প্রখ্যাত নির্মাতা সত্যজিৎ রায় ১৯৮০ সালে নির্মাণ করেন কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘হীরক রাজার দেশে’। রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্রধর্মী সিনেমাটির পটভূমি এক স্বৈরতান্ত্রিক রাজ্যকে ঘিরে, যেখানে শাসক ‘হীরক রাজা’ শিক্ষা নিয়ে এক ধরনের আতঙ্কে ভুগতেন। তার ভাষ্যে, ‘যে যত বেশি জানে, সে তত কম মানে?’ অর্থাৎ শিক্ষিত-সচেতন মানুষকে দুঃশাসন মানানো কঠিন—এ সত্য তিনি ভালো করেই জানতেন। তাই উদয়ন পণ্ডিতকে নির্দেশ দিয়েছিলেন এমন শিক্ষা দিতে, যাতে প্রজারা মাথা নত রাখতে শেখে, প্রতিবাদ না করে। একপর্যায়ে রাজশক্তি পাঠশালা বন্ধ করে দেয়, বইপুস্তক পুড়িয়ে ফেলে, আর মগজ ধোলাইয়ের যন্ত্র বসিয়ে জনগণকে করে তোলে অন্ধ অনুসারী। এই ছিল হীরক রাজার শিক্ষানীতি—জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়ে অনুগত দাস তৈরি করা।

কল্পিত রূপকথার এ গল্প বাস্তবের সঙ্গে এতটা মিলে গেছে যে ভেবে শিউরে উঠতে হয়! গত দেড় দশকে শেখ হাসিনার শাসন শিক্ষা খাতে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তা যেন হুবহু হীরক রাজার নীলনকশার প্রতিচ্ছবি। শিক্ষা ব্যবস্থাকে তারা ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে। এমন এক প্রজন্ম তৈরির জন্য, যারা রাজনীতি সচেতন হবে না। প্রশ্ন তুলবে না। অবৈধ শাসনের প্রতি চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দেবে না।

এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভুলে ভরা বই বিতরণ করা হয়েছে বছরের পর বছর। ইতিহাসকে বিকৃত করে গড়া হয়েছে বিকৃত চেতনার এক প্রজন্ম। পরীক্ষার খাতায় কিছু না লিখলেও নম্বর দেয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। অটোপাসকে করা হয়েছে নিয়মতান্ত্রিক। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা ও চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে নিয়মিত। জিপিএ ৫-এর সংখ্যা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হতো, যেন শিক্ষার মান বৃদ্ধির এক ভুয়া ছবি তুলে ধরা যায়। কিন্তু জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে সুশিক্ষিত ও নৈতিক নাগরিক তৈরির প্রকৃত প্রয়াস থেকে তারা ছিল যোজন যোজন দূরে।

এ ধ্বংসযজ্ঞের উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু করে রাখা এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশী স্বার্থের কাছে সমর্পণ করা। এভাবে বেসরকারি খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো—সিইও, এমডি থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক আসন—সবই বিদেশী নাগরিকদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক ভয়াবহ বিপৎসংকেত।

নৈতিক অধঃপতন এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছিল যে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ‘সহনীয় পর্যায়ে ঘুস খাওয়া’কে জায়েজ করেছিলেন। সে সময় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের তথ্য তুলে ধরা হয়। এতে অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগের ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছিল। শিক্ষা ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠীর এসব অনিয়ম-দুর্নীতির ফলে সাধারণ মানুষের দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা উঠে যায়। সচেতন নাগরিকেরা বাংলা মাধ্যমের প্রতি আস্থা হারিয়েছিলেন। ইংরেজি ভার্সনেও সন্তুষ্টি ছিল না। তাই বহু অভিভাবক বাধ্য হয়ে সন্তানদের ইংরেজি মিডিয়াম বা বিদেশী কারিকুলামে পড়িয়েছেন, যা সমাজে আরো গভীর বৈষম্য তৈরি করেছে।

পরীক্ষা হচ্ছে জ্ঞান ও মেধা যাচাইয়ের বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের সনদ দিয়েছিল। অবশেষে আওয়ামী লীগ সরকার এমন একটি শিক্ষানীতি প্রণয়নের পরিকল্পনা নেয়, যেখানে এ মূল্যায়ন ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে যেত; শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক শ্রেণী থেকে অন্য শ্রেণীতে উঠে যেত। ফ্যাসিস্টের এসব উদ্যোগ কেবল শিক্ষার মান ধ্বংসের পরিকল্পনা নয়; এটি ছিল অসচেতন-আত্মসম্মানবর্জিত এক প্রজন্ম তৈরি করার এক ভয়ংকর চক্রান্ত।

আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা খাতের এ ধ্বংসাবশেষ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে স্বৈরশাসকের প্রথম আঘাতই আসে জ্ঞানের ওপর। সত্যজিৎ রায়ের কল্পকাহিনী কেবল একটি শিশুতোষ রূপকথা নয়; এটি ছিল সতর্কবার্তা। যে জাতি শিক্ষার শক্তিকে দুর্বল হতে দেয়, সে জাতি রাজনৈতিকভাবে দাসে পরিণত হয়। শেখ হাসিনার শিক্ষানীতি আমাদের সেই বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।

উদয়ন পণ্ডিত ও তার শিষ্যরা রাজার বিকৃত শিক্ষা গ্রহণ করেনি। তারা প্রজাদের নিয়ে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হীরক রাজার পতন ঘটিয়েছেন। আমাদের শিক্ষার্থীরাও তা-ই করেছে। সঙ্গে ছিলেন একদল আলোকিত শিক্ষক। তবে ১৫ বছরে শিক্ষা ব্যবস্থার যে ক্ষতি হয়েছে, তা রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব না। গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছে। পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুকরণ ও সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে আগের কারিকুলাম থাকলেও ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। কিন্তু এখন দরকার শিক্ষা খাতের পুনর্গঠন ও গুণগত পরিবর্তন। কিন্তু ইতিহাস বিকৃতির সংশোধন, পরীক্ষার স্বচ্ছতা, যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ, এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুগোপযোগী শিক্ষার প্রসার ছাড়া মুক্তচিন্তার বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডকে ভেঙে ফেলার প্রতিটি ষড়যন্ত্র প্রতিহত করাই আজকের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

আগামীতে যদি বিএনপি সরকার গঠন করে, তবে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শিক্ষাদর্শন অনুসারে কর্মমুখী ও বিজ্ঞানমুখী শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। জিয়াউর রহমানের শিক্ষাদর্শন ছিল সময়োপযোগী, উৎপাদনমুখী এবং নৈতিক মূল্যবোধ ও জাতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযুক্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের মূল উপাদান। তিনি জাতীয় চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এমনকি ২০০ বছরের পুরনো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে সর্বস্তরে বিজ্ঞান ও কর্মমুখী শিক্ষার পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষাকেও যুগোপযোগী করেছেন তিনি।

১৯৭৮ সালে তিনি ঢাকায় জাতীয় শিক্ষা ওয়ার্কশপ আয়োজন করেন, যেখানে দেশের শিক্ষাকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করে বাস্তবমুখী, সমন্বিত শিক্ষানীতি গ্রহণের দিকনির্দেশনা দেন। জিয়াউর রহমান বৃত্তিমূলক, কারিগরি, কৃষি ও চিকিৎসাশিক্ষার সম্প্রসারণে গুরুত্বারোপ করেছিলেন এবং বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি তিনি মানবিক শিক্ষা, ধর্মীয় শিক্ষা এবং চরিত্র গঠনের গুরুত্ব বুঝে পাঠ্যক্রমে নৈতিকতা ও স্বাধীনতাসংক্রান্ত ইতিহাস সংযোগের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার এ দৃষ্টিভঙ্গি শিক্ষা ক্ষেত্রে তাকে একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্মরণীয় করে রেখেছে।

বিএনপি এরই মধ্যে ৩১ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেছে। শিক্ষাসংক্রান্ত ২৪ নং দফায় শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বাঙ্গীণ সংস্কার, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে চাহিদামূলক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষায় জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণার গুরুত্ব এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রচলন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। উন্নত বিশ্বে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হলেও বিগত সময়ে আমাদের দেশে এ হার ছিল ২ শতাংশের নিচে। এক্ষেত্রে শিক্ষা খাতে জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। তারেক রহমানের এ উদ্যোগ শিক্ষা ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করবে বলে আশা করছি। গণতন্ত্রমনা নতুন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন চালু হবে। এছাড়া শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প ও উৎপাদন খাতে গবেষণা ও উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে। ক্রীড়া ও জাতীয় সংস্কৃতির উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়া হবে এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ করা হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বহির্বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন সময়ের দাবি।

ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম: শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি