বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান নগর জনসংখ্যা, আবাসনের চাহিদা, নির্মাণ ব্যয়, জমির সীমাবদ্ধতা, দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি এবং পরিবেশগত চাপ সবকিছু মিলিয়ে দেশের নির্মাণ শিল্পকে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নতুন প্রযুক্তি ও নতুন উপকরণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। এ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইঞ্জিনিয়ারিং উড এবং প্যানেল বোর্ড। আধুনিক আবাসন ও নগরায়ণে প্যানেল বোর্ডের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্যানেল বোর্ড কোনো একটি নির্দিষ্ট উপাদানের নাম নয়, এটি একটি বিস্তৃত শ্রেণী। প্যানেল বোর্ডের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বোর্ড অন্তর্ভুক্ত, যেমন পার্টিকেল বোর্ড, এমডিএফ, এইচডিএফ, প্লাইউড, ব্লকবোর্ড, ওএসবি বোর্ড, সিমেন্ট বোর্ড, জিপসাম, পিভিসি বোর্ড ও ইনসুলেটেড প্যানেল ইত্যাদি।
বাংলাদেশে প্যানেল বোর্ডের মার্কেট সাইজ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। যা প্রতি বছর ১২-১৫ শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে। প্যানেল বোর্ড ইন্ডাস্ট্রিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। বাংলাদেশে সুপার বোর্ড, আকিজ বোর্ড, পারটেক্স, আম্বারসহ প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠান প্যানেল বোর্ড উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতার ভিত্তিতে সুপার বোর্ড সর্ববৃহৎ, যার পার্টিকেল বোর্ড উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১২৫০ সিবিএম। দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদন সক্ষমতা আকিজ বোর্ডের, দৈনিক ১০০০ সিবিএম। প্যানেল বোর্ডের সহায়ক শিল্প ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মরত আছেন। হাতিল, আখতার, হাতিম, নাভানা, নাদিয়াসহ সারা দেশে ৫০ হাজারের মতো ফার্নিচার কারখানা উৎপাদনে নিয়োজিত আছে।
বাংলাদেশের নগরায়ণ এখন শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাশাপাশি গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, বগুড়া, রংপুর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন শহর ও শিল্পাঞ্চলে আবাসন, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, হোটেল ও বাণিজ্যিক ভবনের চাহিদা বাড়ছে। আবাসিক, বাণিজ্যিকসহ নানা ধরনের আবাসনের দরজা, পার্টিশন, আসবাব, ক্যাবিনেট ও অভ্যন্তরীণ সজ্জায় প্যানেল বোর্ডের ব্যবহার নান্দনিকতার অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। বর্তমানে উন্নতমানের বোর্ডের মাধ্যমে মডুলার ফার্নিচার, অভ্যন্তরীণ পার্টিশন ও ইন্টেরিয়রে ব্যবহার দ্রুততার সঙ্গে বেড়ে চলছে। প্যানেল বোর্ডের ব্যবহারে নির্মাণ ব্যয় কমানো সম্ভব। তুলনামূলক কম খরচে ফার্নিচার ও অভ্যন্তরীণ নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের আবাসন ব্যবস্থায় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। প্যানেল বোর্ড শিল্প স্মার্ট আবাসন ও নগরায়ণে উদ্ভিদ বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর, সাশ্রয়ী নির্মাণ, টেকসই উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে রাজস্ব ও অর্থনীতিতে অনন্য অবদান রেখে চলেছে।
বাংলাদেশে দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানি পণ্যও রয়েছে এবং কিছু প্যানেল পণ্য এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে রফতানিও হচ্ছে। কাঠের গুঁড়া, করাতের গুঁড়া ও অন্যান্য কাঠজাত অবশিষ্টাংশ ব্যবহার করে পার্টিকেল বোর্ড তৈরি করা হয়। এতে গ্রাম ও নগর উদ্ভিদ বর্জ্যের প্রক্রিয়াজাতকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
বৃক্ষ নিধন ও নতুন কাঠের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিল্পের উপজাত ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ কাজে লাগানো যায়। দেশের নানা প্রান্ত থেকে কাঠ ও কাঠজাত বজ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, বোর্ড উৎপাদন ও নতুন পণ্য সৃষ্টির মাধ্যমে সার্কুলার ইকোনমি শক্তিশালী হচ্ছে।
পার্টিকেল বোর্ড মূলত কাঠের কণা ও আঠা দিয়ে তৈরি। তাই এর নিরাপত্তা, স্থায়িত্ব ও পরিবেশগত প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে কাঁচামাল, আঠা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার মানের ওপর। পার্টিকেল বোর্ড পানি বা অতিরিক্ত আর্দ্রতা শোষণ করলে ফুলে যেতে পারে, বাঁকতে বা স্তর আলাদা হতে পারে। ফলে বোর্ডের শক্তি কমে যায়; ফার্নিচার ও পার্টিশনের আয়ু কমে; ছত্রাক বা পচন দেখা দিতে পারে। তাই আর্দ্রতা প্রতিরোধী বোর্ড এবং সঠিক আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘ স্থায়িত্বের জন্য জরুরি। কাঠজাত হওয়ায় সাধারণ পার্টিকেল বোর্ড আগুনে জ্বলতে পারে। ভবনে এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়া রোধ করা গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী আগুন প্রতিরোধী ব্যবস্থা এবং নির্ধারিত অগ্নিনিরাপত্তা মান অনুসরণ করতে হয়। নিম্নমানের পার্টিকেল বোর্ডে ব্যবহৃত আঠা থেকে ফরমালডিহাইড বাতাসে নির্গত হতে পারে। দীর্ঘ সময় বেশি মাত্রায় এটির সংস্পর্শে থাকলে চোখ, নাক ও শ্বাসনালিতে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে স্মার্ট নগরের বদ্ধ ও শক্তিসাশ্রয়ী ভবনে বায়ু চলাচল কম হলে অভ্যন্তরীণ বায়ুর মান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই কম তেজস্ক্রিয়তা নির্গমনকারী আঠা ব্যবহার করা জরুরি।
বাংলাদেশে এরই মধ্যে সুপার বোর্ড ও গ্রিন বোর্ড ব্র্যান্ড নিজস্ব গবেষণাগারে দীর্ঘ গবেষণার পর পানি প্রতিরোধী, আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রিত জিরো ইমিশন (ই-জিরো) বোর্ড বাজারে সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। কার্ব/ইপিএ কর্তৃপক্ষ সুপার বোর্ড ও গ্রিন বোর্ডের উৎপাদিত পণ্যগুলোকে ই-জিরো সার্টিফিকেশনের মাধ্যমে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ বোর্ডগুলো গ্রাহক ও আর্কিটেক্ট মহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। সুপার বোর্ড নিজস্ব গবেষণায় আগুন প্রতিরোধী বোর্ড ও দরজা উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে, যা বাজারে সরবরাহ করছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের পরিবেশবান্ধব বোর্ড উৎপাদনে সুপার বোর্ড ইউরোপিয়ান একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বোর্ডের ঘনত্ব, কণার আকার, আঠার পরিমাণ, চাপ ও তাপমাত্রা সবকিছু সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে বোর্ড দুর্বল হতে পারে। মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে বোর্ডের নির্দিষ্ট শক্তি, ঘনত্ব, আর্দ্রতা প্রতিরোধ ও মাত্রাগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন প্লাইউড ব্যতীত অন্যান্য প্যানেল বোর্ডর মান নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত কোনো নীতিমালা ছিল না। সুদীর্ঘ অপেক্ষার পর বিএসটিআই ২০২৬ সালে প্যানেল বোর্ড মান নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়েছে। সব উৎপাদনকারী কোম্পানি মান নিয়ন্ত্রণ নিদের্শনা বাস্তবায়নে এগিয়ে এলে এবং বিএসটিআই কর্তৃক অনুমোদিত সব কোম্পানিকে এটি পরিপালনে সক্ষমতা অর্জন করলে টেকসই উন্নয়নের মাত্রা ত্বরান্বিত হবে। আঠা শুধু কণাগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখে না; এটি বোর্ডের শক্তি, পানি প্রতিরোধ, নির্গমন এবং ব্যবহারকালকেও প্রভাবিত করে। তাই কম ফরমালডিহাইড বা উপযুক্ত বিকল্প আঠা ব্যবহার করলে পরিবেশ ও ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য ক্ষতি কমানো যায়। স্মার্ট নগরায়ণে পার্টিকেল বোর্ডকে শুধু সস্তা নির্মাণসামগ্রী হিসেবে দেখলে হবে না; এটিকে নিরাপদ, টেকসই, স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী হিসেবে নিশ্চিত করতে মান নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।
মোহাম্মদ নূরুণ নবী
হেড অব বিজনেস, সুপার বোর্ড










