দেশে বড় আকারের বিনিয়োগের গতি ধীর। এ অবস্থায় কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির জন্য এমএসএমই খাতে বাড়তি মনোযোগ প্রয়োজন কিনা?
বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে বড় আকারের বিনিয়োগ কিছুটা শ্লথ। ফলে বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানও প্রতিকূল অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এমএসএমই খাতই সবচেয়ে সম্ভাবনাময়, যা দ্রুততম সময়ে কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে।
‘ওয়েট-অ্যান্ড-সি’ পলিসিতে থাকা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি দেশের মধ্যেই বিনিয়োগচক্র চালু রাখতে হলে এসএমই খাতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক ঋণপ্রাপ্তি সহজীকরণ, ব্যাংকিং নীতিমালায় নমনীয়তা, বিশেষ করে এসএমই ঋণের প্রভিশনসংক্রান্ত নীতি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।
ঢাকা ব্যাংক পিএলসি বিশ্বাস করে একটি শক্তিশালী এসএমই খাতের ওপর নির্ভর করেই দেশের বিস্তৃত ও টেকসই অর্থনৈতিক ভিত গড়ে তোলা সম্ভব।
অনেক এমএসএমই উদ্যোক্তা এখনো ব্যাংক ঋণ সুবিধার বাইরে। তাদের জন্য আপনারা কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন?
২০২৫ সালের ১৭ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক যে এসএমই মাস্টার সার্কুলার জারি করেছে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি শুধু সংজ্ঞাগতভাবে অনেক অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অনলাইন উদ্যোক্তাকে এসএমই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করছে না, বরং তাদের ব্যাংক ঋণের আওতায় আনার পথও উন্মুক্ত করেছে।
এ নীতির সঙ্গে সংগতি রেখে ঢাকা ব্যাংক পিএলসি ডিজিটাল মাধ্যম ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্লাটফর্ম ব্যবহার করে প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণের সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে আমাদের ই-ঋণ (e-Rin) প্লাটফর্মের মাধ্যমে একজন গ্রাহক খুব সহজে এক কর্মদিবসের মধ্যেই প্রাথমিক ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন।
দক্ষতা ও তথ্যের ঘাটতি, প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত হওয়া এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কী করা প্রয়োজন?
দক্ষতা ও তথ্যপ্রবাহের ঘাটতি এমএসএমই খাতের বিকাশে অন্যতম বড় বাধা। এ সমস্যা সমাধানে জেলাভিত্তিক তথ্য ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ক্লাস্টারভিত্তিক উদ্যোক্তা সহায়তা এবং টেকনোলজির সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা ব্যাংক মনে করে এসএমই ফাউন্ডেশনকে সচল কো-অর্ডিনেটর হিসেবে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগাতে হবে। আমরা এরই মধ্যে বিভিন্ন জেলাভিত্তিক ক্লাস্টার যেমন ফার্নিচার, তাঁত, চামড়াজাত শিল্প, কারুশিল্প, কৃষিভিত্তিক পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদিতে ঋণ ও পরামর্শসেবা চালু করেছি। এছাড়া গ্রুপ গ্যারান্টিভিত্তিক ঋণ মডেল আরো বিস্তৃত করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ কীভাবে এমএসএমই খাতকে রফতানি আয়ের অংশীদার করতে পারে?
সরাসরি রফতানিতে এমএসএমই খাতের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম। তবে দেশের বড় বড় রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের সাপ্লাই চেইনে এ খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও অনেক উদ্যোক্তার রফতানি লাইসেন্স বা বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা নেই। তবে যদি ট্রেড লাইসেন্স, রফতানি সনদ ও প্রশিক্ষণ প্রাপ্তি সহজ করা যায়, তাহলে এ খাত থেকে সরাসরি রফতানি আয় বাড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে আইসিসি বাংলাদেশ, ইপিবি ও অন্যান্য লাইসেন্সিং সংস্থার সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
ঢাকা ব্যাংক পিএলসি সম্প্রতি কয়েকটি সম্ভাবনাময় রফতানিমুখী এসএমই ক্লায়েন্টদের নিয়ে একটি বিশেষ এক্সপোর্ট রেডিনেস প্রোগ্রাম চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আপনার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এমএসএমই পণ্য বা খাত কোনটি?
আমাদের পর্যবেক্ষণে হস্তশিল্প, কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াকরণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, হালকা প্রকৌশল, সফটওয়্যার ও ফ্যাশনসংশ্লিষ্ট শিল্প সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। দেশের ভেতরে চাহিদার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এদের সম্ভাবনা বিপুল।
ঢাকা ব্যাংক এসব খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক প্যাকেজ প্রডাক্ট নিয়ে কাজ করছে, যার মধ্যে জামানতবিহীন ঋণ, ক্লাস্টার ফাইন্যান্সিং ও ব্যবসা পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৯ সালের মধ্যে প্রতিটি ব্যাংকের এসএমই ঋণের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা ব্যাংক পিএলসি এরই মধ্যে এ লক্ষ্য পূরণে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত ঋণ পণ্য, নারীবান্ধব ব্যাংকিং ডেস্ক, নারী উদ্যোক্তাদের পণ্যের প্রদর্শনী আয়োজন, প্রশিক্ষণ-পরবর্তী ঋণ কর্মসূচি।
আগামী আগস্টে আমাদের এক মাসব্যাপী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছতে আপনাদের শাখা ও এজেন্ট নেটওয়ার্ক কীভাবে কাজ করছে?
বর্তমানে ঢাকা ব্যাংক পিএলসি দেশের ৩৫টি জেলায় ১১৭টি শাখা, তিনটি এসএমই সেন্টার ও ৩৪টি উপশাখার মাধ্যমে এসএমই গ্রাহকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ঋণ আবেদন, ডিজিটাল স্কোরিং মডেল এবং সাপ্লাই চেইন ও ডিস্ট্রিবিউটর ফাইন্যান্সিং প্রক্রিয়ায় এসএমই উদ্যোক্তাদের আরো সহজে ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনছে। বিশেষ করে সাপ্লাই চেইনের ক্ষুদ্র পরিবেশক ও ডিলারদের জন্য আমরা জামানতবিহীন ঋণ ও দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা চালু করেছি, যা সারা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।










