চীনা প্রবাদে বলা হয়, প্রবল বাতাসেই ঘাসের শক্তি বোঝা যায়, আর তীব্র আগুনেই খাঁটি সোনা পরীক্ষা হয়। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কও নানা সময়ের পরীক্ষায় তার প্রাণবন্ত শক্তি ও বিকাশের গতি প্রদর্শন করেছে এবং বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণের সমর্থন অর্জন করেছে।
২০২৬ সালের ১ অক্টোবর গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে বাংলাদেশে চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে চীনের উন্নয়ন ও চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে যারা সমর্থন দিয়ে আসছেন, বাংলাদেশের সর্বস্তরের সেই বন্ধুদের প্রতি আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও গভীর শ্রদ্ধা জানাই। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বসবাসরত সব চীনা নাগরিককে জানাই উৎসবের শুভেচ্ছা ও আন্তরিক শুভকামনা।
এ বছর চীনের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার ১০৫তম বার্ষিকীও পালিত হচ্ছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে এবং এর বৈশ্বিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য।
এ বছর চীন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫১তম বার্ষিকী এবং চীন-বাংলাদেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতার দশম বার্ষিকীও। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে সুখ-দুঃখে একসঙ্গে পথ চলার মধ্য দিয়ে চীন ও বাংলাদেশ পরস্পরের ভালো প্রতিবেশী, ভালো বন্ধু ও ভালো অংশীদারে পরিণত হয়েছে। আমরা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং একে অপরের প্রতি অনেক আন্তরিক। চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে দেশ পরিচালনায় সমর্থন করে, দেশটির জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সমর্থন করে, বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে বাংলাদেশ আরো বড় ভূমিকা পালন করুক—এটিও সমর্থন করে।
এ বছর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো চীন সফর করেন। এ সফরে দুই দেশের নেতারা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেন এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন যুগে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশে শক্তিশালী গতি সঞ্চার হয়েছে। বর্তমানে রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা আরো গভীর হয়েছে, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা ফলপ্রসূ হয়েছে এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও বিনিময় ক্রমেই উষ্ণতর হচ্ছে। চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ভালো সময় অতিক্রম করছে।

তথ্যপ্রমাণই দেখিয়েছে, চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব দুই দেশের এবং দুই দেশের জনগণের মৌলিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ; একই সঙ্গে এটি সময়ের ধারারও অনুকূল। কোনো ঝড়ই আমাদের সম্পর্কের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারবে না।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ আরো উজ্জ্বল হবে এবং আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতার পথ আরো বিস্তৃত হবে। চীন-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব চিরকাল সবুজ ও সজীব থাকুক! আমাদের দুই দেশ সমৃদ্ধ হোক এবং দুই দেশের জনগণের সুখ ও কল্যাণ নিশ্চিত হোক!
এক নজরে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক
বাণিজ্য: ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা ১৬ বছর বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার চীন।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নতুন রেকর্ড গড়ে ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।
বিনিয়োগ: ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের ক্রমপুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
প্রকল্প সহযোগিতা: বাংলাদেশের ‘স্বপ্নের সেতু’ হিসেবে পরিচিত পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছে একটি চীনা কোম্পানি।
চীনের সহায়তায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট নির্মাণ এবং বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু-৬ সংস্কারসহ কয়েকটি প্রকল্প বর্তমানে নির্মাণাধীন। চীনের সহায়তায় নির্মাণাধীন জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হল, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু-৯ এবং জরুরি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রসহ অন্যান্য প্রকল্পের কাজও এগিয়ে চলছে।
স্বাস্থ্যসেবা: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন বাংলাদেশকে ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডেঙ্গু ও কভিড-১৯ পরীক্ষার কিট, ওষুধ, দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহারের ভেন্টিলেটর, রোবোটিক পুনর্বাসন সরঞ্জাম এবং বন্যাদুর্গতদের জন্য ত্রাণসামগ্রী।
শিক্ষা: যৌথ গবেষণা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বিনিময় এবং যৌথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে সহযোগিতা বাড়াতে চীন ও বাংলাদেশের প্রায় ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় এমওইউ স্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশে চীন পাঁচটি কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট ও কনফুসিয়াস ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশজুড়ে প্রায় এক লাখ মানুষ চীনা ভাষা শেখা ও চর্চার সঙ্গে যুক্ত।
ইউনান বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটি ২০ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে।










