সুনির্দিষ্ট সময় পরে পেছনে ফিরে তাকানো চলে। আর সময়টা যদি হয় একটা আস্ত বছর, তবে হিসাবনিকাশের বহু কিছু থাকে, এগোলাম নাকি পিছিয়ে গেলাম খানিকটা? হিসাবের পক্ষে জানুয়ারিই ভালো, রোমান দেবতা জানুসের নামে যার নাম, সবকিছু শুরুর দেবতা ছিলেন তিনি, বছর শুরুর আগেভাগে জানুয়ারির প্রাক্কালে তাই পেছনে ফিরে হিসাব করে এগোনো অবধারিত। তবে পেছনে ফিরে তাকালে কতকিছুই না দেখা যায়। দেখার পরিধি ক্রমেই ছোট করে এনে স্থির হতে পারি ‘বাংলাদেশের নারী’-সংক্রান্ত বিষয়াদিতে।

কয়েক শতাব্দীব্যাপী বাংলাদেশের নারীর জীবনযাপন আমূল বদলে গেছে। বিশেষ করে স্বাধীনতাযুদ্ধে বিজয়ের পর থেকে আজ অবধি নারীর অবস্থানে আশাতীত পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের নারীরা এখন স্বাধীনচেতা, স্বনির্ভর ও সমাজসচেতন হতে শিখেছে। তবে এটা বাংলাদেশের প্রত্যেক নারীর পরিস্থিতি নয়। অধিকাংশ নারী এখনো সমাজের চাপিয়ে দেয়া লৈঙ্গিক ভূমিকা পালনের ও বস্তুত পুরুষতান্ত্রিক সমাজটিতে অধিকার আদায় তথা নিজেকে পুরুষের সমান্তরালে স্থাপন করার সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তার জীবন অতিবাহিত করে। সমাজের নিয়মকানুন ও দেশের আইনের অধিকাংশ এখনো নারীবান্ধব নয়। ক্ষেত্রবিশেষে নারীকে কোণঠাসা করার জন্যও সামাজিক অনুশাসন ও রাষ্ট্রের আইন মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

ক্রমেই বর্ধনশীল অর্থনীতি ও রাজনীতি কিংবা প্রযুক্তির ফলে দ্রুত পরিবর্তনশীল সমাজে যখন প্রায় সবকিছুই অস্থিতিশীল, তখন কেবল নারীর জীবন ও অর্জনের নিশ্চয়তা থাকবে, এমনটা ভাবা অবান্তর। সুতরাং বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতা, অনিশ্চয়তাকে কাটিয়ে, অপারগতাকে উতরে তাকে নিজের অর্জন নিশ্চিত করতে হয়। সেভাবে ভাবলে এত রকমের সমস্যায় ডুবে থাকা সমাজে অবস্থান করেও নারীর বিশেষ অর্জন উল্লেখযোগ্য। এর প্রায় সবক’টি অর্জনই বছরের শেষ ভাগে নারীর ঝুলিতে এসেছে। বলতে গেলে সারা বছরের নারীজীবনের সংগ্রাম যেন তাতে অনেকাংশে লাঘব হয়েছে।

২২ ডিসেম্বরে সাফ ফুটবল টুর্নামেন্টে ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ দলকে ১-০ গোলে হারিয়ে বাংলাদেশের নারীদের অনূর্ধ্ব ১৯ দল জয়লাভ করে। সাফ গেমসের ফাইনাল খেলায় এটাই বাংলাদেশের প্রথম বিজয়। এর আগেও দলটি ভারতের দলের সঙ্গে নয়টি ম্যাচ খেলেছিল বিভিন্ন পর্বে। তার মধ্যে পাঁচটিতে বাংলাদেশ জয়লাভ করে। তবে বাংলাদেশের ঘরে ট্রফি যে নারীর হাত ধরে আসবে তা অনেকটাই কল্পনাতীত ব্যাপার বলে ধরে নেয়া যায়। ফুটবল টিমের, বিশেষ করে অনূর্ধ্ব ১৯-এর নারী সদস্যরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা এবং বলা বাহুল্য প্রধানত সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী থেকে তাদের উত্থান। তাই প্রত্যেক নারীকে অসংখ্য বাধা পেরিয়ে এ পর্যায়ে পা রাখতে হয় এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাই এ জয় বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ।

অন্যদিকে ২০২১-এর নভেম্বরে নারী ক্রিকেট দল একদিনের বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে মূল পর্বে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করে। এটাই হবে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দলের প্রথমবারের মতো মূল পর্বে পা রাখা। এ সুযোগ বাংলাদেশের নারীদের জন্য বিশাল অর্জন।

এ তো গেল খেলার অঙ্গনের অর্জন, অন্যান্য সৃজনশীল ক্ষেত্রেও নারীরা আমাদের দেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। বছরের শেষ ভাগে স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম স্যার জন স্যোন মিউজিয়াম প্রদত্ত স্যোন (Soane) পুরস্কার অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নারীদের জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন। স্যোন মিউজিয়াম স্থাপত্য শিল্পে যুগান্তকারী ছাপ রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ এ পুরস্কার ২০১৭ সালে প্রবর্তন করে। ৫২ বছর বয়সী মেরিনা তাবাসসুম এর আগেও একটি মসজিদের নকশাকারী হিসেবে আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। স্থাপত্য নকশায় আলোর বিচিত্র ব্যবহার তার নকশায় প্রতিফলিত হয়। বর্তমানে তিনি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের ক্যাম্পে এবং সমুদ্রতীরবর্তী ভূমিতে অতিদরিদ্রদের জন্য সবচেয়ে কম মূল্যের উপাদানে কী করে স্থানান্তরযোগ্য বাসস্থান তৈরি করা যায়, এ নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত আছেন।

এ করোনা পীড়িতকালে বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত এক ব্রিটিশ নারীর কথা তো না বললেই নয়। তিনি হলেন সাদিয়া খানম। টানা ১৪ মাসের গবেষণায় তিনি ‘ভলটিক’ নামের এক স্প্রে আবিষ্কার করেছেন, যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকসহ আরো অনেক জীবাণু মুহূর্তে ধ্বংস করতে সক্ষম। ২০২১ সালের জুলাইয়ে আবিষ্কৃত এ স্প্রেকে এনএইচএস ও নাসা একযোগে যুগান্তকারী বলে বর্ণনা করেছে।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী থেকে শুরু করে শহুরে নারী, এমনকি বিদেশে অবস্থানকারী নারীরা স্বক্ষেত্রে নিজেদের কাজের ছাপ রাখতে সক্ষম হচ্ছে, এ অত্যন্ত আশার সংবাদ। দেশের সংস্কৃতি, শিল্প-বাণিজ্য ও কারুশিল্প, প্রত্যেক স্থানে নারীর অবস্থান এখন সুস্পষ্ট। ২০২১ সালেই বাংলাদেশ প্রথম বাণিজ্যিক ব্যাংকে নারী সিইও প্রত্যক্ষ করেছে। নারী উদ্যোক্তা আগের চেয়েও করোনাকালে অনেকাংশে বেড়েছে। পোশাক শিল্পে নারী কর্মীর সংখ্যা এ বছর ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

এ গেল সফলতার বয়ান, যা আমাদের ভবিষ্যতে আরো বেশি পরিশ্রমী ও নারীর প্রতি মনোযোগী হতে উৎসাহিত করে। তবে মুদ্রার যেমন অন্য পিঠ আছে, বাংলাদেশের নারীর অবস্থানের প্রকৃত চিত্রটি সত্যিকার অর্থেই এই কেবল সফলতার কাহিনী থেকে ভিন্ন।

২০২১ সালে বাংলাদেশে নারীর উপরে সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন, ধর্ষণ, অন্যান্য যৌন নির্যাতন, নারী-শিশু নির্যাতন, হত্যা ও বাল্যবিবাহ এত বেড়েছে যে দেশটিকে কোনোমতেই নারীবান্ধব দেশ বলা চলে না। প্রযুক্তি, বিদ্যা, ধন সব মিলিয়ে মানুষ উন্নতির চরম শিখরে ওঠার প্রতিযোগিতায় মত্ত, আগের চেয়ে এ সমাজ অনেক বেশি আধুনিক, কিন্তু নারী যেন এখনো এক শ্বাপত্সংকুল পরিবেশে বাস করে। গত বছরের তুলনায় নারী নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধির দিকে তাকালে তা যে উদ্বেগজনক, এটি যে কেউ স্বীকার করতে বাধ্য।

বছরের শেষ প্রান্তে ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় এক নারী। একই সময়ে প্রবাসীর ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। সার্বিক পরিস্থিতির কথা বলতে গেলে ২০২১ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর পর্যন্ত ৬৫২টি ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যা মামলা হয়েছে। যৌতুকের কারণে নির্যাতন ও জখমের মামলা হয়েছে ৬৩৩টি। যৌতুকের কারণে ২১ জনকে হত্যার মামলা হয়েছে। বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০২১ সালে পারিবারিক নির্যাতন বেড়েছে ১০ শতাংশ। ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে, এ বছর যৌতুকের কারণে হত্যার মামলা ২০০ শতাংশ বেড়েছে।

বছরের শেষ ভাগে নতুন করে আলোচনায় আসে বাল্যবিবাহ। করোনাকালীন লকডাউনের পরে যখন নতুন করে স্কুল খুলে দেয়া হয়, তখন দেখা যায় প্রচুর কিশোরী অনুপস্থিত। তখন অন্তর্বর্তীকালীন বাল্যবিবাহের ভয়াবহ বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে আসে। ১৩টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জানিয়েছে আগের বছরের তুলনায় ২০২১ সালে বাল্যবিবাহ বেড়েছে ২৩৮ শতাংশ।

রাষ্ট্রের আইন যেহেতু নারীকে পুরুষের সমান সম্পত্তি প্রাপ্তির পথে অন্তরায়, তাই পরিবার নারী শিশুকে বোঝা ও পুরুষ শিশুকে আশীর্বাদ মনে করে। পুরুষ পরে বিয়ের মাধ্যমে পারিবারিক সম্পত্তি বৃদ্ধির কারণ হয়ে ওঠে। তাই বাল্যবিবাহের মাধ্যমে নারী শিশুকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা অনেক সময় পরিবারের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষেত্রবিশেষে কন্যার নিরাপত্তা প্রদানের অপারগতাও গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহকে উৎসাহিত করে। সর্বোপরি আইন ও সমাজই এক্ষেত্রে নারী শিশুর মানসিক উত্কর্ষ ও স্বনির্ভরতার ব্যাপারে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

সমাজে ক্ষমতার অপব্যবহার নারীর প্রতি সহিংসতার প্রধান কারণ। পুরুষ জাতি নারী জাতিকে যেকোনো দেশের যেকোনো স্থানেই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক মনে করে। তাই ‘নীচু’ জাতের উপরে ক্ষমতা প্রদর্শনের বা চর্চার ঐকান্তিক ইচ্ছা সে নারীর ওপরে বর্তায়। ধর্ষণের মূল কারণ ক্ষমতার চর্চা। নারী যে পুরুষের অধীনস্থ তা তাকে স্মরণ করে দেয়া, তাকে মানসিকভাবে হত্যা করা, পুরুষের ওপরে ছড়ি ঘোরাতে বাধা প্রদান করা—এসবই ধর্ষণের কুটিল উদ্দেশ্য। যে দেশে ধর্ষণের প্রকোপ বাড়ছে, সেখানে অবধারিতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়ছে। ক্ষমতার অন্যায় চর্চা সমাজের নিম্নশ্রেণী থেকে উদ্ভূত হয় না, বরং উচ্চশ্রেণী থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরাই ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন এবং সাধারণ মানুষ মূল্যবোধের অবক্ষয়ে সে সংস্কৃতি গ্রহণ ও অনুসরণ করে।

সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, শুধু ২০২১ সালের নারী নির্যাতনের নয়, সর্বকালের সব নারীর ওপরে পরিচালিত সহিংসতার বিচার হওয়া প্রয়োজন। একমাত্র সুষ্ঠু বিচার ও কার্যকর আইনের প্রয়োগই বিপথে যাওয়া সমাজকে সামলে নিতে পারে। ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, হত্যা ও পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ অপরাধী চিহ্নিত হওয়ার পরেও তার শাস্তি না হওয়া, ক্ষেত্রবিশেষে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াতেই বাধ্য না হওয়া। বিশেষ করে অপরাধী যদি অর্থবিত্তে বলীয়ান হয়, তবে ছাড় পাওয়া তার জন্য অত্যন্ত সহজ। এক্ষেত্রে ২০২১ সালের কয়েকটি ঘটনার কথা স্মরণ করা চলে।

নারীর জন্য বেঁচে থাকার যেখানে সুস্থ পরিবেশই নিশ্চিত করা যায় না, সেখানে গবেষণায়, খেলায়, শিল্পে নারীর উত্থান ও অর্জন এক অভূতপূর্ব সাফল্য। ২০২১ সাল সেসব সাফল্য নিয়ে এসেছিল সন্দেহ নেই। ফোর্বস তালিকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এশিয়ার ষষ্ঠ ক্ষমতাধর নারী হিসেবে উল্লেখিত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি সময় ধরে একজন নারী দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারায় তার এ অর্জন। যে দেশে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় প্রধান, স্পিকার ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ পদে দীর্ঘকালব্যাপী কোনো না কোনো শাসনামলে নারীর উপস্থিতি দেখা যায়, সেখানে নারীর অবস্থান পোক্ত হবে এটুকু আশা করা হয়তো অবাস্তব নয়।

 

আফসানা বেগম: কথাসাহিত্যিক