দেশের বিভিন্ন খাতের সংস্কারে কমিশন গঠন করা হয়েছে। তবে শিক্ষা খাতের সংস্কারে হয়নি। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন এবং উচ্চশিক্ষা সংস্কারে আপনার পরামর্শ কী?

অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় সংস্কারের জন্য ১১টি কমিশন গঠন করেছে, কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য কোনো কমিশন গঠন করেনি। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য একটি পরামর্শদাতা কমিটি গঠন করা হলেও তার সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতি কম। দক্ষতা ও যথাযথ শিক্ষা ছাড়া শুধু ডিগ্রিই শিক্ষার প্রধান বাধা।

শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় সফল হওয়ার জন্য সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আজই যদি এ পরিবর্তন প্রক্রিয়া শুরু করি, আগামী দশকে বাংলাদেশ একটি জ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনী অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সংকট কী কী?

বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থার অনেকগুলো সংকট রয়েছে। মৌলিক সংকট বলতে গেলে বাজেট বরাদ্দ কম। আরেকটি হচ্ছে শিক্ষা খাতকে রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালনা করা। দেশের শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ প্রায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এটি জিডিপির ১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। রাজনৈতিক বিবেচনায় সার্বিক কার্যক্রম চালানোর জন্য ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে অনেক উপাচার্য পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রতিষ্ঠান অনুমোদন বা বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করে। একজন ‘অযোগ্য’ ব্যক্তি কোনোভাবে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এর ফল ভোগ করতে হয় দুই-তিন দশক।

এছাড়া প্রাথমিক স্তর থেকে দেশে বিভিন্ন ধরনের পাঠ্যক্রম চালু রয়েছে। সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে একক পাঠ্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। গবেষণায় মনোযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থায় আরো উন্নতি সম্ভব। ব্যবহারিক জ্ঞান ও দক্ষতার ওপর জোর দিয়ে পাঠ্যক্রম সংস্কার জরুরি। চাকরির বাজারকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের প্রজন্মকে শিক্ষিত করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি কর্মক্ষেত্রের যোগসূত্র স্থাপন গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার পরপরই বিষয়ভিত্তিক চাকরিও নিশ্চিত করা যায়। পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আরো গুরুত্বপূর্ণ করা উচিত। সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিরা শিক্ষকতায় আসবেন এবং তাদের বেতন কাঠামো সর্বোচ্চ হতে হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে এবং একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

খুব অল্প সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক রÅvংকিংয়ে পেছনে ফেলেছে। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

দেশের প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষকরা যে গবেষণা ও শিক্ষার অবকাঠামোগত বা আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন, তা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যোগ্যতা ও গবেষণা ব্যবহার করেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক রÅvংকিংয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের গবেষণাকর্ম আপলোড হচ্ছে না। ফলে যারা রÅvংকিং করছেন, তারা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা সম্পর্কে জানতে পারছেন না। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেই সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাচ্ছেন। তাদের শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগী হিসেবে নেয়া হচ্ছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করছে এবং এ কারণে তাদের বৃত্তি দেয়া হচ্ছে। এদিক থেকে আমি মনে করি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে এগিয়ে।

আপনি দায়িত্ব নেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও সার্বিক উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার জন্য প্রতি প্রকল্পে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ ৩৯ হাজার টাকা করে বাড়িয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। শিক্ষকদের মানসম্পন্ন গবেষণা প্রকাশে উৎসাহিত করার জন্য জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের জন্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা সম্মানীর ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথম বর্ষে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের প্রথমদিন থেকেই আবাসিক হলে তাদের আসন নিশ্চিত করা হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে যুগোপযোগী অটোমেশন টুলস সংযোজন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আরএফআইডি ও ইউএইচএফ সিকিউরিটি গেট, সহজে বই খুঁজে পেতে ও ইস্যু করতে বুক সার্চিং ও ইস্যু কি আস্ক এবং সহজে ইস্যুকৃত বই জমা দেয়ার জন্য ড্রপবক্স। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কক্ষও রয়েছে।

২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দেশী-বিদেশী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দ্বিপক্ষীয় শিক্ষা ও গবেষণার জন্য সমঝোতা স্মারক চুক্তি সই হয়েছে। এ চুক্তির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় শিক্ষা, গবেষণা ও পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। উভয় প্রতিষ্ঠান গবেষণার মান বৃদ্ধি এবং দেশের মানুষের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর মাধ্যমেও শিক্ষা-গবেষণার মানোন্নয়ন হবে বলে মনে করি।

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষা ও সার্টিফিকেট অর্জনের ওপর অতিমাত্রায় গুরুত্ব দেয়া হয়। জ্ঞাননির্ভর সমাজ গঠনে মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কী পরিবর্তন প্রয়োজন?

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষা ও সার্টিফিকেট অর্জনের ওপর অতিমাত্রায় গুরুত্ব দেয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের চেয়ে কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। জ্ঞাননির্ভর সমাজ গঠনের জন্য মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরীক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, গবেষণার অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনার বিকাশকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিটি বিষয়ে শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা মূল্যায়ন করা উচিত, কেবল লিখিত কাগজপত্র নয়। প্রজেক্ট, ল্যাবরেটরি কাজ, ইন্টার্নশিপ, দলগত কাজ এবং সমস্যা সমাধানভিত্তিক মূল্যায়ন সংযুক্ত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের সমস্যার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়। পরীক্ষা ও সার্টিফিকেট শুধু প্রতীকী অর্জন নয়, বরং শিক্ষার্থীর বাস্তব যোগ্যতার মানদণ্ড হয়ে উঠবে এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে শিক্ষা ব্যবস্থা আরো কার্যকর হবে। সার্টিফিকেট অর্জনকে গুরুত্ব দিতে হবে, গুরুত্ব দিতে হবে সার্টিফিকেট অর্জনের প্রক্রিয়াকে জ্ঞান ও দক্ষতামুখী করার ওপরেও।

নিয়োগকর্তারা বলছেন নিজ নিজ খাতের চাহিদা অনুযায়ী তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট পাচ্ছেন না। আবার বেকারত্বের হারও দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে গ্র্যাজুয়েটরা চাকরি পাচ্ছেন না কেন?

এটি নিঃসন্দেহে বড় সমস্যা। একদিকে নিয়োগকর্তারা চাহিদামাফিক গ্র্যাজুয়েট পাচ্ছেন না। আরেকদিকে গ্র্যাজুয়েটরা কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাচ্ছেন না। শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় না থাকা এর একটি কারণ। আরো কারণ রয়েছে। দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার প্রবণতা বেশি। অনেক দেশে ভোকেশনাল ট্রেনিং করে শিক্ষার্থীরা দ্রুত কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে সফল হন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এর মাধ্যমে দ্রুত চাকরির বাজারের জন্য দক্ষ জনসম্পদ তৈরি করা সম্ভব। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে, যাতে তারা দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন চাকরির জন্য প্রস্তুত হয়। ইন্টার্নশিপ ও চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার সুযোগ বৃদ্ধি এবং শিল্পের সঙ্গে সহযোগিতা করা উচিত। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার ফল দেশী শিল্প-কারখানায় ব্যবহার করতে পারলে আরো কার্যকর হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গুণগত শিক্ষার মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষক রাজনীতি কি গুণগত শিক্ষার অন্তরায়?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ১৯৭৩ সালের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আইনের ৪৪(২) ধারায় সংগঠন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। ফলে রাজনীতি করার ওপর আইনি কোনো বাধা নেই। তবে স্বাধীনতার অপব্যবহার এবং দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে শিক্ষকদের নিজস্ব দায়িত্বে বিভ্রাট দেখা দিয়েছে, যা শিক্ষক রাজনীতিতে উদ্বেগের কারণ হয়েছে। ফলে শিক্ষক রাজনীতি মানসম্মত শিক্ষার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক চর্চার চেয়ে রাজনৈতিক দাসত্বের প্রবণতা কখনো কখনো বেশি হওয়ায় সম্মানিত শিক্ষকদের নিয়ে এ ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিক্ষকদের শিক্ষক রাজনীতির ভালো উদাহরণও রয়েছে; ১৯৫২, ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালে অনেক শিক্ষক দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। শিক্ষক রাজনীতি গুণগত শিক্ষার অন্তরায় এমন মন্তব্য ঠিক নয়, বরং শিক্ষক রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটলে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত হবে।