ভারতে মূলধারায় ক্রিকেট জনপ্রিয় হওয়ার আগেই প্রতিষ্ঠিত হয় ক্রিকেট ক্লাব। তৎকালীন ব্রিটেনের বাইরে প্রথম ক্লাব ভারতেই প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাবই ভারতীয় ক্রিকেটের প্রথম ক্লাব। রামচন্দ্র গুহ জানাচ্ছেন, ‘ক্লাবটি ফোর্ট উইলিয়ামকে ঘিরে থাকা বহু ময়দানে খেলেছে, যার মধ্যে বেশির ভাগই ছিল ক্রিকেটের অনুশীলন।’ এসব খেলার বেশির ভাগই নৈশভোজ ও নাচের মধ্য দিয়ে শেষ হতো। ব্রিটিশ আমলের সেটাই ছিল কেতা। প্রতিষ্ঠার বারো বছর পরে ক্লাবটি একটি ‘বড় ম্যাচ’ আয়োজন করে। এতে ওল্ড ইটোনিয়ানসের বিরুদ্ধে কমসংখ্যক সদস্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ওল্ড ইটোনিয়ানসরা এ ম্যাচে জয়লাভ করে।
ওই একই বছর মাদ্রাজেও একটি ম্যাচ খেলার কথা জানা যায়। ওই তারিখে ড্যানিয়েলসের আঁকা একটি চিত্রকর্ম থেকে এ ধারণা করা হয়। তবে ক্রিকেট ক্লাব হলেও এ ধরনের ক্লাব মূলত ‘ক্লাব কালচার’ই অনুসরণ করত। অর্থাৎ খেলার পাশাপাশি সেখানে সামাজিক জমায়েতের একটি সংস্কৃতি প্রচলিত ছিল। নৈশভোজ ও নাচের কথা থেকেই এ বিষয়টি বোঝা যায়। ক্যালকাটা ক্লাবের মতো মাদ্রাজ ক্রিকেট ক্লাবেও ইংরেজি খানা ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা হতো। তবে কলকাতা ও বোম্বের ক্লাবে সব ধরনের সরঞ্জাম সহজে পাওয়া যেত।
ভারতের ক্রিকেট ক্লাব সম্পর্কে এ জি ব্যাগট তার স্পোর্ট অ্যান্ড ট্র্যাভেল ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড সেন্ট্রাল আমেরিকায় স্মৃতিচারণ করেছেন। ব্যাগট উল্লেখ করেছেন ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ভারতের মানুষের মধ্যে ক্রিকেট নিয়ে তেমন কোনো সচেতনতা ছিল না। তবে সে সময়েই কলকাতার দক্ষিণাঞ্চলে ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬৪ সালে বালিগঞ্জ ক্লাবের শতবর্ষ উদযাপিত হয়। বার্নার্ড ওয়েনের মতে, বালিগঞ্জ ক্রিকেট ক্লাব ছিল মূলত ইংল্যান্ডের খেলা বা তাদের ব্যবস্থাপনারই একটি দিক। সেটি কখনো পুরোপুরি ভারতীয় হয়ে উঠতে পারেনি। তবে খেলা কখনো সময়মতো শুরু হতো না। আলস্য উদযাপনের বা উপভোগের একটা স্বাভাবিক অভ্যাস দেখা যেত সবার মধ্যে।
ভারতের ক্রিকেটে পার্সিরা এগিয়ে ছিলেন সে কথা পাঠক এরই মধ্যে জেনেছেন। পার্সিদের প্রথম ক্রিকেট ক্লাব তৈরি হয় ১৮৪৮ সালে। পার্সি যুবকদের তৈরি এ ক্লাবের নাম ছিল ওরিয়েন্টাল ক্রিকেট ক্লাব। অবশ্য প্রতিষ্ঠার দুই বছরের মধ্যে ক্লাবটি ভেঙে যায়। এরপর ইয়ং জোরোয়্যাস্ট্রিয়ান ক্লাব নামে পুনর্গঠিত হয়। দেড়শ বছর পার করেছে এ ক্লাবটি। ইয়ং জোরোস্ট্রিয়ানের পৃষ্ঠপোষক ছিল ওয়াদিয়া ও টাটা পরিবার। হিরাজী গোস্তা এ ক্লাবের কার্যনির্বাহী ছিলেন। ক্লাবের প্রত্যেক সদস্যের কাছ থেকে দুই আনা করে মাসিক চাঁদা নেয়া হতো। এ ক্লাবের সদস্যরা প্রায় প্রতিদিনই মাঠে খেলতে নামতেন। তবে শুরুতে তাদের খেলাও খুব একটা ‘ক্রিকেটীয়’ ছিল না। অনেক ক্ষেত্রেই হাস্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো।
ক্রিকেটে পার্সিরা শুরু থেকে এগিয়ে থাকলেও এরপর মাদ্রাজ খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এ খেলায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করে। ১৮৪৬ সালে মাদ্রাজ ক্রিকেট ক্লাব তৈরি হয়। চেপাউকে কর্ণাটকের নবাবের নিজস্ব জমিতে এ ক্লাবের খেলার মাঠ তৈরি হয়। এ ক্লাব নির্দিষ্ট বিরতিতে ইংরেজদের বিপক্ষে মাঠে নামত এবং কখনো কখনো জয়লাভও করেছে। বহু বছর পর্যন্ত মাদ্রাজের ক্রিকেট ও ক্লাব মূলত মাইলাপোরের নায়ুডু পরিবারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। মাদ্রাজের মতো পুনেতেও গড়ে ওঠে ক্রিকেট ক্লাব। এ ক্লাবে খেলেছিলেন সে সময়কার অন্যতম আলোচিত খেলোয়াড় বালু।
শুরুটা হয়েছিল ক্রিকেট খেলায় পার্সিদের একাধিপত্য দিয়ে। এরপর সেখানে যুক্ত হয় জিমখানা। ক্রিকেট ক্লাব বা ক্লাব-ক্রিকেট বলে আজ যা বোঝায় তার প্রাথমিক অবস্থা ছিল জিমখানা। এরপর পার্সি ক্লাব ও হিন্দু ক্লাবের মধ্য দিয়ে ক্লাবভিত্তিক ক্রিকেট শুরু হয় ভারতে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ক্রিকেটে ক্লাব সংস্কৃতি বিস্তৃত হয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ বারো বছরে ক্রিকেটকে ঘিরে গড়ে ওঠে: গৌড় সারস্বত ক্লাব, ক্ষত্রিয় ক্রিকেট ক্লাব, গুজরাটি ইউনিয়ন ক্রিকেট ক্লাব, মারাঠা ক্রিকেট ক্লাব, তেলেগু ইয়ং ক্রিকেটার্স। এর বাইরে ছোট পরিসরে ছিল আরো কিছু ক্লাব। ম্যাঙ্গালোরিয়ান ক্যাথলিক ক্রিকেট ক্লাব, পর্তুগিজ গোয়ার ইনস্টিটিউসো লুসো ক্রিকেট ক্লাব ও বোম্বের ইহুদিদের পৃষ্ঠপোষকতায় বোম্বে জুইশ ক্রিকেট ক্লাব। মোটের ওপর বলা চলে ভারতে ক্রিকেটের সূচনাকালে ক্লাবগুলো গড়ে উঠেছিল সম্প্রদায়ের ওপর ভিত্তি করে। এর অবশ্য ভিন্ন কারণ ও গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু মূল বিষয়টি হচ্ছে এসব ক্লাবের মাধ্যমেই ঊনবিংশ শতকে ভারতে ক্রিকেট বিস্তৃত ও জনপ্রিয় হয়।
আসরার আবেদিন: প্রাবন্ধিক





