এককভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পোশাক রফতানির বাজার যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের শীর্ষ পোশাক রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান হা-মীম। ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষিত পাল্টা শুল্কের প্রভাব কেমন হতে পারে বলে মনে করছেন?
ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্কের প্রভাব মোকাবেলায় ব্যবসায়ীদের তেমন কিছু করার নেই, এক্ষেত্রে বিষয়টি রাষ্ট্রীয়ভাবে মীমাংসা হতে হবে। আমেরিকান অ্যাম্বাসেডরসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা আমাদের কারখানা পরিদর্শন করেছেন এবং ট্যারিফ যেন বাংলাদেশের ওপর আরোপিত না হয় সেজন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের প্রধান জোর ছিল প্যারা ট্যারিফের ওপর, যা প্রত্যাহারের কথা তারা জানিয়েছেন। বিশেষ করে আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসা পণ্যের ক্ষেত্রে যে পাঁচ-ছয় ধরনের সনদের প্রয়োজন হয়, সেগুলো সীমিত করার কথা বলেছেন।
ভিয়েতনাম যেমন আমেরিকায় তাদের পণ্য রফতানিতে জিরো ট্যারিফের প্রস্তাব দিয়েছে এবং বিনিময়ে আমেরিকা থেকে আসা পণ্যের ক্ষেত্রেও জিরো ট্যারিফ চেয়েছে, বাংলাদেশও তেমন পাল্টা প্রস্তাব দিতে পারে। বর্তমানে কটন কাপড়ের ওপর ১৫ দশমিক ৬ শতাংশের পাশাপাশি আরো ১০ শতাংশসহ মোট ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ শুল্ক আরোপিত আছে, যা ভবিষ্যতে বাড়তেও পারে। এ বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। এর সঙ্গে শ্রম আইনের সংশোধনের ফলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি পেলে সক্ষমতা আরো কমে যাবে। বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় প্রায় ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি হয়, যার মধ্যে ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারই পোশাক শিল্প। এ বিশাল বাজার হারানোর ঝুঁকি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন। ট্যারিফ নিয়ে আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার সমস্যার কারণে চীন ইউরোপের দিকে ঝুঁকবে এবং রফতানি বহুমুখীকরণ করবে। ফলে আমেরিকার ওপর তাদের নির্ভরতা কমবে, যা অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন করে তুলবে। অন্যদিকে, এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিদ্যমান জিরো ট্যারিফ সুবিধা আর থাকবে না। এতে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে যাবে, এমনকি হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি নানাবিধ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে। প্রাইভেট সেক্টরে ঋণের পরিমাণ কমছে এবং বিনিয়োগের অভাব দেখা যাচ্ছে। ফলে রাজস্ব সংগ্রহ কম হচ্ছে এবং কর্মসংস্থান হ্রাস পাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাজেটকে বিনিয়োগমুখী ও কর্মমুখী করতে হবে। কাঁচামালের ওপর আরোপিত ট্যারিফ প্রত্যাহার করে জিরো ট্যারিফ করা উচিত, কারণ কাঁচামালই উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভিত্তি। বাণিজ্য ঘাটতির দিকে নজর দেয়া এবং আমদানি কমিয়ে রফতানি বাড়ানোর জন্য ট্যারিফ শূন্য করার বিকল্প নেই। পোশাক শিল্পের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের ওপর জোর দিতে হবে। আমেরিকার পাল্টা শুল্ক বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণ গতিশীল হচ্ছে না?
বাজার বহুমুখী ও পণ্য বহুমুখীকরণের উদ্যোগ দীর্ঘদিনের। এক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রধান বাধা হলো ইউটিলিটি। একদিকে সহজলভ্য না আবার দামও বেশি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হলেও বাংলাদেশে তেমন সুযোগের অভাব রয়েছে। ইউটিলিটির ক্ষেত্রে পদে পদে বাধা এবং এর অত্যধিক দামের কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশে ইউটিলিটিকে সহজলভ্য করতে হবে। প্রতিযোগী দেশগুলো তাদের বিনিয়োগকারীদের কী কী সুবিধা দিচ্ছে, সে বিষয়ে নজর রাখা জরুরি। ডলারের বিনিময় হারকে বাজারের (ফ্রি ফ্লোট) ওপর ছেড়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে যদি মূল্যস্ফীতি বাড়ে, অন্যভাবে ভর্তুকি দিতে হবে। তাহলে রফতানি বৃদ্ধি পাবে। যখন রফতানি বাড়বে, তখন মৌলিক কাঁচামালের আমদানিও বাড়বে। এতে করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়বে এবং সরকারি ঋণের পরিমাণ কমবে। বর্তমানে সরকারের ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। আমরা যদি রফতানি বাড়াতে পারি তাহলে আর আইএমএফের দিকে তাকাতে হবে না। বাজেটে এ বিষয়গুলো বিবেচনার পাশাপাশি যদি ব্যবসায়ীদের পরামর্শ আমলে নেয়া হয়, তাহলে তা অর্থনীতির জন্য ভালো হবে।
বৈশ্বিকভাবে এখন ম্যান মেড ফাইবার (এমএমএফ) ব্যবহার বদ্ধি পাচ্ছে। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় এমএমএফ পণ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বাজেটে কোনো ঘোষণার প্রত্যাশা রয়েছে?
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রফতানির ৭৫ শতাংশ কটনবেজড হওয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী দাম বেশি হওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীরা কটনবেজড পণ্য থেকে সরে গিয়ে ম্যান মেড ফাইবারের দিকে ঝুঁকছে। এক্ষেত্রে চীন ও ভিয়েতনাম অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশে ম্যান মেড ফাইবার তৈরির সুযোগ এখনো তেমনভাবে তৈরি হয়নি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সম্পূর্ণরূপে আমদানিনির্ভর। এ পরিস্থিতিতে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে ম্যান মেড ফাইবার উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। তবে ব্যাংকের উচ্চ সুদহার এবং ইউটিলিটির অতিরিক্ত দামের কারণে নতুন বিনিয়োগে তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। ঝুঁকি বেশি এবং সরকারের সুযোগ-সুবিধা কম থাকার কারণেও নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হচ্ছে না। যেমনটা আগে বলেছি, এক্ষেত্রেও প্রতিবেশী দেশ কী ধরনের সুবিধা বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে দিচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে সংগতি রেখে আমাদের জন্যও সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে।
নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কি কোনো প্রভাব রাখছে?
নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবশ্যই প্রভাব ফেলছে। ব্যবসায়ীরা একটি স্থিতিশীল সরকার চান। কারণ ব্যাংক ঋণের সুদের চাকা ঘুরতে থাকে। এদিকে বিভিন্ন সময়ে কারখানা ঘেরাওয়ের মতো ঘটনা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। অযৌক্তিক দাবিতে শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে আসা, ঈদের সময় অতিরিক্ত ছুটির দাবি এসব ঘটনায় স্থানীয় মানুষ অথবা কোনো রাজনৈতিক বা স্থানীয় লোকজনের ইন্ধন থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সরকার কঠোর না হলে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। অন্তর্বর্তী সরকারের অস্থায়ী প্রকৃতির কারণে বিদেশী এবং দেশীয় বিনিয়োগকারীরা কেউই এর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হতে পারছে না। বিনিয়োগকারীরা একটি স্থিতিশীল সরকার চান, যা দ্রুত গঠিত হলে সরকারের ওপর নির্ভরতা বাড়বে এবং বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে বলে আমি মনে করি।
বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী রকম?
একটি রাজনৈতিক সরকারের অনেক বিষয় গোপন থাকে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের তেমন কিছু নেই। একটি বাস্তবমুখী, কর্মমুখী, বিনিয়োগবান্ধব এবং ব্যবহারিক বাজেট প্রত্যাশা করছি। নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে রফতানির ওপর বর্তমানে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া হলেও মোট পণ্যের ওপর ১ শতাংশ উৎসে কর কাটা হচ্ছে, যা অত্যন্ত বেশি। তিনি মনে করেন, রফতানির ক্ষেত্রে এ উৎসে কর তুলে নেয়া উচিত, অর্থাৎ শূন্য করা উচিত। পাশাপাশি প্রণোদনার পরিমাণ আরো বাড়ানো হলে রফতানিকারকরা আরো উৎসাহিত হবেন, যা রফতানি ও বিনিয়োগ উভয়কেই বৃদ্ধি করবে। যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের কারণে চীন বিকল্প বিনিয়োগের স্থান খুঁজছে। তবে তাদের পছন্দ বাংলাদেশ নয়, বরং ভারত, পাকিস্তান বা অন্যান্য দেশ। আমি মনে করি, বাংলাদেশকে এ সুযোগটি কাজে লাগাতে হবে এবং আকর্ষণীয় প্রস্তাবের মাধ্যমে চীনসহ বিভিন্ন বিনিয়োগকারীকে আকৃষ্ট করতে হবে।
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বিষয়ে কিছু বলতে চান?
আমরা মনে করছি যে এ মুহূর্তে সরকারের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না। যে প্রস্তুতির দরকার ছিল সেটা আমাদের নেই। আমাদের ইউটিলিটি নেই, গ্যাসের চাপ কম, এলএনজি আনতে পারছি না। স্থানীয়ভাবে গ্যাসের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। যতদিন জ্বালানি প্রাপ্যতা নিশ্চিতের বিষয়টি স্পষ্ট হবে, ততদিন নতুন বিনিয়োগ আসবে না।
বাজেটে আর কোনো প্রত্যাশা রয়েছে কী?
বিনিয়োগ আকর্ষণ করে এমন বাজেট দিতে হবে। প্রতিবেশী বা প্রতিযোগী দেশের তুলনায় যদি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ কাঠামো না দেয়া হয়, তাহলে কেউই বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না। ভারতের ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় বিনিয়োগ অফার বা প্যাকেজ দেয়া হচ্ছে। দেশী-বিদেশী সবাই সেখানে বিনিয়োগে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আমাদের সে রকম কোনো প্যাকেজ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত বিনিয়োগ সম্মেলন থেকে যেই পরিমাণ প্রতিশ্রুতিগুলো পেলাম, সেগুলো আমরা স্থানীয়রাই করতে পারি, যদি আমাদের গ্যাস দেয়া হয়। কিন্তু সেই সুরক্ষা আমাদের জন্য কোথায়? ওয়ান স্টপ সার্ভিস করতে হবে, ইপিজেডগুলো বানিয়ে রাখছে সেখানে কোনো গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই। আপনারা যদি ভারতে পরিদর্শনে যান তাহলে দেখবেন কীভাবে ব্যাপক হারে সেখানে বিনিয়োগ হচ্ছে। অনেক বড় বিনিয়োগকারীরা সেখানে বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা আকর্ষণীয় অফারে প্রতিযোগী বা প্রতিবেশী দেশে বিনিয়োগ করছে।










