বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিগত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ অগ্রগতিকে টেকসই করতে এবং সরকার ঘোষিত নতুন বাংলাদেশ গড়তে আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট প্রস্তাবে বেসিসের পক্ষ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর ও নীতিগত সংশোধনের সুপারিশ করছি। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে দেশীয় আইসিটি খাত আরো গতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে বলে আমরা মনে করি।

কর অব্যাহতির মেয়াদ ২০৩১ পর্যন্ত বাড়ানো

বর্তমানে আয়কর আইন ২০২৩-এর অধীনে তথ্যপ্রযুক্তি ও আইটিইএস খাতের ১৯টি উপখাতে কর অব্যাহতি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে। আমরা মনে করি, এ সময়সীমা ২০৩১ সাল পর্যন্ত বাড়ানো জরুরি। কারণ বাংলাদেশ সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে দেশকে একটি উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্যে পৌঁছতে রফতানি বহুমুখীকরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র দুই বছরের কর অব্যাহতি অনেক বিনিয়োগকারীকে নিরুৎসাহিত করছে। দীর্ঘমেয়াদি কর সুবিধা দিলে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হবেন, যার ফলে কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি খাতে উদ্যোক্তা তৈরি হবে। কর অব্যাহতি বহাল থাকলে স্থানীয় কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে, একই সঙ্গে দেশীয় সফটওয়্যার ও পরিষেবা ব্যবহার করে বিদেশী প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমবে।

ক্যাশলেস লেনদেনের শর্ত শিথিল করতে হবে

আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কর অব্যাহতি পেতে হলে সব ধরনের লেনদেন ক্যাশলেস করতে হবে। আমরা এ বাধ্যবাধকতার শর্ত শিথিল করার দাবি জানাই। আমরা মনে করি, এখনো দেশে শতভাগ ক্যাশলেস লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। অনেক প্রতিষ্ঠান দৈনন্দিন প্রয়োজন যেমন স্টেশনারি, খাবার, অফিস সরঞ্জাম প্রভৃতি খাতে নগদ লেনদেন করতে বাধ্য হচ্ছে। আমাদের প্রস্তাব, ধাপে ধাপে ক্যাশলেস লেনদেন বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেয়া হোক এবং অন্তত ব্যবসায়িক খরচের ১০ শতাংশ যেন ক্যাশলেস শর্তের বাইরে রাখা হোক।

ক্লাউড সার্ভিসে ভ্যাট কেটে রাখা বন্ধ করা জরুরি

আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো ক্লাউড সার্ভিস খাতে ক্লায়েন্টদের পক্ষ থেকে ভ্যাট কেটে রাখার প্রথা বন্ধ করা। বর্তমানে ক্লাউড সার্ভিস প্রোভাইডাররা যেমন গুগল, অ্যামাজনের কাছ থেকে সেবা নিতে গিয়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দেয়। একই সঙ্গে যখন তারা স্থানীয় ক্লায়েন্টদের সেবা দেয়, তখন ক্লায়েন্টরা আবার ১৫ শতাংশ ভ্যাট কেটে রাখে এবং মূসক ৬ দশমিক ৬ চালান পেতে দুই-তিন মাস সময় লেগে যায়। ফলে ক্লাউড সার্ভিস প্রোভাইডাররা সার্বক্ষণিক তারল্য সংকটে ভোগে। আমরা চাই, ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীদের মতো ক্লাউড সার্ভিস কোম্পানিগুলোকেই যেন ভ্যাট কর্তনের দায়িত্ব দেয়া হয়, যাতে তারা আর্থিকভাবে চাপমুক্ত থাকতে পারে এবং বাজারে আরো বেশি কার্যকরভাবে সেবা দিতে পারে।

স্থানীয় সফটওয়্যার ও পরিষেবা থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করা

দেশের স্থানীয় সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবা বাজার সম্প্রসারণে ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব রেখেছে বেসিস। বর্তমানে শুধু স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে কিছু সীমিত অব্যাহতি থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখনো ৫ শতাংশ পর্যন্ত ভ্যাট প্রযোজ্য। আমরা মনে করি, এ ভ্যাট তুলে দেয়া হলে দেশীয় সফটওয়্যারের দাম কমবে, যার ফলে সাধারণ গ্রাহক ও উদ্যোক্তারা সহজে দেশীয় প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী হবেন। এতে একদিকে যেমন বিদেশী সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরতা কমবে, তেমনি দেশের অর্থনীতিতে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। স্থানীয় সফটওয়্যার খাতের বিস্তার ঘটলে কর্মসংস্থানও বাড়বে এবং প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে।

ভবিষ্যতের জন্য নীতিগত স্থিতিশীলতা প্রয়োজন

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নীতিগত স্থিতিশীলতা। হঠাৎ করে কর সুবিধা প্রত্যাহার বা কঠোর নিয়ম আরোপ বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমায়। তাই সংগঠনটি সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে, বাজেট প্রণয়নের সময় যেন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবতানির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হয়।

তথ্যপ্রযুক্তি খাত কেবল একটি শিল্প নয়, এটি বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার অন্যতম মাধ্যম। কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও রফতানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে এ খাত আগামী দিনে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে, যদি সময়োপযোগী নীতিমালা ও সহায়ক অবকাঠামো নিশ্চিত করা যায়।

তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান বেসিসের এ বাজেট প্রত্যাশাগুলো শুধু তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের নয়, বরং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে মনে করি। কর অব্যাহতি, ক্যাশলেস লেনদেনের বাস্তবতা, ভ্যাট নীতিমালার সংস্কার এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ তার প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের যাত্রায় আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে।