বাংলাদেশে কোকা-কোলার গল্প যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে সফল অংশীদারত্বের অন্যতম সেরা উদাহরণ। এ আইকনিক আমেরিকান পানীয় কোম্পানি প্রথম ১৯৬২ সালে বাংলাদেশে তাদের পদচিহ্ন স্থাপন করে, ঢাকায় তাবানি বেভারেজ (টিবিসিএল) এবং চট্টগ্রামে কে রহমানের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ছয় দশকের যাত্রায় কোকা-কোলা কেবল একটি সতেজ পানীয় সরবরাহকারী ব্র্যান্ডেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

১৯৮২ সালে কোকা-কোলার কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ হয় যখন আব্দুল মোনেম লিমিটেডের (এএমএল) বিশ্বস্ত বটলিং পার্টনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে, ফলে ব্র্যান্ডটি সারা দেশে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। ১৯৮৭ সালে এএমএল কুমিল্লায় কোকা-কোলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বটলিং প্লান্ট স্থাপন করে, যা তাদের কৌশলগত বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। ২০১৭ সালে কোকা-কোলা তাদের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন বোতলজাতকরণ অংশীদার কোকা-কোলা বাংলাদেশ বেভারেজেস (সিসিবিবি) চালু করে, যা এ অঞ্চলের উন্নয়নে ব্র্যান্ডের উপস্থিতি এবং প্রতিশ্রুতিকে আরো দৃঢ় করে তোলে।

যদিও কোকা-কোলার চাক্ষুষ পরিচয় এর বহুমুখী পানীয়র সঙ্গে জড়িত, যেমন কোকা-কোলা, স্প্রাইট, ফ্যান্টা, কিনলে ও কোক জিরো সুগার, বাংলাদেশে এ ব্র্যান্ডের অবদান শুধু একটুকু রিফ্রেশমেন্ট কোম্পানির সীমানাতেই সীমাবদ্ধ নয়। আমেরিকান শিকড় ও বৈশ্বিক দর্শনের দ্বারা পরিচালিত, কোকা-কোলা বাংলাদেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চালক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার কার্যক্রম কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে উৎপাদন, বিতরণ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সম্পৃক্ততার পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলজুড়েই মূল্য সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশে কোকা-কোলার আর্থসামাজিক প্রভাব প্রতিবেদন (২০২১) অনুসারে, পানীয় জায়ান্টটি ২০১৯ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে ১ হাজার ২২০ কোটি টাকা (১৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) অবদান রেখেছে, যা দেশের মোট জিডিপির দশমিক ১১ শতাংশ। সংখ্যাটি কেবল উৎপাদন থেকে সরাসরি প্রাপ্ত অর্থনৈতিক মূল্য নয়; বরং এর ব্যাপক মূল্য শৃঙ্খলে এর প্রভাবেরও প্রতিনিধিত্ব করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কোকা-কোলার অবদানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান। কোকা-কোলা সিস্টেম দেশটিতে প্রায় ২২ হাজার ১০০টি কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে, যার মধ্যে ৮৩৩টি প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে এর নিজস্ব কার্যক্রমে এবং ২১ হাজার ৩০০টি পরোক্ষ কর্মসংস্থান রয়েছে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোয়, যেমন কাঁচামাল উৎপাদন, পরিবহন ও খুচরা বিক্রয়। উল্লেখযোগ্যভাবে কোকা-কোলা দ্বারা সৃষ্ট প্রতিটি সরাসরি কাজের বিপরীতে অন্যান্য শিল্পে অতিরিক্ত ২৬টি কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির এক অনুঘটক হিসেবে ব্র্যান্ডটির ভূমিকা আরো দৃঢ় করে।

কোকা-কোলা তার কর্মক্ষমতা এবং আর্থসামাজিক অবদানের বাইরেও বাংলাদেশে টেকসইতা ও সম্প্রদায়ের কল্যাণ বৃদ্ধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্লাস্টিক বর্জ্য হ্রাস, গুরুত্বপূর্ণ জলসম্পদ পুনরায় পূরণ, অথবা গ্রামীণ অঞ্চলে নারীর ক্ষমতায়ন এ ক্ষেত্রগুলোয় কোকা-কোলার উদ্যোগগুলো করপোরেট দায়িত্ব এবং কমিউনিটি সম্পৃক্ততার এক অনুপ্রেরণাদায়ক মিশ্রণকে প্রতিফলিত করে।

বাংলাদেশে কোকা-কোলার ছয় দশকের ঐতিহ্য ব্র্যান্ডটিকে একটি পরিবর্তনসূচক শক্তি হিসেবে পরিগণিত করে—একটি প্রতিষ্ঠান, যা শুধু তৃষ্ণা মেটাতেই সীমিত নয়; বরং অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। যখন কোকা-কোলা বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় সতেজ করে চলেছে, তখন এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে স্থায়ী অংশীদারত্বের একটি উজ্জ্বল প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এটি প্রমাণ করে পরস্পরের দর্শন ভাগাভাগি করে এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে একত্রে কাজ করলে সমৃদ্ধির পথ তৈরি করা সম্ভব একটি বোতল ও একটি সুযোগের মাধ্যমে।

জু-উন নাহার চৌধুরী: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কোকা-কোলা বাংলাদেশ লিমিটেড