২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে চলেছে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বাড়তে থাকা মুদ্রাস্ফীতি, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দেশের ব্যবসা খাতে প্রবৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, একটি সমর্থক কর কাঠামো তৈরি, পাশাপাশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট, রফতানি বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য নীতিমালা তৈরি; সর্বোপরি দেশের এ অস্থির সময়ের মধ্যেও দেশের শিল্প, ব্যবসা ও বাণিজ্য গতিশীল রাখার জন্য সরকার যথেষ্ট সচেষ্ট। বর্তমান বাস্তবতায় নীতিগত স্থিতিশীলতা ও সময়োপযোগী সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থা ফিরিয়ে এনে অর্থনীতিকে আগামীর সম্ভাবনাময় পথে এগিয়ে নিতে এবারের বাজেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের বিষয়টিকে সামনে রেখে এবারের বাজেট প্রণয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং শিল্প-বাণিজ্যেও টেকসই অগ্রগতির প্রত্যাশা পূরণের জন্য একটি সুপরিকল্পিত রূপরেখা প্রয়োজন। এ বাজেট প্রস্তাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠনের বিষয়গুলো দক্ষতার সঙ্গে বিবেচনা করা আবশ্যক। ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জনের পথে কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদনশীল খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প খাতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিনিয়োগবান্ধব ও সহজ কর কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো অপরিহার্য।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন এবং দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগে গতি আনা। এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারের বাস্তবভিত্তিক ও ব্যবসাবান্ধব প্রস্তাব তৈরি করা প্রয়োজন, যা দেশের অর্থনীতিকে আরো স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
এমসিসিআই বিশ্বাস করে, বাজেটে প্রস্তাবিত কর কাঠামোর সরলীকরণ, করহার যৌক্তিকীকরণ এবং নীতিগত স্বচ্ছতা ব্যবসায়ীদের আস্থা বৃদ্ধি করবে। বিশেষ করে উৎপাদনশীল খাত, রফতানি খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নে উৎসাহ দেবে। উৎপাদন খাতে শুল্ক-করের ভারসাম্য রক্ষা, দক্ষ জনবল গড়তে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি তৈরিতে বাজেটে দিকনির্দেশনা থাকা প্রয়োজন, যা সময়োপযোগী ও যুগোপযোগী। নীতিগত স্বচ্ছতা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য কর প্রশাসন ও কর নীতিমালার মধ্যে পৃথককরণ এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি করপোরেট করের হার যৌক্তিকীকরণ, উৎসে কর ব্যবস্থার সংস্কার, ডিজিটাল কর ব্যবস্থা চালু এবং আমদানি পর্যায়ে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার প্রবর্তন দেশের অর্থনীতিকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তা, বন্দর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পরিবহন অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হলে রফতানি খাত এবং অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নের গতিশীলতা বহুগুণে বাড়বে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগের ওপর জোর দেয়া হলে ভবিষ্যৎ শিল্প প্রয়োজন ও পরিবেশ সুরক্ষা দুটিই নিশ্চিত করা যাবে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি দেশের নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়ক হবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও উদ্ভাবনমুখী গবেষণায় বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কর-নেট সম্প্রসারণ এখন সময়োপযোগী ও অপরিহার্য। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছেনি, যা একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে দেশের করের ভার একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ওপরই অধিকাংশ সময় কেন্দ্রীভূত থাকে, ফলে কর ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ জনগণের আস্থা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্মানিত চেয়ারম্যানের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আয়করদাতা নিবন্ধিত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ হলেও নিয়মিত রিটার্ন দাখিলকারীর সংখ্যা মাত্র ৪৫ লাখ। এর মধ্যেও দুই-তৃতীয়াংশ করদাতা শূন্য রিটার্ন দাখিল করেন। অন্যদিকে প্রায় ৮০ লাখ নিবন্ধিত করদাতা এখনো রিটার্ন দাখিলের আওতার বাইরে রয়ে গেছেন। বিপুলসংখ্যক অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় নাগরিক করের আওতার বাইরে রয়ে যাওয়ায় কর কাঠামো অসম ও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে কর হার বৃদ্ধি না করে কর-নেট সম্প্রসারণই হতে পারে রাজস্ব বৃদ্ধির সবচেয়ে টেকসই পথ। একই সঙ্গে কর ফাঁকি রোধ, কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে করদাতাদের জন্য কর প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন। একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়সংগত কর ব্যবস্থাই দেশের অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
এমসিসিআই সবসময়ই একটি উন্নত রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালুকরণে গুরুত্ব আরোপ করে আসছে। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বর্তমান সরকারের দক্ষ নেতৃত্ব এবং বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যানের সামগ্রিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে এনবিআর দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে চলছে।
এমসিসিআই বাজেট প্রস্তাবের মধ্যে সবসময়ই বাজেট ব্যবস্থাপনা অধিকতর গতিশীল করার দিকে জোর দিয়ে থাকে। এমসিসিআই বিশ্বাস করে যে বাজেট ব্যবস্থাপনা গতিশীল ও স্বচ্ছ হলে ব্যবসায়ীরা স্বপ্রণোদিত হয়ে রাজস্ব প্রদান করবে। এমসিসিআই তাদের বাজেট প্রস্তাবে সামগ্রিক কল্যাণ তথা দেশের কল্যাণ ও ব্যবসায়ীদের কল্যাণ চিন্তা করে থাকে। এতে একদিকে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হয়, অন্যদিকে দেশের রাজস্ব আয়েও ঘাটতি হয় না। এমসিসিআই জনগণের বিদ্যমান আয় রক্ষা করে এমন প্রবৃদ্ধিভিত্তিক নীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে বাজেট প্রস্তাব দিয়ে থাকে।
আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০২৫-২০২৬-এর জন্য এমসিসিআই নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছে:
১. করপোরেট কর হার ও কার্যকর করের যৌক্তিকীকরণ: করপোরেট করের হার হ্রাস করা¡ও নগদ লেনদেনের শর্তের কারণে ব্যবসায়ীরা এর সুবিধা নিতে পারছেন না। এছাড়া অ-অনুমোদিত ব্যয় ও উৎসে কর কর্তনের (টিডিএস) কারণে কার্যকর করের হার অনেক বেশি। এ শর্তাবলি পুনর্বিবেচনা ও কার্যকর করের বোঝা কমিয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান উৎসাহিত করা আবশ্যক।
২. নীতি ও প্রশাসন পৃথক্করণ: একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক কর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কর নীতি প্রণয়ন এবং কর প্রশাসনের কার্যক্রমকে পৃথক করা জরুরি।
৩. কর ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন ও সরলীকরণ: কর দাখিল ও পরিশোধ প্রক্রিয়া সহজ করতে এবং কর অফিসে সরাসরি যাতায়াত কমাতে একটি সমন্বিত অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সব কর-সংক্রান্ত পরিষেবা এক জায়গায় আনার গুরুত্ব অপরিসীম।
৪. রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্রের (পিএসআর) যৌক্তিক প্রয়োগ: বিপুলসংখ্যক পিএসআর দাখিলের বাধ্যবাধকতা ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে জটিল করে তুলছে। এর ব্যবহারিক পর্যালোচনা ও পরিধি সীমিত করা প্রয়োজন।
৫. নিরীক্ষার সময়সীমার পুনর্বিবেচনা: নতুন আয়কর আইনে নিরীক্ষার জন্য ছয় বছর সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়টি পূর্ববর্তী আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন।
৬. অনুমোদিত তহবিলের ওপর কর প্রত্যাহার: বেসরকারি খাতের ভবিষ্যৎ তহবিলসহ অন্যান্য কল্যাণ তহবিলের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহারের সুবিধা থাকা প্রয়োজন।
৭. আমদানি পর্যায়ে কাস্টমস কর্তৃক সঠিক মূল্য নির্ধারণ: আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্যের ভিত্তিতে একটি স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালুর ব্যবস্থা।
৮. স্থানীয় শিল্পের বিকাশে প্রণোদনা: স্থানীয় শিল্পের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কর হার হ্রাস, ভ্যাট ও শুল্ক যৌক্তিকীকরণ এবং যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা।
৯. মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কর হার পুনর্বিন্যাস: ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে একটি বাস্তবসম্মত কর কাঠামো তৈরির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা।
১০. উৎসে কর কর্তন নীতির সংস্কার: ব্যবসায়িক বাস্তবতার নিরিখে উৎসে কর কর্তনের নিয়ম ও হার পুনর্নির্ধারণ বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১১. ভ্যাট আইনের সরলীকরণ: ই-ইনভয়েসিং ও রেয়াত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো সরল রাখা।
আসন্ন বাজেটে সুবিন্যস্ত কর কাঠামো, শুল্ক-ভ্যাট নীতির সহজীকরণ, উৎপাদন খাতে উদ্ভাবনী প্রণোদনা এবং রফতানি প্রবৃদ্ধি-সহায়ক উদ্যোগ দেশের শিল্প ও ব্যবসায় নতুন গতি জোগাবে।
এমসিসিআই সবসময় সরকারের অংশীদার হয়ে ব্যবসাবান্ধব ও প্রবৃদ্ধিবান্ধব নীতি তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের প্রস্তাবিত সুপারিশ বাজেটে প্রতিফলিত হলে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি হবে আরো শক্তিশালী, প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই।
আমাদের প্রত্যাশা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা।










