অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ওষুধ খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার হয়েছে কি? আপনাদের যে ধরনের আশা ছিল, সরকার তার কতটুকু পূরণ করতে পেরেছে?
অন্তর্বর্তী সরকার যে কয়েকটি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে, তার মধ্যে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন একটি। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা এবং সম্ভাবনাগুলোকে চিহ্নিত করেছে। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হলে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনে উল্লেখিত কিছু সংস্কারের বাস্তবায়ন জরুরি। যে প্রস্তাবগুলোয় দ্বিমত রয়েছে সেগুলো আমাদের যারা স্বাস্থ্য খাতের অংশীদাররা রয়েছে, তাদের সঙ্গে বসে একটা সমাধানে আসা সম্ভব বলে আমি মনে করি।
ওষুধ শিল্পের কোন কোন দিক সংস্কার হওয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প পার্শ্ববর্তী যতগুলো সার্কভুক্ত দেশ আছে, সেগুলো থেকে কয়েক গুণ এগিয়ে। ওষুধ শিল্পে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ থেকে আমাদের দেশ উন্নত। আমরা উচ্চ মানের ও কার্যকর ওষুধ উৎপাদন করতে সক্ষম। দেশের মোট চাহিদার ৯৫ শতাংশ আমাদের দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো পূরণ করতে সক্ষম। আমাদের অনেক ওষুধ পৃথিবীর অনেক দেশে রফতানি হচ্ছে। ওষুধ শিল্পের অগ্রগতিতে আমাদের যেটি দরকার তা হলো আমাদের গবেষণা ও উন্নয়নে সরকারের মনোযোগ। গবেষণা ও উন্নয়ন যদি আমরা না করি তাহলে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে আমরা তাল মিলিয়ে চলতে পারব না। স্বাস্থ্যসেবাকে উন্নত করতে পারব না। আমি এখন চীনের একটি ব্যবস্থার উদাহরণ দিতে পারি। সেখানে সরকার নিজ উদ্যোগে ন্যাশনাল রিসার্চ ল্যাব করে দেয়। সেই রিসার্চ ল্যাবে বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি তাদের প্রয়োজনীয় আধুনিকতম গবেষণাগুলো করে। প্রয়োজনীয় ওষুধ উদ্ভাবন করে এবং এ ল্যাবের মধ্য দিয়ে উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। এটির মাধ্যমে তাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর উন্নতমানের আধুনিক সেবা নিশ্চিত করতে পারে। আমাদের এখানে এ মডেল যদি আমরা মাথায় আনি তাহলে আমাদের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি অবশ্যই অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে।
ওষুধের দাম নিয়ে দেশে রোগীদের নানা রকম মত আছে। দেশে ক্যান্সারের ওষুধের দাম নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
আমাদের দেশের মানুষের আয় এখনো অনেক কম। সেই হিসেবে ক্যান্সার চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল। অনেকে বলে ভারতে ওষুধের দাম কম। বাংলাদেশে ক্যান্সারের জন্য যুগান্তকারী যেসব ওষুধের উদ্ভাবন করা হয়েছে, যেমন ইমিউনোথেরাপি, অ্যান্টিবডি—এসব ওষুধের দাম ভারত থেকেও আমাদের দেশে কম। এছাড়া ব্যাংকক-থাইল্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে আমাদের দেশের ওষুধের দাম আরো কম। সেই দিক থেকে চিন্তা করলে আমরা বলতে পারি আমাদের দেশের ওষুধের দাম কম। তবে সার্বিক দিক চিন্তা করেলে ওষুধের দামসহ ক্যান্সারের চিকিৎসা আমাদের দেশে এখনো ব্যয়বহুল।
দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ক্যান্সারের ওষুধের যে চাহিদা তার কতটুকু দেশের উৎপাদকরা পূরণ করতে পারছেন?
দেশে ক্যান্সারের ওষুধের মোট চাহিদার ৯৭ শতাংশ আমরা উৎপাদন করতে সক্ষম। শুধু আমরা একা না, দেশের যে ২০টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি ক্যান্সারের ওষুধ নিয়ে কাজ করে, তারাও আছে। প্রতিটি কোম্পানির যথেষ্ট সক্ষমতা আছে। দেশের কোথাও ক্যান্সারের ওষুধের অপ্রতুলতা আছে সেটি দেখানো যাবে না। তবে ভারতের ভিসা বন্ধ হওয়ার পরও বিভিন্ন মাধ্যমে ক্যান্সারের ওষুধ আমাদের দেশে আসছে। যেটি আমাদের দেশের ওষুধ শিল্পের জন্য হুমকিস্বরূপ।
ক্যান্সারের ওষুধ উৎপাদনে দেশে প্রচলিত আইন ও নীতি কতটা সহায়ক? এক্ষেত্রে আপনাদের কোনো পর্যবেক্ষণ বা প্রত্যাশা আছে কি?
আমাদের ওষুধ শিল্পের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হলো ডিজিডিআই। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর আমাদের এ শিল্পকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করে। তবে এখানে কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আছে। যেমন গত এক বছরে নতুন পণ্যের উৎপাদন, বিপণনের ড্রাগ কন্ট্রোল কমিটির (ডিসিসি) একটিও সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। তার সঙ্গে সম্পূরক টেকনিক্যাল সাবকমিটির গত এক বছরে একটিও সভা হয়নি। এ রকম একটি কঠিন সময়ে যখন আমরা ২০২৬ সালে উন্নত দেশে উন্নীত হব তখন এমনিই আমরা পেটেন্ট পাব না। সেজন্য এক বছর ধরে যে বাজারজাত বা বিপণন কার্যক্রম বন্ধ আছে সেটি আমাদের অনেক ভোগাবে। এখানে এটা আমাদের বেশি ফোকাস করা দরকার। কারণ রোগের ধারা পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের দেশে বা পৃথিবীতে নতুন নতুন রোগ আসছে। নতুন নতুন রোগের সঙ্গে নতুন নতুন চিকিৎসা পদ্ধতিও আবিষ্কৃত হচ্ছে। আমাদের এখানে প্রচলিত আইনে, আধুনিকতর চিকিৎসা ব্যবস্থা সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী করা এবং তাদের সহজে সেবা দিতে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। যেমন আমাদের এখানে আমরা ওরকমভাবে অবকাঠামো উন্নত করতে পারিনি। আমাদের দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। অথচ আমরা এত উন্নয়নশীল দেশের মতো করে রেগুলেশন করে রেখেছি, যেটা আমরা আসলে মানতে পারছি না। যার কারণে উন্নত বিশ্বের যে চিকিৎসাপদ্ধতি রয়েছে সেগুলো আনতে পারছি না। যেমন বায়োসেমিলার, ইমিউনোথেরাপি, কর্টিসেল থেরাপি—এ চিকিৎসাগুলো অন্য দেশের মানুষ ব্যবহার করছে ক্যান্সারসহ মারণব্যাধি বিভিন্ন অসুখ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। এদিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে পড়ছি। আমাদের এখানে যে নীতিমালা আছে তা অনেক বেশি সহজীকরণ দরকার। এটি দুটি কারণে দরকার। মূলত ট্রিুপস-এগ্রিমেন্ট যখন বন্ধ হয়ে যাবে; সেই প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবেলা করার জন্য আগামী ১০ বছরে যে ড্রাগ প্রয়োজন সেগুলো এখনই রেজিস্ট্রেশন করা দরকার। না হলে আমাদের দেশের মানুষ বিরাট স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ব।
দেশে উৎপাদিত রফতানি করা ওষুধ এবং ক্যান্সারের ওষুধের গুণমান বজায় রাখতে সরকার থেকে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন?
আমাদের দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো সিজিএমপির (কারেন্ট গুড ম্যানুফ্যাকচরিং প্র্যাকটিস) মধ্য দিয়ে চলে। তাই দুই দেশের জন্য দুই রকমের ওষুধের কোয়ালিটি নির্ধারণ করার কোনো সুযোগ নেই। চাহিদা অনুযায়ী প্যাকেজিং বা ভাষা পরিবর্তন করি। এর সঙ্গে ওষুধের কার্যকারিতার কোনো সম্পর্ক নেই।
সবশেষে আমরা বলতে চাই, ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি হিসেবে আমরা ব্যাপকভাবে অগ্রসর হচ্ছি। দেশে এ ইন্ডাস্ট্রিতেই প্রতিটি সেক্টরে দক্ষ জনবল কাজ করে। আমি খুবই আশাবাদী যে সরকার যদি এ শিল্পকে সহযোগিতা করে তাহলে এ খাত ভবিষ্যতে গার্মেন্টস শিল্পের মতোই উন্নতি করবে।










