কিডনি মানুষের রেচন অঙ্গ। আমাদের শরীরের বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাব আকারে বের করা কিডনির প্রধান কাজ। এছাড়া এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্ত উৎপাদন ও পানির সমতা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। কিডনি রোগ প্রধানত দুই প্রকার—১. আকস্মিক কিডনি রোগ (একেআই) ও ২. দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ (সিকেডি)।
কিডনি রোগের প্রধান কারণ হলো কিডনির প্রদাহ (নেফ্রাইটিস), ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, কিডনি ও মূত্রনালিতে পাথর, মূত্রনালিতে প্রতিবন্ধকতা ও বংশগত কিডনি রোগ।
প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগের কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। শরীর, মুখ, হাত-পা ফোলা, প্রস্রাবে অসুবিধা, উচ্চরক্তচাপ, অরুচি, বমি ভাব দুর্বলতা ও শরীর ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া ইত্যাদি কিডনি রোগের সাধারণ লক্ষণ। যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগ আছে, যাদের বংশে কিডনি রোগ আছে, যারা ব্যথানাশক ওষুধ বেশি সেবন করেন তাদের কিডনি রোগের ঝুঁকি রয়েছে।
কিডনি সুস্থ আছে কিনা জানতে আজই শরীরের রক্তচাপ ও ওজন মাপুন। প্রস্রাব পরীক্ষা করে দেখুন সুগার ও প্রোটিন যাচ্ছে কিনা। রক্তের গ্লুকোজ, ক্রিয়েটিনিন ও কিডনির আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করুন।
কিডনি রোগ সম্পর্কে ভুল ধারণা ও সঠিক তথ্য
প্রচলিত রয়েছে শরীর, চোখ, মুখ ফোলা মানেই কিডনি রোগ। তবে সঠিক তথ্য হলো শরীর, চোখ, মুখ ফোলা মানেই কিডনি রোগ নয়। শরীরের অন্যান্য রোগ যেমন হৃদরোগ, লিভারের রোগ বা অ্যালার্জির কারণেও শরীর, চোখ, মুখ ফুলে যেতে পারে। এছাড়া অনেকে মনে করেন কিডনি রোগে শরীর ফোলা মানেই ফেইলিওর। তবে শরীর ফোলা মানেই কিডনি ফেইলিওর না। বাচ্চাদের নেফ্রোটিক সিনড্রোম হলে প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন যাওয়ার কারণে শরীর ফোলা থাকে। কিন্তু কিডনির কার্যকারিতা অটুট থাকে। প্রচলিত ধারণা—কিডনি রোগ হলে অবশ্যই কিছু লক্ষণ থাকবে। যেমন শরীর ফোলা, প্রস্রাব কম হওয়া। সঠিত তথ্য হলো কিডনি রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণহীন থাকতে পারে। কিডনির কার্যকারিতা ৬০-৭০ ভাগ কমে যাওয়ার পর লক্ষণ দেখা দেয়। এজন্য কিডনি রোগকে নীরব ঘাতক বলা হয়। ধারণা প্রচলিত রয়েছে—প্রস্রাবে রক্ত যাওয়া মানেই কিডনি রোগ। তবে আসলে তা নয়। মূত্রনালি, মূত্রথলি বা মূত্রপথের রোগের কারণেও প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যেতে পারে।
অনেকে মনে করেন, বেশি করে পানি পান করলে কিডনি রোগ ভালো হয়। তবে কিডনি রোগ প্রতিরোধের জন্য পরিমিত পানি পান করা প্রয়োজন। কিডনির পাথরজনিত রোগে বেশি পানি পান করা ভালো। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কিডনি রোগী অতিরিক্ত পানি পান করলে বিপদ হতে পারে।
আবার অনেকেরই ধারণা, রক্তে সিরাম ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা না বাড়লে ধরে নিতে হবে কিডনি রোগ নেই। তবে বিষয়টি হলো অনেক কিডনি রোগ যেমন নেফ্রাইটিসে প্রাথমিক পর্যায়ে রক্তের সিরাম ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিক থাকতে পারে। তখন শুধু প্রস্রাবে অতিরিক্ত প্রোটিন বের হয়।
আবার কেউ কেউ মনে করেন, ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপের কারণে কিডনি রোগ হলে একটি কিডনির কার্যকারিতা কমে যায়। আসলে ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপের কারণে কিডনি রোগ হলে দুটি কিডনিই সমানভাবে আক্রান্ত হয়। আবার কারো ধারণা, ডায়াবেটিস বা উচ্চরক্তচাপ মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে রাখলে কিডনি রোগ হবে না। তবে প্রকৃতপক্ষে ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে কিডনি রোগের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
কিডনি ফেইলিওর মানেই নিশ্চিত মৃত্যু বলেও মনে করেন কেউ কেউ। তবে কিডনি রোগ মানেই নিশ্চিত মৃত্যু নয়। কিডনি সংযোজন বা ডায়ালাইসিস করে কিডনি ফেইলিওর রোগী দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারেন। আবার কিডনি ডায়ালাইসিস নিয়েও আছে ভুল ধারণা। কারো কারো ধারণা, ডায়ালাইসিস করলে রোগীর মৃত্যু দ্রুত হয়। আসলে সঠিক সময়ে ডায়ালাইসিস করলে রোগী অনেক দিন বেঁচে থাকেন।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, কিডনি রোগ বিভাগ
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল







