ভারতীয় উপমহাদেশে ক্রিকেট এখন অন্যতম জনপ্রিয় খেলা। ফুটবল বেশি জনপ্রিয় না ক্রিকেট তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। তবে ক্রিকেট পিছিয়ে থাকবে না। বিশ্বকাপ, টি২০, আইপিএল থেকে বিপিএল—সব ধারার ক্রিকেটেরই আছে দর্শক, আছে জনপ্রিয়তা। সব বয়স, ধর্ম, জাতের মানুষই ক্রিকেট উপভোগ করে। কিন্তু শুরুতে ক্রিকেট এমন সর্বোতভাবে গৃহীত হয়নি। উপমহাদেশে, বিশেষত ভারতেই ক্রিকেট প্রথম জনপ্রিয় হয়েছিল এবং সেই সূচনার আছে নিজস্ব ইতিহাস। এর সঙ্গে আবার জড়িত ধর্ম ও সম্প্রদায়। যেমন ভারতে ক্রিকেটে প্রথম আগ্রহ দেখিয়েছিল পার্সি সম্প্রদায়। তারাই ক্রিকেটকে এগিয়ে নেয়। এরপর ক্রিকেটে যুক্ত হয় হিন্দুরা এবং পরবর্তীকালে ভারতের ক্রিকেট পেয়েছে হিন্দুদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ক্রিকেটে যুক্ত হয়েছে বহু হিন্দু খেলোয়াড়।
ভারতের ক্রিকেটে হিন্দুদের সংযুক্তির বিষয়টি একজন খেলোয়াড়ের সংযুক্তির মধ্য দিয়ে নির্দেশ করা যায়। ১৮৬১ সালে রামচন্দ্র বিষ্ণু নাভেলকর নামে এ খেলোয়াড় মাঠে নেমেছিলেন বলে জানা যায়। পাঁচ বছর পর তার উদ্যোগে বোম্বে ইউনিয়ন ক্রিকেট ক্লাব তৈরি হয়। মজার ব্যাপার হলো মারাঠি এ খেলোয়াড় ছিলেন ‘প্রভু’ গোত্রের হিন্দু। তার চালু করা ক্লাবেও কেবল প্রভু গোত্রের খেলোয়াড়দেরই সুযোগ দেয়া হয়। এদিকে এলফিনস্টোন কলেজে পার্সিরা ক্রিকেটে এগিয়ে গিয়েছিল। ফলে সেখানকার হিন্দু ছাত্ররাও পার্সিদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে। ১৮৭৭ সালে কয়েকজন মারাঠি হিন্দু ছাত্র মিলে হিন্দু ক্রিকেট ক্লাব তৈরি করে। মাসে ২ আনা চাঁদা দিতেন এ ক্লাবের প্রত্যেক সদস্য। কিছুদিন পর গুজরাটি হিন্দু ব্যবসায়ীরা আর্থিক সহায়তা দেয়া শুরু করলে সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে।
ক্রিকেটের অনুশীলন পার্সিরা শুরু করেছিলেন হিন্দুদের আগে থেকে। ফলে তারা কৌশল ও সুযোগের ক্ষেত্রে ছিলেন এগিয়ে। তাদের খুব একটা সহযোগিতাও করা হয়নি। এলফিনস্টোন কলেজের হিন্দু ছাত্ররা এ নিয়ে কলেজের কাছে অভিযোগও জানিয়েছে। পার্সিরা মূলত ইংরেজদের অনুসরণে ক্রিকেট খেলা শিখে নিয়েছিল ততদিনে। আর এদিকে হিন্দুরা ধুতি পরে খালি পায়ে খেলতে নেমে পিছিয়ে পড়ত প্রতিবার। ব্যাপারটা অনেকটাই আমির খানের ‘লগান’ সিনেমার মতো। সেখানে যেমন গ্রামের লোকজন ক্রিকেটের ‘অ আ ক খ’ না জেনেই প্রস্তুত হচ্ছিল, ক্রিকেট খেলা শুরু করার সময় হিন্দু ক্লাবের অবস্থাও একই রকম ছিল। এ কারণে পার্সি ও ইংরেজদের বিদ্রূপেরও শিকার হয়েছেন হিন্দুরা। তবে এ থেকে ক্রিকেটে তাদের উচ্চাভিলাষ বেড়েছে বৈ কমেনি।
ভারতের ক্রিকেটের সূচনার সময় পার্সি ও হিন্দুদের দ্বৈরথ মাঠে গড়িয়েছিল। ব্যাপারটা এমন নয় যে তারা সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন। দ্বৈরথটা ছিল খেলাতেই। প্রতি সপ্তাহে হিন্দু ও পার্সিদের মধ্যে ম্যাচ খেলা হতো। ময়দানে তারা নামতেন নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের জন্য। মজার ব্যাপার হলো এখন যেমন খেলার মধ্যে জাতীয়তাবাদের একটা ধুয়া উঠেছে—খেলায় জয়লাভ মানে দেশের জয়—সেকালে সম্প্রদায়কে বড় করে দেখানোর হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল ক্রিকেট। এর বাইরে খেলাটিকে পৌরুষ প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন খেলোয়াড়রা।
পরবর্তী সময়ে ক্রিকেটসহ অন্যান্য খেলার ক্ষেত্রে ভারতে জিমখানা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৮৭৫ সালে বোম্বে জিমখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর বলা চলে জিমখানা হয়ে ওঠে খেলার কেন্দ্রবিন্দু। ফুটবল, ক্রিকেট ও পোলো খেলার অনুশীলন, পরিকল্পনা হতো এখানে। কিন্তু সেখানে ভারতীয়দের প্রবেশাধিকার ছিল না। বোম্বের সাত হাজার ইউরোপীয়দের মধ্যেও কেবল অভিজাত ও ‘বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন’ ব্যক্তিরা এর সদস্য হওয়ার সুযোগ লাভ করতেন। ভারতীয়রা বাবুর্চি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে সেখানে কাজ করার সুযোগ পাওয়ার পাশাপার্িশ ক্রিকেটারদের প্রবেশাধিকার ছিল। সেখানে অবশ্য হিন্দু বা পার্সির পার্থক্য করা হতো না। এ সময় পোলো ও ক্রিকেট নিয়ে একটি সংকট চলতে থাকে। পোলো খেলার জন্য জিমখানায় বেশি জায়গা ছিল। বহুদিন ধরে পোলোই অন্যতম জনপ্রিয় খেলা থাকার কারণে এমন হয়েছিল। এ সময় পার্সি ও হিন্দু খেলোয়াড়রা মিলে একটি পিটিশনের মাধ্যমে ক্রিকেটের জন্য বেশি জায়গার দাবি জানায়। এ সবকিছু ঘটছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে।
এই সময়ের মধ্যে বোম্বের হিন্দুরা ক্রিকেটে উন্নতি করতে থাকে। এর মধ্যে কচ্ছের রাও শ্রী খেঙ্গারি তিনটি পুরস্কার লাভ করেন। ১৮৮২ সালে হিন্দু ক্রিকেট ক্লাব একটি ব্রিটিশ দল কার্লটন ক্রিকেট ক্লাবকে পরাজিত করে। এর মধ্য দিয়ে হিন্দুরা জিমখানারও মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। পরের বছর জিমখানা হিন্দু সিক্সটিনের বিরুদ্ধে খেলতে রাজি হয়। ১৮৮৬ সালে খেলাসংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি ১৯ পৃষ্ঠার একটি নীতিমালা তৈরি করেন। Rules and Regulations of the Hindu Cricket Club নামে এ নীতিমালায় সদস্যদের পাঁচ শ্রেণীতে বিভক্ত করে তাদের প্রদেয় চাঁদার পরিমাণ নির্দিষ্ট করা হয়।
ক্রিকেট নিয়ে বা আরো স্পষ্ট করে বলা যায় ক্রিকেটকে আশ্রয় করে নিজেদের সেরা প্রমাণ করার একটি চেষ্টা পার্সি ও হিন্দুদের মধ্যে দেখা যায়। ১৮৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পার্সিদের পত্রিকা রাস্ত গোফতার লিখেছিল—পার্সিরা যেভাবে সফল হচ্ছে তা দেখে ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ও এক্ষেত্রে নিজেদের এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে। রামচন্দ্র গুহ রচিত এ কর্নার অব আ ফরেন ফিল্ড বইয়ে তিনি এক পার্সি খেলোয়াড়ের কথা উল্লেখ করেছেন। ফেরামজি প্যাটেল নামে এ খেলোয়াড়ের ভাষায়, ‘It is the opinion of many
teachers that the Parsee boy takes to cricket as a duck takes to water. The
Hindu is slow in learning it, but once attracted by the game he goes on
improving.’
আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রিকেটে হিন্দুরাও এগিয়ে ছিল। চিন্তা করতে অবাক লাগলেও সত্য করাচিতে ক্রিকেটের ক্ষেত্রে হিন্দুরা ছিল এগিয়ে। এদের মধ্যে অবশ্য বেশির ভাগই উচ্চবর্ণের হিন্দু ছিলেন। সিন্ধের জিএ ক্যানসের নামে একজন ক্রিকেটার ছিলেন। তিনি হিন্দু ইউনিয়ন ক্রিকেট ক্লাব তৈরি করেন। ৯ পয়সা থেকে ২ রুপি পর্যন্ত চাঁদা দিতেন এর সদস্যরা। এর মধ্যে ক্লাবের সুবর্ণ সময়ে সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৪০। নিয়মিতই মাঠে নামতেন তারা। কিন্তু খেলার জন্য উপযুক্ত জায়গা ছিল না। ক্যানসেরের পরিবার সরকারের কাছে আবেদন করে ক্রিকেট খেলার জন্য করাচিতে আলাদা স্থানের ব্যবস্থা করেন। তার আত্মজীবনী থেকে জানা যায় করাচিতে ক্রিকেটের ক্ষেত্রে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে সৌহার্দ্য ছিল।
আজকের দিনে এসে ক্রিকেট সাধারণ মানুষের জন্য সময় কাটানো বা বিনোদনের মাধ্যম। খেলোয়াড়দের জন্য জীবিকা, প্রচারমাধ্যম ও খেলুড়ে দেশের জন্য ব্যবসার হাতিয়ার। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই খেলার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এমনকি ব্যক্তিও মুনাফা অর্জন করে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতের ক্রিকেট মূলত আজকের মতো না হলেও এ বিষয়গুলোর কিছু কিছু তার মধ্যে কাজ করেছে। ক্রিকেটকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠে পার্সি ও হিন্দু জিমখানা। পাশাপাশি মুসলমানদের মধ্য থেকেও অনেকে ক্রিকেটে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তবে সেটা আরো পরের কথা। ভারতে ক্রিকেটের শুরুটা মূলত ছিল পার্সি ও হিন্দুদের মধ্যে একটা ঠাণ্ডা মর্যাদার লড়াই। সেটাতে হিন্দুরা ধীরে ধীরে নিজেদের উন্নত করে পার্সিদের ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।
ক্রিকেটে ভারতীয় হিন্দুদের এই প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল নতুন নতুন ক্লাব। সেখানে আবার নিজেদের মধ্যেও কিছু দ্বন্দ্ব ছিল। যেমন উচ্চবর্ণের না হলে সব সময় সুযোগ পাওয়া যেত না। আশুতোষ গোয়ারিকর ভারতীয় ক্রিকেটের সূচনার ইতিহাস পড়েছিলেন কিনা জানি না, কিন্তু ‘লগান’ সিনেমায় ভুবনের দল গঠনের সময়ও এ রকম পরিস্থিতির চিত্র তিনি রেখেছেন। কাচরা চরিত্রটিকে দলে নেয়ার ক্ষেত্রে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু খেলার ক্ষেত্রে একটি বড় বিষয় হলো জাতপাত এড়িয়ে যাওয়া। সেটা অর্জন করতে ভারতকে অনেকটা সময় দিতে হয়েছিল। স্পোর্টস স্পিরিট বলে যে কথাটা আছে সেটা এখনো অর্জিত হয়েছে কিনা বলা কঠিন, তবে ক্রিকেটের ক্ষেত্রে ভেতরকার রাজনীতি থাকলেও জাতীয় দলে নানা ধর্মের খেলোয়াড়দেরই দেখা যায় এখন। ক্রিকেট কেবল পার্সি বা হিন্দুদের থাকেনি।
মাহমুদুর রহমান: লেখক





