একাত্তরে যে
বাংলাদেশের উদ্ভব,
তা ছিল
বিশ্বের দরিদ্রতম
দেশগুলোর একটি।
হেনরি কিসিঞ্জার
মনের ঝাল
মিটিয়েছেন একে
তলাবিহীন ঝুড়ি
বলে। শতকরা
৮০ ভাগের
বেশি মানুষ
গ্রামবাসী। তার
প্রায় কাছাকাছি
হার কৃষিজীবী
পরিবারের। জাতীয়
আয়ের শতকরা
৬০ ভাগের
মতো আসে
কৃষি থেকে।
প্রায় ১৫০
বছর আগে
বঙ্কিমচন্দ্র তার
‘বঙ্গদেশের
কৃষক’ প্রবন্ধে
লিখেছিলেন, ‘দেশের
মঙ্গল? দেশের
মঙ্গল, কাহার
মঙ্গল? তোমার
আমার মঙ্গল
দেখিতেছি, কিন্তু
তুমি আমি
কি দেশ?
তুমি আমি
দেশের কয়জন?
আর এই
কৃষিজীবী কয়জন?
তাহাদের ত্যাগ
করিলে দেশে
কয়জন থাকে?
হিসাব করিলে
তাহারাই দেশ—দেশের
অধিকাংশ লোকই
কৃষিজীবী।’ পাকিস্তানি
জামানায় এ
দৃশ্যের মৌলিক
কোনো পরিবর্তন
হয় না।
আরো যোগ
হয় আন্তর্জাতিক
বাণিজ্য, ব্যাংক-ব্যবসা
ও আমলাতন্ত্রে
পরিকল্পিত অথবা
নিজস্ব ঐতিহ্যপুষ্ট
চারিত্রিক প্রবণতাসঞ্জাত
শোষণ। এ
বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতেই
মুজিব-তাজউদ্দীন
নেতৃত্বে আওয়ামী
লীগের ছয়
দফা কর্মসূচির
ঘোষণা (১৯৬৬)।
তারই চূড়ান্ত
বিস্ফোরণ ১৯৭০-এ
অখণ্ড পাকিস্তানে
একমাত্র সাধারণ
নির্বাচন, যার
যৌক্তিক পরিণাম
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের
রক্তাক্ত অভ্যুদয়।
কথাগুলো বলা,
আমরা এর
বিপরীতে কী
চেয়েছিলাম, তা
বোঝানোর জন্য।
১৯৭২-এ
রচিত হয়
আমাদের সংবিধান।
রাষ্ট্রের চার
মূলনীতি নির্দিষ্ট
হয়—বাঙালি
জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র,
ধর্মনিরপেক্ষতা ও
সমাজতন্ত্র। এ
সমাজতন্ত্র অবশ্য
কেতাবি শ্রমিক
শ্রেণীর একনায়কত্বের
ভিত্তিতে নয়,
তা বাজারের
কর্মকাণ্ড চালু
রেখেও রাষ্ট্রীয়
ব্যবস্থাপনায় শোষণহীন
সমাজ গড়ার
লক্ষ্যে। এতে
যা প্রথমেই
চোখে পড়ে,
তা হলো
যেকোনো কর্মকাণ্ডে
কারো বেতনের
ঊর্ধ্বসীমা ওই
সময়ে ৫০০
টাকায় বেঁধে
দেয়া ও
সর্বোচ্চ ১০টা
ধাপের ভেতর
বেতন-কাঠামো
নির্ধারণ করা।
পারিপার্শ্বিক চাপে
এ নির্দেশ
বজায় রাখা
যায়নি। পর্যায়ক্রমে
প্লাবন ও
অনাবৃষ্টির কারণে
কোনো কৃষি
সংস্কার সম্ভব
হয়নি। ক্ষুদ্র
কিন্তু প্রভাবশালী
এক সচ্ছল
জনগোষ্ঠীর আচরণে
পাকিস্তানি প্রতিপত্তির
বৃত্ত থেকে
বের হয়ে
আসতে পারেনি।
জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার
অচরিতার্থতায় যোগ
হয় চুয়াত্তরে
দুর্ভিক্ষের কশাঘাত।
বঙ্গবন্ধুর কাছে
এ মর্মান্তিক।
তিনি এবার
তুলনায় সক্রিয়
সমাজবাদের পথে
অগ্রসর হওয়ার
নীতিমালা ঘোষণা
করেন। তার
প্রধান দুটো
বৈশিষ্ট্য হলো,
বাংলাদেশের আদর্শে
বিশ্বাসী সব
জনগণকে নিয়ে
একদলীয় (বাংলাদেশ
কৃষক-শ্রমিক
আওয়ামী লীগ—বাকশাল)
গণতন্ত্র ও
কৃষিতে বাধ্যতামূলক
সমবায় ব্যবস্থা।
কোনোটিরই কার্যকারিতা
পরীক্ষিত হয়নি।
যে প্রেক্ষাপটে
আমরা স্বাধীনতা
সংগ্রামে নামতে
বাধ্য হয়েছিলাম,
যেখানে ভূখণ্ডের
পরিচয় ছিল
অনুন্নত কৃষিনির্ভর
গ্রামীণ অর্থনীতি,
সেখানে আজ
বাংলাদেশে মোট
জাতীয় আয়ে
কৃষির অনুপাত
প্রায় ১৮
শতাংশ, যেখানে
শিল্প খাত
থেকে আসে
শতকরা প্রায়
৩২ ভাগ
ও সেবাপণ্য
থেকে আনুমানিক
শতকরা ৫০
ভাগ। জনসংখ্যার
নিবেশনও পালটেছে।
এখন শতকরা
প্রায় ৪০
ভাগ মানব-মানবী
শহরবাসী। এর
নিচে অবশ্য
অন্য একটা
পরিবর্তন ক্রিয়াশীল।
আগে উপজেলা
বা থানা
সদর অধিকাংশ
ছিল গ্রামাঞ্চল।
এখন তারা
সবাই শহর
বলে গণ্য।
তবে তার
চেয়ে বড়
কথা, বিদ্যুৎ
ব্যবস্থা পৌঁছে
গেছে শতকরা
৭০ ভাগের
ওপর গ্রামে।
সেচ ব্যবস্থার
উন্নতিতে এর
ভূমিকা কম
নয়। তথ্যপ্রযুক্তির
ব্যবহার চোখে
পড়ে হতদরিদ্র
গ্রামীণ পরিবারেও।
গ্রাম-শহরের
ব্যবধান যে
শুধু কমেছে
তা-ই
নয়, ইন্টারনেট
ও মোবাইল
ফোনের যুগলবন্দি
প্রত্যন্ত গ্রামকেও
যুক্ত করেছে
বহির্বিশ্বের সঙ্গে।
আমাদের অজান্তেই
আমরা কিন্তু
বদলে যাচ্ছি।
সবটা যে
হজম হচ্ছে,
তা বলি
না। কিন্তু
অনিশ্চয়তাকে না
মেনে নিলে
উন্নয়নও তো
সম্ভব নয়।
এখন শতভাগ
ছেলেমেয়ে প্রাথমিক
শিক্ষার সুযোগ
নেয়। সবাই
টেকে না।
কিন্তু প্রায়
১৫ লাখ
ছেলেমেয়ে বছরে
মাধ্যমিক স্তর
অতিক্রম করছে,
একে খাটো
করে দেখার
উপায় নেই।
শিক্ষার বিভিন্ন
স্তরে ছেলেমেয়ের
ব্যবধান ক্রমহ্রাসমান।
প্রাথমিক স্তরে
মেয়েদের অনুপাতই
কিঞ্চিৎ বেশি।
অনুমান করি,
গ্রামীণ অর্থনীতিতে
প্রয়োজনের তাগিদে
ছেলেরাই তুলনায়
বেশি ঝরে
পড়ে। আমাদের
মুক্তিযুদ্ধের অবদানও
একটা আছে।
তখন যে
অধিকাংশ পরিবারের
নিরাপত্তার জন্য
ছোটাছুটি, দেশান্তরী
হয়ে, দেশের
ভেতরেও—পাড়া
থেকে পাড়ায়,
গ্রাম থেকে
গ্রামে মাথা
গুঁজে পালিয়ে
থাকা তার
অনিবার্য পরিণাম,
মেয়েদের সচলতা
বাড়া, বাইরের
কাজেও তাদের
দৃশ্যমান হওয়া।
এটা ঘটমান।
আমরা পরিবর্তনের
পথে। একে
ঠেকাতে চাওয়া
মানে সজ্ঞানে
আত্মহত্যার পথ
বেছে নেয়া।
আজ আমরা
এও জানতে
পাই, এদেশে
একজনের গড়
প্রত্যাশিত আয়ু
৭১ বছরের
কিছু বেশি।
এবং সেখানে
তুলনায় বেশিদিন
বাঁচার সম্ভাবনা
মেয়েদেরই। এ
তথ্য আমাদের
উত্ফুল্ল করে।
তাই বলে
কি দুর্ভাবনার
কোনো কারণ
ঘটে না?
অবশ্যই ঘটে।
অন্তত আমি
তা এড়াতে
পারি না।
আগেই বলেছি,
আমাদের জনসংখ্যা
১৬ কোটির
ওপর। সম্ভবত
ঘনত্বের দিক
থেকে পৃথিবীতে
সবচেয়ে বেশি।
অবশ্য সিঙ্গাপুরের
মতো নগররাষ্ট্রের
কথা ভাবছি
না। বৃদ্ধির
হার যথেষ্ট
কমেছে। তার
পরও দুশ্চিন্তা
থাকে। বালতি
ভরে গেলে
কলের মুখ
থেকে টিপ
টিপ করে
জল পড়লেও
তা উপচে
পড়ে। যেমন
খুশি ছড়ায়।
চারপাশ নষ্ট
করে। নষ্ট
হয়। আমাদের
জনসংখ্যা এখন
উপচে পড়া
অবস্থাতেই। জনসংখ্যা
বৃদ্ধি মানে
বাড়তি শ্রমের
জোগান। শ্রম
মানে মৌলিক
উৎপাদিকা শক্তি।
এমন যুক্তি
ততক্ষণই খাটে,
যতক্ষণ ওই
শ্রমের সুনিযুক্তির
সম্ভাবনা থাকে
এবং সবার
খাওয়া-পরা-বাসস্থানের
এবং প্রকৃতির
ও অন্যান্য
মানুষের সঙ্গে
আনন্দময় সংযোগের
স্বাভাবিকতা ও
স্বাচ্ছন্দ্য বজায়
থাকে। বলা
যায়, মানুষের
উদ্ভাবনী শক্তি
ও প্রযুক্তির
বিস্ময়কর বিকাশ
এতদিন এ
সমস্যার মোকাবেলা
করে এসেছে।
কিন্তু আরো
কতদূর তা
সম্ভব? ম্যালথাসের
মতো করে
নয়, বিশ্ব
পরিবেশকে যেভাবে
বিকৃত ও
ধ্বংস করে
চলছি, সেদিকে
তাকিয়েই আদৌ
নিশ্চিন্ত বোধ
করতে পারি
না। বিশ্ব
জনসংখ্যা দ্বিতীয়
মহাযুদ্ধের পর
ছিল ২০০
কোটি। এখন
তা ৭০০
কোটি পেরিয়ে
৮০০ কোটির
দিকে দ্রুত
এগিয়ে চলেছে।
মানুষের অধিকার
বাড়ানো মানে
প্রকৃতিকে বিনষ্ট
করা। তা
থেকে ক্ষয়ক্ষতির
আশঙ্কা যেসব
ভূখণ্ডে সবচেয়ে
বেশি বাংলাদেশ
তাদের অন্যতম।
সমগ্র বিশ্বের
প্রেক্ষাপটে সম্পদের
ন্যায়সম্মত বণ্টন
কীভাবে করা
যায়, সেটি
দেখার।
আরো একটি
বিষয় ভাবায়,
তা হলো
আমাদের শিল্পায়নের
ধরন। শ্রমঘন
অদক্ষ প্রযুক্তিনির্ভর
ও অস্বাস্থ্যকর
পরিবেশে এ
কারবার বিশ্বমন্দার
সময়েও, বলা
চলে তার
কারণেই, ফুলে-ফেঁপে
উঠেছে। সামাজিক
প্রভাবপ্রতিপত্তির বিন্যাসেও
স্বদেশে তার
প্রভাব পড়েছে।
কোনো মূল্যবোধ
আরোপ না
করেও অনুমান
করি, এতে
মুদ্রার পুরনো
আচরণবিধি ‘গ্রেশামস
ল’ চালু
হওয়ার আশঙ্কা।
একই রকম
প্রতিক্রিয়া ঘটে
চলেছে আমাদের
জনসংখ্যা রফতানি
কার্যক্রমের অনুসরণে।
বাস্তব এই,
যেসব অঞ্চলে
তাদের রফতানি,
সেগুলো প্রাকৃতিক
সম্পদে ধনী,
কিন্তু জীবন-ভাবনায়
দীন। আমাদের
অর্ধশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন
দরিদ্র রফতানীকৃত
মানবসম্পদ কোনো
মুক্ত মন
নিয়ে দেশে
ফেরে না।
এদিকে তাদের
পাঠানো উপার্জনে
গ্রামে তাদের
পরিবারের জৌলুশ
বাড়ে। উচ্চাভিলাষী
যারা, তারা
শহরে বসতি
গড়ে। জনসংখ্যার
নিবেশনে এখানেও
একই গ্রেশামস
ল বিকৃতি
ঘটিয়ে চলেছে।
আগামী দিনের
বাংলাদেশে এর
কি কোনো
প্রভাব পড়বে
না?
এরই বিপরীতমুখী
আর একটা
স্রোত একাত্তরের
পর থেকেই
বইতে শুরু
করে। জনসংখ্যা
রফতানি নীতির
মতো তেমন
চোখে পড়ে
না, কিন্তু
আমার বিবেচনায়
তাতে আর
এক ধরনের
বিপর্যয় নিঃশব্দে
আমাদের গ্রাস
করছে। আমাদের
মেধাবী ছেলেমেয়েরা
পাশ্চাত্যের উন্নত
বিশ্বে নিজেদের
যোগ্যতার উপযুক্ত
স্বীকৃতি পেলে
আর ফিরে
আসে না।
সেসব জায়গায়
আমাদের ডায়াস্পোরা
গড়ে উঠতে
থাকে। দেশে
মেধার তুলনামূলক
ঘাটতি বাড়ে।
ব্যাপারটার সংক্রমণ
চোখে পড়ার
মতো। বঙ্কিম
যাদের বলেছিলেন
‘চশমা
নাকে বাবু’
আমাদের সে
শিক্ষিত বাঙালি
সম্প্রদায়ের আজকের
ধ্যান-জ্ঞান,
তারা অভিবাসী
হবেন, তাদের
বাবা-মা
বছরে-দুবছরে
অন্তত একবার
তাদের ‘ভিজিট’
করে আসবেন।
এমনটি পঞ্চাশের
দশকে ছিল
না। তাই
ভাষা আন্দোলন
হয়েছে। বাংলাদেশের
ভিত্তি রচিত
হয়েছে।
সনৎকুমার সাহা:
প্রাবন্ধিক
ও অর্থনীতিবিদ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক’





