ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিংবা ব্রিটিশ শাসনের সূত্রেই দক্ষিণ এশিয়ার মাটিতে ক্রিকেট খেলার সূচনা। একটি মত অনুসারে ভারতবর্ষের মাটিতে প্রথম ক্রিকেট ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৭২১ সালে। এটি হয়েছিল ক্যাম্বেতে। আরেকটি মত অনুসারে সেটা হয়েছিল ১৭৫১ সালে। মাঠে ব্রিটিশ সেনাদের দল মুখোমুখি হয়েছিল ভারতে বসবাসরত সিভিলিয়ান ব্রিটিশ নাগরিকদের। ব্রিটিশদের কাছ থেকে শুরুতেই খেলাটি গ্রহণ করেছিল ভারতের পার্সি সম্প্রদায়। ১৭৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতা ক্রিকেট ক্লাব। এটি দুনিয়ার দ্বিতীয় পুরনো ক্রিকেট ক্লাব। প্রতিষ্ঠার ১০ বছরের মাথায় কলকাতা ক্রিকেট ক্লাব ইটনিয়ানদের সঙ্গে একটি ম্যাচ আয়োজন করেছিল। এ ম্যাচে ইটনিয়ানদের রবার্ট ভ্যানসিটার্ট সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন। এটাই ভারতবর্ষের মাটিতে কোনো ক্রিকেটারের প্রথম ‘শতক’। এসব যখন ঘটছিল তখন স্থানীয়রাও বিদেশী শাসকদের এমন ‘অভিজাত’ খেলাকে অনুকরণ করতে চাইল। কোম্পানির ভারতীয় সেনারা ক্রিকেট খেলতে শুরু করে। এমন সময় ক্রিকেট নিয়ে একটি চমকদার খবর পাওয়া যায়, এতদিনের কেন্দ্র মাদ্রাজ থেকে বহু মাইল দূরে—পূর্ববঙ্গের কোণে থাকা সিলেটে। সিলেটে কোম্পানির একটি রেজিমেন্টে দেশী সিপাহিরা তাদের ইংরেজ কর্তাদের সঙ্গে ক্রিকেট ম্যাচ খেলে। অনেকে ম্যাচটিকে ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে। ১৮৪৫ সালের ৩ মার্চ স্পোর্টিং ইন্টেলিজেন্স ম্যাগাজিনে এ ম্যাচ নিয়ে বিস্তারিত প্রকাশ হয়েছিল। ‘সিপয় ক্রিকেট’ শিরোনামে আরেকটি ব্রিটিশ পত্রিকায়ও এ ম্যাচ নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়। একজন প্রতিবেদক নিজে খেলাটি দেখেছিলেন। অরেকটি পত্রিকার শিরোনাম ছিল ‘সিপয় ক্রিকেট অ্যাট সিলেট’। এ প্রতিবেদনে বলা হয়, রেজিমেন্টের দুটি দলের মধ্যে খেলা হয় এবং প্রতি দলে অন্তত আটজন করে স্থানীয় সিপাহি খেলেছিল। সিপাহি সুফুলের নাম পাওয়া যায়, যার বোলিং সেদিন সবার প্রশংসা পেয়েছিল। স্পোর্টিং ইন্টেলিজেন্স ম্যাগাজিনে একজন লিখেছিলেন:
সবচেয়ে উৎসাহী
ইউরোপীয় ক্রিকেটাররাও
এ স্থানীয়
সিপাহিদের চেয়ে
বেশি শক্তি
আর উল্লাস
নিয়ে খেলতে
পারবে না।
আমি নিজে
কোনো ক্রিকেটার
নই, তবে
ম্যাচের একজন
দর্শক ছিলাম।
খেলায় অংশ
নেয়া বা
দর্শক অফিসারদের
প্রশংসা স্থানীয়
সিপাহিদের উত্ফুল্ল
করেছিল। সুফুল
ছাড়াও রুস্তম
ও মারওয়ান
সিং নামে
আরো দুজন
খেলোয়াড়ের ভালো
পারফরম্যান্সের খবর
জানা যায়।
এ লেখক আরো আশা প্রকাশ করেছিলেন যে ভারতীয় সিপাহিরা এক বা দুই মৌসুমের মধ্যেই দক্ষ ক্রিকেটার হয়ে উঠবে। ১৮৩৩ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে সেনাবাহিনীর সিপাহিরা কটক, সিলচর, ব্যারাকপুর, দমদম, আগ্রা, মেদিনীপুর ও সিলেটে অনেক ম্যাচ খেলেছিল।
ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ কর্মকর্তারা অনেক সময়ই একাকী বোধ করেছেন, অনেকে খাবার, ভিন পরিবেশে মানসিক বিষাদে আক্রান্ত হয়েছেন। নীরদ চৌধুরী একবার বলেছিলেন, এমন ইংরেজদের জন্য সাহিত্য ছিল স্ত্রী আর খেলাধুলা ছিল রক্ষিতার মতো। বই আর ঘর কিংবা মাঠের খেলাতেই তারা শান্তি খুঁজতেন। থমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে আশ্রয় খুঁজেছিলেন প্লুটার্কের লাইভস আর হেরোডটাসের ইতিবৃত্তে। এক প্রজন্ম পরে উইনস্টন চার্চিল দক্ষিণ ভারতের গরমে অতিষ্ঠ হয়ে সময় কাটাচ্ছিলেন ম্যাকলের জীবনী পড়ে।
তবে সবাই তো আর এমন পণ্ডিত কিংবা পড়ুয়া ছিলেন না। তারা এ ভিনগ্রহে মুক্তি খুঁজেছিলেন খেলার মাঠে। রামচন্দ্র গুহ উল্লেখ করেছেন, ভারতে প্রথম ক্রিকেট খেলার উল্লেখ পাওয়া যায় ১৭২১ সালে। ক্যাম্বে বন্দরে ব্রিটিশ নাবিকরা নিজেদের মধ্যে এ খেলা খেলেছিলেন। এক নাবিক লিখেছেন, আমাদের জাহাজ যখন একটি খাঁড়িতে দিন পনেরোর জন্য অবস্থান করছিল, তখন আমরা প্রতিদিনই ক্রিকেট খেলতাম। ওখানে প্রচুর কুলির বাস ছিল। তারা আমাদের খেলা দেখতে আসত। একজন নৌ-কর্মকর্তা লিখেছেন, আমাদের সেনাদের জন্য তাদের ব্যারাকের পাশেই ক্রিকেট মাঠ বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। মহারানীর জাহাজে ব্যাট ও বল থাকত। বাতাস ও আবহাওয়া পক্ষে থাকলে ক্রিকেট খেলা হতো।
এভাবে ব্রিটিশ পতাকার মতো ক্রিকেটও প্রথমিকভাবে জায়গা করে নিয়েছিল ভারতের উপকূলীয় এলাকায়। ভারতীয় ক্রিকেটের প্রথম হ্যাট্রিক, প্রথম টাই ম্যাচ ও প্রথম শতক—সবই ছিল সামরিক সদস্যদের। কলকাতা ক্রিকেট ক্লাব ইটনিয়ানদের সঙ্গে যে ম্যাচ আয়োজন করেছিল সেখানেই প্রথম ক্রিকেট বাজির প্রচলন হয়।
১৭৯২ সালে মাদ্রাজে ক্রিকেট খেলা জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কথা জানা যায়। ১৮২৫ সালে বোম্বে গেজেট পত্রিকায় ক্রিকেট রিভাইভড শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয়:
ক্রিকেট খেলোয়াড়রা
শীত মৌসুমের
জন্য তাদের
অনুশীলন শুরু
করতে যাচ্ছেন।
খেলার সূচিতে
হ্যাম্পশায়ার, সাসেক্স
ও কেন্টের
মতো অনেক
কাউন্টির খেলোয়াড়দের
কুইন রয়্যালসের
সদস্যদের সঙ্গে
বেশ কয়েকটি
ম্যাচ আছে
খেলার সূচিতে।
র্যাকেট কোর্টের
কাছের মাঠে
বিকাল ৪টায়
সবাই জমায়েত
হবে এবং
তখন খেলাও
শুরু হবে।
শীতকালে প্রতি
বৃহস্পতিবার এমন
সময়েই খেলা
হবে।
নারীদের বসার
জন্য তাঁবুর
ব্যবস্থা হবে।
আর যেহেতু
ক্রিকেটাররা যথাযথ
ইউনিফর্ম পরে
আসবেন তাই
আমরা আশা
করছি এ
দ্বীপের সবচেয়ে
সুন্দর একটি
দৃশ্যের অবতারণা
হবে।
যেহেতু দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী এবং একই সঙ্গে কুখ্যাত ঔপনিবেশিক শক্তির হাত ধরে প্রচলিত হলো, তাই এর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক। রামচন্দ্র গুহসহ অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ভারতের মাটিতে ব্রিটিশদের ক্রিকেট খেলা শুরু করার পেছনে কোনো সক্রিয় রাজনৈতিক কিংবা আর্থসামাজিক কৌশল ছিল না। বরং এটা তারা এই বিদেশে স্রেফ নিজেদের বিনোদনের জন্যই চালু করেছিল। ভারতে তখন ইংরেজ পুরুষদের মাথায় ঝুলত মৃত্যুর খড়্গ—যুদ্ধ নয়তো, ভিনদেশে কোনো প্রাণঘাতী রোগ। এমন জীবনে খেলাধুলাই ছিল তাদের অন্যতম সান্ত্বনা। ক্রিকেট খেলতে খেলতে তারা তাদের ইংল্যান্ডের জীবনকে কিছু সময়ের জন্য হলেও ফিরে পেত। রামচন্দ্র এখানে একটু আগে উদ্ধৃত করা ঘোষণা থেকে একটি শব্দের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন—‘খেয়াল করলে দেখা যাবে বোম্বেতে ক্রিকেট নিয়ে ঘোষণাটিতে “আমাদের দ্বীপ” শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয়েছে। ক্রিকেটের এই আনন্দের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশরা কল্পনা করত যে তারা দেশকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে।’
রামচন্দ্র গুহ আরো লিখেছেন, ‘অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় শুরুতে স্থানীয়দের ক্রিকেট খেলা শেখানোর কোনো ইচ্ছা ব্রিটিশদের ছিল না। খেলাটি তারা ইংল্যান্ডে বসে তৈরি করেছে এবং ভারতের মাটিতে খেলেছে ভিনদেশের অচেনা পরিবেশের ক্লান্তি কাটাতে। খেলাটি বিস্তৃত হয়েছিল আরেকটি ব্রিটিশ উদ্ভাবনের হাত ধরে—সামাজিক ক্লাব। শহর, ক্যান্টনমেন্ট এবং অনেক সময় বিরান জায়গাতেও ইংরেজদের এসব ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিদেশ বিভূঁইয়ে বসবাসকারীদের সামাজিক জীবন ছিল এই ক্লাবকেন্দ্রিক। এগুলোতে বইয়ের সংগ্রহ সামান্য হলেও তারা খেলাধুলা ও মদ্যপানের অবারিত সুযোগ তৈরি করেছিল।’
কলকাতা ক্রিকেট ক্লাব ও মাদ্রাজ ক্রিকেট ক্লাবে ব্রিটিশ খাবার ও বিনোদনের ব্যবস্থা ছিল। ভারতীয়দের জন্য ছিল জিমখানা। নামটি এসেছিল গেন্ড-খানা বা বল-ঘর থেকে। জিমখানার সদস্যরা যেসব খেলা খেলত সেগুলো সবই ইংরেজ সাহেবদের—হুইস্ট (কার্ড গেম), বিলিয়ার্ড, টেনিস এবং সর্বোপরি ক্রিকেট। অন্য খেলাগুলোর তুলনায় ক্রিকেট ছিল দলগত, বেশি সময় নেয়া এবং বেশ আনুষ্ঠানিক। বড়-সবুজ-পরিচ্ছন্ন মাঠ, সাদা পোশাক, খেলার আনুষ্ঠানিকতা, লাঞ্চ-টি ব্রেক—সব মিলিয়ে ক্রিকেট ময়দানে ইংরেজরা যেন ইংল্যান্ডের সংস্কৃতিকে খুঁজে পেতেন।
শুরুতে বিষয়টি ছিল শাসকরা খেলবেন আর দরকারি ফুট ফরমায়েশ খাটবেন ভারতীয়রা। ১৮৪০-এ কলকাতা ক্রিকেট ক্লাবের একটি বিবরণীতে চিত্রটি পাওয়া যায় ভালোভাবেই—
ক্রিকেট ময়দানে
দুটো প্রশস্ত
তাঁবু থাকত।
এগুলো আয়না,
সোফা, চেয়ার
দিয়ে চমৎকারভাবে
সাজানো থাকত।
খেলোয়াড়দের চাহিদামতো
সিগারেট, বরফ
দেয়া সোডা-ওয়াটার
ও শ্যাম্পেন
রাখা হতো।
এগুলো পরিবেশন
করত পাগড়ি
পরা ভারতীয়রা
এবং তারা
খেলার মূল
স্পিরিটে কখনোই
প্রবেশ করতে
পারতেন না।
বোম্বে ও কলকাতার মতো বন্দর নগরীতে ক্লাবের সংখ্যা ছিল বেশি এবং ক্রিকেট খেলার দরকারি সামগ্রী সহজে ইংল্যান্ড থেকে আনানো যেত। তাই এসব শহরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে ইংরেজদের সমাজ বেশ সরগরম ছিল। ক্রিকেট যে ভিন সংস্কৃতিতে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়া ইংরেজদের জন্য হাঁফ ছাড়ার উপলক্ষ হয়েছিল সে প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। তামিলভূমিতে শুষ্ক এক এলাকায় লবণ ও আবগারি বিভাগে চাকরি করতেন এক কর্মকর্তা। সে সময় মাদ্রাজ থেকে গোলন্দাজ বিভাগের একটি সেনাদল সে এলাকায় আসে। ব্যস, সুযোগ পেয়ে লবণ ও আবগারি বিভাগ সেই সেনাদের সঙ্গে ক্রিকেট সিরিজ খেলে ফেলেছিল। সেনাদের দলে সবাই ছিলেন ব্রিটিশ আর এদিকে তিনজন স্থানীয়কে যুক্ত করা হয়। মাঠ পরিচর্যা আর পিচ তৈরিতে কাজ করেছিল স্থানীয়রাই। পিচে নারকেলের ছোবড়া বিছানো হয়েছিল। অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার জন্য লবণ ও আবগারি বিভাগের ইংরেজ কর্তারা তাদের স্বজাতির সেনা সদস্যদের কাছে দুঃখ প্রকাশও করেছিলেন।
প্রাথমিককালের অনেক বিবরণী, ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় ভারতীয়রা শুরুতে ক্রিকেটের প্রতি বিশেষ কোনো আকর্ষণ বোধ করেনি, বরং এ খেলা তাদের কাছে সাহেবদের পাগলামি মনে হতো। রোদের মধ্যে চামড়ার বল-ব্যাটের পিটাপিটি আর মাঠ জুড়ে দৌড়ানোর মধ্যে কী আনন্দ আছে সেটা তাদের কাছে বোধগম্য ছিল না।
ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম ক্রিকেট খেলায় নাম লিখিয়েছিল বোম্বের পার্সিরা। এরা তখন ছিল একটি মুত্সুদ্দি গোষ্ঠী। ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতা ছিল তাদের অর্থনৈতিক সুবিধার জরুরি কাজ। ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার্থে তারা গুজরাট থেকে বোম্বেতে পাড়ি জমায়। ব্রিটিশ পোশাক, ইংরেজি খাবারের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেটকেও তারা গ্রহণ করে। এ বোম্বেতেই ভারতীয় ক্রিকেটের সূচনা ও বিকাশ।
এসএম রশিদ: লেখক





