বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ক্রমাগত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এক সময় এখানে প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা হতো সংক্রামক রোগকে। বর্তমানে তার জায়গা নিয়েছে অ-সংক্রামক রোগ, দুর্ঘটনাজনিত আঘাত, বার্ধক্যজনিত জটিলতা এবং কর্মস্থল-সম্পর্কিত নানা শারীরিক সমস্যা। এ নতুন বাস্তবতায় কেবল ওষুধ, অস্ত্রোপচার কিংবা হাসপাতালের শয্যা বাড়ালেই যথেষ্ট নয়; রোগীর পূর্ণ পুনর্বাসন এখন স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম প্রধান অঙ্গ। আর এ পুনর্বাসনের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছেন ফিজিওথেরাপিস্টরা। তাদের দক্ষতা ও অবদানকে যথাযথভাবে কাজে না লাগাতে পারলে স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন কখনই পূর্ণতা পাবে না।

অ-সংক্রামক রোগের বিস্তার ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব বহু গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার বা স্ট্রোকের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় কেবল ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব নয়; শরীরের কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার অপরিহার্য। ফিজিওথেরাপিই সেই দায়িত্ব পালন করে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন, কিন্তু অস্ত্রোপচারের পর ফিজিওথেরাপি না পাওয়ায় অনেকেই কখনই পূর্ণ সুস্থতা ফিরে পান না। একইভাবে জনসংখ্যার আয়ু বৃদ্ধির কারণে প্রবীণ জনগোষ্ঠী দ্রুত বাড়ছে, যারা হাঁটু ব্যথা, কোমর ব্যথা ও আর্থ্রাইটিসের মতো সমস্যায় ভোগেন। তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করতে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি অত্যন্ত কার্যকর। শিশুদের ক্ষেত্রেও এ সেবার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সেরিব্রাল পালসি, অটিজম কিংবা জন্মগত শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখে। নিয়মিত থেরাপির মাধ্যমে এসব শিশু হাঁটা, বসা, খেলা এবং স্কুলে অংশগ্রহণের মতো দক্ষতা অর্জন করে, যা তাদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্ট্রোক-পরবর্তী রোগীদের অধিকাংশের পুনর্বাসন সেবা প্রয়োজন হয় এবং এ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকে ফিজিওথেরাপি। রোগীর জীবনমান উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতায় ফিরিয়ে আনার জন্য এর গুরুত্ব তাই অপরিসীম।

বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক তিন লাখেরও বেশি মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন এবং তাদের প্রায় ৭৫ শতাংশ রোগীর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন। স্ট্রোক-পরবর্তী ফিজিওথেরাপি রোগীদের হাঁটার ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়, হাতের কার্যক্ষমতা বাড়ায়, ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল শেখায় এবং ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ফিরতে সহায়তা করে। একইভাবে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও ফিজিওথেরাপি অপরিহার্য। এসব দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা কেবল ওষুধে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; জীবনধারায় পরিবর্তন ও নিয়মিত ব্যায়ামই দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। ফিজিওথেরাপি রোগীদের সক্রিয় জীবনযাপন বজায় রাখতে সহায়তা করে, ফলে তারা শুধু ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন না। ক্যান্সার-পরবর্তী রোগীরাও ফিজিওথেরাপির মাধ্যমে শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তি ও মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হন।

দুর্ঘটনার ফলে সৃষ্ট শারীরিক ক্ষতি, হাড় ভাঙা কিংবা অস্ত্রোপচারের পর সম্পূর্ণ সুস্থতার জন্য ফিজিওথেরাপি অপরিহার্য। সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা বা দৈনন্দিন জীবনের নানা আঘাতের পর যেসব রোগী পুনর্বাসন পান না, তারা স্থায়ীভাবে শারীরিক সীমাবদ্ধতার শিকার হয়ে যান। এর ফলে ব্যক্তি যেমন তার কর্মক্ষমতা হারান, তেমনি পরিবারকেও দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে স্বাস্থ্যব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি উৎপাদনশীলতার ঘাটতির বোঝা বহন করতে হয়।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৯ শতাংশ মানুষ ৬০ বছরের বেশি বয়সী, অর্থাৎ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আর্থ্রাইটিস, কোমর ও হাঁটুর ব্যথা, চলাফেরার সীমাবদ্ধতা এবং ভারসাম্যহীনতার মতো সমস্যা দেখা দেয়, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নিয়মিত ফিজিওথেরাপি এ প্রবীণদের ব্যথা কমায়, চলাফেরার সক্ষমতা বাড়ায় এবং দৈনন্দিন কাজে স্বনির্ভর করে তোলে, ফলে তারা স্বাবলম্বী জীবনযাপন করতে পারেন।

তবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যনীতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাঠামোতে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত নয়। বেশির ভাগ সরকারি হাসপাতালে ফিজিওথেরাপিস্টের পদ নেই। যেখানে আছে (যেমন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল) সেখানে ফিজিওথেরাপিস্টরা সবাই মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল (এমএটিএস) থেকে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) বিষয়ে ডিপ্লোমাধারী। ফলে মানুষকে হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যয়বহুল চিকিৎসা নিতে হয় অথবা সেবা না নিয়েই অক্ষম জীবন কাটাতে হয়। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদিও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল প্রতিষ্ঠান ফিজিওথেরাপি শিক্ষা চালু করেছে, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও বিশেষায়নের সুযোগ এখনো সীমিত। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কারিকুলামের অভাবে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো পেশাগত মর্যাদার অভাব। ফিজিওথেরাপিকে প্রায়ই গৌণ বা সহায়ক সেবা হিসেবে দেখা হয়। অনেক চিকিৎসক ও রোগী এখনো মনে করেন ফিজিওথেরাপি কেবল ব্যথা কমানোর একটি উপায়। অথচ উন্নত বিশ্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ফিজিওথেরাপিস্টরা চিকিৎসা দলের অপরিহার্য সদস্য। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে প্রাথমিক থেকে তৃতীয় পর্যায়ের প্রতিটি ধাপে ফিজিওথেরাপিস্টরা সম্পৃক্ত। অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় প্রতিটি হাসপাতালে পুনর্বাসন বিভাগ রয়েছে। ভারতের মতো দেশও জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে ফিজিওথেরাপিকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত পদ সৃষ্টি করেছে। ফলে রোগীদের চিকিৎসা কার্যকর হচ্ছে, পুনর্বাসন ত্বরান্বিত হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ফিজিওথেরাপির প্রয়োজনীয়তা বোঝার জন্য প্রথমে ফিজিক্যাল মেডিসিন এবং ফিজিওথেরাপিস্টদের ভূমিকা স্পষ্ট করা দরকার। উন্নত বিশ্বের উদাহরণ ঘটলে দেখা যায়, ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন (পিএমআর) হলো অন্যান্য চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের মতো একটি চিকিৎসা বিশেষত্ব, যেখানে (সাধারণত তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে) ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা (ফিজিয়াট্রিস্ট) রোগ নির্ণয়, ওষুধের প্রেসক্রিপশন এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকেন। অন্যদিকে গ্র্যাজুয়েশন স্তরের ফিজিওথেরাপিস্টরা (যারা ব্যাচেলর অব ফিজিওথেরাপি বা সমতুল্য ডিগ্রিধারী) সে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। তারা শারীরিক ব্যায়াম, ম্যানুয়াল থেরাপি, ইলেকট্রোথেরাপি এবং রোগী শিক্ষার মাধ্যমে রোগীর কার্যক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেন। উদাহরণস্বরূপ, একজন স্ট্রোক রোগীর ক্ষেত্রে নিউরোলজিস্টের পাশাপাশি ফিজিয়াট্রিস্ট রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন, আর ফিজিওথেরাপিস্ট সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী রোগীকে হাঁটতে, ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং পেশির শক্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করেন। এ দুই পেশার সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। আবার অর্থোপেডিক সার্জন অথবা কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান (যেমন রিউমাটোলজিস্ট বা খেলাধুলাজনিত আঘাত-সংক্রান্ত চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক) ফিজিওথেরাপিস্টদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। রোগীকে রেফারেল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফিজিওথেরাপিস্টের কাছে পাঠানো হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্ট একসঙ্গে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন। ফিজিওথেরাপিস্ট থেরাপি প্রদান ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন, আর চিকিৎসক রোগীর অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা তত্ত্বাবধান করেন। সফল চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টের মধ্যে সমন্বিত ও নিয়মিত যোগাযোগ অপরিহার্য।

উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যেমন যুক্তরাজ্যে হাসপাতালের প্রতিটি ফিজিওথেরাপি ইউনিটে একজন সিনিয়র ফিজিওথেরাপিস্টের নেতৃত্বে কয়েকজন জুনিয়র ফিজিওথেরাপিস্ট, সহকারী এবং প্রশাসনিক কর্মী কাজ করেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের একটি মাঝারি আকারের হাসপাতালে অন্তত দুই থেকে চারজন ফিজিওথেরাপিস্ট (বিপিটি) নিয়োগ করা প্রয়োজন, যেখানে নারী-পুরুষ উভয়ের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ অনেক রোগী, বিশেষত নারী রোগীরা, নারী ফিজিওথেরাপিস্টের সঙ্গেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পাশাপাশি দুই থেকে তিনজন সহকারী অর্থাৎ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) এবং অন্তত একজন প্রশাসনিক কর্মী থাকা অপরিহার্য।

নির্দিষ্টভাবে বলা যেতে পারে, গ্রামীণ এলাকায় ইউনিয়ন পর্যায়ে যে সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে তিন সদস্যের একটি ফিজিওথেরাপিস্ট ইউনিট রাখা যেতে পারে। সেখানে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট (বিপিটি) এবং দুজন সহকারী অর্থাৎ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) রাখা যেতে পারে, যাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী হওয়া উচিত। শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কথা বলা হয়েছে, সেখানেও অনুরূপ একটি ফিজিওথেরাপি ইউনিট স্থাপন করা যেতে পারে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অন্তত পাঁচ সদস্যের একটি দল থাকা জরুরি, যার মধ্যে দুজন ফিজিওথেরাপিস্ট (বিপিটি), দুজন সহকারী অর্থাৎ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) এবং একজন রিসেপশনিস্ট বা প্রশাসনিক কর্মী থাকবেন। জেলা হাসপাতালের ক্ষেত্রে একজন সিনিয়র ফিজিওথেরাপিস্টের নেতৃত্বে চারজন ফিজিওথেরাপিস্ট (বিপিটি), আটজন সহকারী অর্থাৎ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) এবং একজন প্রশাসনিক কর্মীর সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ফিজিওথেরাপি ইউনিট গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপিস্টদের প্রেসক্রিপশনের অধিকার নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। উন্নত দেশগুলোয় যেমন যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায়, বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফিজিওথেরাপিস্টরা সীমিত প্রেসক্রিপশনের অধিকার পান। বিশেষ করে প্রাথমিক সেবার স্তরে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিস্টরা রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং পুনর্বাসন-সংক্রান্ত প্রেসক্রিপশন প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় গ্র্যাজুয়েশন স্তরের ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগ কাঠামোর অনুপস্থিতির কারণে বর্তমানে যারা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) হিসেবে কাজ করছেন, তাদের সংগত কারণে চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে কাজ করতে হচ্ছে।

সরকারি হাসপাতালে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) ও গ্র্যাজুয়েশন স্তরের ফিজিওথেরাপিস্টদের মধ্যে পার্থক্য নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা (ফিজিওথেরাপি) সাধারণত তিন-চার বছরের প্রশিক্ষণ নিয়ে সীমিত সেবা দেন। অন্যদিকে গ্র্যাজুয়েশন স্তরের ফিজিওথেরাপিস্টরা পাঁচ বছরের বিস্তৃত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ শেষে স্বাধীনভাবে রোগী মূল্যায়ন ও চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করার মতো দক্ষতা অর্জন করেন। এ বিভ্রান্তি দূর করতে একটি স্বতন্ত্র ফিজিওথেরাপি কাউন্সিল গঠন করা জরুরি, যা নিবন্ধন, মান নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফিজিওথেরাপিস্টরা এখন প্রাথমিক মূল্যায়ন ও চিকিৎসা পরিকল্পনায় সরাসরি ভূমিকা রাখছেন। যুক্তরাজ্যে তারা ‘ফার্স্ট কন্টাক্ট প্র্যাকটিশনার’ হিসেবে কাজ করেন, যেখানে তারা চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই রোগীর সমস্যা মূল্যায়ন করেন। অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় তারা স্বাধীনভাবে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন। নিউজিল্যান্ডে প্রাথমিক পর্যায়ে পেশি-হাড়ের সমস্যার অধিকাংশ রোগীর সেবা দেন ফিজিওথেরাপিস্টরা। বাংলাদেশেও গ্র্যাজুয়েশন স্তরের ফিজিওথেরাপিস্টদের এ ভূমিকা পালনের জ্ঞান ও দক্ষতা রয়েছে, তবে নীতিগত স্বীকৃতি ও পেশাগত মর্যাদার অভাবে তারা তা প্রয়োগ করতে পারছেন না।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম প্রণয়ন, উচ্চতর ডিগ্রি চালু ও গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করা জরুরি। চিকিৎসক, নার্স, ডায়েটিশিয়ান এবং ফিজিওথেরাপিস্টদের সমন্বিত দল গঠন করতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও স্বাস্থ্যশিক্ষা কর্মসূচির ব্যবহার জরুরি। প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেবা আরো সহজলভ্য করা সম্ভব। টেলি-রিহ্যাবিলিটেশনের মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকার রোগীরাও বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্টের সেবা পেতে পারেন। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে এটি সফলভাবে চালু আছে, বাংলাদেশেও তা কার্যকর হতে পারে।

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপিস্টদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে স্বাস্থ্যসেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। রোগীর দ্রুত পুনর্বাসন সম্ভব হবে। হাসপাতালের শয্যা খালি হওয়ার হার বাড়বে। চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে। সর্বোপরি মানুষের জীবনমান উন্নত হবে, যা স্বাস্থ্যসেবার আসল লক্ষ্য। বাংলাদেশ এখন স্বাস্থ্যসেবার রূপান্তরের পথে। শুধু চিকিৎসা নয়, রোগীর পূর্ণ সুস্থতা ও কর্মক্ষমতায় ফেরা নিশ্চিত করাই হলো আসল উদ্দেশ্য। ফিজিওথেরাপিস্টরা সেই উদ্দেশ্য পূরণে অন্যতম চালিকাশক্তি। তাই স্বাস্থ্যসেবায় ফিজিওথেরাপিস্টদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন আর বিলম্ব করার মতো বিষয় নয়। স্বাস্থ্যনীতি, বাজেট এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে তাদের সক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলেই বাংলাদেশ একটি টেকসই ও আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে।

ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশ (এএইচআরবি); আহ্বায়ক, নেটওয়ার্ক ফর হেলথ কেয়ার এক্সিলেন্স (এনএইচই)