দেড় যুগ আগের কথা। মো. ফিরোজ আলম তখন বিদেশে ছিলেন। হঠাৎ একদিন বমি শুরু হয় তার। সঙ্গে শরীর ফুলে যায়। হাসপাতালে ভর্তি হলে কিডনি পয়েন্ট বেশি ধরা পড়ে। সেখানে তাকে জুগুলার ভেনাস ক্যাথেটার দিয়ে দুটি হেমোডায়ালাইসিস দেয়া হয়। অসুস্থতার জন্য তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে এসে ২০০৭ সালে একটি অলাভজনক হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা নেয়া শুরু করেন। এ সময় তিনি কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পর্কে জানতে পারেন। কিছুদিন পর ওই হাসপাতালে কিডনি প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। ওই বছরের মার্চের শেষে তার কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়। তার বড় ভাই তাকে কিডনি দান করেছিলেন। এরপর দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তিনি ওই হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং সুস্থ আছেন।
বাংলাদেশে কিডনি সংযোজন শুরু হয় আশির দশকে। ১৯৮১ সালের অক্টোবরে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে প্রথম একজন রোগীর (৩২) দেহে সফলভাবে কিডনি সংযোজন করা হয়। কিডনিদাতা ছিলেন তার আপন বোন (৩৬)। এরপর ১৯৮৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট ৩ হাজারের ওপর কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রতি বছর ২০০-২২০টি কিডনি সংযোজন করা হয়। ডায়ালাইসিসের চেয়ে কিডনি প্রতিস্থাপনে ব্যয় কম এবং রোগী ভালো থাকে বছরের পর বছর।
মানবদেহে দুটো কিডনি, একটি লিভার, একটি হৃৎপিণ্ড, দুটো ফুসফুস থাকে। এছাড়া রয়েছে প্যানক্রিয়াস ও ইনটেস্টাইন। এ অঙ্গগুলোকে বলা হয় সলিড অর্গান। এগুলো ঠিকভাবে কাজ না করলে শরীর অসুস্থ হতে থাকে। একপর্যায়ে মৃত্যু হয়। সুতরাং এসব অঙ্গ অকেজো হয়ে গেলে রোগীর একমাত্র উপায় হচ্ছে অঙ্গ সংযোজন করা।
অঙ্গ সংযোজন দুই ভাগে ভাগ করা হয়। জীবিত ব্যক্তির দেহ থেকে অঙ্গ দান ও মৃত ব্যক্তির অঙ্গ দান।
উন্নত বিশ্বে ৭০-৮০ ভাগ অঙ্গ সংগ্রহ করা মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে। আর ২০-৩০ ভাগ সংগ্রহ করা হয় জীবিত নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে। জীবিত ব্যক্তি কিডনিদাতাদের বয়স ২১ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হতে হবে। তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকতে হবে। দেহে কোনো ধরনের সংক্রমণ, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও ক্যান্সার থাকা যাবে না। কিডনিগ্রহীতার বয়স সাধারণত ৬ থেকে ৬৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। তার দুটো কিডনি সম্পূর্ণ অকেজো হতে হবে ও তা ভালো হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। এক্ষেত্রে কিডনি গ্রহীতার দেহে কোনো ধরনের সংক্রমণ থাকা চলবে না। এমনকি ভবিষ্যতে যাতে কোনো সংক্রমণ না হয় সেজন্য তাকে নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, টিটেনাস, চিকেনপক্স এমন সংক্রামক রোগের টিকা কিডনি দানের দুই-তিন মাস আগেই দেয়া হয়। এছাড়া হেপাটাইটিস-বি ও করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন দেয়া হয়ে থাকে। কিডনি অকেজো রোগীর ডায়ালাইসিস শুরু করার আগে কিডনি সংযোজন করা ভালো। জীবিত কিডনিদাতার কাছ থেকে একটি ও মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে দুটি কিডনিই নেয়া যায়।
মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার জন্য অঙ্গ সংগ্রহ করা যায়। মৃত ব্যক্তি বলতে মস্তিষ্কের মৃত্যু বলা হয়ে থাকে। মস্তিষ্কের মৃত্যু হলে কোনো মানুষেরই আর জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
২০১১ সালের অঙ্গ সংযোজন আইনে বলা হয়েছে, জীবিত অবস্থায় বাবা-মা, ভাই-বোন, চাচা-মামা, খালা-ফুফু, চাচাতো-মামাতো-ফুফাতো-খালাতো ভাই-বোন স্বেচ্ছায় রোগীকে কিডনি দান করতে পারবেন। স্বামী-স্ত্রীও একজন আরেকজনকে কিডনি দিতে পারবেন।
বাংলাদেশে প্রায় ৪০ হাজার কিডনি, ৪৫ হাজার লিভার ও ৮০ হাজার স্ট্রোকের রোগী আছেন। অন্যদিকে ২৫ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর মারা যান। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতদের ৫০ ভাগেরও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যদি প্রতিস্থাপন করা হয়, তবে অঙ্গ-অকেজো অনেক রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে। এতে ৩০ ভাগ হার্ট অকেজো রোগীকে বাঁচানো সম্ভব। এ অসম্ভবকে সম্ভব করতে হলে আমাদের আইসিইউ শক্তিশালী করা প্রায়োজন ও নিয়মিত ব্রেন ডেথ ঘোষণা করা দরকার।
কিডনি প্রতিস্থাপনের পর ৭০-৮০ ভাগ রোগী পাঁচ বছর এবং ২৫-৩০ ভাগ রোগী ১৫-২০ বছর সুস্থ-স্বাভাবিক কর্মমুখর জীবন যাপন করতে পারেন।
তবে সবসময় তাকে নির্দিষ্ট চিকিৎসকের কাছে বছরে তিন-চারবার যেতে হবে। এ সময় নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ সেবন বাধ্যতামূলক। কিডনি সংযোজনের ওষুধ কোনো কারণ ছাড়া বন্ধ রাখা যায় না। এই রোগীদের সংক্রমণের হার অন্য রোগীর চেয়ে বেশি। সুতরাং বাসায় ও বাইরে সংক্রমণ রোধে সবসময় তাকে সাবধানতা অবলম্বন করে চলতে হবে। পানি ও খাবারের প্রতি যত্নবান হতে হয়। প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট ব্যায়াম, হাঁটা-চলা করা উচিত। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর ডায়াবেটিসের হার বেড়ে যায়। উচ্চরক্তচাপ হতে পারে। আমাদের দেশে যক্ষ্মা হওয়ার প্রবণতা বেশি থাকে।
অন্যদিকে একজন কিডনি অকেজো রোগী ডায়ালাইসিস করে মাত্র পাঁচ বছর বেঁচে থাকতে পারেন। ডায়ালাইসিসের রোগীকে যেহেতু সপ্তাহে দুই-তিনদিন ৪ ঘণ্টা করে ডায়ালাইসিস করেই সময় কাটাতে হয়, তাই তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কঠিন। তাদের ঘর-সংসার করা অনেক কঠিন। সংসারে তাদের অনেকটাই বোঝা মনে করা হয়। তাই প্রতিটি রোগীর উচিত কিডনি সংযোজন করা।
জনসচেতনতার অভাবই আমাদের দেশের অঙ্গ সংযোজনে বড় প্রতিবন্ধকতা। গবেষণায় দেখা গেছ, সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক চিকিৎসক, মেডিকেল শিক্ষার্থী ও নার্সদের মধ্যেও মৃত ব্যক্তির অঙ্গ-সংযোজন ও এ-সংক্রান্ত আইন সম্বন্ধে ধারণা কম। এ জনসচেতনতা তৈরিতে প্রথমে চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিতদেরই এগিয়ে আসা প্রায়োজন। তারা জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে সহয়তা করতে পারেন। পাশাপাশি ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশন, দৈনিক পত্রিকার মতো মূলধারার গণমাধ্যম আরো বেশি ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
কিডনি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ







