দেশের এমএসএমই খাত এখন কেমন করছে?

বাংলাদেশের এমএসএমই খাত বর্তমানে ধীরে ধীরে উন্নতি করছে এবং দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বর্তমানে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে এমএসএমই খাতের অবদান প্রায় ৩২ শতাংশ। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ এ খাতে জড়িত। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রাক্কলন অনুসারে, দেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান প্রায় ১২ শতাংশের কাছাকাছি, যেটিকে আমাদের অবশ্যই গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। এমএসএমই খাতে আরো বিনিয়োগ ও নিরাপদ ব্যবসায় পরিবেশ নিশ্চিতের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা ও নীতি সহায়তা, প্রযুক্তি সুবিধা সহজলভ্য করে তোলা, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত কাঠামো তৈরিসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে খাতসংশ্লিষ্ট নানা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ‌এমএসএমই নীতিমালা ২০২৫ বাস্তবায়িত হলে আগামীতে দেশের উদ্যোক্তারা আরো উপকৃত হবেন বলে আশা করা যায়।

এমএসএমই খাতে ঋণ প্রদানে আপনাদের অভিজ্ঞতা কেমন? এ খাতে ঋণ সুবিধা সহজলভ্য করতে সরকারের কাছে আপনাদের কোনো প্রত্যাশা আছে কি?

বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সিএমএসএমই খাতের দীর্ঘমেয়াদি অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভারত, ভিয়েতনাম, চীনের মতো দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এখনো সিএমএসএমই খাতের ক্ষমতায়নের দিক থেকে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। সিএমএসএমই খাতের উন্নয়নে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজলভ্য ও সময়োপযোগী আর্থিক বিনিয়োগ প্রাপ্তি নিশ্চিতকরণে আইডিএলসি ফাইন্যান্স দুই দশক ধরে এ খাতে সফলতার সঙ্গে ঋণসেবা প্রদান করে আসছে।

সিএমএসএমই খাতে ঋণ প্রদানে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্যান্সিং স্কিমের সাহায্যে এ খাতে ঋণ সুবিধা সহজলভ্য করার চেষ্টা করছি। সাম্প্রতিক হালনাগাদকৃত সিএমএসএমই মাস্টার সার্কুলারেও নতুন করে ইনফরমাল ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের সিএমএসএমই খাতের শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে, যা এ খাতের উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আমরা মনে করছি। তবে প্রান্তিক, কুটির ও মাইক্রো খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে সরকার থেকে আরো বেশি তহবিল বরাদ্দকরণ, প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল প্লাটফর্ম ও তথ্যভিত্তিক প্রক্রিয়ার উন্নয়নে আরো বেশি মনোযোগ দেয়া হবে— আমরা এমনটা প্রত্যাশা করি।

তথ্যের ঘাটতি, প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা দেশের এমএসএমই খাতের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। উদ্যোক্তাদের এসব সমস্যা সমাধানে আপনাদের কোনো সহায়তার উদ্যোগ আছে কি?

আমরা মূলত একটি অ্যাসিস্টিভ মডেলে এমএসএমই খাতের উদ্যোগগুলো অর্থায়ন করে থাকি, যেখানে আমাদের রিলেশনশিপ ম্যানেজাররা উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা দিয়ে থাকেন। তাছাড়া আমরা আমাদের ঋণ প্রক্রিয়াটি ডিজিটালাইজ করেছি, যার ফলে উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন প্রক্রিয়াটি আরো সহজ ও স্বচ্ছ হয়েছে।

আমরা বছরে দুইবার বিনামূল্যে ডিজিটাল লোন স্টেটমেন্ট প্রদান করি, যাতে গ্রাহকরা নিজের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা অর্জন করতে পারেন। আমাদের প্রতিটি শাখায় প্রশিক্ষিত কাস্টমার সার্ভিস অফিসাররা রয়েছেন, যারা উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনে সরাসরি সহায়তা দিয়ে থাকেন। এমন নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা তথ্য ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে উদ্যোক্তাদের পাশে থাকতে প্রতিনিয়ত কাজ করছি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট এ খাতের উন্নয়নে কতটা সহায়ক হবে বলে মনে করেন?

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনা অনুসারে, আগামী তিন বছরের মধ্যে এসএমই খাতের বিকাশে ১৫ হাজার নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, ২৫ হাজার উদ্যোক্তাকে দক্ষতামূলক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান, বিভাগীয় শহরে এসএমই প্রোডাক্ট ডিসপ্লে ও সেলস সেন্টার স্থাপন এবং জেলা শহরগুলোতে আঞ্চলিক এসএমই পণ্যমেলার আয়োজনসহ নানা উদ্যোগ গৃহীত হবে। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাসহ প্রান্তিক পর্যায়ের সিএমএসএমই খাতের ১০ হাজার উদ্যোক্তাকে ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্তও প্রমাণ করে যে আগামীতে দেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা ব্যবসায় বিকাশে আরো উন্নত সুবিধা পাবেন।

এমএসএমই খাতে ঋণ প্রদানে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা কেমন? এ খাতের বিকাশে আপনাদের ভূমিকাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

এমএসএমই খাতের গ্রাহকদের অর্থায়নের ক্ষেত্রে আইডিএলসি ফাইন্যান্স দ্রুততম সময়ে ঋণ প্রক্রিয়াকরণের ওপর সবসময়ই জোর দিয়ে থাকে। দেশের বৃহত্তম এনবিএফআই হিসেবে আইডিএলসির সিএমএসএমই ঋণ পোর্টফোলিও এ খাতের মধ্যে সবচেয়ে বড়, এমনকি অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংকের তুলনায় আমাদের এ খাতের পোর্টফোলিও আকারে বৃহত্তর।

বাংলাদেশে আমরাই প্রথম ঋণ প্রদান প্রক্রিয়ার জন্য লোন ওরিজিনেশন সিস্টেম ও ক্রেডিট স্কোরকার্ডের ব্যবহার শুরু করি, যা সিএমএসএমই গ্রাহকদের জন্য অর্থায়ন প্রাপ্তির সময়কে উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। এভাবে আমরা সিএমএসএমই খাতের গতিশীলতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছি।

এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তাদের অংশগ্রহণকে সহায়তা দিতে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা ২০১৬ সাল থেকে ‘আইডিএলসি এসএমই পূর্ণতা’ নামে একটি বিশেষায়িত পণ্য চালু করেছি, যার মাধ্যমে আমরা নারীদের জন্য একটি থ্রিসিক্সটি-ডিগ্রি, অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ সহায়তা কাঠামো নিশ্চিত করি। এর মাধ্যমে এরই মধ্যে ৭ হাজারের বেশি নারী উদ্যোক্তাকে তাদের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির পথ দেখিয়েছে আইডিএলসি।

নারীদের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করে আইডিএলসি। আমাদের প্রতিটি শাখায় নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা হেল্প ডেস্ক রয়েছে, যেখানে প্রশিক্ষিত কর্মীরা তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে থাকেন। নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে আমরা এসএমই ঋণের তুলনায় কম হারে ঋণ প্রদান করে থাকি। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্ধারিত পুনর্অর্থায়ন স্কিমে সহজে প্রবেশাধিকার পেতে আমরা প্রয়োজনীয় সহায়তাও দিয়ে থাকি। আগামীতেও আমরা দেশে নারী নেতৃত্বে গড়া ব্যবসাগুলোকে আরো এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।