ইলেক্ট্রো মার্ট বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য সম্পর্ক আশির দশক থেকে। চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অবকাঠামো, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক উন্নয়নকে কেন্দ্র করে একটি ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে। চীন বাংলাদেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোয় একটি প্রধান আর্থিক অবদানকারী। বেইজিং বাংলাদেশের অধিকাংশ পণ্যের ওপর শুল্কমুক্ত সুবিধাও দেয়।
বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন অংশীদার। বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান বিদেশী বিনিয়োগকারী চীন, যা জ্বালানি, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগে মনোনিবেশ করছে। বাংলাদেশকে তার স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) অবস্থা থেকে মসৃণভাবে উত্তরণে সহায়তা করতে চীন আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ শক্তি ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়ে সম্পর্ককে একটি সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ ও চায়নার সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে অনেক বিস্তৃত হয়েছে, এটি এখন শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগ বা উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, কর্মসংস্থান ও শিল্প সহযোগিতা এখন এ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক পণ্যের অন্যতম বিপণনকারী গ্রুপ ইলেক্ট্রো মার্ট বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিকস কনকা ও গ্রীর সঙ্গে প্রযুক্তি শেয়ারের মাধ্যমে বাংলাদেশে উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। গ্রুপটির শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামালের একটি বৃহৎ অংশ চায়না থেকে সংগ্রহ করছে।
আশির দশকে চীনের সঙ্গে যখন ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপের বাণিজ্য সম্পর্কের সূচনা হয়, তখন বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক পণ্যবাজারে বড় হিস্যা ছিল জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের। পরবর্তী সময়ে ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুন নেওয়াজ সেলিম বাংলাদেশে চীনা ইলেকট্রনিকস পণ্য আমদানি করতে শুরু করেন। প্রথম দিকে কয়েক লাখ টাকা নিয়ে ট্রেডিং ব্যবসা শুরু করেন উদ্যোক্তা নুরুন নেওয়াজ সেলিম। পরবর্তী সময়ে তার যোগ্য নেতৃত্বে সহোদর তিন ভাই মো. নুরুল আমিন, মোহাম্মদ নুরুচ্ছাফা মজুমদার এবং মো. নুরুল আফছারের সহযোগিতা ও পরিচালনায় ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপ এখন প্রায় সাত হাজার লোকের কর্মসংস্থানকারী একটি বৃহৎ ইলেকট্রনিকস পণ্যের উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশে চাইনিজ ইলেকট্রনিক পণ্যকে গ্রাহকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি ও আস্থায় আনতে সক্ষম হই। ব্যবসা শুরুর প্রাথমিক পর্যায়ে চায়না ব্র্যান্ডের পণ্য বাজারজাতকরণে আমাদের বেশ কঠিন সময় পার করতে হয়। কারণ চায়না ব্র্যান্ডের প্রতি গ্রাহকদের একটি বিরূপ ধারণা ছিল। গ্রাহকদের সে ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে আমাদের এ পর্যায়ে আসতে হয়েছে। আমাদের এ পথচলায় গ্রাহক, শুভানুধ্যায়ী, পার্টনার, ডিলারসহ অনেকে সহযোগিতা করছেন, যাদের অবদান আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি এবং সবসময় আমরা তাদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। পণ্যের মান উন্নয়নসহ দেশের পরিবেশ ও গ্রাহকদের চাহিদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পণ্য সরবরাহ করায় গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত আমাদের ব্র্যান্ডের প্রতি আস্থা রেখেছেন। ফলে কনকা, গ্রী ও হাইকো ব্র্যান্ডের ইলেকট্রনিক পণ্য বর্তমানে শহর, উপশহর ও গ্রাম-গঞ্জের প্রতিটি ঘরে ঘরে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক পণ্য চাহিদার প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ দেশেই উৎপাদন হয়ে থাকে। যার সিংহভাগ যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের জোগানদার চীন। অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চীন থেকে নিরাপদ, মানসম্মত ও টেকসই কাঁচামাল সংগ্রহ করছে। ফলে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি শিল্প খাতের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত আধুনিক ইলেকট্রনিকস যন্ত্রপাতির একটি বড় অংশ চীন সরবরাহ করছে, যা শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে এবং মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া এর মধ্য দিয়ে শুধু কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি হচ্ছে না; প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গেও বাংলাদেশের শিল্প খাতের একটি সংযোগ তৈরি হচ্ছে।
শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও প্রযুক্তি আমদানিতেও দুই দেশের বাণিজ্য আরো সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে এ সম্ভাবনাকে আরো বাড়িয়ে তুলতে হলে কিছু বাধা দূর করতে হবে। কাস্টমস শুল্কায়ন কার্যক্রম সহজীকরণসহ সব সরকারের সব পর্যায়ে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আমদানি প্রক্রিয়াকে আরো সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করতে হবে। ব্যবসায়ীদের জন্য লেনদেনের খরচ কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ করা গেলে দুই দেশের বাণিজ্য অনেক বাড়তে পারে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যস্বত্বভোগী ব্যয় কমবে, সরাসরি সরবরাহকারীদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরি হবে। ফলে দুই দেশের প্রকৃত বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো গভীর হবে।
আমার বিশ্বাস, আগামী দিনের বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক হবে আরো গভীর, বহুমাত্রিক ও পারস্পরিক লাভজনক। শুধু বাণিজ্য নয়, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, টেকসই কৃষি, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের আধুনিকায়নেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
মো. নুরুল আফছার: উপব্যবস্থাপনা পরিচালক
ইলেক্ট্রো মার্ট গ্রুপ









