রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতসহ অতীতের বিভিন্ন সময় দেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের আর্থিক চাপ ও সংকট তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস খাতের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে স্থানীয় কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি বারবার সামনে এলেও অজানা কারণে পিছু হটতে হয়েছে সরকারকে। মূলত বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলেও কয়লা উত্তোলনে বড় ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি; যে কারণে আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়ে দেশের বিপুল পরিমাণ কয়লার মজুদ সিদ্ধান্তের অভাবে পড়ে আছে মাটির নিচে বলে মনে করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিভাগের এক কার্যপত্র সূত্রে জানা গেছে, দেশে পাঁচটি খনিতে যে পরিমাণ কয়লা রয়েছে তার ২০ শতাংশ উত্তোলন করা গেলেও ১ হাজার ৫৬৪ মিলিয়ন কয়লা উত্তোলন করা যেতে পারে, যা ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা পূরণ করতে পারে। দেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানি করছে পেট্রোবাংলা, যা মোট গ্যাসের চাহিদার এখন ২৫ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ। এ গ্যাস আমদানি করতে সরকারকে গত অর্থবছরে ৫৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। আর এ খাতে ভর্তুকি লেগেছে অর্থবছরে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ এ জ্বালানি ব্যয় ব্যতিরেকে কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার বড় সুযোগ এখনো রয়ে গেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘দেশের কয়লা উত্তোলনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হলে নিরপেক্ষ সমীক্ষা প্রয়োজন। আমি মনে করি আমাদের এ পুরো কয়লা উত্তোলনের ব্যবস্থাপনাটা ভালোভাবে তৃতীয় কোনো পক্ষ দিয়ে, যার কোনো স্বার্থ নেই, বাংলাদেশের এ রকম কাউকে দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। তারা যদি বলে যে না এটার ঝুঁকি সীমিত আকারে এবং এর ঝুঁকি সামলানো সম্ভব হবে, কোনো সমস্যা হবে না, তাহলে আমরা এগিয়ে যেতে পারি। আর যদি বলে ঝুঁকি অনেক বেশি, এ ঝুঁকি নেয়া যাবে না, তাহলে আমরা দেশীয় কয়লা উত্তোলনের চিন্তা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করতে পারি। আমার কথা হলো প্রপোজালের অনেস্ট এক্সামিনেশন হতে হবে। ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জকে ভয় পেলে চলবে না। পৃথিবীর কোনো বড় প্রজেক্ট, মেগা প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ ছাড়া হয়নি।’
দেশের পাঁচটি কয়লা খনির মধ্যে একমাত্র বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করছে পেট্রোবাংলা। এ খনিতে এখনো ৩৯০ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এ খনি থেকে প্রতি বছর সর্বোচ্চ সাড়ে নয় লাখ টনের মতো কয়লা উত্তোলন করছে পেট্রোবাংলার সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল)। কয়লা উত্তোলন শুরু থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১ কোটি ৬৪ লাখ ৬৯ হাজার টনের বেশি কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে। দেশের সবচেয়ে বেশি গভীরতার কয়লা খনি অবস্থিত জয়পুরহাটের জামালগঞ্জে। এ খনির গভীরতা ৬৪০ থেকে ১ হাজার ১৫৮ মিটার। তথ্য-উপাত্ত অনুসারে, খনিটিতে ৫ হাজার ৪৫০ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ রয়েছে। ১৯৫৯ সালে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (জিএসবি) এ কয়লা খনি আবিষ্কার করে। এ খনির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হলেও কয়লা উত্তোলনে রাষ্ট্রীয় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি। খনি আবিষ্কারের ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কিংবা বিদেশী কোনো কোম্পানির দ্বারস্থ হবে কিনা, সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি পেট্রোবাংলা।
বড়পুকুরিয়া-জামালগঞ্জ ছাড়াও আরো তিনটি কয়লা খনি রয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুরের দিঘীপাড়া কয়লাখনি আবিষ্কার হয় ১৯৯৫ সালে। এ খনিতে ৮৬৫ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ রয়েছে। এছাড়া রংপুরের খালাসপীর কয়লা খনিতে ৬৮৫ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ রয়েছে। আর ফুলবাড়ীতে মজুদ রয়েছে ৫৭২ মিলিয়ন টন।
দেশের এ পাঁচ কয়লা খনির মধ্যে একটি খনি ছাড়া বাকি চারটি খনির বিষয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে। তবে সে সমীক্ষার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি জ্বালানি বিভাগ। বরং সমীক্ষাগুলো নিয়ে বিগত সরকার বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিলেও তাতে শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিপুল পরিমাণ কয়লা মজুদ থাকার পরও কেন দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তা তোলা যায়নি সে বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মকবুল ই-ইলাহী চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে শুরু থেকেই প্রথম যে সংকটটি ছিল সেটি হলো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকা। দ্বিতীয়ত, পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্নতা। প্রাণপ্রকৃতিকে রক্ষা করে কীভাবে খনি থেকে কয়লা উত্তোলন করা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি। তবে একটি দৃঢ় ও শক্ত অবস্থান তৈরি করা গেলে হয়তো দেশের কয়লা সম্পদ উত্তোলন করা যেত। তা দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি হিসেবে সরবরাহ করা গেলে বিপুল পরিমাণ বিদেশী মুদ্রা ব্যয় কমানো যেত।’
দিনাজপুরের দিঘীপাড়া কয়লা খনি উন্নয়নে ২০০৫ সালে পেট্রোবাংলাকে লাইসেন্স দেয় সরকার। জিএসবি এ কয়লা খনি আবিষ্কার করে। এ খনিতে ৮৬৫ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ রয়েছে। উন্নয়নকাজ ২০১৮ সালে শুরু করে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিসিএমসিএলের তত্ত্বাবধানে সে সময় জার্মানির দুটি ও অস্ট্রেলিয়ার একটি কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম খনি এলাকায় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালায়। প্রায় তিন বছর সমীক্ষা চালিয়ে ২০২০ সালে পেট্রোবাংলায় প্রতিবেদন জমা দেয় কনসোর্টিয়ামটি। ওই প্রতিবেদনে দিঘীপাড়া কয়লা খনি থেকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা তোলার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দিঘীপাড়া খনিতে সম্ভাব্য মজুদের পরিমাণ ৭০ দশমিক ৬ কোটি টন। বছরে ৩০ লাখ টন হিসাবে ৩০ বছরে নয় কোটি টন কয়লা উত্তোলন করা যাবে। কয়লা তোলার ব্যয় টনপ্রতি হবে ১৬০ ডলার। তবে এটি অনেক ব্যয়বহুল মনে হওয়ায় বিসিএমসিএল ওই জরিপ প্রতিবেদন ডিএমটি নামের যুক্তরাজ্যের আরেকটি কোম্পানিকে দিয়ে পর্যালোচনা করে।
১৯৮৯ সালে রংপুরের খালাসপীর নামে আরেকটি কয়লা খনি আবিষ্কার হয়। ওই খনিতে ৬৮৫ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদের তথ্য জানায় বিসিএমসিএল। যদিও জিএসবি জানায়, এ খনিতে ১৪৩ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ রয়েছে। খনিটি আবিষ্কারে সাড়ে তিন দশক পেরিয়ে গেলেও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা।
খালাসপীর খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জাতীয় সংসদের এক প্রশ্নোত্তর পর্বে জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। গত ২ এপ্রিল সংসদে রংপুর-৬ আসনের বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমিনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে এ কথা জানান।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে ১৯৯৭ সালে বিএইচপি মিনারেলস কয়লা খনি আবিষ্কার করে। বিসিএমসিএলের তথ্য অনুসারে, এ খনিতে ৫৭২ মিলিয়ন টন কয়লা মজুদ রয়েছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, মূলধন ও পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে ফুলবাড়ী খনি উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থ প্রয়োজন পড়বে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। এ বিনিয়োগ করা গেলে এখান থেকে কয়লা তোলা যাবে প্রায় ৮৩ বিলিয়ন ডলারের (বড়পুকুরিয়ার কয়লার দাম বিবেচনায়)।
ফুলবাড়ী থেকে কয়লা উত্তোলনের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে এর বিরোধিতা সবচেয়ে বেশি। ২০০৬ সালে ফুলবাড়ী খনি থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রতিবাদে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়। আহত হয় বহু মানুষ। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য হলো ফুলবাড়ী থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা আহরণ করা হলে তা এখানকার জীবন-জীবিকা ও বাসস্থান এবং স্থানীয় প্রাণপ্রকৃতি, প্রতিবেশ ও বাস্তুসংস্থানের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে উঠবে। সে সময় জনগণের তীব্র আন্দোলনের মুখে ‘ফুলবাড়ী চুক্তি’ হয়।
২০০৬ সালের পর ফুলবাড়ী থেকে কয়লা উত্তোলনসংক্রান্ত বিষয়টি ঝুলে থাকে প্রায় ২০ বছর। দেশে জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ফুলবাড়ী থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার উদ্যোগ নেয়। যদিও অনির্বাচিত সরকারের এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িত না হওয়ার আহ্বান জানান জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে অনেকেই।
সর্বশেষ গত বছরের ১১ মার্চ জিসিএম রিসোর্সেস তাদের ওয়েবসাইটে ‘ফুলবাড়ী কোল মাইনিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ওভারবর্ডেন স্ট্রিপিং কনট্রাক্ট’ বিষয়ে একটি ঘোষণা দেয়। এজন্য চীনা কোম্পানি পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন চায়নার সঙ্গে চুক্তি করে জিসিএম। কোম্পানিটি ‘পাওয়ার চায়না’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। এ চুক্তির মাধ্যমে পাওয়ার চায়না দিনাজপুরের আলোচিত ফুলবাড়ী কয়লা খনি উন্মুক্ত পদ্ধতিতে উন্নয়ন করবে। পাশাপাশি সাড়ে ছয় হাজার মেগাওয়াটের বেশি ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। বাংলাদেশে এখনো এশিয়া এনার্জি করপোরেশন নামেই সক্রিয় রয়েছে জিসিএমের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি।









