গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষা খাতে বড় সংস্কার প্রত্যাশিত ছিল। বিগত এক বছরে তার কতটুকু পূরণ হয়েছে বলে মনে করেন?
এ সরকারের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল শিক্ষাসংস্কার। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে শিক্ষাটা অগ্রাধিকার থেকে ছুটে গেছে। ১১টি সংস্কার কমিশন করা হলো কিন্তু শিক্ষায় কোনো সংস্কার কমিশন হয়নি। কিছু সিদ্ধান্ত, কিছু কাজ তারা করেছেন, যা সাধারণ মানুষের কোনো কাজে আসবে না। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা না করেই অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে এত মানুষ প্রাণ দিল, সেখানে আবার কোটা পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে আলাদা করে বৃত্তি পরীক্ষা নেয়া হবে। বাকি ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থী কোথায় যাবে? এ অর্থ যদি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ নিশ্চিতে ব্যয় করা হতো, তাহলে সেটি বেশি ইতিবাচক হতো। মাধ্যমিকে ভর্তির ক্ষেত্রে যে ন্যূনতম ফি নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিম্নবিত্ত পরিবারের সাধ্যের বাইরে। আমরা যখন চা বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা জানিয়েছে এত উচ্চ ফি দিয়ে তারা সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করাতে পারছে না। যাদের দুজন সন্তান আছে, তারা কোনোমতে একজনকে ভর্তি করাচ্ছে। একই অবস্থা শহরাঞ্চলে বসবাসকারী অন্যান্য নিম্নবিত্ত পরিবারেও। এ ধরনের সিদ্ধান্ত তো প্রত্যাশিত নয়।
প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে পিইডিপির মাধ্যমে গত দেড় দশকে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ২০১১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্সে আরো বেশি দুর্বলতা দেখা গেছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন প্রতিবেদনটিও মূলত তৈরি করা হয় ঋণদাতা উন্নয়ন সহযোগীদের চাপে। তবে এ প্রতিবেদনে যেসব ফলাফল আসে, তা বিবেচনায় নেয়া হয় না। যারা আমাদের প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা করেন, তারা প্রায় সবাই আসেন প্রশাসন থেকে। শিক্ষা খাতে কাজ না করায় শিক্ষার সংকটগুলো সম্পর্কেও তারা যথাযথ অবগত থাকেন না এবং গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় যথাযথ গুরুত্বের ঘাটতি থেকে যায়। এছাড়া আমাদের প্রকল্পগুলোয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। আরেকটি বিষয় হলো আমাদের প্রাথমিক শিক্ষকরা এখনো ১৩তম গ্রেডে বেতন পান। সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কারণে মেধাবীরা এ পেশায় থাকতে চান না। ফলে শ্রেণীকক্ষে কাঙ্ক্ষিত মানের পাঠদানও নিশ্চিত হয় না।
প্রাথমিক শিক্ষার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের আসার সুযোগ নেই। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
মালদ্বীপ শিক্ষায় খুব দ্রুত এগিয়েছে। এশিয়ার মধ্যে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সবচেয়ে উন্নত বলা যায়। সেখানে মন্ত্রীসহ শিক্ষার নীতিনির্ধারণী সব পদে শিক্ষকরা কাজ করেন। ফলে তারা সমস্যাগুলো ভালোভাবে বোঝেন এবং সে অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষকরা ক্যাডার সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় তারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যেতে পারেন না। প্রাথমিক শিক্ষায় অনেক আগে থেকেই মহাপরিচালক, উপমহাপরিচালক পদে প্রশাসন ক্যাডারের ব্যক্তিরা দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের বেশির ভাগেরই মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা নেই। ফলে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে আসা সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার দূরত্ব থাকে এবং সেখানে মাঠপর্যায়ের সংকটের সমাধান থাকে না। আমরা যদি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে চাই, তাহলে এসব বিষয় আমাদের পর্যালোচনা করতে হবে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এ কাঠামোয় সংস্কার আনতে হবে।
সংবিধানে একমুখী শিক্ষার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ৫০ বছর পার হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। প্রাথমিক স্তরেই পাঁচ ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা ও ১১ ধরনের বিদ্যালয় আছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
সংবিধানে শিক্ষা নিয়ে এক ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি দেয়া হয়েছে। শিক্ষাকে মূলনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে সংবিধানে একমুখী শিক্ষার কথা থাকলেও বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বহু আগে থেকে বিষয়টি নিয়ে কথা বললেও কোনো সরকারই এটি কার্যকরের উদ্যোগ নেয়নি। আর এখন বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এত বেড়ে গেছে যে এটিকে এক ধারায় নিয়ে আসা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে একমুখী শিক্ষা বাস্তবায়ন করা না গেলেও ইংরেজি মাধ্যম, ধর্মীয় মাধ্যমসহ মূলধারার সবগুলোকেই ন্যূনতম একটা জায়গায় নিয়ে আসা জরুরি। শিক্ষানীতি-শিক্ষাক্রমে সে উদ্যোগ নেয়াও হয়েছিল। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঁচটি অভিন্ন বিষয়ে পাঠদানের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু তা পরে আর মনিটরিং করা হয়নি এবং বাস্তবায়নও হয়নি। ফলে শিক্ষায় নানা ধারার শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য ক্রমেই বেড়ে চলছে। রাষ্ট্রকে বৈষম্যহীন করতে হলে প্রথমে শিক্ষার এ বৈষম্য দূর করতে হবে। একমুখী শিক্ষা নিশ্চিত না করা গেলেও সব ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই সরকারি নীতিমালার আওতায় আনা এবং নির্দিষ্ট শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সমপরিমাণ ন্যূনতম দক্ষতা অর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিক্ষার উন্নয়নে করণীয় কী?
শিক্ষায় পুনর্গঠন নয়, রূপান্তর প্রয়োজন। শুধু বই বা শিক্ষাক্রম পরিবর্তন করলেই রূপান্তর হবে না। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার্থী নয়, মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে কিনা, সেটা দেখতে হবে। আমাদের সন্তানরা দশম শ্রেণী পাস করছে। কিন্তু তারা ষষ্ঠ শ্রেণীর জ্ঞান অর্জন করতে পারছে না। তাহলে তাদের আমরা কী শেখাচ্ছি? শিক্ষা তো শুধু উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্তের জন্য নয়। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে অভিভাবকের অর্থ আছে তার সন্তান ভালো মানের শিক্ষা পাচ্ছে। আর যার অর্থ নেই সে পাচ্ছে না। এ বৈষম্য দূর করতে অন্তত উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা প্রয়োজন।
বাজেটে শিক্ষায় যে বরাদ্দ দেয়া হয়, সেটি যথেষ্ট নয়। এ খাতে প্রয়োজনীয় বাজেট নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একসঙ্গে সম্ভব না হলেও একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ধীরে ধীরে বাজেটকে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে হবে। দেশে বর্তমানে শিক্ষকদের যে বেতন কাঠামো, তাতে মেধাবীরা এ পেশায় আসতে চান না। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে দক্ষ-মেধাবী শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর কথা অনেক আগে থেকে বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। এটি বাস্তবায়ন করা উচিত। এছাড়া, আমাদের দেশে এখনো দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ে। শিক্ষার্থীদের যে উপবৃত্তি দেয়া হয়, মূল্যস্ফীতির কারণে তা দিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কেনা সম্ভব হয় না। প্রাথমিকে উপবৃত্তি অন্তত ৫০০ টাকা করা উচিত। আবার আমাদের বিদ্যালয়গুলোয় মিড ডে মিল এবং আফটার স্কুল প্রোগ্রাম চালু নেই। কর্মজীবী মায়েদের চিন্তায় থাকতে হয় দুপুরে স্কুল ছুটির পর তার সন্তানটি কী খাবে, কে তার দেখাশোনা করবে। এ চিন্তা থেকে তারা সন্তানকে মূল ধারার বাইরের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে বাধ্য হয়। যেমন গাজীপুরে গেলে দেখা যায়, সেখানে গার্মেন্টসের আশপাশে অনেক হেফজখানা রয়েছে। শ্রমিকরা তাদের সন্তানদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে না দিয়ে এখানে দিচ্ছেন। কারণ তিনি যতক্ষণ কাজে থাকেন তার সন্তান এখানে নিরাপদ থাকে। স্কুলগুলোয় মিড ডে মিল এবং আফটার স্কুল প্রোগ্রামের মতো বিষয়গুলো চালু করতে হবে। সর্বোপরি শিক্ষার মানের উন্নতি করতে চাইলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা অংশীজনদের সমন্বয়ে করতে হবে। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।










