দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবাসন খাত কতটা প্রস্তুত? টেকসই নগর গড়তে এখনই কোন তিনটি পরিবর্তন সবচেয়ে জরুরি?

বাংলাদেশের নগরায়ণ যে গতিতে এগোচ্ছে, আবাসন খাতের প্রস্তুতি সে গতির সঙ্গে সমান নয়। গত চার দশকে বেসরকারি ডেভেলপাররা লাখো পরিবারের মাথার ওপর ছাদ দিয়েছেন। কিন্তু এ সাফল্য মূলত ভবননির্ভর, নগরনির্ভর নয়। রাস্তা, ড্রেনেজ, পানি, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও গণপরিবহন তৈরি হচ্ছে ভবনের পরে, কখনো কখনো একেবারেই হচ্ছে না। ফলে ঢাকা ও অন্য বড় শহরে ঘনত্ব বাড়লেও জীবনমান সে অনুপাতে বাড়ছে না।

আমাদের বিবেচনায় তিনটি পরিবর্তন সবচেয়ে জরুরি:

  • পরিকল্পনা আগে, নির্মাণ পরে: বিশদ অঞ্চলভিত্তিক মহাপরিকল্পনা (ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান) কার্যকর করা এবং তা মেনে ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত করা। এতে অবকাঠামো ও ঘনত্বের মধ্যে ভারসাম্য আসবে।
  • নিয়মকানুনের কঠোর ও স্বচ্ছ প্রয়োগ: সকল রিয়েল এস্টেট-এর রাজউক, সিডিএ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধিমালা এবং বিএনবিসি কোড মেনে চলা অপরিহার্য। অগ্নিনিরাপত্তা ও ভূমিকম্প-সহনশীলতার মানদণ্ড সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর থাকতে হবে। দায়িত্বশীল ডেভেলপাররা যেন অসম প্রতিযোগিতার শিকার না হন, সেজন্য অনুমোদন প্রক্রিয়া জবাবদিহিমূলক করা দরকার।
  • জলবায়ু সহনশীল ও সম্পদসাশ্রয়ী নির্মাণ: প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, সবুজ পরিসর, পানি ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি সাশ্রয়কে ভবিষ্যতে আর অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এগুলো ভালো আবাসনের মৌলিক অংশ হওয়া উচিত। শেল্‌টেকে্‌র নিজস্ব অবস্থানেও বিএনবিসি অনুসরণ, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু–সংবেদনশীল নকশাকে একই কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হয়।

স্মার্ট আবাসন মানে এখন শুধু প্রযুক্তি নয়; নিরাপত্তা, জ্বালানি সাশ্রয়, পরিবেশ ও জীবনযাত্রার মানও এর অংশ। দেশের আবাসন প্রকল্পে এসব বিষয় কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, আর আপনাদের প্রকল্পে এর বাস্তব উদাহরণ কী?

সচেতনতা বাড়ছে, তবে এখনো বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে ‘‌অতিরিক্ত খরচ’ হিসেবে দেখা হয়, ‘‌দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ’ হিসেবে নয়। বাজারের একটি বড় অংশে সিসিটিভি বা লিফটকেই ‘‌স্মার্ট’ ধরা হয়। অথচ স্মার্ট আবাসনের মূল কথা হলো বসবাসকারীর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, ব্যয় সাশ্রয় ও পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতা।

a10

শেল্‌টেক্‌ প্রায় চার দশক ধরে কাঠামোগত নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। আমাদের প্রকল্পে যে বিষয়গুলোর ওপর জোর দেয়া হয়:

  • নিরাপত্তা: ভূমিকম্প সহনশীল কাঠামো নকশা, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও জরুরি নিঃসরণ পথ এবং প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি ব্যবস্থা।
  • জ্বালানি সাশ্রয়: প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ রেখে নকশা, কম বিদ্যুৎ খরচের বাতি ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার, সম্ভাব্য ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ।
  • পরিবেশ: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ছাদবাগান ও খোলা জায়গা রাখা।
  • জীবনযাত্রার মান: লবি, খেলার জায়গা, প্রতিবন্ধী বা বয়স্কদের জন্য সহজ চলাচলের ব্যবস্থা ও কমিউনিটি স্পেস।

নকশা ও প্রকৌশল সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও আমরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করি, যাতে নির্মাণ শুরুর আগেই সম্ভাব্য অসামঞ্জস্য শনাক্ত করা যায়। আমাদের কাছে স্মার্ট আবাসন মানে প্রযুক্তির প্রদর্শন নয়; বরং নিরাপদ, দক্ষ, টেকসই ও উন্নত জীবনযাপনের পরিবেশ তৈরি করা।

একটি আধুনিক আবাসন প্রকল্প শুধু ভবন নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ভবিষ্যতের প্রকল্পে এ ধারণা কীভাবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত? সবুজ এলাকা, যাতায়াত ও কমিউনিটি সুবিধার ক্ষেত্রে কোনটিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন?

ভবিষ্যতের প্রকল্প হবে ‘‌বাসস্থান’ নয়, ‘‌বসতি’। সেখানে থাকার জায়গার পাশাপাশি থাকবে ওয়াকিং ট্র্যাক, চিলড্রেন প্লে এরিয়া, ছাদে বা খোলা প্রাঙ্গণে প্রবীণের বসার জায়গা, দৈনন্দিন কেনাকাটার সুবিধা এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ। অর্থাৎ কমিউনিটি লিভিংয়ের সব চাহিদা পূরণ যেখানে আছে তার প্রয়োজন থাকবে।

এছাড়া যাতায়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেননা ঢাকার মতো শহরে যানজটের কারণে মানুষ প্রতিদিন বহু ঘণ্টা হারাচ্ছে, যা সরাসরি স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও পারিবারিক সময়কে ক্ষতিগ্রস্ত করে। গণপরিবহনের সঙ্গে সংযুক্তি এবং পথচারীবান্ধব পরিবেশ না থাকলে সবুজ এলাকা ও কমিউনিটি সুবিধার পূর্ণ সুফলও মানুষ পায় না। এছাড়া বর্তমানে সবুজ এলাকা কোনোভাবেই বিলাসিতা নয়। ঘনবসতিপূর্ণ শহরে খোলা জায়গা ও গাছপালা তাপ কমায়, বায়ুর মান উন্নত করে এবং মানসিক স্বস্তি দেয়। তাই তিনটিকে একই নকশা-ভাবনার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।

জমির দাম ও নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে, আবার ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতাও সীমিত। এ অবস্থায় মান ঠিক রেখে আবাসন সাশ্রয়ী করার বাস্তবসম্মত উপায় কী?

সঠিক নকশা, কার্যকর স্থানবিন্যাস, কাঠামোগত পরিকল্পনা এবং প্রকৌশল সমন্বয়ের মাধ্যমে অনেক অপচয় কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্মাণে ভুল, পুনঃকাজ এবং সময়ের অপচয় কমানো যায়। এতে ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে থাকে। শেল্‌টেকে্‌ প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণের একটি উদ্দেশ্যই হলো এ দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো।

a11

তবে শুধু ক্রয়মূল্য কমানোই যথেষ্ট নয়। একটি বাড়ির বিদ্যুৎ, পানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও দীর্ঘমেয়াদে পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, টেকসই উপকরণ এবং জ্বালানিসাশ্রয়ী নকশা ক্রেতার সামগ্রিক ব্যয় কমাতে সহায়তা করে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি ও সহনীয় গৃহঋণ ব্যবস্থা এবং পরিকল্পিত নতুন নগরাঞ্চল তৈরি করা গেলে আবাসনের ওপর মূল্যচাপও কিছুটা কমানো সম্ভব।

আগামী ১০-২০ বছরে বাংলাদেশের আদর্শ আবাসন কেমন হবে বলে দেখেন? সেটি গড়তে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ ভূমিকা কী হওয়া উচিত?

আমরা এমন আবাসনের স্বপ্ন দেখি, যেখানে:

ভবনগুলো হবে জ্বালানিসাশ্রয়ী, নবায়নযোগ্য শক্তিনির্ভর ও জলবায়ু সহনশীল।

  • বসতিগুলো পাবে মেট্রোরেল, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিটের মতো গণপরিবহনের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ। অর্থাৎ, নগর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্মাণ।
  • প্রযুক্তি ব্যবহার হবে সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য, যেমন ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও সেবা।
  • নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্যও থাকবে মানসম্মত ও সাশ্রয়ী আবাসন।
  • পুরনো এলাকার পরিকল্পিত পুনর্বিন্যাস হবে, নতুন করে পরিবেশ ও কৃষিজমি নষ্ট করে নয়।

শুধু একটি ভবন ভালো হলেই হবে না। শহরের সামগ্রিক পরিকল্পনাও শক্তিশালী হতে হবে। সরকারের দায়িত্ব হবে ভূমি ব্যবহার, গণপরিবহন, নাগরিক অবকাঠামো, নির্মাণবিধি এবং গৃহঋণের নীতিগত কাঠামো উন্নত করা। অন্যদিকে বেসরকারি খাতকে মানসম্মত নির্মাণ, স্বচ্ছতা, উদ্ভাবন ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে হবে।

ভবিষ্যতের শহর শুধু বেশি ভবনের শহর হবে না; সেটি আরো পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাসযোগ্য হতে হবে। সরকার ও বেসরকারি খাত সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানের টেকসই নগরজীবন গড়ে তোলা সম্ভব।