বাংলাদেশে চাকরির কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে ছাত্র আন্দোলনের পর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সে প্রত্যশা পূরণ হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
না। প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। শিল্পের বিস্তৃতি ছাড়া বাংলাদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। সেবা খাত বড় হচ্ছে এবং সেখানে কিছু নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছেও, কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যে বিপুলসংখ্যক স্নাতক প্রতি বছর বের হচ্ছে, তাদের কর্মসংস্থানের জন্য যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বা প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন তা দেখতে পাচ্ছি না। এক বছর খুব অল্প সময়। তবে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না; বরং আমরা দেখছি বিনিয়োগ কমেছে, বহু শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে। শুনেছি যে প্রায় ১৫-১৬ লাখ নারীকর্মী চাকরি হারিয়েছেন। আমরা একটা ট্রানজিশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এবং আমার মনে হয় না এ অল্প সময়ের মধ্যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনো সুযোগ এ সরকারের আছে। গত ১০ বছরে যে উন্নয়নের বয়ান আমরা শুনেছি, তা ছিল কর্মসংস্থানবিহীন উন্নয়ন। সেটা হয়েছে মূলত বড় অবকাঠামোয় বিনিয়োগের মাধ্যমে, যার কারণে আমাদের জিডিপি বেড়েছে। তবে তার সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। সুতরাং, দীর্ঘদিন ধরেই সত্যিকার অর্থে কর্মসংস্থান বাড়ছে না।
বর্তমানে সংস্কার নিয়ে অনেক বেশি আলোচনা হচ্ছে। শিক্ষা সংস্কারের তেমন উদ্যোগ চোখে পড়েনি। শিক্ষা খাতের কোন কোন বিষয় সংস্কার জরুরি বলে মনে করেন?
শিক্ষা খাতে দ্রুত সংস্কার করাটা কঠিন কাজ। বর্তমান সরকারের প্রথম চার-পাঁচ মাস লেগেছে থিতু হতেই। সিলেবাস বা পাঠ্যবইয়ের কন্টেন্ট পরিবর্তনের মতো কিছু কাজ এ সময়ে হয়েছে, কিন্তু শিক্ষা খাতে কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি। বিগত সরকার শেষের দিকে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের একটা প্রচেষ্টা নিয়েছিল, কিন্তু তাতে ভুলত্রুটি ছিল। আগেকার দিনে পরীক্ষার ফলাফল ছিল মুখস্থবিদ্যা নির্ভরশীল। তা থেকে বের হওয়ার জন্য সৃজনশীল পদ্ধতি আনা হলো। কিন্তু দেখা গেল কোচিংনির্ভরতা কমল না। পরীক্ষার প্রশ্নে সৃজনশীলতার অভাব দেখা গেল; কিছু সীমিতসংখ্যক প্রশ্নই বারবার ঘুরেফিরে আসতে থাকল; তাতে শিক্ষার্থীরাও অভ্যস্ত হয়ে গেল এবং যথারীতি আবারো মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়ল। সুতরাং সংস্কার করতে হলে আমাদের পদ্ধতিগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। এটা খুব কঠিন চ্যালেঞ্জ। আমাদের শিক্ষকরা কোচিংয়ের দিকে কেন ঝুঁকছেন সে কারণটা আমাদের বের করতে হবে। শিক্ষকদের বেতন বাড়ানো দরকার, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শিক্ষকদের বেতন কতটুকু বাড়ালে কোচিং বন্ধ হবে? ২০১৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ করা হলো, তার পরও দুর্নীতি কমেনি। একইভাবে যথেষ্ট বেতন দিলে শিক্ষকদের কোচিং প্রবণতা বন্ধ হয়ে যাবে, সে বিষয়েও আমি ঠিক নিশ্চিত না।
সংস্কারের জন্য আমাদের জ্ঞান ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সংমিশ্রণে একটা নতুন পদ্ধতি তৈরি করতে হবে। মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীলতা ভাঙতে হবে। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবক সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিগত সরকার সবাইকে সম্পৃক্ত না করে সচেতনতা না বাড়িয়েই নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে গিয়েছিল, তাই সেটা ব্যর্থ হয়েছে। শিক্ষা খাতের সংস্কার দ্রুত করার কোনো সুযোগ নেই, সময় নিয়ে ধাপে ধাপে করতে হবে। যত বেশি সম্ভব অংশীদারকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সে সংস্কার করার মতো সময় এ সরকারের হাতে আছে বলে আমি মনে করি না।
বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে বাজেট প্রতি বছরই কমছে। গবেষণায় বরাদ্দও অপ্রতুল, গুণগত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পরও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত শিক্ষা কি অবহেলিতই রয়ে গেছে?
জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ। আমাদের মতো সীমিত সম্পদের উন্নয়নশীল দেশে উন্নয়ন ধরে রাখতে হলে দক্ষ মানবসম্পদ, সৃজনশীল মানুষ প্রয়োজন। অনেক কাজে অনেক টাকা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না, কারণ দক্ষ লোকবল নেই। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণায় বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। একটা বড় সমস্যা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায়োগিক গবেষণা খুব কম হয়, যা কিছুই গবেষণা হচ্ছে তা মূলত শিক্ষকরা পদোন্নতির প্রয়োজনে করছেন। কিন্তু মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত ছিল প্রায়োগিক গবেষণা। কিন্তু প্রায়োগিক গবেষণালদ্ধ জ্ঞান যদি দেশে কাজে লাগানো না যায়, তাহলে তো গবেষণায় উৎসাহ থাকবে না। দুটো ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রায়োগিক গবেষণায় বড় সাফল্য এসেছে জনস্বাস্থ্য ও কৃষি। আমাদের দেশে জনস্বাস্থ্য খাতে এত সমস্যা রয়েছে যে এখানে যেকোনো গবেষণাই প্রয়োগ করা যায়। অনেক কাজ এরই মধ্যে হয়েছে এবং সেগুলোর বিশ্বব্যাপী এক ধরনের পরিচিতিও আছে। কৃষি খাতে যেমন লবণাক্ততা, খরা, বন্যা সহনশীল ও উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, সেসব ফসল এখন মাঠে চাষ হচ্ছে। এ রকম হলে গবেষকদের মনে এক ধরনের মানসিক সন্তুষ্টি কাজ করে। সুতরাং গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়নের একটি রূপরেখা থাকতে হবে—ভবিষ্যতে আমার কী ধরনের লোকবল দরকার, কী ধরনের গবেষণা দরকার। আমি কি ভারী শিল্পর দিকে মনোযোগ দেব, নাকি শ্রমঘন বা হালকা শিল্পের দিকে। পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব বাজারের চাহিদা পূরণে নিজেদের উৎপাদনে যেতে হবে এবং উৎপাদনে গেলে প্রয়োজন হবে নতুন উদ্ভাবন এবং নতুন উদ্ভাবনে প্রয়োজন গবেষণা। বিশ্বের সব বড় প্রতিষ্ঠানেই রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট উইং থাকে—অ্যাপল, স্যামসাং, অ্যামাজন, টয়োটা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রায়োগিক গবেষণায় ব্যয় করে। সে গবেষণালদ্ধ জ্ঞান থেকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উদ্ভাবন নিয়ে আসে। আমাদের দেশে নিজস্ব উদ্ভাবনের উদ্যোগ তেমন দেখা যায় না।
দেশে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের কোনো সংযোগ নেই। একাডেমিয়া-ইন্ডাস্ট্রির কোলাবরেশন নেই। দিন দিন বেকারত্ব বাড়ছে। নতুন কর্মসংস্থানও সীমিত। আপনার মতে করণীয় কী?
শিল্প, বেসরকারি ও সরকারি খাতে হাতেগোনা কয়েকটা চাকরি ছাড়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার বাইরে চাকরির বাজারে পিএইচডিধারীদের যথেষ্ট চাহিদা নেই। তবে এটাও ঠিক যে পিএইচডির মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমরা বিদেশে দেখেছি যখন একটা বড় কোম্পানি তাদের নিজস্ব গবেষণার মাধ্যমে কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারে না, অথবা তারা যদি মনে করে যে নির্দিষ্ট একটা সমস্যার সমাধান তাদের এ মুহূর্তে না হলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন, তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আসে। এ চাহিদা সৃষ্টি করতে হলে সরকারকে বড় ভূমিকা নিতে হবে।
বিভিন্ন শিল্পে প্রচুর বিদেশী নাগরিক কাজ করছে। তারা কোন দেশ থেকে এসেছে, সে তথ্য হয়তো আছে, কিন্তু তারা কে কোন খাতে কাজ করছে, কী ধরনের পদে কাজ করছে, সে তথ্য সরকারের কাছে নেই। সে জায়গাগুলোয় আমাদের তরুণরা কেন যেতে পারছে না? কেউ তো নিজের ইচ্ছায় বিদেশীদের কাজ দিতে চায় না, তারা দেশী লোকই চায়। এ স্কিল গ্যাপ চিহ্নিত করে আমাদের শিক্ষার্থীদের সে স্কিলগুলো দিতে হবে।
কো-অপ প্রোগ্রাম, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, ইন্টার্নশিপ–এগুলো খুব বড় আকারে করতে হবে। কারিকুলামকেও ফ্লেক্সিবল করতে হবে। এখন যেমন চার বছরে গ্র্যাজুয়েশন শেষ হয়, কো-অপ থাকলে সেটা পাঁচ বছর হবে। একজন শিক্ষার্থী প্রথম দুই বা তিন বছর পড়াশোনা করে এক বছর কো-অপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে ফিরে এসে আবার বাকি এক বা দুই বছরের পড়াশোনা শেষ করবে। এতে গ্র্যাজুয়েশনের সময় সে এক বছরের কাজের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে বের হতে পারবে। ইউজিসিকে ফ্লেক্সিবিলিটিটা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দিতে হবে। এজন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকার, ইন্ডাস্ট্রি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান ভূমিকা আছে।










