বিকেলের দিকে অফিসের টানা বারান্দায় ছুরির ফলার মতো এক চিলতে রোদ এসে পড়ে। সেই রোদে তির তির কাঁপে বিদায়বেলার সুর। আয়নাল হকের মনটা এ সময় অকারণেই বেশ খারাপ হয়ে যায়।

এই রোদে কোনো ঘ্রাণ নেই, টাটকা ঝাঁজ নেই, কেবলই ন্যাপথালিন মাখা পুরনো কাপড়ের বিবর্ণতা। তবু সেই রোদে মাথা পেতে কংক্রিটের সেকেলে রেলিংটার ওপর ঝুঁকে পড়ে আয়নাল। আলস্য নেশায় বুঁদ হয়ে স্মৃতি হাতড়ে মরে।

আহ্্, শৈশবে এ ক্ষণটা ছিল বটে! ধানের খোলায় ডাংগুলির কাঠিতে ঝেড়ে পিটুনি দেয়া, বটের ডাল থেকে হরিয়ালের ছানা পেড়ে আনা, নাড়া ক্ষেতে ইচ্ছেমতো ডিগবাজি দেয়ার টুকরো ঘটনাগুলো সুদূরের শঙ্খচিলের মতো ডানা ঝাপটে মরে। এ যেন টিনের বাক্সে ঢোকানো বুক চিনচিন করা বায়োস্কোপ। এরই মধ্যে ভুশ করে ভেসে ওঠে অকালে ঝরে যাওয়া বাবার করুণ মুখ। উদাস মেঘের মতো সাদা মানুষটা গলায় ফাঁস দিয়ে মরল, অথচ কেউ কিছু করল না!

আয়নালের বুকের ভেতর শীতের ম্রিয়মাণ ঝরনার মতো একটা কান্না ঝরে যায়। এই নগরের কোলাহল ছেড়ে অনেক দূরে হারিয়ে যেতে ইচ্ছা করে।

এ সময় আয়নালের মগ্ন চৈতন্যে আঁচড়! একটা শোরগোল। হ্যাঁ, ওদিকে বড় স্যারের ঘর থেকেই তো আসছে। নড়েচড়ে ওঠে আয়নাল। বোঝার চেষ্টা করে— হঠাত্ কী হলো।

এ সময়টায় জাবর-কাটা চতুষ্পদের লেজ গোটানো কায়া আর ঘরে ফেরার তাড়ার মধ্যে কোনো তফাত খুঁজে পায় না আয়নাল। লঙ্কাকাণ্ড বাধানোর সময় নয় এটা।

গোটা অফিসে নিজেকে কাগজ-কাটা কীটের চেয়েও তুচ্ছ মনে করে আয়নাল। কাজেই বড় সাহেবের রাজ তখেত হাতিঘোড়া মরলেও তার কিছু আসে-যায় না। এর পরও কৌতূহলটা দমাতে পারে না আয়নাল। এগিয়ে যায় হইচইয়ের দিকে।

এলাহি কাণ্ড সেখানে। মানবসম্পদের পুরো ব্যাটালিয়ন উপুড় হয়ে কী যেন খুঁজছে। শুকনো মৌসুমে বিলে পানি কমে গেলে গ্রামবাসী সবাই যেমন হাতড়ে মাছ ধরতে নামে, ঠিক তেমনই একটি ব্যাপার। পদভারে যারা ভারী, তাদের এই হাতড়ে বেড়ানো চলছে বড় সাহেবের কামরায়। অন্যরা বাইরে বারান্দার এ মাথা-ও মাথা করছে।

আয়নালের খুব কৌতূহল হলো। সে ঠায় দাঁড়িয়ে মজা দেখতে লাগল। এ অফিসে সুইপার আর দারোয়ান বাদে বাকি সবাই তার ওপর। কাজেই এক ধরনের অস্বস্তি পেয়ে বসল তাকে। সবাই গতর খাটাচ্ছে, আর সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছে, এমন দৃশ্য বিরল। কিন্তু আয়নালকে কেউ কিছু বলল না। দু-চারজন এক নজর তাকাল ঠিকই, কিন্তু বিরস মুখে কাজটা করেই যেতে লাগল।

বড় স্যার কখনো রেগে গেলে প্রায়ই বলেন, ‘অফিসের সবাই কুঁড়ের হাড্ডি! এদের দুবেলা করে কোমরের ব্যায়াম করানো উচিত।’

আয়নালের মনে হলো, স্যার আজ সত্যিই ওদের কোমরের জং ছাড়াতে এই রেত মারছেন।

আয়নালের এক কাঠি ওপরে বজলুল হোসেনও হাতড়ে মরছে। তার দিকে সে বারকয়েক এমনভাবে তাকাল, সপাটে ছোড়ার জন্য ঢেলা খুঁজছে একটা। বজলু বলেই ফেলে, ‘ওই বেটা আহাম্মক, খাড়াইয়া খাড়াইয়া কী ছিঁড়স! হাত লাগা। বড় স্যারে দেখলে বুঝবি মজা। একদমে চাকরি নট!’

আয়নাল গা করে না। এমনিতে সে সাদাসিধে মানুষ, তবে ভেতরে বুনো মোষের মতো জেদ আছে। সময়ে সময়ে মাথাচাড়া দেয়। সে ঠায় দাঁড়িয়েই থাকে। অফিসে এত বড় একটা আলোড়ন, অথচ আয়নাল দুই মিনিট আগেও বিন্দুবিসর্গ জানতে পারেনি। সিঁদুরে পোকার চেয়েও যেন অধম সে। কী হয়েছে আসলে?

কী যে হয়েছে, তা টের পাচ্ছেন বড় কর্তা মোস্তাকিম চৌধুরী। নিজের কামরায় কাঠ হয়ে বসে তিনি। ২২ হাজার টাকার ঘূর্ণি চেয়ারে বসেও জুত পাচ্ছেন না। অলসতা করে সিসি ক্যামেরা না বসানোর ভুলটা কুটকুট কামড়াচ্ছে।

তাঁর মোবাইল ফোনটা আবার বেজে ওঠে। এবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও কলটা রিসিভ করলেন মোস্তাকিম। ওপাশ থেকে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু জুবায়ের খান অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলেন, ‘কী ব্যাপার, চৌধুরী, সাড়া নেই কেন? কী হয়েছে?’

‘আর বলিস না, ভাই। আমার তো সর্বনাশ হয়ে গেছে!’

‘ভূমিকা না করে বলে ফেল না।’

‘আমার সেই গোল্ড কয়েনটা মিসিং!’

‘গোল্ড কয়েন?’

‘হ্যাঁ, ওই যে আমার দাদি আমাকে যে সোনার মোহরটা গিফট করেছিলেন। মানে, জন্মের পর ওটা দিয়ে আমার মুখ দেখেছিলেন।’

‘ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। তা, ওটা অফিসে এল কী করে?’

‘তোর ভাফব বলছিল ওটাকে তার গোল্ড চেইনের লকেট করে দিতে— পড়েই যখন আছে। এজন্য নিয়ে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম, ফেরার সময় কোনো জুয়েলারি হয়ে যাব।’

‘তা বেশ। কিন্তু ওটা মিসিং কীভাবে?’

‘লাঞ্চ সেরে ওটা বক্স থেকে বের করে দেখছিলাম। বুঝলি না, নস্টালজিয়া আর কি। তারপর একটা কল এল। পরে কয়েনটার কথা কমপ্লিটলি ভুলে গেলাম। একটু আগে যেই মনে পড়েছে, দেখি ওটা নেই।’

হে হে করে হাসেন জুবায়ের খান। বলেন, ‘আরে, ভালো করে খুঁজে দেখ, আশপাশেই কোথাও রেখেছিস। বয়স হচ্ছে না! সব কি আর মনে থাকে?’

মোস্তাকিম চৌধুরী বেশ বিরক্ত হন। বয়স নিয়ে কটাক্ষ করলে আঁতে লাগে। চতুর জুবায়ের খান তা টের পান। বলেন, ‘এক কাজ কর। তোর পিওন ওটার নাম যেন কী, ওটাকে চেপে ধর। সাঁড়াশি চাপ দিবি। এরা হলো নুইসেন্স। কাজের কাজ কিছু করে না, শুধু ঝামেলা পাকায়!’

মোস্তাকিম চৌধুরী কথা খাটো করে বন্ধুকে খসান। বজলুকে মনে মনে ঘেঁটে দেখেন। নাহ্, লোকটা চালু বটে, কিন্তু ওই মোহর হাতানোর মতো নয়।

যে করেই হোক, ওটা খুঁজে বের করতে হবে— এমন একটা নোটিস দিয়ে অফিস থেকে বের হয়ে যান তিনি।

আরো পরে, সবার শেষে, ধীর পায়ে অফিস থেকে বের হয় আয়নাল। ঘষা নীল কাঁচের মতো সাঁঝ। ক্লান্ত পায়ে মোড়ের চায়ের দোকানে গিয়ে দাঁড়ায় ও। ওর মতো আরো অনেকে ভিড় করেছে সেখানে। কলা, বিস্কুট, পুরির সঙ্গে তুফান চলছে চায়ের কাপে। বেশির ভাগই খেটে খাওয়া মানুষ। অনেকেরই দুপুরে মুখে কিছু গোঁজার ফুরসত মেলেনি। এখন যা পারছে, গিলছে।

আয়নালের অত তাড়া নেই। দুপুরের মোটা ভাত আর সবজির ঘণ্টতে দেহঘড়ি এখনো পুরোদমে টিকটিক। বাসায় গিয়ে ছাতামাথা নিয়ে সেই তো বউয়ের বাতচিত! যে মুখে এক সময় মধু ঝরত, এখন তা কাড়াইলের ছুঁচাল কাঠি। এই খোঁচায় কুঁকড়ে থাকার চেয়ে এখানে তারিয়ে তারিয়ে চা পান অনেক ভালো।

আয়নাল এক কাপ চায়ের সঙ্গে লম্বা একটা টোস্ট বিস্কুট নেয়। একটু দূরে গিয়ে আয়েশ করে চায়ে ভিজিয়ে বিস্কুট খেতে থাকে। শেষ বিকেলের ডামাডোল নিয়ে ভাবে। বড় স্যারের নাকি সোনার মোহর খোয়া গেছে। কানাঘুষা থেকে শুনেছে সে। কম কথা নয়— স্বর্ণমুদ্রা! শৈশবে দাদির কাছে সোনার মোহরের কেচ্ছা শুনেছে আয়নাল। এসব রাজা-বাদশার ধন। একালে রাজা নেই, মোস্তাকিম চৌধুরীরা আছেন। তাঁরাই এখন রাজা। কিন্তু মোহরটা গেল কই?

চা-টোস্ট শেষ করে একটা সিগারেট ধরায় আয়নাল। ৯ টাকা হয়েছে। ৫০ টাকার নোট মেলে ধরতেই দোকানি খেঁকিয়ে ওঠে। আয়নাল শার্টের দুই পকেট হাতড়ে ৭ টাকা পায়। আর ২ টাকা?

ও হ্যাঁ, প্যান্টের বাঁ পকেটে ২ টাকার কয়েন আছে। কিন্তু পকেটে হাত গলাতেই দুটো কয়েন ঠেকে। দুটোই বের করে আয়নাল। হাতের তালুতে মেলে ধরে। ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলোতে ধরা পড়ে তফাত। একটা রুপালি, আরেকটা সোনালি।

ঝট করে মনে পড়ে দুপুরের সেই ঘটনা। অফিসের করিডোর দিয়ে তখন যাচ্ছিল আয়নাল। আশপাশে আর কেউ ছিল না। বড় স্যারের কামরার মুখোমুখি যে মোটা পিলার, সেটার কাছে ঠিকরে আসা কড়া রোদে ঝিলিক দিচ্ছিল সোনালি কিছু। অভ্যাসবশে আয়নাল কুড়িয়ে নিল। ভালো করে দেখেওনি তখন। ভেবেছে, এক টাকার সেই পুরনো কয়েন। অমনি পকেটে ঢুকিয়েছে। আয়নালের বুকটা ধকধক করে, পেটের ভেতর আলোড়ন। এটা কি তবে বড় স্যারের সেই সোনার মোহর?

চা-বিস্কুটের টাকা দিয়ে চলে আসে আয়নাল। সস্তা সিগারেটে ঘন ঘন কয়েকটা টান মেরে শেষ হওয়ার আগেই ফেলে দেয়। মনের ভেতর হাজারো বুদ্বুদ। তবে কি সেই রাজার ধন ওর হাতের মুঠোয়?

ডান হাতে মুঠোবন্দি সোনালি গোল চাকতিটাকে আরো চেপে ধরে আয়নাল। যেন এখনই কেউ কেড়ে নেবে! অদ্ভুত এক ঘোর পেয়ে বসে ওকে। ইস্কাটন থেকে বাংলামোটর অবধি হেঁটে চলে আসে। এবার মিরপুরের বাস।

ধাতব গোল বস্তুটি এখন আয়নালের প্যান্টের পকেটে। নিরেট জিনিসটা যেন হঠাত্ প্রাণ ফিরে পেয়েছে। চঞ্চল টুনির মতো লাফাচ্ছে ওটা। ফাঁক পেলেই ফুড়ুত্। পকেটটা কৌশলে চেপে ধরে আয়নাল। বাসের সহযাত্রীদের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়। মনে হয়, ওর পকেটের খবর সবাই জেনে গেছে।

মিরপুর গোলচক্করে নেমে হাঁপ ছাড়ে আয়নাল। চারপাশে ব্যস্ত মানুষ। যে যার ধান্দায় ব্যস্ত। কে রাখে কার খোঁজ? উত্তেজনা দমাতে পারে না আয়নাল। গোল জিনিসটা বের করে কৌশলে এক দোকানের আলোতে দেখে নেয়।

আশির দশকের এসএসসি পাস আয়নাল। রানী ভিক্টোরিয়াকে চেনে সে। সোনালি ধাতব চাকতিতে তাঁর খোদাই করা ছবি দেখেই বুঝল— হ্যাঁ, এটাই বিকেলের সেই হুলুস্থূলের কারণ। স্যারের বহু আকাঙ্ক্ষিত ধন!

চট করে মোহরটা পকেটে ঢোকায় আয়নাল। ঘটনা পরিষ্কার। স্যারের অলক্ষে মোহরটা মেঝেতে পড়ে গাড়ির মতো একটা দৌড় দিয়েছে। সোজা পিলারে এসে থেমেছে। আর কপালগুণে এটা আয়নালের আয়ত্তে। এ মোহরটা এখন তার!

আয়নাল নিজে নিজেই যুক্তি দাঁড় করায়— মোহর হচ্ছে গুপ্তধন। এই ধন যখন যার কাছে, তখন তার। কাজেই এটা এখন আয়নাল হকের। অন্য কারো এতে হক নেই। কিন্তু এই মোহর দিয়ে সে করবে ফক?

ফুটপাত ধরে বাসার দিকে হাঁটতে থাকে আয়নাল। মাথায় আউলা বাতাসের ঢেউ। মোহরটা বউয়ের হাতে তুলে দেয়া যায়। বুকটান করে বলবে, ‘খালি তো নিমুরাইদা ভাদাইম্যা কও, এই দ্যাখো, তোমার লাইগা কী আনছি!’

কিন্তু এই মোহরের মর্ম বুঝবে মোমেনা? তিরিশ পোরোনোর পর থেকে একের পর এক সমস্যায় ভুগছে সে। এখন নগদে একটা মেয়েলি সমস্যা জুটিয়েছে। আছে দাঁতব্যথাও। চিকিত্সক বলেছেন, একটা দাঁতে রুট ক্যানাল, আরেকটায় ফিলিং লাগবে। বিশেষ ছাড় দিয়েও ৫-৭ হাজার টাকার ফ্যাঁকড়া। এ সময় এই মোহরে কি মন ভরবে মোমেনার? বরং এটা বিক্রি করে নগদ টাকা দিলেই খুশি।

বুদ্ধিটা ছনাত্ করে ঘষা দেয় আয়নালের টনকে। তাই তো,  মোহরটা বিক্রি করে দিলেই তো কিছু কড়কড়ে নোট। বাজারে এখন সোনার যা ঠমক, এটার দাম ৪০-৫০ হাজার টাকা তো হবেই। আরে, ২০-৩০ হাজার পেলেই বা কম কী! পুরোটাই তো ফাও। মোমেনার চিকিত্সা হবে, মেয়ে মৌসুমির সেই আবদারও মেটানো যাবে— বারবার কথা দিয়েও যা সে পূরণ করতে পারেনি। মোহরটা নিয়ে কোথায় যাবে সে? চাঁদনী চক, নিউমার্কেট না বায়তুল মোকাররম?

ডেরায় ফিরে বোবা বনে যায় আয়নাল। বউ বলে, ‘মুখে রাও নাই ক্যান? স্যারে বকা দিছে? বজলু শয়তানে আবার বদমায়েশি করছে?’

আয়নাল কিছু বলে না। এড়িয়ে যায়। মোহর বিক্রির টাকায় কী কী করবে, এই হিসাব মেলাতে ব্যস্ত সে। কথা বলার সময় নেই। উত্তেজনায় রাতে খেতে পারে না সে। বিছানায় শুয়ে চোখ পিটপিট করে।

আয়নাল যখন মোহর বিক্রির টাকা নিয়ে মনে মনে মচ্ছবে মেতেছে, এ সময় মোস্তাকিম চৌধুরীর বাসায় চলছে ঈশানী মেঘের দাপট। তাঁর মিসেস জেনে গেছেন— গোল্ড কয়েন মিসিং। এসব কথা বাতাসের আগে ছোটে। আর লাগিয়ে দেয় সাতাত্তরটা প্যাঁচ। এর একটা কেবল শুরু।

মোস্তাকিম সকালে বের হওয়ার সময় গিন্নি কয়েক পদের বাদাম আর কিশমিশ দিয়ে ফিরনি খাইয়েছিলেন। সে রূপ এখন পাল্টে গেছে। মুখের ওপর তিনি বলেই ফেলেন, ‘কানে যা আসে, তা তো মিথ্যা না। নিশ্চয়ই তুমি কয়েনটা ওই ঘোড়াটে মেয়েকে গিফট করেছো!’

মোস্তাকিমের মাথার ভেতর আগুন ধরে যায়। এর হল্কা গিয়ে লাগে বজলুর গায়ে। পরদিন অফিসে গিয়েই বজলুকে তিনি সোজা বলে দেন, ‘আজকের মধ্যে আমার ওই জিনিস চাই। না পেলে তোর চোদ্দ গুষ্টিকে জেলে ভরব! এ রুমে তুই ছাড়া আর কে আসে?’

বড় স্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে বজলু মাথা ঘুরে পড়ে গেল। কে তুলবে তাকে? কর্তার কোপানলে পড়া মানেই সে অস্পৃশ্য।

কিন্তু আয়নাল পারল না। এগিয়ে গেল। অথচ বজলু আর সে দা-মাছ। প্রতি মাসে অফিসে যে পত্রিকা জমে, বড় কর্তার পিওন হওয়ার দাপটে তা বিক্রি করে দু-পয়সা হাতিয়ে নেয় বজলু। একবার টাইফয়েড হলো তার। পত্রিকা জমাতে লাগল আয়নাল। বিক্রির করার আগের দিন বজলু এসে হাজির। আয়নালের সঞ্চিত ধন কেড়ে বিক্রি করে দিল। এক টাকাও দেয়নি— এমন বখখিল!

আরেকবার যা করেছে! অফিসের বার্ষিক মেজবানিতে বিশাল আয়োজন। আয়নাল বহু কায়দা করে বাবুর্চির সাগরেদকে পটিয়ে দুই প্যাকেট বিরিয়ানি বাগাল। বাসায় নেবে। মাঝখান থেকে বজলু এসে চিলের মতো ছোঁ। সবার সামনে বেইজ্জতি করে ছাড়ল। সেই থেকে তক্কে তক্কে আছে আয়নাল— মওকা একটা আসুক, এমন শিক্ষা দেবে, মাথা তুলতে পারবে না বজলু। আজ এসে গেছে সেই সুযোগ।

বজলুর কাছে কেউ ভিড়ছে না। বিদ্যুতের তার থেকে ছিটকে পড়া কাউয়ার মতো পড়ে আছে সে। মজা দেখার এই এক সুযোগ। কিন্তু হূদয়ের অতল থেকে একটা আউলা বাতাস এসে আয়নালের মনটাকে দলে ময়দার তাল বানিয়ে দেয়। সে এগিয়ে যায় বজলুর কাছে। তাকে লম্বা বেঞ্চিতে শুইয়ে মাথায় পানি ঢালে। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে বজলু। হিসাব বিভাগের তিরিক্ষি বুড়োটা এসে কুঁদে ওঠেন, ‘যা, এই হতচ্ছাড়াকে বাইরে ফেলে দিয়ে আয়!’

সে দায়ও আয়নালের। আগারগাঁওয়ের তালতলায় থাকে বজলু। ছয় ছেলেমেয়ে নিয়ে কুরুক্ষেত্র। তার কাহিল দশা সেখানে বেশ আলোড়ন তুলল। বউ-ছেলেমেয়ে সবাই তাকে নিয়ে অস্থির।

প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে এসে আরো উতলা হয় বজলু। মাতম করে ওঠে, ‘বাঁচন নাই গো, আমার বাঁচন নাই! বড় স্যারে আমারে পুলিশে দিব। আমারে ফাঁসিতে ঝুলাইব!’

তার এ মাতমে দুই মেয়ে বিলাপ শুরু করে। সে বিলাপের করুণ সুর আয়নালকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সুদূর অতীতে। গ্রামের হাইস্কুলের দপ্তরি ছিল তার বাবা। স্কুলে একবার চুরি হলো। পুলিশ এসে সোজা গ্রেফতার করল তাকে। হাতকড়া লাগিয়ে পেটাতে পেটাতে নিয়ে গেল। এক মাস পর হাজত থেকে ফিরে এসে আত্মহত্যা করল তার নির্দোষ বাবা।

আয়নালের চোখ দুটো ভিজে ওঠে। আর দাঁড়াতে পারে না।

পরদিন মোস্তাকিম চৌধুরী থানায় ফোন করার আগেই তাঁর কক্ষে আয়নাল হাজির। মোহরটা পকেট থেকে বের করে বড় স্যারের টেবিলে রাখে সে। বলে, ‘বজলুর কোনো দোষ নাই, স্যার! এইটা কেউ চুরি করে নাই। কীভাবে য্যান বারান্দায় গেছিল। আমিই কুড়াইয়া পাইছিলাম!’

মোস্তাকিম চৌধুরী মোহরটা তুলে নিয়ে শীতল দৃষ্টিতে তাকান আয়নালের দিকে। আয়নাল জানে, এখন কী ঘটতে পারে। তা ঘটুক, এজন্য সে প্রস্তুত।