ও মিলিটারি সার্ভিসের ভদ্রলোকরা আছেন, সেখানেই তাদের ক্লাব আছে। অনেক জায়গায় ক্লাবগুলো প্রাসাদের মতো দেখতে। তাই এখানে সবসময়ই নিজের ঘরের মতোই মনে হতো। হোটেলগুলো সবসময় যথেষ্ট ভালো হতো না। তাই এসব ক্লাবে গমনকারীরা সেখানকার সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কৃতজ্ঞ থাকত।
পরের দিন ছিল শুক্রবার। খুব ভোরে বন্ধুরা এল ঘোড়া নিয়ে। বন্ধুদের এ দলটির গন্তব্য ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং হিমালয়কে যেখানে সবচেয়ে ভালো দেখা যায় সেখানে যাওয়া। কিন্তু আমি বাসায় রয়ে গেলাম একান্তে দর্শনের জন্য। কারণ বাইরে ঠাণ্ডা ছিল খুব বেশি আর আমি ঘোড়ায়ও ভালো চড়তে পারি না। মুখে পাইপ নিয়ে গায়ে বেশ কয়েকটা কম্বল চড়িয়ে আমি ২ ঘণ্টা জানালায় দাঁড়িয়ে রইলাম। দেখলাম ধূসর দিগন্তের মধ্য থেকে সূর্য বেরিয়ে আসছে এবং তার গোলাপি আভা একের পর এক বরফে ঢাকা পর্বতচূড়া ছুঁয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে সোনালি আলো সবাইকে ধুয়ে যাচ্ছে। তারপর একসময় বরফে মোড়া পুরো পার্বত্যাঞ্চল আলোয় ভেসে গেল।
কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়া সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৮ হাজার ফুটের চেয়ে বেশি উঁচু। এটাই আমার দেখা সবচেয়ে উঁচু এলাকা। গড়ে এ অঞ্চলটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২ হাজার ফুট উঁচু। এভারেস্টের উচ্চতা কাঞ্চনজঙ্ঘার চেয়ে ১৭ হাজার ফুট বেশি। কিন্তু তা আমার সামনে জড়ো হওয়া পর্বতের সমুদ্রের অংশ নয়। তাই এভারেস্টকে দেখতে পাইনি। তবে এ নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই। কারণ আমার মনে হয়, এত উচ্চতার পর্বত গ্রহণযোগ্য নয়।
চীনার দৃষ্টি
জিম করবেট
নৈনিতালের সবচেয়ে ভালো বর্ণনা হচ্ছে, এটা পূর্ব ও পশ্চিমে বিস্তৃত এক উন্মুক্ত উপত্যকা। তিনদিকে পাহাড়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ চূড়া ‘চীনা পিক’, যার উচ্চতা ৮ হাজার ৫৬৯ ফুট। শেষের দিকে খোলা জায়গা আছে এবং সেখান দিয়েই একটা সড়ক নৈনিতালের দিকে এগিয়েছে। উপত্যকায় পাখির বাসার মতো আছে একটা হ্রদ, যার পরিধি হবে মাইল দুয়েকের একটু বেশি। উপত্যকার ওপরে ও গোড়ায় আছে বাজার। গাছে জড়ানো পাহাড়ে বিন্দুর মতো আছে বাড়িঘর, গির্জা, স্কুল, ক্লাব, হোটেল। লেকের তীরে আছে বোটহাউজ, একটা মন্দির।
ভূতত্ত্ববিদরা এ হ্রদের উত্পত্তি নিয়ে বিভক্ত। কেউ বলেন এর উদ্ভব হিমবাহ থেকে, কারো মতে ভূমিধস আবার কেউ মনে করেন অগ্ন্যুৎপাত। হিন্দু কিংবদন্তিতে এ লেকের উদ্ভবের পেছনে তিনজন প্রাচীন ঋষির কথা উল্লেখ করা হয়— আত্রি, পুলসতেয়া ও পুলাহা। পবিত্র গ্রন্থ স্কন্দ পুরাণে উল্লেখ আছে, একবার তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে এ তিন ঋষি চীনায় এসে পৌঁছেন। তৃষ্ণায় কোথাও পানি না পেয়ে তারা চীনার গোড়ায় একটি গর্ত করেন এবং তিব্বতের পবিত্র মানসসরোবর থেকে পানি নিয়ে আসেন। তিন ঋষি চলে যাওয়ার পরে দেবী নৈনি নেমে আসেন। তিনি এ হ্রদের পানিতেই আবাস করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পানি ও গাছপালার আকর্ষণে হ্রদের চারপাশে আসতে থাকে নানা ধরনের পশু-পাখি এবং তারা এ উপত্যকাকেই নিজেদের আবাস হিসেবে গ্রহণ করে। দেবীর মন্দিরের চার মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে আমি আরো অনেক পশু-পাখির সঙ্গে বাঘ, লেপার্ড, ভালুক ও সামবার দেখেছি। একই জায়গায় আমি ১২৮ প্রজাতির পাখি দেখেছি।
এক জোড়া ভালো ফিল্ড গ্লাস নিয়ে চীনার চূড়ায় উঠলে কেউ পাখির চোখে নৈনিতালকে ঘিরে পুরো শহরটা দেখতে পাবেন। চূড়ায় ওঠার ঢাল বেশ খাড়া, কিন্তু কেউ যদি পাখি, গাছ ও ফুল নিয়ে আগ্রহী হন, তাহলে এ তিন মাইলের সফর আপনার গায়ে লাগবে না। আর চূড়ায় উঠতে উঠতে যদি তিনজন ঋষির মতো আপনিও তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়েন, তাহলে আপনাকে একটা স্ফটিক স্বচ্ছ ঠাণ্ডা পানির ঝরনা দেখিয়ে দিতে পারব। খাওয়াদাওয়া ও বিশ্রাম সেরে এবার তাকান উত্তর দিকে। আপনার ঠিক নিচেই দেখবেন ঘন জঙ্গলে ঢাকা এক গভীর উপত্যকা, যা কোসি নদী পর্যন্ত চলে গেছে। নদী ছাড়িয়ে শৈলশিরাঘেঁষে আছে গ্রাম, যা এখানে ওখানে বিন্দুর মতো দেখা যায়। এমনই একটি শৈলশিরায় অবস্থিত আলমোরা শহর। যাহোক, আমরা যেখানে ছিলাম, সেখান থেকে ৬০ মাইল উত্তরে গেলে ত্রিশূল। পুব ও পশ্চিমে কয়েক শত মাইলজুড়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে বরফে ঢাকা পর্বত। ত্রিশূলের পূর্ব দিকে ভারতের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্ঘ নন্দ দেবীর (২৫,৬৮৯ ফুট) অবস্থান। আপনার ডানদিকে নন্দ কোট, দেবী পার্বতীর দাগহীন বালিশ। একটু দূরে পূর্ব দিকে পঞ্চ চুল্লি; তিব্বতে কৈলাস যাওয়ার পথে পাণ্ডবরা এই পাঁচ স্থানে রান্না করেছিল।
এবার আমার সঙ্গে চলুন চীনার চূড়া থেকে পাখির চোখে দেখা গ্রামগুলোর একটিতে যাই...
গ্রামপ্রধান মারা গেছেন। তার স্ত্রী বেঁচে আছেন এবং তিনিই আমাকে গ্রাম ঘুরিয়ে দেখালেন। এখানে আপনি চা পাবেন, কিন্তু তাতে কোনো পানি নেই। একেবারে খাঁটি দুধে গুড় মিশিয়ে চা তৈরি করা হয়। গ্রামপ্রধানের স্ত্রী আমাদের স্বাগত জানালেন। এখানে কোনো পর্দার ব্যাপার নেই এবং তার দিকে তাকালে তিনি বিব্রত হন না। এবং তিনি দেখতে আকর্ষণীয় ছিলেন। তিনি ১০০ প্রজন্মের ব্রাহ্মণ পরিবারের কন্যা। তার বংশের প্রতিষ্ঠাতার মতোই তার রক্ত খাঁটি। বিশুদ্ধ রক্তের গৌরব সব মানুষের স্বভাবজাত। তবে বিশুদ্ধ রক্তের প্রতি ভারতে যে সম্মান দেখানো হয়, তা আর অন্য কোথাও দেখা যায় না। এ গাঁয়ে কয়েক বর্ণের মানুষের বসবাস। স্বামীর পর তার স্ত্রীই এখন গ্রামের প্রশাসক। কেউ কখনো তার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। তার মুখের কথাই গ্রামের আইন। কারণ একটাই, তিনি ব্রাহ্মণ, ভারতের ভূমির নুন।
চীনার চূড়া থেকে ফিল্ড গ্লাস লাগিয়ে যে হাজারো গ্রাম দেখা যায়, তারই একটি এ গ্রাম। আমার জীবনের সেরা সময় আমি এখানেই কাটিয়েছি।
পর্বত আমার রক্তে
রাসকিন বন্ড
আমি তখন ইংল্যান্ডে, লন্ডনের ভিড়ভাট্টা আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই দিন কাটাচ্ছি। সেই সময়েই আমার মনে হিমালয় সবচেয়ে জীবন্ত হয়ে দেখা দিয়েছিল। আমি ওই বিরটা নীল-ধূসর পর্বতমালার মধ্যেই বেড়ে উঠেছিলাম। তারাই আমার রক্তে পুষ্টি জুগিয়েছে। আমি তখন তাদের থেকে হাজার মাইল দূরে; মাঝে রয়েছে সাগর, সমতল আর মরুভূমি। হিমালয়কে আমি আমার জীবন থেকে আলাদা করতে পারছিলাম না। পর্বতের সঙ্গে এমনই হয়। একবার আপনি সেগুলোর সঙ্গে বসবাস করলে তা সে যেকোনো মাত্রার সময়ের জন্যই হোক না কেন, আপনি তাদের হয়ে যাবেন। এর থেকে কোনো মুক্তি নেই।
তাই মার্চের লন্ডনে ধোঁয়াশা পরিবেশ আমার কাছে হয়ে গেল পর্বতের কুয়াশা; যানবাহনের শব্দ হয়ে গেল পর্বত থেকে নেমে আসা গঙ্গার স্রোতধারার শব্দ।
আমার মনে পড়ে একটা ছোট পার্বত্য পথের কথা, যে পথ আমার ক্লান্তিহীন পা জোড়াকে ওক আর রোডোডেনড্রনের ঠাণ্ডা, মিষ্টি একটা বনে নিয়ে যেত এবং সেখান থেকে নগ্ন, বাতাসে ভেসে যাওয়া এক পাহাড়চূড়ায়। পাহাড়টাকে ডাকা হতো মেঘের শেষ নামে। এর এক পাশে ছিল সমতল আর অন্য পাশে তাকালে দেখা যেত বরফে ঢাকা পর্বতচূড়া। নিচে উপত্যকাজুড়ে বয়ে চলেছে সোনালি নদী। নিচে ধানক্ষেত সবুজের ঝিলিক তুলে যাচ্ছে। আর পাহাড়ে বাতাস দেবদারুর শাখায় হু-হু শব্দ তুলছে। মনে হচ্ছে লম্বা দেবদারুগুলো যেন ফাঁদে আটকা পড়েছে।
বৃষ্টির সময় কুয়াশা মেঘ পুরো উপত্যকাকে ঢেকে ফেলে। বাদ থাকে কেবল পাহাড়টা, মনে হয় আকাশে একটা দ্বীপ। বন্য ফুল জন্মায় পাথরের খাঁজে। নানা ধরনের ফুল পাহাড়ের ঢালজুড়ে ফুটে আছে।
পাহাড়ের এক স্থানে একটা পুরনো ভাটিখানার ধ্বংসাবশেষ ছিল। ছাদটা অনেক আগেই গায়েব হয়ে গেছে। বৃষ্টি মেঝেটাকে মসৃণ আর হলুদ করে দিয়েছে। বেশ কয়েকজন উদ্যমী ব্রিটিশ তাদের পুরো জীবন এখানেই কাটিয়ে দিয়েছে সমতলে স্বদেশবাসীর জন্য বিয়ার তৈরি করে করে। আর এখন দেয়ালে জন্মেছে মস ও ফার্ন। পুরনো পাথরের সিঁড়ির তলায় এক গর্তের মধ্যে নিজের আবাস করেছে এক বনবিড়াল। বিড়ালটা ধূসর রঙের, খুব সুন্দর, কালো ডোরাকাটা আর হালকা সবুজ চোখ। মাঝে মাঝে বিড়ালটা সিঁড়ির ধাপ কিংবা দেয়ালের ওপর দাঁড়িয়ে আমাকে দেখত, কিন্তু কখনো খুব কাছে আসত না।
পাহাড়ে কেউ বাস করত না। কদাচিৎ কিছুদিন থাকার জন্য খড় নির্মিত কুঁড়ে ঘরে থাকত কোল বার্নাররা। গ্রামবাসী অবশ্য তাদের পশুর পাল ঘাসে ঢাকা ঢালে চরাতে নিয়ে আসত। প্রত্যেক গরু ও ভেড়ার গলায় ঘণ্টা ঝোলানো থাকত। ঘণ্টার শব্দ থেকে রাখাল বালকেরা বুঝতে পারত, তাদের গরু বা ভেড়াগুলো কোথায় আছে। রাখাল বালক তখন নিশ্চিন্তে শুয়ে শুয়ে রোদ পোহাত এবং বনের স্ট্রবেরি খেত। ঘণ্টার শব্দের কারণে পশুগুলো দূরে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত না।
অনেক রাখাল বালক-বালিকার কথা আমার এখনো স্মরণ আছে।
একটা ছেলে ছিল, বাঁশি বাজাত। সেই বাঁশির দুরন্ত, মিষ্টি, সরল সুর পার্বত্য এলাকার পরিষ্কার বাতাসে ভেসে ভেসে বেড়াত। ঠোঁট থেকে বাঁশি না সরিয়েই সে মাথা ঝাঁকিয়ে আমাকে সম্ভাষণ জানাত। কাছেই একটা মেয়ে পশুদের জন্য ঘাষ কাটত। তার পায়ের গোড়ালিতে ভারী গহনা আর কানে থাকত রুপার বড় দুল। সে কখনই তেমন কথা বলত না, কিন্তু পথে আমার সঙ্গে দেখা হলেই একটা বাঁকা হাসি হাসত। সে মাঝে মাঝে নিজেকেই গান শোনাত, কখনো গাইত তার ভেড়ার পালের প্রতি, কখনো ঘাসের জন্য কিংবা কখনো নিজের হাতে থাকা কাস্তের প্রতি।
একটা ছেলে ছিল, যে শহরে বিক্রি করতে দুধ নিয়ে যেত (দূরত্বটা ছিল প্রায় পাঁচ মাইল)। মাঝে মাঝেই আমরা একসঙ্গে শহরে যেতাম, পথে তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ হতো। সে কখনো এই পাহাড়ি এলাকা থেকে অন্য কোথায় যায়নি। সে কোনো বড় শহরেও কখনো থাকেনি। সে কখনো ট্রেনে চড়েনি। আমি তাকে শহরের গল্প বলতাম আর সে আমাকে গাঁয়ের গল্প শোনাত। সে আমাকে শোনাত ভুট্টা থেকে রুটি তৈরির প্রক্রিয়া, পর্বতের মধ্যে বয়ে চলা স্রোতধারায় কীভাবে মাছ ধরা যায় কিংবা কীভাবে ভালুক তার বাবার ক্ষেতের কুমড়ো চুরি করতে আসত। সে আমাকে বলেছিল, কুমড়ো পাকলে ভালুকরা এসে সেগুলো নিয়ে যেত।
আরো মনে আছে পাইনের পাতার ঘ্রাণ, ওক গাছের সোনালি আর ম্যাপলের লাল, হিমালয়ের কোকিলের ডাক, পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসা কুয়াশার চাদর।
খুবই অদ্ভুত যে, কীভাবে ছোট্ট কোনো ঘটনা, টুকরো কথোপকথন বারবার স্মৃতিতে ভেসে আসে। ব্যস্ত সময়ে ভিড়ে ঠাসা কোনো ট্রেনে দাঁড়িয়ে সামনের যাত্রীর খুলে রাখা পত্রিকার পাতায় আমি দেখতে পাই, একটা ভালুক পাকা কুমড়ো নিয়ে যাচ্ছে।
একটা ভালুক আর একটা কুমড়ো— গুজ স্ট্রিট ও টটেনহ্যাম কোর্ট রোড স্টেশনের মধ্যে, হিমালয়ের সব সৌরভ আর শব্দ আমাকে ধাওয়া করছিল।
একজন অজ্ঞাত সন্ন্যাসী হিসেবে ভারত ভ্রমণ
স্বামী বিবেকানন্দ
আমি একবার হিমালয় ভ্রমণ করেছিলাম। আমাদের সামনে দীর্ঘ সড়ক বিস্তৃত হয়ে আছে। আমরা সন্ন্যাসীরা অন্যদের বলতে পারি না যে আমাদের নিয়ে যাও। তাই পুরো পথ আমাদের হেঁটেই যেতে হয়েছে। আমাদের সঙ্গে একজন বৃদ্ধ ছিলেন। সামনে উঁচু-নিচু হয়ে চলে গেছে শতমাইল পথ। এ দৃশ্য দেখে সেই বৃদ্ধ বলে উঠলেন, ‘ওহ! এ পথ কীভাবে পার হব। আমি আর হাঁটতে পারছি না। আমার পাঁজর ভেঙে যাবে।’ আমি তাকে বললাম, ‘আপনার পায়ের তলায় তাকান। যে রাস্তা আপনি পেরিয়ে এসেছেন, সেই একই রাস্তা আপনার পায়ের তলায়। এবং এ একই রাস্তা আপনি আপনার চোখের সামনে দেখছেন। এবং সামনে যে পথ দেখছেন, সেটাও একই পথ। সামনের পথও একইভাবে আপনার পায়ের তলায় আসবে।’
বহুবার আমি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। পেটে ক্ষুধা, ক্ষতবিক্ষত পা; দিনের পর দিন আমার কোনো খাবার ছিল না, হাঁটার শক্তি ছিল না। মনে হচ্ছিল জীবন দূরে চলে যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে আমার মনে এল: ‘আমার কোনো ভয় নেই, মৃত্যু নেই। আমার কোনো ক্ষুধা নেই, তৃষ্ণা নেই। আমি এমনই! আমি এমনই! পুরো প্রকৃতি মিলে আমাকে পিষে ফেলতে পারবে না, আমি বরং তার প্রভু।’
হিমালয়ে ভ্রমণের সময় পাহাড়ি মানুষের একটি গ্রামে আমি এক রাতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। রাতে ঢোলের শব্দ শুনে আমি অনুসন্ধান করে আমার গৃহকর্তার কাছে জানতে পারলাম যে, একজন গ্রামবাসীর ওপর কোনো এক দেবতা বা ভালো আত্মা ভর করেছে। নিজের প্রচণ্ড কৌতূহল মেটাতে বিষয়টা আমি দেখতে গেলাম। অকুস্থলে গিয়ে দেখি অনেক মানুষ। বড়, ঝাঁকড়া চুলওয়ালা লম্বা এক মানুষ আমাকে ইশারায় দেখাচ্ছিলেন, শুনলাম এনার ওপরই দেবতা ভর করেছেন। দেখলাম কাছেই আগুনে তিনি একটা কুঠার উত্তপ্ত করছেন। কিছুক্ষণ পর সেই লাল উত্তপ্ত কুঠার মানুষটার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঠেসে ধরা হলো এবং তার চুলেও। সবাই বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করল যে, সেই মানুষটার শরীরের কোনো অংশই পুড়ল না। তার চেহারায়ও ব্যথার কোনো ছাপ ছিল না। গ্রামের হেডম্যান আমার কাছে এসে বললেন, ‘মহারাজ, এ ব্যক্তিকে দয়া করে এক্সারসাইজ করুন।’ আমি সেই মানুষটার কাছে এগিয়ে গেলাম। কাছে গিয়ে সেই উত্তপ্ত কুঠার পরীক্ষা করে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল খুব। কুঠারে হাত দিলাম, সঙ্গে সঙ্গে আমার আঙুল পুড়ে গেল। যদিও ততক্ষণে সেই কুঠার অনেকটাই ঠাণ্ডা হয়ে লাল থেকে কালো হয়ে গেছে। আঙুলের পোড়াটা আমার মনেক অস্থির করে তুলল। কুঠারের জারিজুরি নিয়ে এতক্ষণ যা ভেবেছিলাম, সব ভুল হয়ে গেল! যাহোক, সেই আঙুল পোড়া নিয়েই আমি সেই মানুষটার মাথায় হাত রাখলাম এবং কিছুক্ষণ জপ করলাম— ১২ মিনিট। তারপর গ্রামবাসীর আমার প্রতি সে কী শ্রদ্ধা! আমাকে সবাই একজন অসাধারণ মানুষ বলে ধরে নিল! কিন্তু পুরো ঘটনার কোনো আগা মাথা খুঁজে পেলাম না। তাই কোনো কথা না বলে আমি ফিরে এলাম। তখন প্রায় মধ্যরাত, আমি ঘুমাতে গেলাম। কিন্তু হাত পোড়ার যন্ত্রণা ও পুরো ঘটনা নিয়ে বিস্ময় আমাকে সারা রাত ঘুমাতে দেয়নি। বারবার মনে পড়ছিল সেই ঘটনা যে, একটা জ্বলন্ত কুঠার কীভাবে একজন মানুষের শরীর পোড়াতে পারল না। তখন মনে হলো, ‘হোরাশিও, তোমার দর্শনের স্বপ্নে যা দেখো তার চেয়ে ঢের বেশি বস্তু আছে স্বর্গ আর দুনিয়ায়।’
হিমালয়ে আমি দ্বারে দ্বারে ঘুরে খাবার ভিক্ষা করেছি। বেশির ভাগ সময় আমি কঠোর আধ্যাত্মিক তপস্যা করেছি।
স্বামী হরিদাসের যাত্রা
রাহুল সাংকৃত্যায়ন
সে আমলে ঋষিকেশ কোনো নগর ছিল না; শহরও বলা যায় না, এমনকি একটা বড় গ্রামও না। ছিল বলতে ছোট-বড় ডজনখানেক দোকান। আরো ছিল প্রচুর বন ও পতিত ভূমি। তিন বছর পরে যেখানে কয়েকটা ছনের কুঁড়েঘর ছিল, সেখানে অট্টালিকা দেখতে পাওয়াটা চমকে দিয়েছিল। যে ঋষিকেশ ছিল সাধুদের শহর, সেখানে এখন বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে।
সংস্কৃত ভাষায় দক্ষরা জায়গাটিকে হূষিকেশ নামে ডাকেন, এটা কৃষ্ণের নাম। তবে এ নামে এখানকার পুরো ইতিহাস পাওয়া যাবে না। ঋষিকেশে গুপ্ত যুগের মূর্তি পাওয়া গেছে। সে সময়ে ঋষিকেশ নামটি ছিল না। তখন এ অঞ্চল অযোধ্যা নামে পরিচিত ছিল এবং এটা ছিল সাধুদের শহর।
স্বামী হরিদাস আশা করেছিলেন যে, হিমালয়ের গভীরে বনের মধ্যে তিনি যোগীদের দেখা পাবেন। তারা ঋষিকেশ থেকে লছমনঝুলা পর্যন্ত সফর করেছিলেন এবং সেখানে এক সপ্তাহ অবস্থান করেন। তপোবন ও কাজলিভবনে তারা অনেক সাধুর দেখা পেয়েছিলেন কিন্তু কাউকে যোগ চর্চা করতে দেখেননি।
বাবার আত্মা স্পর্শ করতে
জামলিং তেনজিং নোরগে
(তেনজিং নোরগে ও এডমন্ড হিলারি ১৯৫৩ সালে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এভারেস্টের চূড়া জয় করেন। তেনজিংয়ের পুত্র জামলিং তেনজিং নোরগে ১৯৯৬ সালে এভারেস্ট জয় করেন। পুরো যাত্রায় বাবার স্মৃতি তাকে বিদ্ধ করেছে। জামলিংয়ের সেই স্মৃতিচারণ)
সাউথ কোলের ক্যাম্পে বসে আমি আমার বাবার প্রত্যাশাটা টের পেয়েছিলাম, যেমন আমার নিজেরটাও বুঝতে পেরেছিলাম। ২৯ বছর বয়সে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, ব্রিটিশদের সঙ্গে ওটাই তার শেষ এভারেস্ট অভিযান। এ বিপজ্জনক পর্বতে তিনি বহুবার তার জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছেন। তার মা, আমার পিতমহী তাকে অনুরোধ করেছিলেন এ পর্বত অভিযান থেকে অবসর নিতে।
অভিযানের দুজন ব্রিটিশ চার্লস ইভান্স ও টম বোর্দিলন প্রথম অ্যাসল্ট পার্টি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। মে মাসের ২৬ তারিখ তারা সাউথ সামিটের উদ্দেশে সাউথ কোল ত্যাগ করেন। তাদের সঙ্গে ছিল সামিট ফ্ল্যাগ। আমার বাবার ধারণা ছিল, তারা চূড়ায় পৌঁছতে পারবেন না। কর্নেল জন হান্ট এরই মধ্যে আমার বাবা ও এডমন্ড হিলারিকে দ্বিতীয় সামিট দল হিসেবে নির্বাচিত করে ফেলেছিলেন।
ব্রিটিশরা অনুভব করছিল এটাই তাদের শেষ, হিমালয়ে এটাই তাদের শেষ অভিযান। তাই এভারেস্টের চূড়া জয় করতে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। সামনেই ছিল রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অভিষেক। তাই ব্রিটিশরা সেই উপলক্ষে এভারেস্ট জয় করে একটা উৎসব করবে বলে আশা করছিল। আমার বাবা ও শেরপারা চাপে পড়েছিলেন। রানীর অভিষেক নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। ব্রিটিশরা ভারত নিয়ন্ত্রণ করলেও কখনো নেপাল দখল করেনি।
আজ আমি সান্ত্বনা পাই যে, এভারেস্ট অভিযানে একজনের মৃত্যুর বিপরীতে পাঁচজন তার চূড়া জয় করতে পেরেছেন। কিন্তু ১৯৫৩ সালের অন্ধকার রাতে আমার বাবা দেখছিলেন তাদের আগে চেষ্টা করা ১৮ জনই মারা গেছেন, কেউই এভারেস্টের চূড়া জয় করতে পারেননি।
আমি যতই উপরে উঠছিলাম ততই আমার হূদস্পন্দন মাথায় বাড়ি দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল লামাদের ঢোলের অবিশ্রান্ত শব্দ। দক্ষিণ-পশ্চিম শৈলশিরায় বসে আমার খুব একাকী লাগছিল, জীবনে এমনটা আর কখনো লাগেনি। বাড়ির কথাও খুব মনে পড়ছিল। আমরা যেখানে বসেছিলাম সেখানেই চূড়ায় ওঠার আগে আমার বাবা ও হিলারি তাদের শেষ ক্যাম্প করেছিলেন।
বাবা আমাকে বলেছিলেন হিলারি তাদের অক্সিজেন ব্যবস্থা ঠিকঠাক করতে গিয়ে ছোট স্টোভটা জ্বালিয়েছিলেন। ওই আগুনে বরফ গলানো হয়। আমার বাবাও সঙ্গে থাকা বিভিন্ন খাবার ওই স্টোভে গরম করতেন।
হিলারি স্টেপ দিয়ে একবারে মাত্র একজনই উঠতে পারেন। কয়েকজন বিশিষ্ট শেরপা আমাকে বলেছেন, হিলারি স্টেপ হচ্ছে ‘তেনজিং ব্যাক’। তাদের মতে, হিলারি হয়তো এ অংশটি উঠতে নেতৃত্বে ছিলেন কিন্তু তিনি এক ধাপ উঠেই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি আমার বাবার কাঁধে ভর রেখে আবার সুস্থ হয়েছিলেন। আমার আরোহণ ছিল সহজ, কারণ আমি জানতাম— আমি তেনজিংয়ের কাঁধে চেপে উঠছি।
বহু বছর ধরে আমার স্বপ্ন ছিল চোমোলুঙ্গমা (এভারেস্ট)। স্বপ্নে সেসব অভিযানে আমার সঙ্গে ছিলেন বাবা ও দক্ষ শেরপারা। কিন্তু চূড়ায় পৌঁছার আগেই আমার স্বপ্ন ভেঙে যেত।





