বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) সরকারি ও বেসরকারি খাতের শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী একমাত্র ও একক জাতীয় চেম্বার। দেশের কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির জন্য শিল্প খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে বিসিআই। শিল্প সেক্টরের নিরবচ্ছিন্ন প্রবৃদ্ধির জন্য এ খাতের শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক কর কাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে শিল্প খাতে জ্বালানি সংকট, বাংলাদেশে এডিপি বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি শিল্প প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এসব সমস্যা সমাধানে নিম্নলিখিত সুপারিশ উত্থাপন করছি:
১. চলমান ব্যবস্থা ও এলডিসি হতে উত্তরণ পর্যায়ে কাস্টমস, মূসক ও আয়কর সংক্রান্ত বিধি-বিধান ও পদ্ধতি, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, বিশ্ব কাস্টমস সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক চর্চার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা এবং আইনি ও পদ্ধতিগত সংস্কার করা।
২. টেকসই অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ, ব্যবসা-বান্ধব ও করদাতা সহায়ক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে আমদানি শুল্ক, আয়কর এবং মূল্য সংযোজন কর বিষয়ে বিদ্যমান বিধি-বিধান সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা।
৩. নিত্যব্যবহার্য পণ্য এবং কাঁচামালের মূল্য ও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা। শিল্প ও সেবা খাত, মাইক্রো, ক্ষুদ্র এবং মাঝারিসহ উৎপাদনশীল করা। সরবরাহ খাতের শুল্ককর হারের সুস্থির যৌক্তিক স্তরবিন্যাস করা।
৪. কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস করে অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য যুগোপযোগী কারিগরি-প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল পরিষেবা প্রবর্তন।
৫. সুষম কর ব্যবস্থা, ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণ ও উৎপাদনশীলতার ধারাবাহিক বৃদ্ধি সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ কর ও পরোক্ষ করের বিদ্যমান অনুপাত ৩৫:৬৫ থেকে দ্রুত ৬৫:৩৫ এ নামিয়ে আনার প্রস্তাব করছি।
জাতীয় শুল্ক ও কর পরিকাঠামো
১. কর ব্যব্যস্থা সহজীকরণ করা। করহার কমিয়ে আয়কর এবং মূসকের আওতা সম্প্রসারণ করার জন্য বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে আয়কর ও মূসকের আওতায় নিবন্ধন করা। নিয়মিত রিটার্ন দাখিল তদারক করতে সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন ব্যবসা ও পেশাজীবী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, লাইসেন্স ও নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করার জবাবদিহিমূলক বিশেষ বিধান করা।
২. সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ধরনের কাজে হালনাগাদ কর নিবন্ধন নম্বর এবং কর পরিশোধের হালনাগাদ সনদ দাখিল বাধ্যতামূলক করা।
৩. সরকারি-বেসরকারি, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রদত্ত যাবতীয় শুল্ক ও করসহ অন্য সুবিধার সমতায়নের প্রস্তাব করছি।
আয়কর
১. দেশের বিনিয়োগ চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করে যুগোপযোগী আয়কর আইন প্রণয়ন।
২. একই আয়ের ওপর একাধিকবার কর আদায় পরিহার করে সব করায়িত আয় চূড়ান্ত করযোগ্য আয়ের হিসাব থেকে বাদ দেয়া।
৩. স্থানীয় ঋণপত্রের ওপর ৩% হারে, এলসি কমশনের ওপর ৫% এবং আমদানি পর্যায়ে ৫% উৎসে কর আদায় করা হয়, যা সমন্বয় করা বা ফেরত পাওয়া যায় না। এসব উৎসে কর রহিত করা বা ক্ষেত্রমতো প্রকৃত মুনাফার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করা।
৪. কেবল চূড়ান্ত করযোগ্য নিট আয়ের লাভ লোকসানের ভিত্তিতে আয়কর আরোপ করার প্রস্তাব করছি।
মূসক
১. নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত টার্নওভারকারী একক বা সম্পর্কিত এন্টারপ্রাইজগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এলটিইউ তালিকাভুক্ত করা। সব বৃহৎ কর অঞ্চলে এলটিইউ স্থাপন করা।
২. নিম্ন আয় ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যবহার্য পণ্য, সাধারণ পণ্য পরিবহন, নিত্যপ্রয়োজনীয় অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবা, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শিল্পের কাঁচামাল/উপকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রি-সাইক্লিং, টেন্ডার-বহির্ভূত সরাসরি পণ্য মেরামত বা সার্ভিসিং খাত ইত্যাদি ক্ষেত্রে মূসক ও সম্পূরক শুল্ক স্থায়ী অব্যাহতি দেয়া।
৩. আমদানি করা উপকরণ ব্যবহারের ওপর এক দফায় মূসক আরোপিত হলেও সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের ক্ষেত্রে দুই দফায় মূসক আরোপিত হয়। ফলে স্থানীয় উৎপাদন মূল্য অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে। তাই উৎপাদন খাতের কোনো প্রতিষ্ঠান (১ম পক্ষ) অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে (২য় পক্ষ) সাব-কন্ট্রাক্টিং ভিত্তিতে উপকরণ উৎপাদন চুক্তি করলে চুক্তিবদ্ধ দ্বিতীয় পক্ষের ১ম পক্ষের নিকট উপকরণ সরবরাহের ওপর মূসক অব্যাহতি প্রদান করার প্রস্তাব করছি।
আমদানি শুল্ক
১. আন্তর্জাতিক চর্চা ও বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শুল্ক মূল্য নির্ধারণ চুক্তির পরিপন্থী, মুদ্রা পাচারে সহায়ক বিদ্যমান ট্যারিফ মূল্য ও মিনিমাম ভ্যালু সংক্রান্ত বিধান রহিত করা। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার শুল্ক মূল্য নির্ধারণ চুক্তির বিধান অনুযায়ী প্রণীত শুল্ক মূল্যায়ন (আমদানি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ) বিধি এসআরও নং-৫৭-আইন/২০০০/১৮২১/শুল্ক, তাং ৩/০২/২০০০ কাস্টমস আইন ২০২৩ এর ২৭ ধারায় সন্নিবেশ করে কার্যকর করা।
২. প্রায়ই কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়ায় বিলম্বের সম্মুখীন হতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে ডকুমেন্টেশন পূর্ণাঙ্গ করতে ৭২-১৫০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। পণ্য ছাড়াতে আরো সময়ের প্রয়োজন হয়। এ বিলম্ব অতিরিক্ত মাসুলের/খরচের সৃষ্টি করে যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়ায়। এজন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়াগুলোকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করার প্রস্তাব করছি।
রফতানি বহুমুখীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি
১. দেশী-বিদেশী বাজারমুখী সামগ্রিক উৎপাদনশীল শিল্প খাতের সহায়ক যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা সব খাতের জন্য অবারিত করা। বিশ্ব সরবরাহ চেইনে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে সামগ্রিক শিল্প খাতগুলোকে দেশী-বিদেশী বাজারমুখীকরণের টেকসই ধারাবাহিক কর্মসূচি গ্রহণ এবং নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন করা।
২. রফতানি পণ্য প্রস্তুতকরণে ব্যবহৃত আমদানীকৃত এবং দেশীয় উপকরণের ওপর পরিশোধিত সব শুল্ক ও কর মওকুফ গণ্য করে একক বিভাগ মারফত ফেরত প্রদান করা। ৩. দেশ-বিদেশে ভোক্তাদের দ্বারপ্রান্তে পণ্য নিয়ে যেতে এসএমই খাতের রফতানি পণ্যের জন্য ওয়্যারহাউজ ও বিতরণ ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে সিএমএসএমইগুলোকে বৈশ্বিক ই-কমার্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম করা।
৪. অহেতুক খরচ ও সময় কমানোর জন্য রফতানি খাতসহ শিল্প খাতে উৎস ও আগাম কর ফেরত দেয়ার পরিবর্তে বিলোপ করা।
গত ৫ জুলাই-আগস্ট মাসের বিপ্লব ও পরবর্তী সময়ে তৈরি পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। এতে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিদেশী ক্রেতারা তাদের অর্ডার ভারত, ভিয়েতনাম ও শ্রীলংকার মতো দেশগুলোয় স্থানান্তর করেছে। এ সংকট মোকাবেলায় ও রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতা বাড়ানোর জন্য রফতানি আয়ের উৎসে কর ১% থেকে কমিয়ে ০.৫% করা।
৬. এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে রফতানিতে বর্তমান নগদ প্রণোদনা ও ভর্তুকির মধ্যে যেগুলো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় সেগুলো ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনা। এর পরিবর্তে বিকল্প উপায়ে রফতানি প্রণোদনা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করছি।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত
১. এসএমই খাতের বিকাশের জন্য পৃথক করহার নির্ধারণ করা প্রয়োজন। টার্নওভার কর হ্রাস করা হলে এসএমই ব্যবসায়ীরা করের আওতায় আসতে উৎসাহিত হবে।
২. তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের জন্য বাজেটে বিশেষ তহবিল গঠন করা।
৩. ক্ষুদ্র শিল্প ও নারী উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে খাতভিত্তিক যৌথ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিভাগভিত্তিক দুই-তিনটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন সাপেক্ষে বন্ডেড-ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রদান করা;
৪. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য কর পরিপালন সহজ করা। কর নেটের আওতায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে উৎসাহিত করার জন্য কর নির্ধারণ ও আয়কর পরিগণনা প্রক্রিয়া সহজকরণ করা।
৫. মাইক্রো, কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প খাতে সব ধরনের ইউটিলিটির ওপর ভ্যাট অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব করছি। ৬. শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বৃহৎ ও ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য করারোপের ভিন্নতা পরিহারের প্রস্তাব করছি।










