ঢাকার বদলে যাওয়া স্থাপত্যে গ্লাসের ব্যবহার এখন চোখে পড়ার মতো। বহুতল ভবনের সম্মুখভাগ থেকে অফিসের পার্টিশন, শোরুম, বারান্দার রেলিং কিংবা ঘরের অন্দরসজ্জা সবখানেই বাড়ছে এর উপস্থিতি। সঙ্গে বদলাচ্ছে গ্লাস নির্বাচনের বিবেচনাও। স্বচ্ছতা ও নকশার পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে তাপ নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও নিরাপত্তা। নির্মাণ খাতের এ চাহিদাকে সামনে রেখে পণ্যের পরিসর বাড়াচ্ছে আকিজবশির গ্লাস।

হবিগঞ্জের মাধবপুরে ১২৫ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির কারখানার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৬০০ টন। বালি পরিশোধন থেকে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ফ্লোট ফর্মিং পর্যন্ত উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে। গ্লাসের পৃষ্ঠ মসৃণ রাখা এবং পুরুত্বের সমতা নিশ্চিত করাই এ প্রক্রিয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য।

আকিজবশির গ্লাসের ক্লিয়ার গ্লাসে আয়রনের পরিমাণ ৭০০ পিপিএম পর্যন্ত কমিয়ে আনা হয়েছে। এতে সাধারণ গ্লাসের পরিচিত সবুজাভ আভা কমে এবং আলো সঞ্চালনের হার ৯১ শতাংশের বেশি হয়। শোরুম, গ্যালারি ও ফ্রেমহীন পার্টিশনের মতো জায়গায়, যেখানে পণ্যের প্রকৃত রঙ ও দৃশ্যের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এ বৈশিষ্ট্য বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। আরো স্বচ্ছতার প্রয়োজন হলে রয়েছে লো আয়রন গ্লাস।

ভবনের নকশায় রঙের বৈচিত্র্য আনতে প্রতিষ্ঠানটির পণ্যতালিকায় রয়েছে ছয় শেডের কালার গ্লাস: নেভি ব্লু, ওশান ব্লু, লেক ব্লু, গ্রিন, লাইট ব্রোঞ্জ ও ডার্ক গ্রে। ভবনের বাহ্যিক রূপের পাশাপাশি রোদের ঝলকানি ও সৌরতাপ নিয়ন্ত্রণেও এসব গ্লাস ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে রিফ্লেক্টিভ গ্লাস ব্যবহারে বাইরের দৃশ্য দেখার সুযোগ রেখে দিনের বেলায় ভেতরের পরিসর কিছুটা আড়াল করা যায়।

আকিজবশির গ্লাসের রিফ্লেক্টিভ গ্লাসের প্রতিফলনক্ষমতা সর্বোচ্চ ৮৭ শতাংশ। সিভিডি প্রযুক্তিতে তৈরি আবরণ সৌরতাপ ও অতিবেগুনি রশ্মির একটি অংশ প্রতিরোধ করে। ফলে ভবনের নকশা ও ব্যবহার অনুযায়ী উপযুক্ত গ্লাস নির্বাচন করলে ভেতরের পরিবেশ আরামদায়ক রাখতে সহায়তা পাওয়া যায়।

তাপ নিয়ন্ত্রণে পণ্যতালিকায় আরো রয়েছে লো-ই গ্লাস। এমএসভিডি প্রযুক্তিতে এর পৃষ্ঠে অতি পাতলা ধাতব আবরণ দেয়া হয়, যা দিনের আলো প্রবেশের সুযোগ রেখে ইনফ্রারেড তাপ সঞ্চালন কমায়। সিঙ্গেল সিলভার ও ডাবল সিলভার দুই ধরনের লো-ই গ্লাসই সরবরাহ করছে প্রতিষ্ঠানটি। ইনসুলেটেড গ্লাস ইউনিটে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করা হলে এটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে বড় কাচঘেরা ভবনে এ ধরনের গ্লাস নির্বাচনের গুরুত্ব বেশি।

নিরাপত্তার বিবেচনায় রয়েছে টেম্পার্ড ও লেমিনেটেড গ্লাস। নিয়ন্ত্রিত তাপ প্রক্রিয়ায় তৈরি টেম্পার্ড গ্লাস সাধারণ গ্লাসের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। প্রতিষ্ঠানটির কারিগরি তথ্যানুযায়ী, এটি ২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপীয় চাপ সহ্য করতে পারে। ভাঙলে বড় ধারালো টুকরোর পরিবর্তে ছোট, তুলনামূলক ভোঁতা দানায় পরিণত হয়।

লেমিনেটেড গ্লাসে একাধিক গ্লাসের স্তর পিভিবি ইন্টারলেয়ার দিয়ে যুক্ত থাকে। ভেঙে গেলেও টুকরোগুলো এ মধ্যবর্তী স্তরে আটকে থাকে, যা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমায়। শব্দ নিয়ন্ত্রণেও এ ধরনের গ্লাস কাজে আসে। ব্যালকনির রেলিং, দরজা, শাওয়ার এনক্লোজার কিংবা মাথার ওপরের গ্লেজিংয়ে ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্থাপনার প্রয়োজন ও নিরাপত্তার মান অনুযায়ী গ্লাসের ধরন এবং গঠন নির্ধারণ করা জরুরি।

অন্দরসজ্জার জন্য প্রতিষ্ঠানটি এনেছে কপার-ফ্রি মিরর গ্লাস। আকিজবশির গ্লাসের দাবি, বাংলাদেশে তারাই প্রথম এ ধরনের মিরর বাজারে এনেছে। এর প্রতিফলন ক্ষমতা ৯২ শতাংশ এবং পুরুত্ব আড়াই থেকে পাঁচ মিলিমিটার। প্রচলিত মাপ ৭২×৮৪ ইঞ্চি; প্রয়োজন অনুযায়ী কাস্টম সাইজেও সরবরাহ করা হয়। ভ্যানিটি, ড্রেসিং কর্নার, দেয়ালের সাজ ও আসবাবের কাজে এ মিরর ব্যবহার করা হচ্ছে।

নকশায় আরো বৈচিত্র্য আনছে ডিজিটাল প্রিন্টেড গ্লাস। সিরামিক ও ইউভি দুই ধরনের প্রিন্টের মাধ্যমে গ্লাসে ছবি, নকশা, লোগো বা গ্র্যাফিক ফুটিয়ে তোলা যায়। সিরামিক প্রিন্টের কালি টেম্পারিংয়ের সময় গ্লাসের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়। ফলে ভবনের অন্দর ও বহির্ভাগ, উভয় ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার সম্ভব। ইউভি প্রিন্ট মূলত অন্দরসজ্জা ও ব্র্যান্ডিংয়ের কাজে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। পার্টিশন, ওয়াল ক্ল্যাডিং, ভবনের সম্মুখভাগ ও দিকনির্দেশক সাইনেজে ব্যবহার করা যায় এসব প্রিন্টেড গ্লাস।

উৎপাদন ব্যবস্থায় সম্পদের ব্যবহার নিয়েও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, কারখানায় চুল্লির তাপ পুনরুদ্ধার করে কাজে লাগানো হয়। জিরো লিকুইড ডিসচার্জ ব্যবস্থায় পানি শোধন করে পুনর্ব্যবহার করা হয়; উৎপাদনের উপজাতও পুনরায় কাজে লাগানোর ব্যবস্থা রয়েছে। বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো হয় সৌরশক্তি, স্টিমচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিডের সমন্বয়ে।

‘দ্য ফাইন গ্লাস মেকার’ পরিচয়ে আকিজবশির গ্লাস উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি ও পণ্যের বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, বাংলাদেশের স্থপতি, ডেভেলপার ও গৃহমালিকদের জন্য এমন গ্লাস সহজলভ্য করা, যা আধুনিক ভবনের নকশা, আরাম ও নিরাপত্তার প্রয়োজন মেটাতে পারে।