বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে কাজে লাগিয়ে এসএমই খাতের উন্নয়নে কী কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে?

বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা তরুণ জনশক্তি, শক্তিশালী এসএমই নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল ওয়ান স্টপ সার্ভিসের সমন্বয়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করছে। পরিকল্পিত প্রয়োগ ও সহযোগিতার মাধ্যমেই এ সম্ভাবনাকে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব।

এমএসএমই খাতে ঋণ প্রদানে আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন?

আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, এ খাতের উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে থাকে। ফলে তারা সঠিকভাবে আর্থিক পরিকল্পনা, হিসাবরক্ষণ ও ব্যালান্স শিট তৈরি করতে পারেন না, যা ঋণ অনুমোদনের বড় বাধা। তাছাড়া অনেক সময়ই তাদের ব্যবসার মূলধন প্রয়োজন হয় তাৎক্ষণিকভাবে, যা বেশির ভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।

সরকারের প্রতি আমাদের সুপারিশ হলো:

ডাটাকেন্দ্রিক সিএমএসএমই স্কোরিং সিস্টেম তৈরি করা, যাতে সহজেই রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট করা যায়।

ঋণ নিশ্চয়তা (ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম) আরো প্রসারিত ও প্রক্রিয়াগতভাবে সহজ করা।

একটি কেন্দ্রীয় সিএমএসএমই উদ্যোক্তা ডাটাবেজ তৈরি করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ তথ্যভিত্তিক ঋণ দিতে উৎসাহ দেয়া।

এমএসএমইর বিকাশে আপনাদের ভূমিকাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সিএমএসএমই খাতে একটি সহায়ক ও সাপোর্টিভ রোল পালন করছে। মূলধনের ঘাটতি দূরীকরণ, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির দিক দিয়ে এ অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিএমএসএমই খাতের বিকাশে এনবিএফআইগুলোর অবদান আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির ক্ষেত্রে অপরিসীম। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব (ডিসেম্বর ২০২৪) অনুযায়ী:

সিএমএসএমই খাতে মোট ঋণ স্থিতির পরিমাণ ৩ লাখ ১৩ হাজার ১৭৫ দশমিক ৭৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর সিএমএসএমই খাতে ঋণ স্থিতির পরিমাণ ১১ হাজার ৮৯৩ দশমিক ২৯ কোটি টাকা, যা মোট সিএমএসএমই ঋণের ৪ শতাংশ। সুতরাং ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর সিএমএসএমই খাতে ঋণ বিতরণ বাড়ার সুযোগ রয়েছে। তবে প্রয়োজন পর্যাপ্ত তহবিল, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা, নীতিগত সহায়তা এবং একটি উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশ, যাতে এনবিএফআইগুলো তাদের কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করতে পারে। ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআইএস) অনেকাংশে ‘ঝুঁকি সহনশীল’ হওয়ায় নতুন ও অনানুষ্ঠানিক উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। আমাদের মতে, আমরা শুধু আর্থিক সুবিধা নয়, বরং সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করি।

এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তাদের অংশগ্রহণকে সহায়তা দিতে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

বাংলাদেশে যেহেতু নারীদের নিজের নামে সম্পদ বা জামানতযোগ্য সম্পদ দেয়ার ক্ষমতা কম, সেক্ষেত্রে তাদের ঋণপ্রাপ্তির সম্ভাবনাও অনেকটাই কমে যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফাইন্যান্স ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে অন্যান্য অনেক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে থাকে। যেমন যদি কোনো নারী উদ্যোক্তার ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসায়ের অভিজ্ঞতা দীর্ঘ দিনের নাও হয়, কিন্তু যদি তার ব্যাবসায়ের মডেল ঠিক থাকে, সেক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ফাইন্যান্স তাদের ঋণ দিয়ে থাকে। শুধু ঋণ বিতরণ করেই বাংলাদেশ ফাইন্যান্স তাদের দায়িত্ব পালন শেষ করছে না। এখানে নিবিড় তদারকির মাধ্যমে তাদের স্বাস্থ্য সুবিধা, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, আর্থিক নিরাপত্তার জন্য জীবন বীমা সুবিধা নিয়ে এসে বিজয় নামে একটি প্লাটফর্ম তৈরি করেছে। গ্রামপর্যায়ে আমরা নারীদের গাভী ও পশুপালনের জন্য ঋণ দিচ্ছি। গ্রামের নারীরা গাভী ও পশুপালন করে লাভবান হতে পারে না, তার বড় কারণ হচ্ছে স্থানীয় মহাজন বা এনজিও থেকে সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তিতে চড়া সুদে ঋণ নেয়া। বাংলাদেশ ফাইন্যান্স এ সমস্যা দূর করার জন্য গরু মোটাতাজাকরণ ব্যবসায় এককালীন পরিশোধযোগ্য ঋণের ব্যবস্থা করেছে। ডেইরি খাতে মাসিক কিস্তিভিত্তিক ঋণের ব্যবস্থা করেছে।

এছাড়া বিভাগীয় শহরের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন জেলা শহরে হ্যান্ডিক্রাফটসহ স্থানীয় বাজারে চাহিদা রয়েছে এমন ব্যবসায়ে জড়িত নারীদের ৫-২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ খুব সহজ শর্তে প্রদান করছি। এসব নারীর সঙ্গে আরো অসংখ্য নারী কাজ করছেন।

ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরে যেসব নারী উদ্যোক্তা রয়েছেন, যাদের ব্যবসায় প্রসার অনেক বড় এবং যারা ম্যানুফ্যাকচারিং বা টেকনোলজি বেজড কাজ করছেন তাদের ৫০ লাখ টাকা বা তার অধিক ঋণ দিয়ে থাকি। ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিলেও আরও বড় অংকের ঋণও আমরা দিয়ে থাকি।

উদ্যোক্তাদের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিসের বিষয়টি কতটা অগ্রসর হয়েছে?

এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি) উদ্যোগের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রদানের বিষয়টি বর্তমানে বেশ খানিকটা অগ্রসর হয়েছে। বিডা একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস পোর্টাল চালু করেছে, যা ৩৫টি সরকারি সংস্থা, ১২টি ব্যাংক ও পাঁচটি চেম্বার অ্যাসোসিয়েশনের ১৩৩টির বেশি পরিষেবা এক ছাদের নিচে নিয়ে এসেছে। এ প্লাটফর্মের মাধ্যমে আবেদন জমা দেয়া থেকে শুরু করে চূড়ান্ত অনুমোদন পর্যন্ত পুরো বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক, বিডা ও এসএমই ফাউন্ডেশন একসঙ্গে এ উদ্যোগ নিয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে এখনো এর বাস্তব সুবিধা তেমন নয়। অবশ্য এটি উদ্যোক্তাদের জন্য একটি কার্যকর হাব হয়ে উঠবে, যদি এক জায়গায় ব্যাংক, ট্রেড লাইসেন্স, ট্যাক্স, ট্রেনিং, ই-কমার্স ইত্যাদি যুক্ত করা যায় এবং এটির সঙ্গে এআই ও মোবাইল অ্যাকসেস যুক্ত করা যায়।

আমরা চাই সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে। আমরা চাই এ দেশের নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগী হিসেবে কাজ করতে। আমরা মনে করি, এ ধারা যদি অব্যাহত থাকে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি নারীদের জন্য ঋণের সুবিধা অব্যাহত রাখতে পারে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের রি-ফাইন্যান্সিং স্কিম অব্যাহত রাখতে পারে, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই এ দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে, যা আমাদের দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।