নির্মাণ খাতে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের সক্ষমতা কতটা বেড়েছে?

নির্মাণ খাতে আমরা যাদের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার বলি, যারা বিভিন্ন স্থাপনার নকশা করেন, তারা সাধারণত দেশে কী ধরনের নির্মাণসামগ্রী ও সরঞ্জাম পাওয়া যাচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করেই ডিজাইন করেন। আগে যেমন ৫০০ শক্তির রড পাওয়া যেত, তখন সেটাকে ভিত্তি করেই নকশা করা হতো। এখন ৬০০ শক্তির রড এসেছে। প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে এখন ৬০০ শক্তির রড ব্যবহার করে নকশাও হচ্ছে। এভাবেই ধাপে ধাপে সক্ষমতা বাড়ছে।

ইনডাকশন ফার্নেসে যারা উৎপাদন করছেন, তারাও মানের ক্ষেত্রে আরো উন্নতির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরপর ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস এসেছে। প্রযুক্তির এ পরিবর্তন নির্মাণ খাতের সক্ষমতাকেও এগিয়ে নিচ্ছে।

আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণে এর প্রভাব কতটা?

এর বড় প্রভাব আছে। বর্তমানে যে তিনটি এমআরটি প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে, সেগুলোর জন্য গত সেপ্টেম্বরে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেয়া হয়েছে। সেখানে যে রড ব্যবহার করা হবে, সেটি ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেসের রড হতে হবে। বিকল্প হিসেবে ওপেন হার্ট বা অক্সিজেন ফার্নেসের রড ব্যবহার করা যায়। কিন্তু ওপেন হার্ট বা অক্সিজেন ফার্নেস আমাদের দেশে নেই। ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস রয়েছে বলেই এখন সেই প্রযুক্তির উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

অর্থাৎ যখন যে হালনাগাদ প্রযুক্তি আসছে, তার সঙ্গে মিল রেখে আমাদের নকশা ও নির্মাণ পদ্ধতিও পরিবর্তিত হচ্ছে।

তাহলে কি বলা যায় আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণ সক্ষমতা এখন বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে?

অবশ্যই। বাংলাদেশে এখন মানসম্পন্ন নির্মাণসামগ্রীও তৈরি হচ্ছে, আবার মানসম্পন্ন নির্মাণকাজও হচ্ছে। আমাদের স্থপতি ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের দক্ষতা বেড়েছে, তাদের মানসিকতাতেও পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণ করার মতো প্রয়োজনীয় রসদ এখন বাংলাদেশেই রয়েছে।

শুধু বড় ভবন নয়, বড় বড় সেতু, কালভার্ট, টানেল ও এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি হচ্ছে। এসব অবকাঠামো নির্মাণে যে পরিমাণ ও ধরনের নির্মাণসামগ্রী প্রয়োজন, সেগুলোও বাংলাদেশে ভালোভাবেই উৎপাদিত হচ্ছে।

এ সক্ষমতার পরও ইস্পাত খাতে রফতানি কেন বড় পরিসরে হচ্ছে না?

বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বাড়লে আমাদেরও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। রড বা সিমেন্ট—দুই ক্ষেত্রেই কাঁচামালের বড় অংশ বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে আমাদের অতিরিক্ত ফ্রেইট দিতে হয়। পাশাপাশি কাস্টমসের বড় শুল্ক কাঠামোও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে অবস্থান তৈরি করতে হলে এসব অনেক কিছু পরিবর্তন করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো অর্থায়ন কাঠামো।

অর্থায়ন কাঠামো কীভাবে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে কমিয়ে দিচ্ছে?

ধরুন, আমি ১ হাজার কোটি টাকা দিয়ে একটি শিল্প স্থাপন করব। এর ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ৩০০ কোটি টাকা ইকুইটি দিতে হচ্ছে এবং ৭০০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। ৩০ শতাংশের নিচে আবার ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া যায় না।

এখন এই ৭০০ কোটি টাকা ঋণ পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। অথচ একটি কারখানা স্থাপন করে উৎপাদনে যেতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লেগে যায়। ৭০০ কোটি টাকার ঋণের ওপর প্রথম বছরেই যদি ১২ শতাংশ সুদ দিতে হয়, তাহলে প্রায় ৮৪ কোটি টাকা সুদ আসে। এরপর প্রতি বছর বড় অঙ্কের কিস্তি পরিশোধ করতে হয়।

অন্য দেশগুলোতে কি পরিস্থিতি ভিন্ন?

ভারত, চীন, জাপানের মতো দেশে এ ধরনের বিনিয়োগে উদ্যোক্তারা শুধু ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করেন না। তারা পুঁজিবাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহ করেন। ফলে প্রতি বছর কিস্তি ও সুদের যে চাপ, সেটা উদ্যোক্তাকে একইভাবে বহন করতে হয় না। উদ্যোক্তা যে মুনাফা করছেন, তার একটি অংশ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ভাগ করছেন। ফলে তাদের উৎপাদন ব্যয় কম পড়ে। তাহলে তাদের সঙ্গে আমি বিশ্ববাজারে কীভাবে প্রতিযোগিতা করব? অন্য দেশের উৎপাদন ব্যয় বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ সরকার যদি এখানকার উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধা দেয়, তাহলেই বৈশ্বিক রফতানি বাজারে অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।

রফতানি প্রণোদনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

আমরা যখন বিলেট রফতানি করেছিলাম, তখন ইনসেনটিভ পাওয়া যেত। গার্মেন্টস খাতও এভাবেই বড় হয়েছে এবং এখনো রফতানিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল ১৫ শতাংশ ক্যাশ ইনসেনটিভ পাব। সেটাকে ভিত্তি করেই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু পরে সেটা ৪ শতাংশ চূড়ান্ত হয়। ফলে এ রফতানি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।

তাহলে সামনে বাংলাদেশের শিল্প ও রফতানি খাতের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কী?

আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একসময় ২০ বিলিয়ন ডলারের আশপাশে ছিল, এখন সেটা প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ভালো অবস্থানে এসেছে। ব্যালান্স অব পেমেন্টও ভালো হয়েছে। রফতানি বেড়েছে, রেমিট্যান্স বেড়েছে।

এখন আমাদের পরবর্তী কাজ দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। শিল্পে প্রযুক্তি আসছে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হলে দক্ষ মানুষ প্রয়োজন। তাই দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব

দিতে হবে।