শেষতক সবকিছু খুব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমনির্ভর হয়ে উঠেছে। সমবয়সী কোনো বন্ধুজন এ কথা বলে কী বোঝাতে চান তা স্পষ্ট না হলেও ইঙ্গিতটা বোঝা তো যায়। আবার পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারা যায়নি বলে একটু যেন না বোঝার ভানও করি। এতে কিছু সুবিধা হয়, অসুবিধাও কিছু কম হয় না। এই ফাঁকে ভাবা যায়, কথাগুলো কী অর্থে বলেছেন, এ কি মন্তব্য নাকি তারও জিজ্ঞাসা। ওই ‘সবকিছু’ বলতে তিনি কী বুঝিয়েছেন, সমাজের সকল কিছু নাকি শুধু সাহিত্যের প্রকাশ।
কথা এগোতেই বোঝা গেল, তিনি যদিও সকল অর্থে সবই বুঝিয়েছেন, কিন্তু খেদের জায়গা নির্দিষ্ট: সাহিত্যের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অন্তর্জালনির্ভর হয়ে পড়া। আচ্ছা, তবে তা-ই ঘটেছে অথবা ঘটতে চলেছে! বিবরবাসী কিংবা সাহিত্যপাঠে উৎসাহহীন মানুষের তো এ বিষয়ে কোনো ধারণা না-ই থাকতে পারে। বাজারে বই পাওয়া যায়। করোনার সর্বগ্রাসী প্রতাপে মাস খানেক দেরি করে ভাঙাচোরাভাবে অমর একুশে গ্রন্থমেলা অনুষ্ঠিতও হয়েছে। কিন্তু বইমেলার বাইরে সারা বছর দেশের পত্রপত্রিকা আর সাময়িকপত্রে সেসব লেখা প্রকাশিত হয় বা হয়ে থাকে, সেই স্রোতের অনেকখানিকই তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর অন্তর্জালের দখলে চলে গেছে? তিনি নিশ্চয়ই সে কথাই বোঝাতে চেয়েছেন।
ওই প্রশ্নের কিংবা মন্তব্যের সরাসরি উত্তর হতে পারে, হ্যাঁ, গেছে অথবা যাচ্ছে। যেকোনো টেকনোলজিই তার ক্ষমতার বিস্তার অনুযায়ী নিজেকে সচল রাখবে। মুদ্রণ শিল্পের প্রসারের পরও লোকসাহিত্যের মৌখিক অংশ টিকে থেকেছে আপন শক্তিতে নিজস্ব বৃত্তে। আজকে যদি একজন তার একটি লেখা চাইলেই হাজার কি লাখ মানুষকে পড়িয়ে নিতে পারে, তাহলে সে কেন মুদ্রণের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে?
তখনই তিনি কানের পাশে বাহিত করেন শঙ্খ ঘোষের বিখ্যাত কবিতাটির নাম: ‘মূর্খ
বড়ো, সামাজিক নয়’। বলে, প্রায় বিড়বিড় করে শোনান কবিতার শেষ পঙিক্তটি, ‘লোকে
বলবে মূর্খ বড়ো, লোকে বলবে সামাজিক নয়’। কথাটা উল্টো হয়ে গেল না? নাকি উল্টো বলে পাল্টাটা জানাতে চান। প্রকৃত সাহিত্যকার যখন নিজের লেখার বাইরে আড়াল-আবডালের আড়ই ব্রত করে নেন, সমাজ হয়তো সেজন্য অসামাজিক বলছে তাকে, কিন্তু মূর্খ তো বলে না। তবে এ সমাজে খানিকটা অচল বলে সে অর্থে মূর্খই হয়তো। যদি সেই অর্থে ওই পঙিক্তর উল্টোটাই আর তা তার বক্তব্যের মর্মার্থ বা শানে নজুল হয়, তাহলে কী দাঁড়ায়? সাহিত্যে এত এত অপ্রয়োজনীয় ফসল আর তা যেন খ্যাতির মোহে সামাজিকীকরণের ফাঁক গলে চরম মূর্খামিকেই প্রকাশিত করছে! যেখানে শিল্পমাত্রই বর্ম চায়, বর্ম ছাড়া এ ফসল ঠিকঠাক ফলে না। প্রকৃত ফসলের সে তরীতে স্রষ্টার ঠাঁই হয় না, কিন্তু সোনার তরী সাহিত্যস্রষ্টার সব সোনার ধান ভরে বেয়ে চলে যায়!
তা দৈনিকের সাহিত্য পাতার ক্রমহ্রাসমানতা (ব্যতিক্রম বাদে, দৈনিকের সাহিত্য পাতা কখনো সাহিত্যের জায়গা নয়, তা বেরোয় সাহিত্যকে বিষয় করে), সাপ্তাহিক-পাক্ষিকের অনুপস্থিতি, মাসিক পত্রের সংখ্যাও কম। করোনার প্রকোপে পার্বণী সংখ্যাগুলোও সংকুচিত ও প্রায় অপ্রকাশিত। বাস্তবতা যখন এমন, তাহলে তরুণ লেখকদের যাওয়ার জায়গা কোথায়। প্রায় সম্পাদনাহীন ওয়েব পোর্টাল? সেখানেও সবার ধৈর্য হয় না প্রয়োজনীয় সময় দেয়ার। ইত্যাদি বিষয় ওই মন্তব্যের পর যদি ঘুরেফিরে আসে। যদি আসে? এসেছে তো।
এর জন্য কি দায়ী এই নির্দয় করোনাকাল? যদি হাসান আজিজুল হকের বহুখ্যাত আত্মজা ও একটি করবী গাছের প্রথম পঙক্তি ‘এখন নির্দয় শীতকাল, ঠান্ডা নামছে হিম’-এর অনুকরণে লেখা যায়, ‘এখন
নির্দয় করোনাকাল, মানুষ ধুকছে নিঃসীম।’ গন্তব্য পাতালে কিংবা হাসপাতালে। তাহলে ওপরের সবক’টি বিষয়কে এক বাক্যে মান্যতা দিয়ে দেয়া যায়? এসব সাহিত্যিক প্রবণতা আগে থেকে তেলে-জলে বেড়ে উঠছিল, করোনা একেবারে খোল খুলে সামনে নিয়ে এসেছে? এখন কথা উঠতে পারে, মানবেতিহাসে অনেক দিনের পরে ২০২১ খ্রিস্টাব্দের মতন এক দগদগে বছরে এমন সাহিত্যিক সালতামামির আদৌ প্রয়োজনীয়তা আছে কি নেই। যেখানে নগরগুলোয় ভিখারির সংখ্যা বেড়েছে। অজস্র মানুষ কর্মহীন। যাদের সামর্থ্যের দিক থেকে মধ্যবিত্ত বলা যায়, তারা অনায়াসে নেমে গেছে নিম্নধ্যবিত্তের কাতারে। সেইমতো বাকিরা নিচের দিকে। দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে। সামনে আরো বাড়বে। এ সুযোগে অনেক আদার বেপারি জাহাজের খোঁজখবরও নিয়েছেন উন্নতির বিপুল আগ্রহে। তাদের আঙুলগুলো কলাগাছ না হোক, নিদেন ‘সুপারি গাছের সারি’তে পরিণত হয়েছে। ওদিকে বেদিতে বাঁধানো বটবৃক্ষ তো বটবৃক্ষ, সেখানে সাধারণত ঝড়ের আভাস তেমন থাকে না। সামনের বসন্তেই ও গাছে ঝিরিঝিরি নতুন পাতায় সিন্দুহিন্দোল খেলে যাবে। এ বাস্তবতায় এমন একটি বছরে সাহিত্যের গতিপ্রকৃতি সংক্রান্ত অক্ষম এ আলোচনা! এ আসলে নিরূপায় অক্ষমতারই অন্য নাম। তবু যেকোনো হিসাব নেয়াই তো দর্পণে ফিরে নিজেদের দেখা, আত্মসমালোচনা, নিকট অতীতচারিতাও কখনো কখনো প্রয়োজনীয় বইকি।
এই করোনাকালে যখন আশু নবতরঙ্গ নয়া নামে আবার ভয়জাগানিয়া আগমনী গান শুনিয়েই যাচ্ছে। এর ভেতরেও উত্তরণের জন্য কী কী করণীয় তার কোনো দিশা খোঁজা যাক বা না-ই যাক, এটা অন্তত ভাবার সময় এসেছে, পরিবর্তন দরকার। সে সময় হয়তো আরো আগেই এসেছিল, এভাবে আর চলা উচিত নয়। এসব বিচার ও সম্পাদনাহীন লেখা সাহিত্যের ময়দান পঙ্কিল করছে মাত্র। সে প্রভাব বইমেলায়ও পড়ছে। তাতে সাহিত্যের নামে সব পক্ষই ভীষণ অসৎ হয়ে উঠেছে। অন্তর্গত অসততা কোনো শিল্পের জন্য বিন্দুমাত্র মঙ্গলজনক নয়। যে ঘটনা এরই মধ্যে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকের ক্ষেত্রে ঘটেছে, তা সাহিত্যের ক্ষেত্রে ঘটা এখন সময়ের ব্যাপার। নইলে সাহিত্যের বন্ধুর পথের পরিব্রাজকের মৃত্যু মুহূর্তে যে অশ্রুবর্ষিত হয়, তা প্রায়ই সোস্যাল মিডিয়ার কুমিরের চোখের জল। কারণ তাদের হাঁটাপথের শর্তগুলোর কোনোটিই আমাদের ক্ষেত্রে রক্ষিত হয়নি।
২.
এ বছর প্রয়াতদের মধ্যে শঙ্খ ঘোষ, বুদ্ধদেব গুহ আর হাসান আজিজুল হকের প্রসঙ্গ নানা অনুষঙ্গে ফিরে ফিরে আসছে। তিনজনই এ অতিমারীতে বয়সজনিত কারণে কিছুদিন অসুস্থও ছিলেন। এরপর হঠাৎ প্রস্থান। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে তাদের সাহিত্যচর্চার শুরু। শঙ্খ ঘোষ ‘কৃত্তিবাস’ভুক্ত না হয়েও সে কাগজেই তার কবিতা প্রকাশের সূচনা। শুরু থেকেই তিনি স্বতন্ত্র চিহ্নিত স্বর। ভাষার গূঢ় ও গভীর বিষয় খুব সহজ করে তার হাতে ধরা দিত। শুরুর দিককার ‘যমুনাবতী’ আর পরবর্তীকালের ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘নিহিত
পাতাল ছায়া’, ‘পাঁজরে
দাঁড়ের শব্দ’ ইত্যাদি প্রবচন হয়ে গেছে। ‘বাবরের প্রার্থনা’র কবি হিসেবেও কারো কারো কাছে পরিচিত। অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রাবন্ধিকও তিনি। রবীন্দ্রসাহিত্য সম্পর্কে তার জ্ঞানের নিবিড় সাক্ষ্য বহন করে চলে ‘নির্মাণ আর সৃষ্টি’, ‘উর্বশীর
হাসি’ ‘কালের
মাত্রা ও রবীন্দ্রনাটকে’র মতো বই। এছাড়া ‘ঐতিহ্যের বিস্তার’, ‘ছেঁড়া
ক্যাম্বিসের ব্যাগ’, ‘ঘুমিয়ে
পড়া অ্যালবাম’, ‘জার্নাল’
প্রতিনিধিত্বকারী গদ্যগ্রন্থ। প্রচুর লিখেছেন সমকালীন সাহিত্য ও সাহিত্য ব্যক্তিত্বদের সম্পর্কে। রবীন্দ্রনাথের লেখার পাঠ ও পাঠান্তর নিয়ে তার ভাষ্য বিশেষজ্ঞের। পূর্ব বাংলা-পর্বের আত্মজীবনকে কিশোর পাঠকদের উপযোগী করে লিখেছেন।
হাসান আজিজুল হক বাংলাদেশের সাহিত্যে চিহ্নিত হন ছোটগল্পের রাজপুত্র হিসেবে। এ অর্থে ছোটগল্পই তার সাহিত্যিক সিদ্ধির প্রধান মাধ্যম। তারুণ্যে রচিত ‘শকুন’, ‘মন
তার শঙ্খিনী’, ‘আত্মজা
ও একটি করবী গাছ’, ‘আমৃত্যু
আজীবন’ থেকে ‘নামহীন গোত্রহীন’, ‘কৃষ্ণপক্ষের
দিন’, ‘খনন’,
‘পাতালে হাসপাতালে’, ‘বিধবাদের
কথা’ ইত্যাদি ছোটগল্প বাংলাভাষী পাঠকের মুখে মুখে ফিরছে বহুদিন ধরে। সম্ভবত নরেন্দ্রনাথ মিত্রের পরে হাসান আজিজুল হক ছোটগল্প লিখেই গদ্য লেখক হিসেবে ঔপন্যাসিকদের কাতারে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছেন। পরিণত বয়সে ‘আগুনপাখি’ ও ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’ নামে দুটো উপন্যাস লিখেছেন। প্রচুর সাহিত্যিক ও সমাজ-রাজনীতিবিষয়ক প্রবন্ধও রচনা করেছেন। সক্রেটিসকে নিয়ে বাংলায় বহুপাঠ্য জীবনীটি তার। ছোটদের জন্য লিখেছেন ‘লাল ঘোড়া আমি’ নামের অসাধারণ আখ্যান। হাসান আজিজুলের হকের কলমের দুর্বিনীত ক্ষমতা তার ভাষায়। ভীষণ তীখ্ন আর তীব্র। একেবারে সরাসরি ও লক্ষ্যাভিমুখী। সে ভাষায় বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিম, রাঢ় ও বরেন্দ্রভূমির যে আখ্যান তিনি লিখেছেন তা বাংলা সাহিত্যে তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে। ‘কথাসাহিত্যের কথকতা’ ও ‘একাত্তর: করতলে ছিন্নমাথা’ গ্রন্থ দুটি প্রবন্ধ সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
বুদ্ধদেব গুহ আগাগোড়া স্বভাব রোমান্টিক, যা তার সমকালীন লেখকদের থেকে পৃথক। বন-জঙ্গল সেই রোমান্টিক চোখে নর-নারী রোমান্সের সঙ্গে যুক্ততায় সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। বিভূতিভূষণের সঙ্গে তাকে অনেকে তুলনা করেন, কিন্তু বিভূতির অন্তর্গত ক্ষুব্ধ দৃষ্টি তার কলমে কখনই ছিল না। ‘বনজ্যোত্স্নায় সবুজ অন্ধকারে’ অত্যন্ত স্বাদু গদ্যে লিখতেন বুদ্ধদেব, কখনো একটু মজলিসি মেজাজেও বইত সেই ‘সবিনয় নিবেদন’। ‘মাধুকরী’, ‘কোজাগর’
তার জনপ্রিয় উপন্যাস। কিশোর পাঠকের জন্য লিখেছেন ঋজুদার অ্যাডভেঞ্চারাস কাহিনী।
হাবীবুল্লাহ সিরাজী বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে প্রয়াত হন। ষাটের শেষ দিকে বাংলাদেশের কবিতায় তার আগমন। সত্তর ও আশির দশকেই এ দেশের গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। ‘দাও বৃক্ষ দাও দিন’, ‘হাওয়া
কলে জোড়া গাড়ি’, ‘নোনা
জলে বুনো সংসার’ ইত্যদি কাব্যগ্রন্থে তার স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত। কবিতাসহ অন্যান্য বিষয়ে গদ্যও লিখেছেন। তিনি বাংলা একাডেমিতে কিছু বিষয়ে নতুনত্ব সংযোজন করেছিলেন। বাংলা একাডেমি অনুবাদ পত্রিকা।
সত্তর দশকের প্রধান কথাসাহিত্যিকদের একজন বুলবুল চৌধুরীর গল্পগ্রন্থ ‘টুকা কাহিনী’র ও উপন্যাস ‘ইতু বউদির ঘর’ তাকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। মধ্যবঙ্গের আঞ্চলিক উপভাষায় তার পারদর্শিতা ছিল চোখে পড়ার মতো। লিখেছেন আত্মজৈবনিক রচনাও।
রহস্য সাহিত্যের পাঠকদের কাছে শেখ আবদুল হাকিম পাঁচ দশক ধরে অতি পরিচিত নাম। মাসুদ রানা সিরিজে ‘অগ্নিপুরুষ’ আর ‘গড ফাদার’ ও ‘আততায়ী’র মতো অসাধারণ অনুবাদের জন্য বহু পাঠক তাকে স্মরণ করবেন। লিখেছেন প্রচুর। সেবা প্রকাশনীর প্রধানতম লেখকদের একজন। পরে সেবার বাইরেও লিখেছেন বিদেশী কাহিনী অবলম্বনে অসংখ্য উপন্যাস। ‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’ সিরিজের অনেকগুলো বইয়ের মালিকানা স্বত্ব নিয়ে কাজী আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তার বিবাদ আলোচনায় ছিল।
আতাউর রহমান রম্য লেখক হিসেবে পাঠককে আনন্দ দিয়েছেন। কৌতুকের সঙ্গে প্রাজ্ঞতা মিলেমিশে থাকত তার লেখায়, পাঠক হিসেবে তিনি যে মননের পরিচয় দিতেন সেখানে, তাতে তার রুচির পরিচয়ও পাওয়া যেত।
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর মৃত্যুও বাঙালির ভিন্ন রুচির অধিকারে খানিকটা অকাল আঘাত। তার চলচ্চিত্রেও কবিত্ব ধরা পড়ত। ‘নিম অন্নপূর্ণা’, ‘গৃহযুদ্ধ’,
‘বাঘ বাহাদুর’ ‘চরাচর’,
‘উত্তরা’, ‘তাহাদের
কথা’, ‘লাল
দরজা’ ইত্যাদি তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র। ছোটগল্পকে কাহিনীচিত্রে রূপান্তর করায় দারুণ মুনশিয়ানা ছিল তার হাতে। কবিতা লিখতেন।
আবদুল রাজাক গুরনাহ নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে অনেকেই ভীষণ অবাক হয়েছেন, অনেকে খুশির বারতাও দিয়েছেন। আমাদের উচ্ছ্বাস আর নিরাশা প্রকাশের বিষয়টা প্রায়ই এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন নোবেল কমিটি তাদের কাছ থেকে জেনেই পুরস্কারটি দিয়েছেন, বিপরীতটা এমন যে প্রতি বছর কাকে যে তারা পুরস্কৃত করেন জগতে এত এত বিশিষ্ট লেখক থাকতে! আমরা ভুলে যাই নোবেল সাহিত্য পুরস্কার তার নির্দিষ্ট ভূরাজনীতিমাফিক চলে। নেহাত কখনো কখনো বদনামের ভাগ কমাতে এর বাইরে যায়। তলস্তয়-জয়েসসহ আরো কেউ এর বাইরে থেকে যাওয়াটা তারা গণনায় নেন না। ১০৮ বছর আগে একজন বাঙালি কবি এ পুরস্কার পেয়েছিলেন, এ ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা তিনি, কিন্তু আজ বাংলা ভাষা যতই জনবহুল হোক ওই সাহিত্য পুরস্কারের রাজনৈতিক কেন্দ্রে আমরা নেই। গত শতকের শুরুর কলকাতার যে সাংস্কৃতিক প্রভাব, আজকের ঢাকা-কলকাতা কোনো নগরেরই নেই তা। ওদিকে আমাদের ভাষার প্রধান লেখাগুলোর তর্জমা ভীষণ দুর্বল অথবা তা অনুবাদ অসম্ভব। পথের পাঁচালীর ইংরেজি অনুবাদ কেমন অথবা কী তাতে লেখা হয়েছে অথবা লেখা গেছে, একটু সংবাদ নিলেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়।
মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলো করোনার কারণে বন্ধ ছিল। ফলে বইয়ের দোকানে শ্রেণী পাঠ্য বই যেমন বিক্রি হয়নি, পাশাপাশি যেসব সহায়ক আর পুরস্কারের বইপত্র বিক্রি হতো তা হয়নি। তবে অনলাইনে বই কেনাবেচা হয়েছে, গৃহবন্দি মানুষের কেউ কেউ বই পড়েছেন, এটা আশাবাদী হওয়ার। এর মধ্যে এমন বই বেরিয়েছে যে সামাজিক যোগাযোগের কারণে তার দ্বিতীয় সংস্করণও হয়েছে। এ তো খুশির খবর। কয়েকটি নতুন পত্রিকা বেরিয়েছে, চিন্তা সৃষ্টি ও তত্ত্বের। তার দুটি ‘বাঙ্গাল’ ও ‘তত্ত্বতালাশ’। ‘মাটি’ নামের ৩০ বছর আগে প্রথম প্রকাশিত ও কয় বছরের মধ্যে অনিয়মিত হয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া পত্রিকাটি মারুফ রায়হানের সম্পাদনায় আবার বের হতে শুরু করেছে বছরের একদম শেষে, এটা লেখক-পাঠকের জন্য আনন্দের সংবাদ। শোনা যাচ্ছে, আরো দু-একটি সাহিত্য পত্রিকা বেরোবে। করোনার কারণে ঈদ সংখ্যা প্রায় বেরই হয়নি। বণিক
বার্তার ঈদ সংখ্যা ‘সিল্করুট’ দৃষ্টিনন্দন মুদ্রণসৌকর্যে বেরিয়েছে। প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যাও বেরিয়েছিল, কিন্তু বাজারে আসতেই শেষ, অনেকে দেখতে পায়নি। প্রখ্যাত মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার দস্তয়েভস্কি সংখ্যা বেরোবে মশিউল আলমের সম্পাদনায়, এটি হাতে পাওয়ার জন্য অনেকে আগ্রহী। কিছু সাহিত্য পুরস্কার নিয়মিত দেয়া হয়েছে, কোনো কোনোটা আপতত স্থগিত। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর শততম জন্মবার্ষিকী সামনে। নিশ্চয়ই তাকে নিয়ে এ সময়ের সাহিত্যিক ও গবেষকদের আগ্রহের স্মারক দেখা যাবে।
এদিকে বছরটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকী। করোনা এর অনেক অয়োজনকেই ব্যাহত করেছে। আশা করা যায়, সামনের বইমেলায় এ-সংক্রান্ত বইপত্র বেরোবে। এরই মধ্যে কয়েকটি গল্প ও কবিতা সংকলন বেরিয়েছে। সামনে নিশ্চয়ই আরো বেরোবে। আশাবাদী হওয়া যাবে যদি উল্লেখযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এমন বই তো বছরের যেকোনো দিনই বেরোতেই পারে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের গবেষণার দীনতা আশা করি ঘুচবে। এ বিষয়ে পরিশ্রমী গবেষণাগ্রন্থ না হলে নির্মোহ কথাসাহিত্য রচনা দুষ্কর। শুধু অভিজ্ঞতাই কথা ও নাট্যসাহিত্যের জন্য যথেষ্ট নয়।
আর, ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল কমেনি, তবু রণক্লান্ত কবির অমর পঙক্তিতে আজো বুক বাঁধা যায়!
প্রশান্ত মৃধা: কথাসাহিত্যিক





