বলা হয় ‘ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেট’। কিন্তু এ খেলায়ও বর্ণবৈষম্যের ঘটনা রয়েছে। গত শতাব্দীতে দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবৈষম্যের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত ছিল। ভারতীয় ক্রিকেটও এ অভিশাপ থেকে মুক্ত নয়। তবে ভারতীয় ক্রিকেটে বর্ণবৈষম্য কাজ করেছে ভিন্নভাবে। কেননা বর্তমানে ভারতে ক্রিকেট যেভাবে অনুভব করা হয়, অতীতে কিন্তু সেভাবে ছিল না। ব্রিটিশরা বিভক্তি ও শাসননীতির অংশ হিসেবে খেলাটি ভারতে আমদানি করে এবং সফলভাবে তাদের গোপন অভিসন্ধি বাস্তবায়ন করে। ধর্মের ভিত্তিতে পাঁচদলীয় প্রতিযোগিতা, যা বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে একে অন্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছিল, তা এ সত্যের উজ্জ্বল প্রমাণ।

উনিশ শতকের শেষ লগ্নে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ভারতের মাটিতে একজন অচ্ছুত খেলোয়াড় ছিলেন। তার নাম বাবাজি পালওয়ানকর বালু। তিনি ছিলেন ধীরগতির বোলার, বিশেষ করে বাম হাতি অর্থোডক্স স্পিনার। তিনি বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ভারতীয় ক্রিকেট জগতে একজন ‘আনসাং হিরো’ (অঘোষিত নায়ক) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি হিন্দু ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন তবে দলিত সম্প্রদায়ের, অর্থাৎ অচ্ছুত বা নিম্ন বর্ণের। এ কারণে তাকে নিয়ে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা আছে ক্রিকেট মাঠে ও মাঠের বাইরে।

প্রারম্ভিক জীবন ও ক্রিকেটে অভিষেক

পালওয়ানকর বালু ১৮৭৬ সালের মার্চে ধারওয়াদে চামড়া শ্রমিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। পালওয়ানকরের পারিবারিক নামটি তার নিজের গ্রাম পালওয়ান থেকে এসেছে। তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য স্কুলে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসুবিধার কারণে তাকে লেখাপড়া বাদ দিতে হয়েছিল।

বালু ও তার ভাই শিবরাম পুনে শহরে অফিসারদের ফেলে দেয়া সরঞ্জাম দিয়ে ক্রিকেট খেলা শিখেছেন। তবে ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসেবে বালুর পরিচিতি ও অভিষেক খুব সহজে আসেনি। 

বালু পুনেতে (তৎকালীন পুনা) পার্সিদের ক্রিকেট ক্লাবে ৩ টাকা মাসিক বেতনে পিচ পরিচর্যার কাজ পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে (১৮৯২ সালে) তিনি ইউরোপীয়দের পুনে ক্রিকেট ক্লাবে চলে যান। কেননা ক্লাবটি ১৭ বছর বয়সী বালুকে ৪ টাকা মাসিক বেতনে কাজ দিয়েছিল। তিনি কাজ পেয়েছিলেন তার প্রতিভার জন্য নয়, বরং সেখানে তিনি অনুশীলন নেট তৈরি ও পিচ রোল করতেন এবং ঝাড়ু দিতেন। সেসব মাঠে ব্রিটিশরা একচেটিয়াভাবে অনুশীলন করত। এছাড়া মাঝে মাঝে তিনি টেনিস কোর্টের দাগ টেনে দিতেন। যা হোক, তখন তার প্রতিভা দেখে ব্রিটিশরা তাকে তাদের ব্যাটসম্যানদের বোলিং করার সুযোগ দিয়েছিল। ইউরোপীয়দের মধ্যে একজন মিস্টার ট্রস তাকে নেটে বল করার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। তার স্লো বাম হাতি বোলিং অনেককে মুগ্ধ করেছিল, বিশেষ করে ক্যাপ্টেন জেজি গ্রেগকে। কথিত আছে যে গ্রেগকে প্রতিবার আউট করার জন্য তিনি বালুকে ৮ আনা করে দিতেন। সে সময়ে বালু প্রথম স্পিন বোলিংয়ের দক্ষতা রপ্ত করেছিলেন। তিনি নেটে প্রচুর বোলিং করেছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাকে কখনো ব্যাট করার সুযোগ দেয়া হয়নি। কারণ তখন ব্যাটিংকে অভিজাত শ্রেণীর জন্য সংরক্ষিত হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ব্রিটিশদের প্রতি তার হতাশা বাড়তে থাকে।

কথায় আছে আগুন কখনো পোড়া ছাইয়ের নিচে চাপা থাকে না। বালুর প্রতিভার কথা শিগগিরই বোম্বেতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৮৯৬ সালে বালু তৎকালীন নতুন প্রতিষ্ঠিত পরমানন্দ জীবন দাস হিন্দু জিমখানার হয়ে খেলার জন্য নির্বাচিত হন। একই বছর পুনেতে ছড়িয়ে পড়া প্লেগের কারণে বালু তার পরিবারকে বোম্বেতে স্থানান্তর করেছিলেন। বোম্বে তাকে ভালো সুযোগ দিয়েছিল।

যদিও বালু ছিলেন একজন তুখোড় বোলার, তবু হিন্দুদের মধ্যে তাকে নির্বাচন করা উচিত কিনা তা নিয়ে অনেক আশঙ্কা ছিল। কেননা তাকে খেলার সুযোগ দিতে গেলে তাদের বর্ণের রীতিনীতি ভাঙতে হবে। অথচ জাতপাতের ট্যাবু ভেঙে ফেলা সহজ ছিল না। এছাড়া তখন ভারতীয় ক্রিকেট জাতিও ধর্মের ভিত্তিতে সংগঠিত হয়েছিল। 

জানা যায়, গোত্র-বর্ণের পক্ষপাতিত্বের কারণে বালুকে হিন্দুদের দলে নির্বাচিত করা হয়নি, কিন্তু তার চিত্তাকর্ষক বোলিং উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না। অবশেষে ১৯০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তার জীবনের মাহেন্দ্রক্ষণ আসে, যেদিন ইউরোপীয়দের বিপক্ষে হিন্দুদের পক্ষে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তার অভিষেক ঘটে। তিনি তাত্ক্ষণিকভাবে তার উপস্থিতি অনুভব করেন এবং তার দলকে ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি জয় অর্জনে সহায়তা করেন।

বালু ছিলেন সবচেয়ে প্রাণঘাতী বোলার। তাকে ‘ভারতের রোডস’ বলা হতো। উল্লেখ্য, উইলফ্রেড রোডস (১৮৭৭-১৯৭৩) ছিলেন একজন ইংরেজ পেশাদার ক্রিকেটার, যিনি ১৮৯৯-১৯৩০ সালের মধ্যে ইংল্যান্ডের পক্ষে ৫৮টি টেস্ট ম্যাচ খেলেন। যদিও তিনি অলরাউন্ডার ছিলেন, তবে ধীরগতির বাম হাতি অর্থোডক্স বোলিংয়ের জন্য বিখ্যাত ছিলেন।

বর্ণবৈষম্যের শিকার

একজন দলিত হওয়ার কারণে পালওয়ানকর বালু সে সময় ভারতে প্রচলিত বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন। খেলার সময় চা বিরতিতে তাকে প্যাভিলিয়নের বাইরে একটি মাটির পাত্র পরিবেশন করা হতো। যদি তিনি তার হাত-মুখ ধুতে চাইতেন, একজন সহকর্মী দলিত পরিচারক তাকে এক কোণে জল দিয়ে আসতেন। তিনি পৃথক টেবিলে বসে আলাদা থালায় দুপুরের খাবার খেতেন। অবশেষে যখন বোম্বেতে বর্ণবৈষম্যের বাধা তুলে নেয়া হয়েছিল, তখন বালু উচ্চবর্ণের লোকজনের সঙ্গে একই টেবিলে বসে সবার সঙ্গে খাবার খেয়েছেন।

খেলোয়াড় হিসেবে বর্ণবৈষম্যের শিকার শুধু তিনি হননি, তার ছোট তিন ভাইয়ের (শিবরাম, গণপত ও ভিথাল) জন্যও হিন্দু দলের ড্রেসিংরুমে অপেক্ষা করত একই রকম বৈষম্যমূলক ব্যবহার। নিজের দলের সতীর্থদের থেকেই তাদের সারাক্ষণ বৈষম্যমূলক আচরণ ও মন্তব্যের শিকার হতে হতো এবং অপমান সহ্য করতে হতো। তবে একসময় ভিথাল হিন্দু দলের ক্যাপ্টেন হয়েছিলেন এবং চারদলীয় ক্রিকেট (হিন্দু, পার্সি, ব্রিটিশ কমিউনিটি ও মুসলিম দল) প্রতিযোগিতায় শিরোপা জয় করেছিলেন। 

রাজনীতি—দ্বিতীয় ইনিংস

ক্রিকেট ছাড়াও পালওয়ানকর বালু রাজনীতিতে অংশ নিয়েছিলেন। বিআর আম্বেদকর (বর্ণ ব্যবস্থা চালু করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে একজন) এবং মহাত্মা গান্ধীর মতো স্বাধীনতাসংগ্রামীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। জানা যায়, তার সময়ে দলিতদের কোনো নেতা ছিল না, তাই দলিত আইকন হওয়ার সুবাদে তিনি নেতা হয়ে উঠেছিলেন।

আম্বেদকরের দাবি ছিল ভারতের রাজনীতিতে নিম্ন বর্ণের জন্য পৃথক নির্বাচক দল গঠন করা। গান্ধী দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করেছিলেন এবং তার জন্য ১৯৩২ সালে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। বালু একজন গান্ধীবাদী ছিলেন এবং গান্ধীর অনশনকে সমর্থন করেছিলেন। তাই তিনি আম্বেদকরের বিরোধিতা করেছিলেন। যখন গান্ধীর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, তখন বালু ও তামিল নেতা এমসি রাজা আম্বেদকরকে আপস করার জন্য চাপ দেন। আম্বেদকর রাজি হননি এবং তিনি পদত্যাগ করেন। তাই নেতা হিসেবে বালু ১৯৩২ সালের ঐতিহাসিক পুনা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

বালু ১৯৩৩ সালের অক্টোবরে বোম্বে মিউনিসিপ্যালিটি আসনের জন্য হিন্দু মহাসভার টিকিটে অসফলভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে বালু আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন, কিন্তু সেবার বোম্বে বিধানসভায় ‘তফশিলি জাতি’ আসনের জন্য, তবে নির্বাচনে হেরে যান।

যা হোক, খেলোয়াড় হিসেবে বালুর কৃতিত্বের জন্য তাকে নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে বেছে নেয়ার সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন বল্লভভাই প্যাটেল (১৮৭৫-১৯৫০)। এছাড়া বালুর নির্বাচনী এলাকায় সাম্প্রদায়িকতা একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। তবে তিনি আম্বেদকরের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তিনি ১৯৩৭ সালের জানুয়ারিতে এক সমাবেশে বলেছিলেন যে তিনি নির্বাচনে লড়তে আগ্রহী নন এবং তিনি কোন আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তা না জেনেই রাজি হয়েছিলেন। যা হোক, শেষ পর্যন্ত তিনি অল্প ব্যবধানে হেরে যান।

অবশেষে তিনি ১৯৫৫ সালের জুলাইয়ে বোম্বেতে মারা যান। সান্তা ক্রুজ শ্মশানে তার শেষকৃত্যে সংসদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সব নিপীড়িত শ্রেণীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

জানা-অজানা তথ্য ও পরিসংখ্যান

বালুর খেলোয়াড়ি জীবনের কিছু জানা-অজানা তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:

 তিনি বাম হাতে অর্থোডক্স স্পিন বল করতেন এবং উভয় দিকেই বল ঘুরিয়ে দিতে পারতেন। তিনি তার দুর্দান্ত বোলিং দিয়ে অন্য দলের ব্যাটসম্যানদের পিচে নাস্তানাবুদ করতেন, যদিও সেসব পিচ ব্যাটসম্যানদের সুবিধার্থে তৈরি করা হতো।

 ১৯০৫/০৬-১৯২০/২১ সাল পর্যন্ত তিনি ১৫ দশমিক ২১ গড়ে ১৭৯ উইকেট লাভ করেন এবং প্রথম ভারতীয় দলিত ক্রিকেটার হন।

 এক ইনিংসে ১৭ বার ৫ উইকেট ও এক ম্যাচে চারবার ১০ উইকেট নিয়েছেন। সেরা বোলিং ছিল ১০৩ রানে আট উইকেট।

 তিনি একজন মাঝারি মানের দক্ষ লোয়ার-অর্ডার ব্যাটসম্যান ছিলেন। ৩৩টি প্রথম শ্রেণীর খেলায় তিনি ৭৫৩ রান (গড় ১৩ দশমিক ৬৯) করেন এবং সর্বোচ্চ রান করেছিলেন ৭৫।

শেষ কথা

এ কথা সত্যি যে পালওয়ানকর বালু তার সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ভারতীয় ক্রিকেটার ছিলেন। খেলোয়াড় হিসেবে তার পরিসংখ্যান ছিল অসাধারণ ও বীরত্বপূর্ণ। এছাড়া কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য, যা আধুনিক ক্রিকেটাররা স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না।

বালুকে ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা বোলার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও তিনি ছিলেন ভারতীয় ক্রিকেটের বর্ণবৈষম্যের উজ্জ্বল উদাহরণ। ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ তার রচিত ‘আ কর্নার অব আ ফরেন ফিল্ড’ গ্রন্থে (২০০২ সালে প্রকাশিত) উল্লেখ করেছেন, ‘তিনি (পালওয়ানকর বালু) একজন অসাধারণ ক্রিকেটার ছিলেন, যিনি অবিশ্বাস্য বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।’ অবশেষে তিনি তার খেলোয়াড় জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। হয়তো অনেকের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন যে ‘সেলফ বিলিফ অ্যান্ড কনফিডেন্স উইল অলওয়েজ আর্ন ইউ সাকসেস’ (নিজের ওপর বিশ্বাস ও আস্থা সবসময় আপনাকে সাফল্য এনে দেবে)।


ফজল হাসান: লেখক ও অনুবাদক