ধীরগতিতে কিডনি রোগ অত্যন্ত জটিল এবং এ রোগ ওষুধের মাধ্যমে সবসময় সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য হয় না। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সেই সব রোগী যারা ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপে ভোগে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ থেকে ধীরগতিতে কিডনি রোগ হয়। এছাড়া কিডনির ছাঁকনির প্রদাহ, দীর্ঘমেয়াদি মূত্র সংক্রমণ, জন্মগত ও বংশগত কিডনি রোগ হয়ে থাকে। এই প্রকার কিডনি রোগ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়, তাই যদি কোনো রোগী প্রথম পর্যায়ে এ রোগের উপসর্গগুলো বুঝতে পারে এবং সময়মতো চিকিৎসা নেয় তবে তা অনেকাংশে নিরাময়যাগ্য। এখানে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, যেমন একজন ডায়াবেটিস রোগী নিয়মিত ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিচ্ছেন অথচ তার ডায়াবেটিস পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না অথবা ডায়াবেটিসের ওষুধ সেবন করছেন কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শ নিয়মিত নিচ্ছেন না। এতে তার প্রস্রাব পরীক্ষা বা রক্ত পরীক্ষা নিয়মিত হচ্ছে না।
একজন ডায়াবেটিস রোগী নিয়মিত প্রস্রাব পরীক্ষা করলে এবং প্রস্রাব পরীক্ষায় প্রোটিন ধরা পড়লে ধরে নিতে হবে যে তিনি ডায়াবেটিসের জটিলতা অর্থাৎ কিডরি রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব রোগীর চোখ ও স্নায়ুজনিত জটিলতা একই সঙ্গে বা কিছু আগে ধরা পড়ে। প্রথম পর্যায়ে প্রোটিন নিঃসরণ ধরা পড়লে চিকিৎসা দিয়ে এ জটিলতা সম্পূর্ণরূপে নিরাময় সম্ভব, কিন্তু পর্যায়ক্রমে প্রোটিনের পরিমাণ অধিক পরিমাণ বেড়ে গেলে কিডনির ছাঁকনি বন্ধ হয়ে যায় এবং কিডনি বিকল হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। অনুরূপভাবে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চরক্তচাপ কিডনির ছাঁকনির মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে এবং ধীরগতির কিডনি রোগ প্রকাশ পায়। পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে আমাদের দেশে অনেক লোক উচ্চরক্তচাপের ওষুধ ঠিকমতো গ্রহণ করে না, কারণ তারা ভাবে যে একবার উচ্চরক্তচাপের ওষুধ শুরু করলে তা সারা জীবন খেতে হবে। কিন্তু এ কথা চরম সত্য যে ওষুধ খেলে ধীরগতির কিডনি রোগ এড়ানো যেতে পারে।
কিডনির ছাঁকনির প্রদাহ একটি মারাত্মক রোগ। অনেক ক্ষেত্রে এর কোনো কারণ জানা যায়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চর্মরোগ এবং কিছু কিছু অনিয়ন্ত্রিত বাত রোগ (যেমন SLE, RA) মারাত্মক ধীরগতির কিডনি রোগের কারণ হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যথাসময়ে চিকিৎসা না করালে এ রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করে। বারবার মূত্র সংক্রমণ রোগীদের সময়মতো চিকিৎসা না নেয়া ধীরগতির কিডনি রোগের কারণ হতে পারে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে জন্মগত ও বংশানুক্রমিক কিডনি রোগ (Polycystic Kidney Disease) ধীরগতির কিডনি রোগের কারণ হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব রোগের সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য চিকিৎসা অনুপস্থিত। তবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, মূত্র সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কিছু নতুন ওষুধ প্রয়োগে Polycystic Kidney Disease-এর চিকিৎসা সম্ভব (Tolvaptan জাতীয় ওষুধ)
উপসর্গ: ক্ষুধামান্দ্য, বমি বমি ভাব, অত্যন্ত দুর্বল লাগা, হাত পায়ে পানি আসা, উচ্চরক্তচাপ ধরা পড়া বা আগের উচ্চরক্তচাপ অনিয়ন্ত্রিত হওয়া, শরীর চুলকানো, শ্বাসকষ্ট হওয়া ইত্যাদি।
তাই ধীরগতির কিডনি রোগীর উপরোক্ত উপসর্গ দেখা মাত্র একজন কিডনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া জরুরি। ধীরগতির কিডনি রোগের চিকিৎসা হিসেবে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও মূত্র সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং তার সঙ্গে খাবারের ও পথ্যের নিয়ন্ত্রণ অতীব জরুরি। এছাড়া শরীরের বর্জ্য পদার্থ যা কিনা বিভিন্ন উপসর্গের কারণ তাকে বের করে দেয়ার জন্য কিছু ওষুধ প্রয়োগ (Phosphate binders) এবং শরীরের ক্যালসিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য ওষুধ প্রয়োগ করতে হয় (Calcitriol)। উপরোক্ত চিকিৎসায় একজন রোগী প্রথম পর্যায়ে অনেক দিন ভালো থাকতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এ রোগ ধীরে ধীরে দুটি কিডনিকে একটি সময় সম্পূর্ণরূপে নষ্ট করে দেয়। পরবর্তী সময়ে রোগীর চিকিৎসার জন্য ডায়ালাইসিস এবং কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে।
কিডনির ছাঁকনির প্রদাহ যেকোনো বয়সে হতে পারে। ছাঁকনির প্রদাহের দরুন শরীর থেকে অধিক পরিমাণে প্রোটিন প্রস্রাবের সঙ্গে নির্গত হয়। যার ফলে একটি রোগীর শরীর ফুলে যায়, কারণ রক্তের মধ্যে পানিকে ধরে রাখার জন্য এ প্রোটিন অত্যাবশ্যকীয়। ছোট বাচ্চাদের বেলা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুবকদের এক প্রকার ছাঁকনির প্রদাহ হয়, যা সময়মতো চিকিৎসা করলে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। এক্ষেত্রে কিডনির বায়োপসি পরীক্ষা করে সময়মতো চিকিৎসা করাতে হবে। এ ধরনের কিডনি রোগকে (Minimal Change Disease) বলে। আরো অনেক প্রকার কিডনির ছাঁকনির প্রদাহ হয়, যা সময়মতো চিকিৎসা করলে অনেকাংশে নির্মূল করা বা প্রতিরোধ করা সম্ভব। পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে আমাদের দেশে রোগীরা সময়মতো চিকিৎসা নিতে আসে না। উপরন্তু বিভিন্ন প্রকার দেশীয় চিকিৎসা নিয়ে থাকে এবং যার দরুন সঠিক চিকিৎসার অনেক দেরি হয়ে যায়।
কিডনি রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তাই সময়মতো চিকিৎসা একটি রোগীর জীবন তথা একটি পরিবার ও বৃহদর্থে একটি সমাজের ওপর চাপ কমাতে পারে।
লেখক: কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ ও আহ্বায়ক বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন







